গতকাল ফ্রাঙ্কফুর্টের হিমশীতল সন্ধ্যাকে অগ্রাহ্য করে এক উষ্ণ মানবিক আবেশে ভরে উঠেছিল প্রবাসী বাঙালির মন। বাইরে ছিল কনকনে ঠান্ডা, বাতাসে শীতের ধারালো স্পর্শ; অথচ শহরের এক উষ্ণ হলে অনুষ্ঠিত রবি সন্ধ্যার পাঠচক্রে শব্দ, সুর আর অনুভবের আলোয় যেন শীতলতা গলে গিয়েছিল। কবিতা, গান ও গল্পের সম্মিলনে এই পাঠচক্র কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়ে থাকেনি—এটি হয়ে উঠেছিল প্রবাসে বেঁচে থাকার এক আবেগময় উৎসব, স্মৃতি ও শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক নির্ভর আশ্রয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সূচনা বক্তব্য পাঠ করেন হাবিব বাবুল। তাঁর কণ্ঠে ছিল প্রবাসে থেকেও ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আগলে রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই পাঠচক্র কোনো একদিনের আয়োজন নয়; এটি একটি ধারাবাহিক যাত্রা, যেখানে প্রবাসের ব্যস্ত জীবন ছাপিয়ে মানুষ ফিরে আসে নিজের ভাষার কাছে, নিজের অনুভবের কাছে। পুরো অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে পরিচালনা করেন নুরল আকন্দ খোকন। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা ও আন্তরিক উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে রেখেছিল প্রাণবন্ত, সংহত ও গতিশীল।
এই পাঠচক্রের এক আবেগঘন মুহূর্ত ছিল সদ্য প্রয়াত পাঠচক্রের কবি দীপঙ্কর দাশগুপ্তের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। নীরবতার মধ্যে উচ্চারিত হয় তাঁর নাম—একজন কবি, একজন সহযাত্রী, যিনি পাঠচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন হৃদয়ের টানে। তাঁর অকালপ্রয়াণে শূন্য হয়ে যাওয়া সেই আসন যেন সবার চোখে ভাসছিল। অনুষ্ঠানে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আগামীতে দীপঙ্কর দাশগুপ্তের স্মরণে একটি স্মরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে, যেখানে তাঁর কবিতা ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে তাঁকে নতুন করে অনুভব করা হবে। এই সিদ্ধান্ত পাঠচক্রকে আরও মানবিক ও দায়বদ্ধ এক উচ্চতায় নিয়ে যায়।
কবিতার পর্বে এক অনন্য আবেশ সৃষ্টি করেন বিলকিস সুলতানা বকুল ও নুরল আকন্দ খোকন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সাদাত হোসেন এবং নিরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা আবৃত্তিতে বিলকিস সুলতানা বকুল যেন শব্দকে শুধু উচ্চারণ করেননি, বরং হৃদয়ের গভীর স্তর থেকে তুলে এনেছেন অনুভূতির রং। তাঁর কণ্ঠে সুনীলের নিঃসঙ্গতা, নিরেন্দ্রনাথের প্রতিবাদী উচ্চারণ আর সাদাত হোসেনের জীবনঘনিষ্ঠ ভাষা মিলেমিশে শ্রোতাদের এক গভীর অনুভবের জগতে নিয়ে যায়।
নুরল আকন্দ খোকন নিজের লেখা কবিতার বই “ কে যায়” থেকে নির্বাচিত কবিতা আবৃত্তি করেন এবং কবিতার ভাবধারা তুলে ধরেন। তাঁর কবিতায় উঠে আসে প্রবাসজীবনের নীরব দীর্ঘশ্বাস, ফেলে আসা শহর ও মানুষের স্মৃতি, আর চলমান জীবনের অনিবার্য যাত্রা। কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ছিল সময়ের ক্ষয়, আবার একই সঙ্গে ছিল টিকে থাকার দৃঢ়তা। শ্রোতারা যেন তাঁর কবিতার ভেতরে নিজের গল্প, নিজের না-বলা কথাগুলো খুঁজে পান।
গানের পর্বে পাঠচক্রে যুক্ত হয় সুরের মায়া। আতিকুর রহমান সবুজ আধুনিক গান, রবীন্দ্রসংগীত এবং লালনগীতি পরিবেশন করে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের ভাববাদী দর্শন আর লালনের মানবতাবাদ প্রবাসের সীমানা পেরিয়ে হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে যায়। নিম্নি কাদের তাঁর মিষ্টি কণ্ঠে আধুনিক ও দেশের গান পরিবেশন করে উপস্থিত সবাইকে গানের আবেগে ভাসিয়ে নেন। তাঁর গানে ছিল শিকড়ের টান, ছিল দেশের মাটির ঘ্রাণ—যা প্রবাসে থেকেও চোখে জল এনে দেয়, মনে জাগায় নস্টালজিয়া।
বাবুল তালুকদারের ক্লাসিক্যাল গান ও তবলার বাঁধন পুরো অনুষ্ঠানকে পৌঁছে দেয় এক ভিন্ন উচ্চতায়। তাঁর শুদ্ধ সুর ও তালের নিখুঁত সমন্বয় শ্রোতাদের মনোযোগকে কেন্দ্রীভূত করে দেয় সংগীতের গভীরে। তবলার প্রতিটি আঘাতে, প্রতিটি ছন্দে যেন সময় থমকে যায়, আর শ্রোতারা হারিয়ে যান এক ধ্যানী মুহূর্তে।
এই সাংস্কৃতিক আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তরিক আপ্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা। বদরুন্নাহার রহমান উপস্থিত সবার জন্য মুড়ি, ছোলা ও চায়ের ব্যবস্থা করেন। প্রবাসে এই সাধারণ মুড়ি আর মজাদার ছোলা যেন হয়ে ওঠে এক আলাদা আকর্ষণ—দেশের উঠোনে বসে বিকেলের আড্ডার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। খাবারের স্বাদে যেমন ছিল দেশ, তেমনি ছিল মানুষের আন্তরিকতার উষ্ণতা। অনুষ্ঠানে ছবি তোলা ও অন্যান্য বিভিন্ন দিকের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন তমজিদুল ইসলাম, যাঁর নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পুরো আয়োজনকে করে তোলে আরও সুশৃঙ্খল ও স্মরণীয়।
ফ্রাঙ্কফুর্টের এই রবি সন্ধ্যার পাঠচক্র আবারও প্রমাণ করে, প্রবাস মানেই শেকড়ছেঁড়া জীবন নয়। বরং ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে দূরদেশেও গড়ে ওঠে এক আপন ভুবন। কবিতা, গান, স্মৃতি আর মানুষের ভালোবাসায় এই পাঠচক্রে প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছিল—যা হিমশীতল আবহাওয়াকেও হার মানিয়ে দিয়েছিল হৃদয়ের উষ্ণতায়। এমন আয়োজন প্রবাসী জীবনে শুধু বিনোদন নয়; এটি পরিচয়ের দীপ, স্মৃতির আশ্রয় এবং আগামী দিনের পথে এগিয়ে চলার এক অনিবার্য প্রেরণা।

