স্বর্ণমুদ্রাই বৈশ্বিক অর্থনীতির চাবিকাঠি

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে—যখন যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক বিনিময় হারের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ (মোরাটোরিয়াম) আরোপ করে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনীতি কার্যত এক স্থায়ী “অস্থায়িত্বের” মধ্যে প্রবেশ করে। অন্য কথায়, তৎকালীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে শুরু করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর উপকূলবর্তী ব্রেটন উডসে একত্রিত হয়, ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ধারণের জন্য। তৎকালীন প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে দাবি তোলে—তাদের জাতীয় মুদ্রা মার্কিন ডলারই হবে আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম।

এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশ। যুক্তরাজ্যের পক্ষে অবস্থান নেন বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইন্স। তাঁর যুক্তি ছিল, একটি কৃত্রিম মুদ্রাকে বৈশ্বিক বিনিময় মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। সাময়িকভাবে এর সুফল মিললেও, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিই স্থায়ী হয়ে উঠতে পারে।

এর বিকল্প হিসেবে কেইন্স প্রস্তাব করেন আরেকটি কৃত্রিম মুদ্রা—এসডিআর বা স্পেশাল ড্রয়িং রাইট—যা স্বর্ণের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যম হতে পারত। কেইন্সের খ্যাতি এবং তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাজ্যের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে নতুন আর্থিক কাঠামোয় তাঁর প্রস্তাব আংশিকভাবে, বলা যায় প্রতীকীভাবেই, অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইতিহাসে এই প্রথম স্বর্ণের পরিবর্তে একটি কৃত্রিম মুদ্রা আন্তর্জাতিক বিনিময় ব্যবস্থার কেন্দ্রে স্থান পায়।

প্রথমদিকে এই নতুন আর্থিক ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দেয়। মার্শাল পরিকল্পনা এবং বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সহায়তার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপ ও জাপান, দ্রুত পুনরুজ্জীবিত হয়। ১৯৫৫ সালের মধ্যে পশ্চিম ইউরোপে “অভাবের দিন” কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়; তুলে নেওয়া হয় মূল্যনিয়ন্ত্রণ, রেশনিং ব্যবস্থা। বৈশ্বিক অর্থনীতি তখন কার্যত “উন্নতির জোয়ারে”।

কিন্তু ১৯৬৬ সালে প্রথম বড় ধরনের ধাক্কা আসে ফ্রান্সে। ফরাসি মুদ্রা ফ্রাঁর অবমূল্যায়ন ঘটে, যার পরিণতিতে শার্ল দ্য গল সরকারের পতন ঘটে এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ফিফথ রিপাবলিক। ফ্রান্সের এই মন্দার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পশ্চিম ইউরোপে। ছাত্র ও শ্রমিকরা রাজপথে নেমে আসে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে—“পরিবর্তন” দাবি করে এবং ইন্দোচীনের অরণ্যে চলমান ব্যয়বহুল যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানায়।

চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা সাড়া দিতে বাধ্য হন। ১৯৭১ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের পথে হাঁটে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে সরে আসে এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ‘দেতাঁত’ নামে পরিচিত সংলাপ প্রক্রিয়া শুরু করে।

তবে ততদিনে নতুন নতুন সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো একত্রিত হয়ে ওপেক গঠন করে এবং নিজেদের পণ্য ও অঞ্চলের জন্য ন্যায্য মূল্য দাবি করে। একই সময়ে, দূরপ্রাচ্যের কমিউনিজমবিরোধী দেশগুলো গড়ে তোলে আসিয়ান—যেমনটি এর আগে ন্যাটো দেশগুলো করেছিল।

এই নতুন শক্তিগুলোর পাশাপাশি চীন ক্রমশ আবির্ভূত হয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আধিপত্যের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে। এর আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের ফলে পূর্ব ইউরোপে নতুন রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।

এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় প্রতিক্রিয়া হিসেবে জি-৭ সম্প্রসারিত হয়ে জি-২০-এ রূপ নেয় এবং ব্রিকস প্লাস গঠিত হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখনো বিশ্বকে স্থিতিশীল করতে যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি।

বরং বিশ্বের ‘নম্বর ওয়ান’ শক্তি অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের বদলে এখন ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণের পথে হাঁটছে—যার শুরু ভেনেজুয়েলার তথাকথিত “অধিভুক্তি” দিয়ে। এতেও যেন ক্ষান্ত নয়; যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘পুরোনো বিশ্ব’-কেও হুমকি দিচ্ছে, ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড গ্রাস করার হুমকি দিয়ে।

লেখক: আলী সানোয়ার
রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.