প্রতিশ্রুতির রাজনীতি ও জনগণের স্বপ্নভঙ্গ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন এলেই প্রতিশ্রুতির জোয়ার নামে। কখনো তা জোয়ার নয়, একেবারে সুনামি। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা—সবকিছু একসাথে দেওয়ার অঙ্গীকার শোনা যায়। বাস্তবে যেগুলোর বেশিরভাগই ক্ষমতায় যাওয়ার পর আর জনগণের চোখে পড়ে না। প্রতিশ্রুতির এই রাজনীতি নতুন কিছু নয়, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা বেড়েছে, আর বেড়েছে জনগণের হতাশা ও অবিশ্বাস।

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও সেই চেনা চিত্র। ডান, বাম, মধ্যপন্থী, ধর্মভিত্তিক কিংবা তথাকথিত স্বতন্ত্র—সব রাজনৈতিক দলই প্রতিযোগিতায় নেমেছে কে বেশি, কে বড়, কে আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—এসব বিবেচনা যেন কোথাও নেই। ভোটের অঙ্কে প্রতিশ্রুতি সাজানো হচ্ছে, বাস্তবায়নের প্রশ্নটিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ভবিষ্যতের অন্ধকারে।

সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামির আমীর কেরু অ্যান্ড কোম্পানিকে আবার চালু করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা এই প্রতিশ্রুতির রাজনীতির একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। জামায়াতে ইসলামী ইসলাম ধর্মকে সামনে রেখে রাজনীতি করে—এটাই তাদের পরিচয় ও দাবি। অথচ ইসলাম ধর্মে মদ স্পষ্টভাবে হারাম। কেরু কোম্পানি ঐতিহাসিকভাবে মদ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ধর্মীয় আদর্শের কথা বলে রাজনীতি করা একটি দল কীভাবে এমন একটি প্রতিশ্রুতি দিতে পারে ? এটি নিছক অসাবধানতা নয়, বরং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হিসাব।

এই হিসাব খুবই সহজ—অর্থনৈতিক লাভ ও ভোটব্যাংক। কেরু কোম্পানি শুধু মদের কারখানা নয়, এটি একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থানের প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপন করা যায়। সেই সুযোগটি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করাই এখানে মূল উদ্দেশ্য। ধর্মীয় আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও বাস্তব রাজনীতির লাভের খাতায় যদি এটি যোগ হয়, তবে আদর্শকে সাময়িকভাবে আড়ালে রাখতেও দ্বিধা নেই। এখানেই প্রতিশ্রুতির রাজনীতির নৈতিক দেউলিয়াপনা স্পষ্ট হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ফারাক নতুন নয়। স্বাধীনতার আগে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতারা নানা প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। স্বাধীনতা মানেই ছিল শোষণমুক্ত সমাজ, অর্থনৈতিক সমতা, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র। কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই সময়ে দেওয়া বহু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি—কিছু ক্ষেত্রে সম্ভব ছিল না, কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ছিল, আবার কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতার লোভ ও স্বার্থপরতা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

৫৪ বছর পর আজ আমরা আবারও সেই একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে আগের চেয়েও বেশি, আগের চেয়েও বড়। কিন্তু রাষ্ট্রের বাস্তবতা বদলেছে কি? বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ চাপের মুখে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ঋণের বোঝা, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব—সব মিলিয়ে সরকারের কোষাগার যে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে, তা বলা যায় না। যেকোনো বড় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন, অথচ সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে—তার কোনো বাস্তব রূপরেখা রাজনৈতিক দলগুলো দেয় না।

রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলা হয় বিনামূল্যে শিক্ষা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, বেকারত্ব দূরীকরণ, গ্রামে গ্রামে শিল্পকারখানা, শহরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা—সব একসাথে। কিন্তু অর্থনীতির প্রাথমিক নিয়মই বলে, বিনামূল্যে কিছুই আসে না। রাষ্ট্রের আয় বাড়াতে হলে কর ব্যবস্থা সংস্কার করতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এসব কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজের কথা বলার চেয়ে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়াই রাজনৈতিকভাবে লাভজনক।

এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নযোগ্যতা বিচার করলে দেখা যায়, এর অন্তত ৮০ শতাংশই কাগুজে। রাজনৈতিক ভাষণে তা যতই আকর্ষণীয় শোনাক না কেন, বাস্তবে তা পূরণ করার মতো আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। তবু এই প্রতিশ্রুতির বন্যা থামে না, কারণ রাজনীতিতে এখন প্রতিশ্রুতি মানে আর অঙ্গীকার নয়—এটি একটি কৌশল, একটি বাজারজাত পণ্য।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই প্রতিশ্রুতির রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী জনগণ। প্রত্যাশা তৈরি হয়, স্বপ্ন দেখা হয়, ভোট দেওয়া হয়। ক্ষমতায় যাওয়ার পর ধীরে ধীরে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলে যাওয়া হয় বা ব্যাখ্যার জালে আটকে দেওয়া হয়। ফলাফল—জনগণের স্বপ্নভঙ্গ, রাজনীতির ওপর অনাস্থা, এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি হতাশা।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি হোক বা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা দল—সবাই একই কায়দায় প্রতিশ্রুতি ব্যবহার করছে। আদর্শ এখানে মুখোশ মাত্র। বাস্তব রাজনীতিতে ক্ষমতাই মুখ্য, আর ক্ষমতার জন্য প্রয়োজনে আদর্শের সঙ্গে আপস করতেও দ্বিধা নেই। কেরু কোম্পানির প্রসঙ্গ তাই শুধু একটি উদাহরণ, পুরো ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।

এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে—এই প্রতিশ্রুতির রাজনীতি থেকে বের হওয়ার পথ কী? এর উত্তর সহজ নয়, তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। প্রতিশ্রুতির মোড়কে মোড়ানো কথার বদলে বাস্তব পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও অতীতের কর্মদক্ষতা বিচার করেই রাজনৈতিক দলকে মূল্যায়ন করতে হবে।

রাজনীতি যদি প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা হিসেবেই চলতে থাকে, তবে স্বপ্নভঙ্গই হবে এর অবধারিত পরিণতি। বাংলাদেশের মানুষ আর নতুন করে স্বপ্ন ভাঙার ভার বহন করতে চায় না। তারা চায় কম কথা, বেশি কাজ; কম প্রতিশ্রুতি, বেশি বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো—রাজনীতিকরা কি সেই বার্তা শুনতে প্রস্তুত ?

লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক: শুদ্ধস্বর ডটকম ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.