গত ২৭ জানুয়ারি ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার মহাশ্বেতা দেবী হলে অনুষ্ঠিত হল ছায়ানট (কলকাতা)-র বিশেষ কবিতা অনুষ্ঠান ‘নানা রঙে নজরুল’। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলামের বহুমাত্রিক সত্তা—বিদ্রোহী, মানবতাবাদী, প্রেমিক ও চেতনার কবি—নজরুলপ্রেমী দর্শকদের সামনে নতুন করে উদ্ভাসিত হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের মে মাসে পথচলা শুরু করে ছায়ানট (কলকাতা)। কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টির বিভিন্ন দিক নিয়ে সারা বছরব্যাপী চর্চা করাই এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য। শুধুমাত্র জন্মদিন বা প্রয়াণ দিবস নয়, বরং নিয়মিত নজরুল-চর্চার ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় ছায়ানট তাদের শিল্পীদের মাধ্যমে নজরুলের সৃষ্টি উপস্থাপন করে থাকে।
এদিনের অনুষ্ঠান শুরু হয় ইন্দ্রাণী নাগের কণ্ঠে নজরুলের ‘বাসন্তী’ কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে। অনুষ্ঠানের প্রতিটি পরিবেশনার আগে নির্বাচিত কবিতা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরেন ছায়ানটের সভাপতি সোমঋতা মল্লিক। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের একাধিক কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে নজরুলের সাম্য ও মানবমুক্তির ভাবনা তুলে ধরা হয়। সুকন্যা রায়ের কণ্ঠে ‘সাম্যবাদী’, অমৃতা দাসের কণ্ঠে ‘নারী’ এবং শর্মিষ্ঠা রায়ের কণ্ঠে ‘বারাঙ্গনা’ দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলেও ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি যে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, তা দর্শকমাত্রেই উপলব্ধি করেন।
অনুষ্ঠানে অন্য মাত্রা যোগ করে অতসী সরকারের কণ্ঠে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘কবির মৃত্যু নেই’ এবং নরেন্দ্র দেবের লেখা ‘জাগো, জাগো নজরুল’। কবিতার মাধ্যমে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে নজরুল-চর্চার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। শিশু শিল্পী সিন্ধুজা গাঙ্গুলী ও শতভিষা দাসের সাবলীল আবৃত্তি অনুষ্ঠানে আলাদা আকর্ষণ সৃষ্টি করে, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নজরুলপ্রেম ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াসকে আরও শক্তিশালী করে।
‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের ‘আগমনী’ কবিতার নির্বাচিত অংশ আবৃত্তি করেন তনুশ্রী অধিকারী। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার পাশাপাশি তাঁর প্রেমিক সত্তাও ধরা পড়ে বিভিন্ন পরিবেশনায়—মৃন্ময়ী দে মুখার্জীর কণ্ঠে ‘বিজয়িনী’, রীতি গাঙ্গুলীর কণ্ঠে ‘কবি-রাণী’, অর্পিতা জানা সাহুর কণ্ঠে ‘রাজভিখারী’ ও ‘পলাতকা’, রাজ্যশ্রী দাসের কণ্ঠে ‘কাল বৈশাখী’, ববিতা গাঙ্গুলীর কণ্ঠে ‘গানের আড়াল’ এবং মাধবী দের কণ্ঠে ‘পথহারা’।
ড. বৈশাখী দাসের কণ্ঠে শোনা যায় নজরুলের স্বল্পশ্রুত কবিতা ‘দে গোরুর গা ধুইয়ে’। স্বাতী ভট্টাচার্যের নির্বাচনে পরিবেশিত হয় ‘অকেজোর গান’ ও ‘পিছুডাক’। নজরুলের দ্বিতীয় পুত্র বুলবুলের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে, কৃষ্ণনগর থেকে লেখা নজরুলের দুটি চিঠি পাঠ করেন সায়ন্তনী বসু।
এছাড়াও, সমাজের কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচালিত ‘লাঙল’ পত্রিকার ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা স্মরণ করা হয়। ‘লাঙল’ পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা ‘সর্বহারা’ আবৃত্তি করেন অমৃতা দাস এবং ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ পরিবেশন করেন সৃজিতা ঘোষ।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে এক বিশেষ যৌথ পরিবেশনার মাধ্যমে। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতা আবৃত্তি করেন ইন্দ্রাণী নাগ এবং নৃত্যে অংশ নেন দেবপ্রিয়া রায়। সোমঋতা মল্লিকের পরিচালনায় এই অনুষ্ঠান আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় নজরুলপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে।
সব মিলিয়ে, ছায়ানট (কলকাতা)-র এই বিশেষ আয়োজন নজরুলচর্চার ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করল। ভবিষ্যতেও সবার সহযোগিতায় এই চর্চা অব্যাহত থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

