শুদ্ধ- অশুদ্ধ, টক- ঝাল- মিষ্টি সবই রাজনীতির সৃষ্টি

“জলের শ্যাওলা”- বেগম জিয়ার মৃত্যু। মানুষের জন্ম হলে মৃত্যু অবধারিত। বেগম জিয়া সাম্প্রতিককালে শারীরিকভবে যে অবস্থার মধ্য দিয়ে পাড় করছিলেন, সেখান থেকে ফিরে আসবেন, এমন ভাবনা সম্ভবত কারো মাঝেই ছিল না। অবশেষে বেগম জিয়ার বিদায় এবং আমাদের দেশে রাজনীতিতে বেগম জিয়ার সম্মান একটি পট পরিবর্তনের পথ রেখা হয়ে থাকবে, নিশ্চিত। রাজনীতিতে আলোচনা, সমালোচনা, শ্লেষ, কটাক্ষ, আক্রমণ (শারীরিক নয়/ আফসোস যে আমাদের রাজনীতিতে সেটা ঘটে), বিদ্রুপ, বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের সর্বত্রই ঘটে, যা আমাদের দেশের রাজনীতিও তার বাহিরে নয়। তবে হিসেবটা মূলত সময়কালের হতে হয়। সেই সময়কালের হিসেবটা আমাদের রাজনৈতিক চর্চায় খুব বেশি ভাল নয়, বলাই বাহুল্য।
কাজের ভাল-মন্দ, দোষ-গুণ বা গুণাবলী সম্পর্কে সুচিন্তিত বিশ্লেষণ, শুধু নেতিবাচক হলেই শুদ্ধ বা মহাজ্ঞানের বিতরণ, তা কিন্ত মোটেও নয়। গঠনমূলক বা ইতিবাচক বিশ্লেষণ সময়ের হিসেবে মূলত সমালোচনার মানদণ্ড হয়। কাজের ত্রুটি বা সম্ভাবনা তুলে ধরা এবং ব্যাখ্যা করা সমালোচনার মাত্রায় যোগ হয় নতুন মাত্রা। বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন কেবলমাত্র দোষ ধরা নয় বরং কোনো কিছুর গঠন, শৈলী, উদ্দেশ্য এবং প্রভাবের একটি বিস্তারিত বিচার। সমালোচনার বহুমুখীতা সমালোচনার একটি বহুবিধ মাত্রা অবশ্যই। প্রকারভেদে গঠনমূলক সমালোচনা (constructive criticism), আত্ম-সমালোচনা (self-criticism) এর বিভিন্ন রূপ থাকে। সমালোচনায় ভুল খুঁজে বের করা বা উন্নতির পথ দেখানো উভয়ই হতে হয়।
রাজনীতিতে সমালোচনার উদ্দেশ্য সাধারণত কোনো কিছুকে আরও ভালোভাবে বুঝতে চাওয়া, মান বিচার করা, এবং উন্নতির জন্য পথের নির্দশন থাকা। সংক্ষেপে বলা যায়, সমালোচনা হলো কোনো বিষয়কে গভীর ও সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করে তার গুণাগুণ বিচার করা সময়ের হিসেবে। সমালোচনায় ত্রুটি নির্দেশ করা থেকে শুরু করে সম্ভাবনা উন্মোচন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে ইতিবাচক ও নেতিবাচকের সমারোহে এবং সেটাই স্বাভাবিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ।
আমাদের রাজনীতিততে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব, প্রীতি, সখ্য, সম্প্রীতি, ভালোবাসা, বা সদ্ভাবের বেশ অভাব, এটা বলাই বাহুল্য। রাজনীতিতে রাগ- অনুরাগ এবং বোঝাপড়া যতটুকু থাকতে হয় রাষ্ট্রের স্বার্থে, আফসোসের যে আমাদের দেশের রাজনীতিতে সেটার বেশ অভাব রয়েছে এবং সেই অভাবটাই আমাদের রাষ্ট্রকে এবং রাষ্ট্রের জনগণকে বরাবরই বেশ ভোগায় এবং ইহাই বাস্তবিক সত্য।
অথচ ভাববার বিষয় হলো এই রাষ্ট্রটির গঠন হয়েছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সদ্ভাব ও ভালবাসায় সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। কিন্ত বাস্তবিক ও কঠিন সত্য হলো স্বাধীন দেশে অবশেষে বিশেষ করে রাজনীতিতে সেই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাবটাই আমাদের কাল হয়ে উঠেছিল। বিস্তারিত ব্যাখ্যার নিশ্চয়ই প্রয়োজন নেই কেননা মাত্র পঞ্চান্ন বছরের স্বাধীন দেশটির দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে সামনে চলে আসবে।
বেগম জিয়ার মৃত্যুতে দেশ বিদেশ থেকে যে শোকবার্তার আসছে, সেটা মূলত বাংলাদেশের সম্মান। ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করলাম যে, এশিয়াসহ বিশ্বের বহুদেশ থেকে বেগম জিয়ার সম্মানে শোকবার্তা এসেছে। এমনকি বহদেশের বহু সম্মানিত চেয়ারপার্সনরাও সশরীরে বেগম জিয়ার সম্মানে উপস্থিত হয়েছেন। বিভিন্ন দেশের শোকবার্তার মাঝে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনায় (যেহেতু দেশে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিবেশ রয়েছে) ভারতের শোকবার্তাটির একটি আলাদা তাৎপর্যপূর্ণ বললে খুব বেশি ভুল বলা হবে না, নিশ্চয়ই। লক্ষ্যণীয যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন, সেই শোকবার্তায় খালেদা জিয়ার সাথে তাঁর অতীতের সাক্ষাৎ ও ভারতের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশ তথা বিএনপির প্রতি ভারতের বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো বলা যায়।
উল্লেখ্য যে, খালেদা জিয়ার অন্তিম অনুষ্ঠানে ভারত থেকে সর্বোচ্চ কূটনীতিক (Diplomat) পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর সম্ভবত ইতিমধ্যেই এসেছেন (যখন এই লেখাটি লিখছি)। এটি বাংলাদেশ তথা বিএনপির প্রতি ভারতে দেওয়া গুরুত্বের প্রতীক বলেই অনুমান হয়। যদিও ভারতের এমন শোকবার্তা আবার দেশের ভিতরে বেড়ে উঠা দেশবিরোধী ও স্বাধীনতা বিরোধী বিএনপির সাবেক মিত্রশক্তির জন্য বেশ অস্বস্তিকর বোধ হচ্ছে বলেই অনুমেয় হয় এবং সেটার কিছু নমুনা বেশ লক্ষ্যণীয বটে।
দেশ বিদেশ ছেড়ে দেশের রাজনীতিতে শোকবার্তাও একটি বিশাল তাৎপর্য বহন করে। লক্ষ্যণীয যে, দেশের একটি বিশেষ আদালতের সর্বোচ্চ রায়ের বোঝা মাথায় নিয়েও শেখ হাসিনা দেশের রাজনীতিতে বেগম জিয়ার মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন, যা রাজনীতিতে একটি ভাল মাত্রার যোগ বলেই মনে করি। শেখ হাসিনার শোকবার্তাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ অবশ্যই। শেখ হাসিনা শোকবার্তায় লিখেছেন, “বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও স্বৈরাচার-বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বেগম জিয়ার ভূমিকার স্বীকৃত” যা রাজনীতিতে বিএনপির প্রতি ইতিবাচক বার্তা বলেই প্রতিয়মান হয়। শেখ হাসিনা পুত্র সচিব ওয়াজেদ জয়ের শোকবার্তাটিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করি। জয় শোকবার্তার  একাংশে উল্লেখ করেছেন, “বিএনপি আমাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, শত্রু নয়, শত্রু হলো দেশবিরোধী, স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত- শিবির”।
এখানে উল্লেখ করতেই হয় যে, আওয়ামীদের মাঝ থেকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রায় সকলেই বেগম জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। যদিও আওয়ামীদের শোক নিয়ে কিছু মহল থেকে (সেটা বিএনপি বা ভিন্ন) কটাক্ষ করা হয়েছে। এখানেই সেই সময়ের হিসেবে যত গণ্ডগোল। উপরেই লিখেছি রাজনীতিতে সময়কালের একটি হিসেব থাকতে হয় এবং সেটা সর্বদাই রাজনীতির জন্য মঙ্গলজনক এবং রাষ্ট্রের। কেন এমনটা বলছি? অবশেষে আওয়ামীদের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকলের শোক প্রকাশ কিন্ত জনমানুষের কাছে পজেটিভ হয়েই আসবে। তাই পজেটিভ বিষয়কে রাজনীতিতে পজেটিভভাবে হিসেব কষতে হয বলেই মনে করি।
এখানে উল্লেখ করতেই হয় যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের এক উপদেষ্টার বচনকে। নাম উল্লেখ করার কোন প্রয়োজন হবে না নিশ্চয়ই। এই উপদেষ্টা ক্ষমতার চেয়ারে বসে যে বয়ান দিয়েছেন। বেগম জিয়া পুত্র কোকোর মৃত্যুর পরে শেখ হাসিনাকে নিয়ে যে বয়ান দিয়েছিলেন, সেটার শতভাগ উল্টোরথের দ্বিচারিতার বয়ান। ক্ষমতার চেয়ারের নিশ্চয়ই আলাদা তাৎপর্য থাকে বা হিসেব। ধারণা করছি, সেই হিসেবেই উপদেষ্টার বয়ানের শব্দচয়নে দ্বিচারিতার প্রকাশ। তবে গ্রহণ বা অগ্রহণ সেটা জনগণের নিজেদের হিসাব কিন্ত।
লেখাটি যখন লিখছি, সম্ভবত বেগম জিয়ার জানাজা ইতিমধ্যেই শেষ’ও হয়ে গেছে (তবে জানি না)। লেখাটির শেষে এসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ইউনূস সাহেবের একটি কর্মের প্রশংসা করেই শেষ করবো। বেগম জিয়ার মৃত্যুতে ইউনূস সাহেব দেশব্যাপী একদিনের ছুটি তিনদিনের শোক দিবস ঘোষণা করেছেন। বিষয়টি একটি ভাল সিদ্ধান্ত। জানি না কার উপদেশে বা ইউনূস সাহেবের নিজের সিদ্ধান্ত, যেটাই হোক, এই সিদ্ধান্তের জন্য ইউনূস সাহেব অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন।
অবশেষে বেগম জিয়ার বিদায় সুন্দর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ হোক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ করে বিএনপিতে বেগম জিয়ার সারা জীবনের রাজনৈতিক বলিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হোক, সেটাই চাইবো এবং বাংলাদেশ বেগম জিয়ার সম্মানে রাজনীতিতে সুন্দর, সহজ- সরল পথের সন্ধান পাক। ওপারে সর্বোচ্চ ভাল থাকুন বেগম জিয়া।
বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.