বাঙালি সমাজে হিজাবের বিস্তার : স্বাধীনতা থেকে স্বতঃস্ফূর্ততা, নাকি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ?

বাংলাদেশে নারীর শিক্ষা, অধিকার ও মুক্তির ইতিহাস লিখতে গেলে প্রথম সারিতে উচ্চারিত হয় বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নাম। সেই রোকেয়া যিনি কলমকে অস্ত্র করে নারীদের শেখালেন—জ্ঞানই শক্তি, স্বাধীনতাই মানবিক মর্যাদা। কিন্তু আজ যখন আমরা সমাজের দিকে তাকাই, এক দারুণ বৈপরীত্য চোখে পড়ে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও নারীর পোশাক, চলাফেরা, উপস্থিতি—সবকিছু নিয়েই বিস্তর আলোচনা, বিচার, নিয়ন্ত্রণ। সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন হলো হিজাব ও বিভিন্ন ইসলামী পর্দার দ্রুত প্রসার। হিজাব এখন কেবল ধর্মীয় চিহ্ন নয়—এটি হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এমনকি মনস্তাত্ত্বিক এক প্রতীক। প্রশ্ন জাগে—কেন এমন বিস্তৃতি ? কী কারণে বাংলাদেশের নারী সমাজে হিজাব পরিধান এক জনপ্রিয়স্বতঃস্ফূর্ত আচরণ হিসেবে জায়গা করে নিল ?

এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে সমাজ-রাজনীতি, ধর্মীয় পুনর্জাগরণ, বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রবাহ, নিরাপত্তাহীনতা এবং নারীর নিজের আত্ম-পরিচয়ের জটিল মিলনবিন্দুতে।

বিশ্বায়নের যুগে পরিচয় প্রশ্নটি অনেক গুরুত্ব পেয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামবিদ্বেষ, যুদ্ধ, অভিবাসী সংকটের প্রেক্ষাপটে মুসলিম সমাজে “পরিচয় পুনরুদ্ধারের” প্রবণতা বেড়েছে। মুসলিম নারীর ক্ষেত্রে হিজাব শক্তিশালী ধর্মীয় পরিচয়ের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফলে বাংলাদেশি নারী—নিজ দেশে বা প্রবাসে—হিজাবের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করছেন। এটি অনেকের কাছে আত্মবিশ্বাসেরও প্রতিচ্ছবি।

ধর্মীয় শিক্ষা এখন সামাজিক মাধ্যম, ইউটিউব, টকশো, ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে সহজপ্রাপ্য। ব্যক্তিগত স্তরে ধর্ম চর্চা বেড়েছে, এবং নারীর শরীর ও শালীনতা নিয়ে ব্যাখ্যা আরও কঠোর ও প্রচারমুখী। যদিও ইসলাম নারীর পোশাক নির্ধারণের ক্ষেত্রে নানা মত ও ব্যাখ্যা রাখে, কিন্তু প্রচলিত ধর্মীয় চর্চায় হিজাবকে “আদর্শ মুসলিম নারীর” মূল পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অনেক নারী মনে করেন—ধর্ম পালন করতে চাইলে পোশাকই প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

বাংলাদেশে নারীদের নিরাপত্তা আজও প্রশ্নবিদ্ধ। বাসে, রাস্তায়, অফিসে—হয়রানি যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। হিজাব অনেক নারীর কাছে নিরাপত্তাবোধের দেয়াল; জনসমক্ষে “দৃষ্টি থেকে আড়াল” থাকার উপায়। এটি স্বাধীনতার প্রতীক নয়, বরং একটি রক্ষাকবচ—যদিও এটি পিতৃতন্ত্রেরই আরেক রূপ। সমাজের পুরুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর পোশাককে দায়ী করে অপরাধের বদলে, আর সেই চাপে অনেক নারী হিজাব বেছে নেন না-চাইলেও।

হিজাবের বাজার এখন বিশাল। নতুন নতুন ফ্যাশন, রঙ, নকশা—এটি এক বৃহৎ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রত্যাশা নারীদের ওপর অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করে—“ভাল মেয়ে” হওয়ার জন্য শালীন পোশাক জরুরি। অনেক পরিবারে কন্যার চরিত্রের পরিমাপ হয় কাপড়ের দৈর্ঘ্যে। তাই পোশাক হয়ে ওঠে আনুগত্য, শালীনতা ও গ্রহণযোগ্যতার সামাজিক সরঞ্জাম।

একটি প্রজন্ম আছে যারা সত্যিকার অর্থেই নিজের ইচ্ছায় হিজাব বেছে নিচ্ছে—ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত স্বস্তি বা পরিণত সিদ্ধান্ত হিসেবে। কিন্তু এই “ইচ্ছা” কি পুরোপুরি স্বাধীন ? নাকি সমাজ, পরিবার, ধর্মীয় প্রচার এবং পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধ দ্বারা গঠিত এক কাঠামোর ভেতরে জন্ম নেওয়া ইচ্ছা? এখানে প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, উত্তর নয় বরং অনুসন্ধান।

রোকেয়া চেয়েছিলেন নারীর মুক্তি—চিন্তার, চলাফেরার, প্রকাশের। তাঁর মূল লড়াই হিজাবের বিপক্ষে ছিল না; ছিল চিন্তার শিকল ভাঙার পক্ষে। আজ নারীরা যদি নিজস্ব সিদ্ধান্তে, আত্মমর্যাদা থেকে, জ্ঞানের আলোয় হিজাব পরেন—তবে সেটি স্বাধীনতা। কিন্তু যদি চাপ, ভয়, গ্রহণযোগ্যতার জন্য করতে হয়—তবে তা নতুন রূপের অদৃশ্য কারাগার।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.