কলকাতা, ১২ ডিসেম্বর:
গত ১২ ডিসেম্বর কলকাতার গোর্কি সদনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ছায়ানট (কলকাতা)-এর পক্ষ থেকে রাশিয়ান ফেডারেশনের কনসাল জেনারেল ম্যাক্সিম কোজলভের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ছবি তুলে দেওয়া হয়। ছবিটির বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে— রাশিয়ান ভাষায় অনূদিত নজরুল রচনা-প্রকাশ অনুষ্ঠানে সোভিয়েত প্রতিনিধিদের মাঝখানে কাজী নজরুল ইসলাম (১৯৬৭)। নজরুল–রুশ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের এক বিরল দলিল হিসেবে ছবিটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কাজী নজরুল ইসলামের সুহৃদ এবং ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম শ্রোতা মুজফ্ফর আহ্মদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতাটি একসময় রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছিল—যদিও তিনি নিজে তা চোখে দেখেননি। মুজফ্ফর আহ্মদ তাঁর ‘রুশ বিপ্লব, লালফৌজ ও কাজী নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক লেখায় উল্লেখ করেছেন, কীভাবে আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষত রুশ বিপ্লব ও লাল ফৌজ নজরুলের চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি লিখেছেন, ‘ব্যথার দান’ গল্প পাঠ করেই তাঁদের কাছে স্পষ্ট হয়েছিল যে রুশ বিপ্লবের প্রতি নজরুলের আকর্ষণ জন্মেছিল। ১৯১৯ সালে ফৌজে থাকা অবস্থায় লেখা ‘হেনা’ ও ‘ব্যথার দান’—এই দুটি গল্পই সেই মননের সাক্ষ্য বহন করে।
নজরুলের ‘বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য’ প্রবন্ধেও রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। গোর্কি সম্পর্কে নজরুলের উচ্ছ্বসিত মূল্যায়ন তাঁর বিশ্বসাহিত্য-বোধের ব্যাপ্তি ও গভীরতাই প্রমাণ করে। গোর্কির সাহিত্যিক প্রভাব এবং বিপ্লবী চেতনা নজরুলের চিন্তাজগতে কীভাবে আলোড়ন তুলেছিল, তা তাঁর লেখায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত।
নজরুল গবেষক মাহবুবুল হকের নজরুল তারিখ অভিধান থেকে জানা যায়, ১৯৩৬ সালে ম্যাক্সিম গোর্কির প্রয়াণ উপলক্ষে কলকাতার অ্যালবার্ট হলের কমিটি রুমে প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে আয়োজিত শোকসভায় অন্যতম আহ্বায়ক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। সেই সভাতেই নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘ গঠনের ঘোষণাও করা হয়, যা বাংলা প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এই সমস্ত তথ্যের আলোকে সহজেই বলা যায়, রুশ বিপ্লব এবং রুশ সাহিত্য–সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত ছিলেন চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের শতবর্ষে সেই ঐতিহাসিক সংযোগকে স্মরণ করতেই ছায়ানট (কলকাতা) এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
গত ১৮ বছর ধরে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টির নানা দিক নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে ছায়ানট (কলকাতা)। শুধুমাত্র জন্মবার্ষিকী বা প্রয়াণ দিবস উদ্যাপন নয়, সারা বছর ধরেই নজরুলের সাহিত্য ও ভাবনার চর্চা এবং নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করাই সংগঠনটির লক্ষ্য।
ছায়ানট (কলকাতা)-এর সভাপতি সোমঋতা মল্লিক বলেন, “আমরা জানতে পারি নজরুলের একাধিক সাহিত্যকর্ম রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এই বিশেষ ছবির সন্ধান পাই, যা সত্যিই আমাদের চমৎকৃত করে। আজ সেই ছবিটি গোর্কি সদনে রাশিয়ান ফেডারেশনের কনসাল জেনারেল ম্যাক্সিম কোজলভের হাতে তুলে দিতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।” তিনি আরও বলেন, “গোর্কি সদনের প্রোগ্রাম অফিসার শ্রী গৌতম ঘোষের আন্তরিক সহযোগিতায় আমাদের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। আমরা আশা করি, গোর্কি সদনের সংগ্রহশালায় ছবিটি যত্ন সহকারে প্রদর্শিত হবে এবং সংস্কৃতিমনস্ক মানুষজন সহজেই এটি দেখতে পারবেন।”
নজরুল ও রুশ সাহিত্য–সংস্কৃতির ঐতিহাসিক বন্ধনকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল এই অনুষ্ঠান, যা বাংলা সাহিত্য ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন হয়ে রইল।

