তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন : রাজনীতির মোড় ঘোরার ইঙ্গিত, নাকি নতুন চ্যালেঞ্জের শুরু ?

প্রায় দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করা একজন প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্বের এমন প্রত্যাবর্তন শুধু দলীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপরও তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে এমন এক সময় তিনি দেশে ফিরলেন, যখন গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও দেশ এখনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়। ‘মব’ আক্রমণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়ে জনমনে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের ফিরে এসে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার প্রত্যয় এবং যেকোনো উসকানির মুখে সংযত থাকার আহ্বান রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।

ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের সংবর্ধনা মঞ্চ পর্যন্ত লাখ লাখ নেতা–কর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়। তবে একই সঙ্গে এই বিশাল জনসমাগম রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও জনদুর্ভোগের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। সাত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লাগা নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকেও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

পূর্বাচলের সমাবেশে তারেক রহমানের বক্তব্যে দুটি দিক বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, তিনি ‘আধিপত্যবাদী শক্তির গুপ্তচর’ ও ষড়যন্ত্রের প্রসঙ্গ তুলে দলের নেতা–কর্মীদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান। দ্বিতীয়ত, তিনি তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলেন এবং শক্ত গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এই বক্তব্য একদিকে দলীয় কর্মীদের মনোবল জোগায়, অন্যদিকে সহিংস রাজনীতির পরিবর্তে সংযমী রাজনৈতিক আচরণের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই আহ্বান কতটা বাস্তবায়িত হবে ? অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় রাজনৈতিক সমাবেশ ও ক্ষমতার পালাবদলের সময় উসকানি ও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। তারেক রহমানের বক্তব্যে শান্ত থাকার ওপর জোর দেওয়া ইতিবাচক হলেও মাঠপর্যায়ে দলের কর্মীদের আচরণ ও সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত এই বক্তব্যের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নেতারা তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে বলছেন। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তন কেবল আবেগঘন রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি আসন্ন নির্বাচনের রাজনীতিতে বিএনপির কৌশলগত অবস্থানকেও স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে এটি অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্যও নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে তারেক রহমানের দেশে ফেরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলা যায়। এই অধ্যায় গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আইনের শাসনের দিকে অগ্রসর হবে, নাকি নতুন উত্তেজনা ও সংঘাতের দিকে যাবে—তা অনেকটাই নির্ভর করবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীলতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণের ওপর। এখন দেখার বিষয়, প্রত্যয়ের ঘোষণাগুলো বাস্তব রাজনীতিতে কতটা প্রতিফলিত হয়।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.