শেখ হাসিনা যখন তার বানানো আদালতে একের পর এক জামাত নেতাদের ফাঁসির আদেশ দেওয়াচ্ছেন তখন একবার মনে হচ্ছিলো এই একই আদালতে কি শেখ হাসিনারও বিচার হতে পারে! তিনিও কি এমনিভাবে কোনদিন ফাঁসির রায় পেতে পারেন! সন্দেহ শেষ পর্যন্ত সত্য হলো। কথায় আছে ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয় বা পরের জন্য কুয়ো খুড়লে তাতে নিজেরই পড়তে হয়। শেখ হাসিনা তার নিজের তৈরী ফাঁদেই আটকে গেছেন।
আমাদের দেশে রাজনীতিক কারও নামে কোন মামলা হলে- হোক তা খুনের মামলা চুরির লুটের বা রেপ কেসের, রং পেয়ে যায় রাজনৈতিক মামলার। বলা হয় পলিটিকাল ভিকটিমাইজেশন। এসব মামলার বিচার রায় বা কার্যকরিতা প্রধানত: নির্ভর করে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর। স্বাধীনতাপূর্বকালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, তাকেও বলা হয়েছিল রাজনৈতিক মামলা। আন্দোলন হলো। গনঅভ্যুত্থানে সরকার পাল্টে গেল, মামলাও উঠে গেল। ’৯১এ বেগম জিয়ার সরকার এরশাদ সাহেবের নামে কয়েক ডজন মামলা করলো জেলে আটকে রাখলো, বিচার করে সাজাও দিলো। ’৯৬এ সরকার পাল্টে গেল, এরশাদ সাহেব জেল থেকে বের হয়ে এলেন। শেখ হাসিনা জামাত নেতাদেরকে ফাঁসিতে ঝোলালেন, অনেককে বন্দী করে রাখলেন, বেগম জিয়াকে চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে পর্যন্ত যেতে দিলেন না, তারেক জিয়াকে সাজার পর সাজা দিয়ে দেশের বাইরে রাখলেন- যেই গদী উল্টে গেল সবই রাতারাতি ভোজবাজীর মত পাল্টে গেল। সেদিন যদি নিজামী মুজাহিদরা ফাঁসিতে না ঝুলে জেলে আটক থাকতেন আজ বীরের বেশে বের হয়ে আসতেন, যেমন তারেক জিয়া হিরো হয়ে কিছুদিনের মধ্যে দেশে ফিরছেন। এসব রাজনৈতিক মামলায় মেরিট যতই থাকুক পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে সাথে রায় এবং কার্যকরিতা বদলে যায়। এটাই এ যাবত দেখে আসছি।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলাও ইতিমধ্যে কিছুটা রাজনৈতিক রং পেয়েছে। জামাত নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং রায়কেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা হয়েছিল। সে সব মামলার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের। অনেক আগের বলে মানুষের তা খুব একটা স্মরণেও ছিল না। ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবেশ বিবেচনায় মামলাগুলোকে রাজনৈতিক বলে প্রতিষ্ঠা করা গেছিলো। কিন্তু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ একেবারে সদ্য, তাজা ঘটনার। এই সেদিনের। চোখ বন্ধ করলেই সবার মানসপটে ভেসে ওঠে। বিচার প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউশন যে সব স্বাক্ষ্য প্রমান উপস্থাপন করেছে তা মানুষের দেখা এবং জানার সাথে মিলে গেছে। যে কারনে এই মামলাকে যেমন শ্রেফ রাজনৈতিক কারনে বলে ব্রাকেটবন্দী করার নীতিগত অবকাশ নাই তেমনি মানুষকেও তা মনে করানো যাবে না।
তারপরও, যেহেতু শেখ হাসিনা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তার সমর্থকরা একে পলিটিকাল ভিকটিমাইজেশন বলে প্রচার প্রপাগান্ডা চালাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কথাটা হচ্ছে, রায় তো একটা হয়ে গেছে। এর ভবিষ্যৎ কি! এ রায় কি কখনও কার্যকর হবে! অথবা পরিবর্তিত হবে, নাকি পরবর্তী কোন সরকারের আমলে বাতিল হয়ে যাবে!
প্রথম কথা হচ্ছে, এই মূহুর্তে রায় কার্যকর হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই কারন শেখ হাসিনা এখন সরকারের হাতে নাই। ভারত যদি কখনও ফেরত দেয় কিছুটা সম্ভাবনা দেখা দেবে। কিন্তু ভারত এখন বা তখন কখনই শেখ হাসিনাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেবে না এটা লিখে রাখা যেতে পারে। শেখ হাসিনা ভারতকে অনেক কিছু দিয়েছে তা নিজের মুখে স্বীকার করেছেন। কৃতজ্ঞতাবশে ভারত তাকে নিজ ভূমিতে ঠাঁই দিয়েছে। তাকে নিয়ে কোন রাজনৈতিক পরিকল্পনা না থাকলেও অন্তত: ফাঁসির মঞ্চের দিকে ঠেলে দেবে না। এভাবে চললে হয়তো তার শেষ জীবনের ঠিকানা ভারত। অথবা ভারত যদি চায় অন্য কোথাও পাঠাতে এই রায় তার একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলো যারা মৃত্যুদন্ডের বিরোধী, তাদের কাছে রিকোয়েস্ট করলে কেউ তাকে গ্রহন করতেও পারে। এমনিতেই একজন ফাঁসির আসামীকে আশ্রয় দেওয়ায় ভারত কিছুটা ইমেজ সংকটে পড়বে তার ওপর ইন্টারপোলের ওয়ারেন্ট বা রেড নোটিশ জারী হয়ে গেলে তা হবে ভারতের জন্য আরও বিব্রতকর।
দ্বিতীয়ত: আপাতত: ফাঁসির রায় ঝুলিয়ে রাখা যায় যদি শেখ হাসিনা ফিরে এসে আপীল করেন। তার জন্য সময় মাত্র ৩০ দিন। তবে সে সাহস তার নাই, থাকলে গত বছর পালাতেন না। আপীল না হলে ৩০ দিন পর ফাঁসি কার্যকরের অন্যান্য আইনী পদক্ষেপগুলো নেওয়া হতে থাকবে। এরপর ভবিষ্যতে যে কোনদিন তাকে পাওয়ামাত্র ঝুলিয়ে দেওয়া যাবে।
তৃতীয়ত: যদি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হয় এই সরকারের মেয়াদ আছে মাত্র তিন মাস। এই মেয়াদকালে রায় কার্যকরের কোন সম্ভাবনা আমি দেখছি না। এরপর নির্বাচিত সরকারের সাথে ভারত শেখ হাসিনার বিষয়ে কোন সমঝোতায় যেতে পারলে ভিন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। তবে সরকারে যারাই আসুক ফাঁসির রায় তুলে নিয়ে শেখ হাসিনাকে নির্দোষ ঘোষনার অবকাশ কারোরই থাকবে না। ফলে বলার অপেক্ষা রাখে না, অনেক দিনের জন্য শেখ হাসিনা ভারতের গলায় একটা কাঁটা হয়েই ঝুলে থাকবেন।
চতুুর্থত: ভারতে বসে কলকাঠি নেড়ে যদি শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীতে তার পক্ষে কোন অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে এবং দেশে তার পক্ষের কোন সরকার গঠিত হয় তাহলে মূহুর্তে এসব মামলা মোকদ্দমা রায় ফাঁসি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। তিনি দিল্লী থেকে রাজকীয় বিমানে আরোহন করে দেশে ফিরে আসতে পারবেন!
না হলে, বাকি জীবন বা জীবনের একটা লম্বা সময় ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে কাটাতে হবে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে, তার দল কোন প্রেশার গ্রুপ হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে, সে সময়কার সরকারের সাথে কোন সমঝোতায় গিয়ে ফাঁসি মাফ করাতে বা খালাশও আনতে পারবে। তবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে কমপক্ষে পাঁচ থেকে দশ বছর।
বটম লাইন:-শেখ হাসিনা আর কোনদিন দেশে ফিরে স্বাভাবিক জীবন পাবেন না। যে যত যাই বলুক এই রায় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছে।
সাঈদ তারেক , লেখক , সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

