ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চুক্তি কার্যকর হয় ২০১৩ সালে। সে সময়ে ভারতের কেন্দ্রে মনমোহন সিংহের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার এবং বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় ছিল। দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট অপরাধ, আন্তরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ, আর্থিক জালিয়াতি, সংগঠিত অপরাধসহ গুরুতর অপরাধ দমনে সহযোগিতা নিশ্চিত করতেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে চুক্তিতে সংশোধন এনে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হয়।
এই প্রতিবেদনটিতে চুক্তির প্রধান ধারা, সংশোধনী, ব্যতিক্রম ও সাম্প্রতিক বিতর্কগুলো নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা হলো।
২০১৩ সালের মূল চুক্তির প্রধান দিকগুলি
ন্যূনতম এক বছর সাজার সম্ভাবনা থাকলে প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ
– চুক্তিতে বলা আছে, যে অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ন্যূনতম এক বছরের কারাদণ্ড হতে পারে, সেটি প্রত্যর্পণের আওতায় পড়বে।
– এটি দুই দেশের আইনে সমভাবে শাস্তিযোগ্য হতে হবে।
অপরাধে প্ররোচনা বা সহায়তা করলেও প্রত্যর্পণযোগ্য
– মূল অপরাধী ছাড়াও অপরাধ সংঘটনে সহায়তাকারী বা প্ররোচককেও হস্তান্তর করা যেতে পারে।
আদালতের রায়ে প্রত্যর্পণযোগ্যতা নিশ্চিত
– বিচারিক প্রক্রিয়ায় অপরাধ প্রমাণ হলে এবং বিচারিক নির্দেশনা থাকলে অপরাধীকে অপর দেশে তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
২০১৬ সালের সংশোধনী: প্রক্রিয়া আরও সহজ
২০১৬ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তিটি সংশোধিত হয়, যেখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়:
গ্রেফতারি পরোয়ানাই যথেষ্ট
– কারও বিরুদ্ধে বৈধ গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেই তাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করা যাবে।
– এ ক্ষেত্রে অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ উপস্থাপন অপরিহার্য নয়।
দুই দেশের পুলিশি ও বিচারিক সহযোগিতা বৃদ্ধি
– দ্রুত তথ্য বিনিময় ও প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি সংশোধিত চুক্তির ভিত্তিতেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জারি হওয়া পরোয়ানার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন জানিয়েছে।
কোন কোন ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ করা যাবে না
চুক্তিতে কিছু স্পষ্ট ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে, যা দুই দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে:
রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধ
– কোনো অপরাধ যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত হয়, তাহলে প্রত্যর্পণ করা যাবে না।
– তবে হত্যা, গুম ও নির্যাতন–এই গুরুতর অপরাধগুলোকে রাজনৈতিক বিভাগে ফেলা যাবে না।
বিচার প্রক্রিয়ার নেপথ্যে যদি না থাকে সৎ উদ্দেশ্য
– চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুযায়ী,
যদি দেখা যায় যে সংশ্লিষ্ট বিচারপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অত্যাচার বা অন্যায় উদ্দেশ্যপ্রসূত, তবে ভারত বা বাংলাদেশ কেউই অপরাধীকে অপর দেশের হাতে তুলবে না।
– এটি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দ্বৈত অপরাধ নীতি
– অপরাধটি দুই দেশেই অপরাধ হিসেবে গণ্য না হলে প্রত্যর্পণ হবে না।
বর্তমান বিতর্ক ও সম্ভাব্য আইনি অবস্থান
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা এবং গ্রেফতারি পরোয়ানার পর দেশটি তার প্রত্যর্পণ চেয়ে ভারতের কাছে আবেদন জানিয়েছে।
তবে ভারত চাইলে নিম্নলিখিত যুক্তিগুলো ভিত্তি করে তাকে প্রত্যর্পণ না-ও করতে পারে—
বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ থাকলে
রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত মামলা বলে বিবেচিত হলে
হাসিনা নিজেও বারবার অভিযোগ করেছেন যে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক এবং বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে না।
ভারত–বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আইনি সহযোগিতা ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে রাজনৈতিক চরিত্রের অভিযোগ, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড—এই তিনটি বিষয় প্রত্যর্পণ-সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তকে সংবেদনশীল এবং জটিল করে তোলে।
সর্বোপরি, প্রত্যর্পণ হবে কি হবে না—এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের সার্বভৌম বিবেচনা, আইনি কাঠামো এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করবে।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক: শুদ্ধস্বর ডটকম ।

