নভেম্বর ১৯৭৫: বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার রক্তাক্ত অধ্যায়

১৯৭৫ সাল—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ষড়যন্ত্র ও রক্তপাতের বছর।  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে ১৫ আগস্ট শুরু হয় এক অন্ধকার অধ্যায়, যার প্রতিফলন ঘটে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আরও ভয়াবহ রূপে।
এই সময়টি ছিল রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, সামরিক কাঠামো এবং জাতীয় আদর্শ—সবকিছুরই বিপর্যয়ের কাল।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতা দখল করেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। সেনাবাহিনীর একদল তরুণ কর্মকর্তা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়, কিন্তু শাসন কাঠামো হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। সেনাবাহিনীর ভেতরে শুরু হয় গোষ্ঠীগত বিভাজন, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ক্ষমতার লড়াই।
এই সময় প্রশাসন কার্যত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতি মোশতাক নামেমাত্র ক্ষমতায় থাকলেও বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ ছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিদ্রোহী কর্মকর্তার হাতে।

৩ নভেম্বর ১৯৭৫: পাল্টা অভ্যুত্থান ও জেল হত্যাকাণ্ড

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ভোরে ঢাকার আকাশে চক্কর দিতে থাকে বিমান বাহিনীর মিগ-২১ যুদ্ধবিমান। তখনই রাজধানীজুড়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটেছে।
সকাল নাগাদ খবর আসে এক ভয়াবহ ঘটনার: ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর হত্যা করা হয়েছে স্বাধীনতার চার জাতীয় নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকেই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকেও বিপর্যস্ত করে দেয়।

এই অরাজক পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর মেধাবী ও দেশপ্রেমিক অফিসার মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ নেতৃত্ব দেন এক পাল্টা অভ্যুত্থানের। তিনি ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে তাঁদের নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ দেন, বিনিময়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিজের হাতে নেন।
তৎকালীন বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এম জি তাওয়াব, যিনি তখন বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মকর্তা, পরবর্তীকালে আমাকে বলেন

“মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ একজন ব্রিলিয়্যান্ট, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক অফিসার ছিলেন। তাঁকে ভারতপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল নিছক রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হিসেবে।” এই কথা ৭০ দশকের শেষের দিকে এয়ার ভাইস মার্শাল এম জি তাওয়াব আমাকে নিজে বলেছিলেন । তখন তিনি জার্মানিতে বসবাস করতেন । 

১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের নেতারা পরে ফকার বিমানযোগে ব্যাংকক পাড়ি জমান। দেশ তখন কার্যত নেতৃত্বশূন্য, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, আর জনগণ দিশেহারা—কার হাতে রয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতা, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ঢাকায় ৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগপন্থী একটি মিছিল বের হয়। মিছিলের নেতৃত্ব দেন খালেদ মোশাররফের ভাই ও মা।
এই ঘটনাকে ঘিরে কিছু মহলে ধারণা জন্মায় যে ভারতীয় প্রভাবেই মিছিলটি সংঘটিত হয়েছে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে এই অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এরই মধ্যে গোপনে সক্রিয় হয়ে ওঠে একদল মধ্যম পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তা, যারা বিশ্বাস করতেন—খালেদ মোশাররফের পদক্ষেপ সেনাবাহিনীর ঐক্যকে ভেঙে দিচ্ছে।

সবশেষে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত হয় আরেকটি অভ্যুত্থান, যা পরবর্তীতে “সিপাহি-জনতা বিপ্লব” নামে প্রচারিত হয়।
এই ঘটনায় নিহত হন মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও কর্নেল হায়দার।
এই অভ্যুত্থানের পর দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।
এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়—সামরিক শাসনের যুগ, যা পরবর্তী এক দশক দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

আজ প্রায় পাঁচ দশক পরও ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের ঘটনাগুলো ইতিহাসের গভীরতম ক্ষতের মতো আমাদের জাতীয় চেতনাকে নাড়া দেয়।
এটি ছিল এমন এক সময়, যখন স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, রাজনৈতিক আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একই সঙ্গে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
৩ নভেম্বরের জেল হত্যাকাণ্ড এবং ৭ নভেম্বরের পাল্টা  সিপাহী অভ্যুত্থান  প্রমাণ করে—স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশ এক গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটে নিমজ্জিত হয়েছিল, যার প্রতিফলন আমরা এখনও রাজনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রত্যক্ষ করি।

নভেম্বর ১৯৭৫ কেবল এক মাস নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অস্থিরতার, ষড়যন্ত্রের ও রক্তপাতের প্রতীক।
এই সময়ের ঘটনা আমাদের শেখায়—গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সামরিক শক্তি নয়, প্রয়োজন জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক ঐক্য ও ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্ব।

লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম | রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.