অভ্যুত্থানে ব্যবস্থা পাল্টায় না, পাল্টায় বিপ্লবে। কিন্তু অভ্যুত্থানে শাসকের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটে। শাসক ক্ষমতাচ্যুত হয়, শাসনব্যবস্থার মূল কাঠামো ঠিক রেখে কিছুটা অদল-বদল হয়। কিন্তু ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর যারা আশা করেছিলেন, দেশ আর আগের মতো থাকবে না তারা ক্রমেই হতাশ হচ্ছেন। কারণ শাসক পরিবর্তন আর শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন, এক নয়। ক্ষমতাসীন দল পরিবর্তন আর ক্ষমতাকাঠামোর পরিবর্তন এক নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষা এবং অতীত অভিজ্ঞতা বলে, শাসক দল বা ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তন হলে, শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন হবেই এমনটা বলা যায় না। বাংলাদেশে স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরকার পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ হয়েছিল। যে কারণে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন করতে হয়েছে। কার, কী ডিজাইন ছিল সেটা নিয়ে অনেক আলোচনা হতে পারে। কিন্তু লাখ লাখ মানুষ যে পথে নেমে এসেছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই গণমানুষের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে অভ্যুত্থানের পর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কী পথনকশা তৈরি হয়েছে যা ভবিষ্যতে দেশের মানুষকে পথ দেখাবে?
সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিয়ে সরকার ক্ষমতায় বসার পর, যে বিতর্কগুলো সামনে এলো তা দেখে যে কারও মনে সন্দেহ উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। অনেকে বলছেন দেশের মানুষের নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে না তো? জাতীয় সংগীত পাল্টানো, সংবিধান পুনর্লিখন, রাষ্ট্রপতি অপসারণ, পিআর বিতর্কের পর- সবশেষে এলো গণভোট প্রসঙ্গ। সাধারণ বা সংসদ নির্বাচনের আগে না পরে, এ বিতর্ক থামল একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে এই সিদ্ধান্তে। কিন্তু গণভোট যে বিষয়ে হবে, তা দেখে মনে হতে পারে এটি একটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অনার্স পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। সমস্ত বিষয় ব্যাখ্যা করে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলা যে কত কঠিন গণভোটের প্রশ্নপত্র না দেখলে বোঝা যাবে না। ‘হ্যাঁ’-এর ভেতরে ‘না’ এবং ‘না’-এর মাঝেও ‘হ্যাঁ’ সংবলিত প্রশ্নে ভোট দিতে গিয়ে বিভ্রান্ত হবেন ভোটার। ফলে গণভোট হবে, কিন্তু কেন ভোট দিচ্ছেন একজন ভোটার তা বোঝা খুব কঠিন হয়ে পড়বে। শুধু ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’-এর মাধ্যমে কি জনগণের মতের প্রতিফলন ঘটে? এটা নির্ভর করে, কোন বিষয়ে ভোট হচ্ছে এবং কী ধরনের প্রশ্ন করা হচ্ছে তার ওপর। জুলাই অভ্যুত্থান সমর্থন করেও সরকারের সব পদক্ষেপ এবং সরকার পরিচালনার সব বিষয়ে সমর্থন নাও থাকতে পারে। যদি এমনই হয়, তাহলে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ দিয়ে কি মত যাচাই করা যাবে? অবশ্য গণভোটে ৪টি জিজ্ঞাসা ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে। নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ। নির্বাচনে মতামত দেবেন জনগণ, অংশ নেবে প্রধানত রাজনৈতিক দলসমূহ (স্বতন্ত্র নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা নেই, কিন্তু নানা জটিলতা আছে), নির্বাচন পরিচালনা করবেন নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনকালীন সরকারের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নির্বাচনের জন্য আরপিও গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপরই নির্ভর করে নির্বাচনে প্রার্থী/রাজনৈতিক দলগুলো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন আর কমিশন তার দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু দেখা গেল, আরপিও সংশোধন হয়ে গেল। কিন্তু নির্বাচনের জন্য প্রধান প্রধান অংশীজন অর্থাৎ রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ তদুপরি দেশের জনগণের কোনো মতামত না নিয়ে। সংশোধিত আরপিওর কয়েকটি দিক নিয়ে আলোচনা করা যাক এক) নির্বাচনে জামানত ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। নির্বাচনী ব্যয় সীমা বাড়িয়ে ২০ লাখ টাকার পরিবর্তে ভোটার প্রতি ১০ টাকা হিসেবে ৫০ থেকে ৭৭ লাখ টাকা করা হয়েছে। পোস্টার ছাপানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ডিজিটাল প্রচারের কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে এতে নির্বাচনের ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকে খরচ শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ নির্বাচনে টাকার কুমিরদের নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা থাকল না। বরং তাদের জন্য আইনি সুযোগ বাড়ল। দেশটা যেন দুভাগে ভাগ হয়ে গেল। একদিকে কোটি কোটি ভোটার, অন্যদিকে গুটিকয়েক টাকাওয়ালা প্রার্থী। শ্রমিক-কৃষক, স্কুল-শিক্ষকসহ সাধারণ মানুষ শুধু ভোট দিতে পারবে, কিন্তু টাকার বাধার কারণে তারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না। এতে করে বিগত দিনের মতোই পার্লামেন্ট বাস্তবে কোটিপতিদের ক্লাবে পরিণত হবে। বিগত নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষণ এবং সংসদ সদস্যদের হলফনামা দেখে, পার্লামেন্টকে কোটিপতিদের ক্লাব বলা হতো। সংসদ সদস্যদের প্রায় শতকরা ৭০ জন ছিলেন ব্যবসায়ী। দেশে কোটিপতিদের সংখ্যা বাড়ছে বলেই সম্ভবত আরপিও সংশোধন করে, জামানত ও নির্বাচনী ব্যয় বৃদ্ধি করে এবার শতভাগ কোটিপতিদের সংসদে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। দুই) জনগণ তো ভোট দেবেন। কিন্তু প্রার্থী এবং দল যদি পছন্দ না করেন, তাহলে কী করবেন? তিনি কি ভোট দিতেই যাবেন না? যদি না যান, তাহলে জাল ভোট পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নির্বাচনে ‘না’ ভোটের বিধান রাখার দাবি দীর্ঘদিনের। ‘না’ ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের মনোভাব বুঝতে পারেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘না’ ভোটের বিধান যুক্ত করা হলেও, পরবর্তী সরকার তা বাতিল করে দেয়। এবারে আরপিও সংশোধন করে বলা হয়েছে শুধু একক প্রার্থী যেসব আসনে থাকবে, সেখানে ‘না’ ভোট থাকবে এবং ভোট সমান হলে কিংবা ‘না’ ভোট বেশি পড়লে দ্বিতীয়বার নির্বাচন হবে। দ্বিতীয় বারও যদি একক প্রার্থী থাকে, তাহলে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। তাহলে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তিও হতে পারে। প্রার্থী এলাকায় গিয়ে বলে এসেছেন, আমাকে ভোট না দিলে অসুবিধা হবে আর আর যদি তিনি একক প্রার্থী হন, তাহলে তো কোনো সমস্যাই নেই। ‘না’ ভোট যদি এক আসনে একাধিক প্রার্থী থাকে, সেখানে একজন দুর্নীতিবাজ, একজন সাম্প্রদায়িক, একজন দুর্বৃত্ত এবং তিনজনই টাকাওয়ালা থাকে তাহলে ভোটার কী করবেন? এই তিনজন প্রার্থীর কাউকেই যদি কোনো ভোটারের পছন্দ না হয়, তাহলে তিনি ‘না’ ভোট দিতে পারবেন না? ফলে সব আসনে ‘না’ ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে ভোটার তার সমর্থন বা বিরোধিতা দুই মনোভাবের প্রকাশ ঘটাতে পারেন। তিন) আইসিটি আদালতে কোনো ব্যক্তির নামে মামলা হলে, সেই মামলায় যদি চার্জশীট দেওয়া হয়, তাহলে ওই ব্যক্তি নির্বাচনে অযোগ্য হবে বলে বলা হয়েছে। প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করতে মামলা বাণিজ্য একটি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার। ফলে মামলা কে করেছে, কার বিরুদ্ধে করেছে এবং কেন করেছে এই তিন বিষয়ই যাচাই করতে হয়। তা না করে, মামলা হলেই আসামি বলা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। কারণ মামলাগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়রানিমূলক এবং নাগরিকের মৌলিক মানবিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের শামিল। আর আদালত কর্র্তৃক দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে, কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা তার অধিকার হরণ করা যায়? নির্বাচন কমিশনের কাছে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হবে।
চার) জনগণের ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পর যদি জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কেউ কাজ করে, তাহলে ভোটারদের অধিকার থাকবে, সেই প্রতিনিধির প্রতি অনাস্থা আনা এবং তাকে প্রত্যাহার করা। একে ‘রাইট টু রিকল’ বলা হয়। অভ্যুত্থানের পর আশা ছিল এই ‘রিকল’ করার বিধান প্রবর্তিত হবে। কিন্তু সংশোধিত আরপিওতে এটা যুক্ত হয়নি। এটি অবসানের দিকনিশানা থাকতে পারত, কিন্তু নেই। পাঁচ) আরপিও এবং নির্বাচনী আরচণবিধিতে আচরণবিধি আছে। কিন্তু কেউ না মানলে, কীভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, প্রক্রিয়াও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার কীভাবে বন্ধ হবে, সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রচারণা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে প্রশাসনিক কারসাজি কীভাবে বন্ধ করা যাবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো পথনকশা নেই। শুধু বলা আছে এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না ইত্যাদি। না করলে কী করবে কমিশন বা কীভাবে শাস্তি দেবে বা নিয়ন্ত্রণ করবে তার সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। যেমন বলা হয়েছে এক নির্বাচনী আসনে প্রতি ওয়ার্ডে ১টি নির্বাচনী ক্যাম্প করা যাবে। যদি কেউ বেশি করে তাহলে নির্বাচন কমিশন কী করবে? বলা হয়েছে, ৩টি মাইক প্রচার করতে পারবে। বেশি নামালে কী হবে? নির্বাচন কমিশন এসব ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেবেন? সতর্ক করেই ছেড়ে দেবেন? তাহলে প্রয়োগহীন আইন দুর্বৃত্তদেরই উৎসাহিত করবে।
ছয়) সরকারি কর্মচারীরা নির্বাচন করতে চাইলে, তারা অবসরের ৩ বছর পর নির্বাচনে যোগ্য হবেন। কোনো ব্যক্তি একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দিলে, তিনি সদস্য হওয়ার ২ বছর পর নির্বাচনে যোগ্য হবেন। কিন্তু অতীতে এসব বিধান উপেক্ষিত হতে দেখা গেছে। এ যেন কাজীর গরুর মতো, শুধু কাগজে আছে গোয়ালে নেই। আর একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সব দল ও মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন কনফ্লিকট অব ইন্টারেস্ট তৈরি করে। পদ এবং ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে, অনৈতিক সুবিধা নেওয়াটা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা নির্বাচন করতে পারতেন না। কারণ উপদেষ্টা থেকে তফসিল ঘোষণার আগমুহূর্তে পদত্যাগ করে নির্বাচন করলে, সরকারে থেকে সে যে সুযোগ ভোগ করে প্রচারণা চালানো, সরকারি তহবিলের বিপুল অংশ অন্যায়ভাবে নিজের নির্বাচনী এলাকায় নানা উন্নয়ন বরাদ্দ দিয়ে নিজের পক্ষে মানুষের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করা নীতিবিরুদ্ধ হওয়া উচিত। কিন্তু তার ব্যত্যয় লক্ষ করা যাচ্ছে। উপদেষ্টাদের কেউ কেউ ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনী কাজে নেমে পড়েছেন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন আরপিও অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নিতে পারেন? সে প্রশ্ন এখন বাতাসে ভাসছে।
গোটা দেশ ছেয়ে আছে বিশাল বিশাল বিল বোর্ডে। পোস্টারে সয়লাব চারদিক। এলাকার জনদরদি, সমাজসেবী এবং নির্যাতন ভোগকারী নেতাদের হাসিমুখ দেখছেন দেশের মানুষ রাস্তার দুই ধারে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে, মানুষের মাথার অনেক ওপরে। বিপুল টাকার ব্যবহার দেখছেন মানুষ। মানুষের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগানোর জন্য নানা বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। লেভেল প্লেইং ফিল্ড তো দূরের কথা, মাঠ প্রস্তুতের আগেই মাঠে নেমে পড়েছেন অনেক জবরদস্ত খেলোয়াড়। আরপিও দিয়ে কী করবেন নির্বাচন কমিশন? কেউ কেউ হুঙ্কার দিচ্ছেন, প্রশাসনকে তাদের কথায় উঠতে-বসতে হবে। নির্বাচনী যুদ্ধে শুধু ভোটারের ভোটে বিজয়ী হওয়া যাবে না। প্রশাসনকে লাগবে তাদের বিজয়ী করতে এমন কথা অকপটে বলে ফেলছেন কেউ কেউ। সংঘাত সংঘর্ষের আলামত দেখা যাচ্ছে কোন কোন স্থানে। এগুলো দেখবে কে, নিয়ন্ত্রণ করবে কে? সবশেষে নির্বাচন কমিশন নির্দেশনা দিয়েছেন, শুরু থেকেই আচরণবিধি প্রয়োগ করতে হবে। তফসিল ঘোষণার আগেই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে, এর কী হবে? গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি, উপেক্ষিত আচরণবিধি, ধনীবান্ধব আরপিওর অধীনে নির্বাচন কি গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের স্বার্থে প্রশ্ন তোলা জরুরি। কিন্তু সঠিক উত্তর পাওয়াটা কম প্রয়োজনীয় নয়।
রাজেকুজ্জামান রতন
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

