১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অথচ অবিচ্ছেদ্য একটি দিন। কারও কাছে এটি “সিপাহী-জনতার বিপ্লব”, আবার কারও মতে “প্রতি বিপ্লব ”। কিন্তু ইতিহাসের পেছনের বাস্তবতা ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করলে এক ভিন্ন চিত্র সামনে আসে।
সম্প্রতি নায়েব সুবেদার মাহবুবুর রহমান, যিনি সে সময় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার প্রধান ছিলেন, একান্ত আলাপচারিতায় এই প্রতিবেদকের (হাবিব বাবুল) সঙ্গে ৭ই নভেম্বরের অজানা কিছু তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, “বিপ্লবটি জাসদ ও কর্নেল তাহেরের পরিকল্পনাতেই হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বহীনতার কারণে তা অন্য খাতে চলে যায়।”
বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা: কর্নেল তাহেরের অনুপ্রেরণায় গঠিত সাধারণ সৈনিকদের সংগঠন
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে দেখা দেয় অসন্তোষ, বিশেষ করে নিম্নপদস্থ সৈনিকদের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের পর তাদের প্রত্যাশা ছিল একটি সমঅধিকারভিত্তিক সেনাব্যবস্থা—যেখানে মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের মর্যাদা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। এই প্রেক্ষাপটেই কর্নেল আবু তাহেরের ভাবনায় জন্ম নেয় “বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা।
নায়েব সুবেদার মাহবুবুর রহমান স্মৃতিচারণে বলেন—
“কর্নেল তাহের আমাদের বলেছিলেন, সেনাবাহিনী আর জনগণের মধ্যে কোনো দেওয়াল থাকবে না। সেনাবাহিনীর ভেতর থেকেই বিপ্লব ঘটাতে হবে।”
এই চিন্তা থেকেই মাহবুবুর রহমান কর্নেল তাহেরের সহযোগিতায় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গঠন করেন। এর লক্ষ্য ছিল—একটি সৈনিক-জনতার যৌথ বিপ্লব ঘটিয়ে ‘গণমুখী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করা।
৭ই নভেম্বর: সিপাহীরা রাজপথে, পরিকল্পনার বাস্তব রূপ
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সকালে সেনানিবাসের সিপাহীরা ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তাদের মুখে স্লোগান—“সিপাহী জনতা ভাই ভাই ।” সেই সময় সেনানিবাসে ছিল বিভক্তি, আর রাজনৈতিক পটভূমিতে উত্তেজনা চরমে।
নায়েব সুবেদার মাহবুবুর রহমান বলেন—
“অভ্যুত্থানটা আমাদের পরিকল্পিত ছিল। কর্নেল তাহেরের দিকনির্দেশনাতেই আমরা ৭ই নভেম্বরের বিপ্লব ঘটাই । লক্ষ্য ছিল জাসদ , গণবাহিনী ও সৈনিক ঐক্যের মাধ্যমে একটি বিপ্লবী সরকার গঠন।”
কিন্তু পরিকল্পনার বাস্তবায়নে দেখা দেয় রাজনৈতিক ও নেতৃত্বসংক্রান্ত জটিলতা।
বিপ্লবী সরকার গঠনের প্রস্তাব ও ব্যর্থতা
সেদিন রাতে মাহবুবুর রহমান কর্নেল তাহেরকে প্রস্তাব দেন, অবিলম্বে একটি বিপ্লবী সরকার ঘোষণা করতে। কারণ সৈনিকরা তখন উত্তেজিত, জনগণও রাজপথে। কিন্তু কর্নেল তাহের ও জাসদের রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব ঘটে।
এই বিলম্বই, মাহবুবুর রহমানের মতে, বিপ্লবের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
“আমরা চেয়েছিলাম কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকার হোক। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখনো দোটানায় ছিল। সেই সময়ের ছোট্ট ভুলটাই ইতিহাসের বড় ক্ষতি হয়ে গেল।”
রেডিও ঘোষণায় নেতৃত্বের সংকট
৭ই নভেম্বর রাতে জাসদের সহযোগী সংগঠন বিপ্লবী গণবাহিনীর সদস্য শামসুদ্দিন পেয়ারা ঢাকা রেডিও দখল করে “সিপাহী বিপ্লবের” আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ঘোষণায় তিনি বিপ্লবী গণবাহিনীর নাম উল্লেখ করলেও, কর্নেল তাহের বা জাসদের নাম উল্লেখ করেননি।
ফলে সৈনিক ও সাধারণ জনগণ মনে করে এই বিপ্লব জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে সংঘটিত হচ্ছে।
এখানেই শুরু হয় ইতিহাসের মোড় ঘোরানো বিভ্রান্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পরবর্তীতে এই ঘটনাকে “বিপ্লবের যোগাযোগ ব্যর্থতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কারণ ঘোষণায় যদি তাহের বা জাসদের নাম আসত, বিপ্লবের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ভিন্ন রূপ পেতে পারত।
বিপ্লবের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় অন্য হাতে
অল্প সময়ের মধ্যেই জেনারেল জিয়া মুক্তি পান এবং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নিজের হাতে নেন। জাসদের পরিকল্পিত বিপ্লব তখন সামরিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে রূপ নেয়।
নায়েব সুবেদার মাহবুবুর রহমানের ভাষায়—
“আমরা ভেবেছিলাম গণবাহিনী ও সৈনিকদের ঐক্যে নতুন রাষ্ট্র গড়ব। কিন্তু দেখা গেল, বিপ্লব আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল। সৈনিকরা বুঝতেই পারেনি কার নেতৃত্বে তারা লড়ছে।”
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: বিপ্লব বনাম পাল্টা অভ্যুত্থান
৭ই নভেম্বরকে কেউ বলেন “বিপ্লব”, কেউ “পাল্টা অভ্যুত্থান”। বাস্তবে এটি ছিল এক নেতৃত্বহীন শক্তির সংঘর্ষ, যেখানে আদর্শিক দিকনির্দেশনার অভাবে গণআন্দোলন সামরিক প্রশাসনের হাতে চলে যায়।
রাজনৈতিক গবেষকরা মনে করেন—
“যদি জাসদ দ্রুত নেতৃত্ব ঘোষণা করতে পারত, তাহেরের ভাবনা বাস্তব রূপ পেতে পারত। কিন্তু দেরি, বিভ্রান্তি এবং সামরিক কৌশলে জিয়া সেই আন্দোলনকে নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নিতে সক্ষম হন।”
হারানো সম্ভাবনার ইতিহাস
৭ই নভেম্বরের বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায়—যেখানে সৈনিক, রাজনীতিক ও জনগণ মুহূর্তের জন্য একত্র হয়েছিল নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্নে। কিন্তু নেতৃত্বহীনতা, রাজনৈতিক দোদুল্যমানতা এবং তথ্যগত বিভ্রান্তি সেই বিপ্লবকে ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে দেয়।
নায়েব সুবেদার মাহবুবুর রহমানের ভাষায়—
“আমরা বিপ্লব শুরু করেছিলাম জনগণের জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতেই সেটা ফিরিয়ে দিতে পারিনি।”
এই সাক্ষাৎকারভিত্তিক বিশ্লেষণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের নয়, বরং হারানো সম্ভাবনারও। ৭ই নভেম্বর সেই হারানো সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে থাকবে, যতদিন পর্যন্ত আমরা সত্য ইতিহাসের মুখোমুখি হতে না পারি।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক: — ( শুদ্ধস্বর ডটকম )
নায়েব সুবেদার মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে লেখকের একান্ত আলাপচারিতার ভিত্তিতে রচিত।

