কলোনের সেই দিনগুলো

তখন সুমন (ছবিতে একেবারে বাঁয়ে) আমাদের সঙ্গে কাজ করত। অন্য শহরে থাকলেও প্রতি সপ্তাহান্তে সে ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের খবর পাঠ করতে কলোনে চলে আসত। আমাদের কাজ ছিল এক বিশেষ ধরণের— ইংরেজি বা জার্মান ভাষায় লেখা খবর নিজে অনুবাদ করে, নিজস্ব ভাষায় সাজিয়ে, তারপর সেই লেখা নিজ কণ্ঠে পাঠ করা। সংবাদপাঠ ছিল যেন একসঙ্গে লেখা ও অভিনয়ের মেলবন্ধন।

ছবির একেবারে ডানদিকে যিনি বসে আছেন, তিনি একেহার্ট গেলব্রিশ— বাংলা বিভাগের প্রথম জার্মান প্রধান। অসামান্য মেধাবী, বিস্তৃত জ্ঞানের অধিকারী সেই মানুষটির প্রতি আজও আমার গভীর শ্রদ্ধা। বিভাগে কর্মী নিয়োগের দায়িত্বও ছিল তাঁরই হাতে। কলোন থেকে তিনি সরাসরি ঢাকায় এসেছিলেন পরীক্ষা নিতে।
আমি তখনও জানতাম না, সেই পরীক্ষাই একদিন আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।

পরীক্ষার দিনে তিনি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে দিয়েছিলেন কিছু সংবাদ, আবার লিখতেও বলেছিলেন একটি ছোট্ট লেখা। শেষে নেন ভয়েস টেস্ট— হয়তো সেখানেই আমার কণ্ঠে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন রেডিওর ভাষা। বহু প্রার্থীর মধ্যে থেকে আমাকেই বেছে নেন ‘ফিমেল ভয়েস’-এর জন্য।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর কলোন থেকে একটি চিঠি এল— সেখানে লেখা, আমি নির্বাচিত হয়েছি এবং যোগদানের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
আজও মনে আছে, সেই চিঠির খাম খুলে পড়ার সময় আমার হাত কাঁপছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করার পর কিছুদিন গবেষণার কাজে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু রসায়নের সেই নিরাবেগ জগত হঠাৎ একদিন ছেড়ে দিলাম— মন বলল, অন্য কোনো সৃজনের দিকে এগোই। তাই যোগ দিলাম সিদ্ধেশ্বরী কলেজে, অধ্যাপনার কাজে। সুবিধাটা ছিল— ক্লাস শুরু হতো সকালেই, আর দুপুরের মধ্যেই শেষ।
দুপুরবেলা, ক্লাস শেষের পর, আমি ছুটে যেতাম ধানমন্ডি দুই নম্বর রোডের সেই ছোট্ট আর্ট গ্যালারিতে— সেখানে শিল্পী আমিনুল ইসলামের কাছে শিখতাম তেলরঙ ও জলরঙের জাদু।
বিজ্ঞান থেকে শিল্পে এই গমন যেন আমার নিজেরই এক নীরব বিবর্তন।

হয়তো সেই শেখারই ফল— আজও আমার আঁকা ছবিই শোভা পায় শহীদ কাদরীর “তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা”, আমার নিজের লেখা “সত্তার অসীম আকাশ”, এবং অনুবাদ গ্রন্থ “পিয়ানো টিচার”-এর প্রচ্ছদে।
এক রঙ থেকে অন্য রঙে, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায়— জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন অনুবাদেরই এক নতুন রূপ।

ছবিতে সুমনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে শাজাহান ফারুক— ঢাকা রেডিও থেকে তিন বছরের চুক্তিতে এসেছিল। তার পাশে আবদুল্লাহ আল ফারুক, সেও ঢাকার রেডিও থেকেই চুক্তিভিত্তিক কাজে যোগ দিয়েছিল। পরেরজন শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত— আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক, তিনিও তিন বছরের জন্য ছিলেন আমাদের সঙ্গে। শুভর পাশে আব্দুস সাত্তার— মর্নিং নিউজ পত্রিকার সাংবাদিক।
আর আমাদের সবাইকে স্নেহে ও শৃঙ্খলায় সামলে রাখতেন, মাঝের সেই চেয়ারে বসা জার্মান প্রযোজক— এসথার কয়েপগেন।

সময় বয়ে গেছে। অনেকেই আজ নানা দেশে, নানা জীবনে ছড়িয়ে পড়েছেন। তবু, কলোনের সেই স্টুডিওর নরম আলো, মাইক্রোফোনের সামনে বসে খবর পড়ার মুহূর্ত, আর কাজের ফাঁকে ভাগ করা হাসির স্মৃতি— এখনো যেন ভেসে আসে হৃদয়ের এক নীরব তরঙ্গে।

বার্লিন থেকে

নাজমুন্নেসা পিয়ারি , সাংবাদিক এবং লেখক , অনুবাদক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.