আমার শৈশব কাল : রূপকথার গল্প , সোনার নৌকা পবনের বৈঠা

তৃতীয় পর্ব :

আমার বড়মা — আসলে আমার মায়ের নানি — আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। তাঁর জন্য নির্ধারিত ঘরেই আমার রাত কাটত। সেই ঘরেই ঘুমাতেন আমার মেঝ খালা। রাত নামলেই আমরা দু’জন বিছানায় শুয়ে থাকতাম আর বড়মা শুরু করতেন তাঁর অপূর্ব কিসসা কাহিনী । নানার বাড়ির দক্ষিণ দিকে ছিল বড় একটি পুকুর। সেই পুকুরে আশপাশের গ্রামের মানুষ স্নান করত, ছেলেমেয়েরা শাপলা- তুলে আনত। আবার সেই পুকুর ঘিরে কত যে কল্পকাহিনী ছড়িয়ে ছিল! কথিত আছে, কোনো এক প্রতিবেশী নাকি দেখেছে— মাঝরাতে পুকুরের মাঝখানে ভেসে উঠেছে সোনার নাও, আর তার বৈঠায় বইছে পবনের হাওয়া !

বড়মা যখন এমন গল্প বলতেন, আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত সেই সোনার নৌকো। ভয়ে গা শিরশির করত, তবু চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে শুয়ে থাকতাম— যদি সত্যিই জানালা দিয়ে উঁকি মারে সেই নৌকো!

আমার নানিও আমাকে খুব স্নেহ করতেন। একদিন বিকেলে তিনি বারান্দায় বসে আরাম করছিলেন,  হঠাৎ তিনি  দেখলেন  উত্তর দিকের ফটক দিয়ে এক অদ্ভুত চেহারার বুড়ি ভেতরে ঢুকল। ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে দক্ষিণ দিকের গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। অথচ সেই গেট তখন বন্ধ! নানি হাঁক দিলেন — “বুড়ি, কই যাও? গেট তো বন্ধ!” — কিন্তু বুড়ি কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা  বন্ধ  গেটের ভেতর দিয়েই  মিলিয়ে গেল! নানি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন — এ মানুষ না, অতিমানব না হয় ভূত !

সেই যুগে এইসব গল্প সবাই নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করত। যে কেউ মানসিক অসুস্থ হলে বলত — “ওকে ভূতে ধরেছে।” তাকে স্বাভাবিক করার নামে ডাকা হতো কবিরাজ, ওঝা, সন্ন্যাসী— আর তারা নির্মম উপায়ে ভূত ছাড়ানোর চেষ্টা করত। আজ ভাবলে অবিশ্বাস্য লাগে, কিন্তু ছোটোবেলায় আমি এসব অন্ধবিশ্বাস গভীরভাবে মেনে নিয়েছিলাম।

গ্রামে তখন বলা হতো — “ভরদুপুরে বাইরে যাস না, সন্ধ্যার পর তেল-মশলা বা ভাজাভুনা হাতে নিয়ে বের হবি না।” আমাদের পাশের গ্রামে এক পুকুরের পাড়ে ছিল ডালভাঙা, পাতাবিহীন এক ভয়ার্ত গাছ। সবাই তাকে ডাকত বঙ্খিই গাছ। কারও হঠাৎ পেটে ব্যথা হলে গ্রামবাসীরা ধরে নিত — “নিশ্চয়ই ওই গাছের পাশ দিয়ে গিয়েছিল!” কারণ তারা নিশ্চিত ছিল, সেই গাছে পুরো ভূতপরিবারের বসবাস। যারা ভুতভীতি ছিল তারা দিনের আলোয়ও  ঐ গাছের  কাছ দিয়ে যেত না।

এমন সব গল্প, ভয় আর কল্পনার জালেই আমার শৈশব কেটেছে। এখন সেসব ভাবলে হাসি পায়, আবার বুকের ভেতর হালকা হাহাকারও জেগে ওঠে— কত সহজ ছিল আমাদের ভয়, কত নিষ্পাপ ছিল সেই বিশ্বাস !

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.