১৯৭৩ সালের ব্যালট বাক্স ছিনতাই হওয়া ডাকসুর নির্বাচন এবং আমার স্মৃতি

 

 

১৯ ৭৩ এর  জাতীয় নির্বাচনের পরপরই আসে ডাকসু নির্বাচন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্রলীগ বিপুল জনপ্রিয়। আমরা আশা করেছিলাম—জাতীয় নির্বাচনে যা-ই ঘটুক না কেন, ডাকসু নির্বাচনে আমরা জিতব। আমি তখন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। কিন্তু কলেজে আমার মন টিকত না। বেশিরভাগ সময় থাকতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রই মনে করত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি মিটিং-মিছিলে আমার সরব উপস্থিতি ছিল। সেই সময় ছাত্রলীগ সভাপতি এ এফ এম মাহবুবুল হক ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। সবাই নিশ্চিত ছিল যে তিনি ভিপি পদে মনোনয়ন পাবেন। সাধারণ সম্পাদক পদে শোনা যাচ্ছিল সাইফুল গনি অথবা জহুর ভাইয়ের নাম—দুজনেই সায়েন্স অ্যানেক্সের ছাত্র। জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন ভিপি সাইফুর রহমান আমাকে বলেছিলেন, তিনি চান গোলাম কিবরিয়া সাধারণ সম্পাদক পদে আসুক। তবে শেষ পর্যন্ত মাহবুব ভাই ভিপি এবং জহুর ভাই সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনয়ন পেলেন। প্রচার ও নির্বাচনী উত্তেজনা ক্যাম্পেইন শুরু হয়ে গেল। কলাভবনের সামনে পরিচিতি সভায় ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আফতাব আহমেদ জ্বালাময়ী বক্তৃতায় মাহবুব–জহুর পরিষদকে ঘোষণা করলেন।মুহূর্তেই কলাভবনের সামনের মাঠ কেঁপে উঠল। হাজার হাজার ছাত্র মিছিল নিয়ে কলাভবন প্রকম্পিত করে তুলল। রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকেও মিছিল এসে যোগ দিল—সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।

 

 অন্যদিকে মুজিববাদী ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যৌথ প্যানেল দেয়। তাদের প্রার্থী ছিলেন ভিপি পদে নূহ আলম লেনিন (ছাত্র ইউনিয়ন) এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ইসমত কাদির গামা (মুজিববাদী ছাত্রলীগ)। স্লোগানের লড়াই ও গুলি নির্বাচনের আগের দিন বিকেলে কলাভবনের সামনে আমরা পাশাপাশি বৃত্ত আকারে বসে স্লোগান দিচ্ছিলাম। আমরা বলছিলাম: “মাহবুব–জহুরের ভয়ে তারা যৌথ প্যানেল দিল গো, শরমও লাগে গো।” ওরা প্রতিউত্তরে বলছিল: “শরম যদি লাগে গো, বোরখা এনে দিব গো।” বন্ধুত্বপূর্ণ স্লোগানবিনিময়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিবেশটা হালকা ছিল। কিন্তু সন্ধ্যায় বিভিন্ন হল থেকে মাহবুব–জহুরের সমর্থকেরা জড় হতে লাগল। আমরা কলাভবন থেকে মিছিল করে সায়েন্স অ্যানেক্সের দিকে যাচ্ছিলাম। পুষ্টিভবনের সামনে আসতেই হঠাৎ গুলির শব্দ! নেতারা দ্রুত নির্দেশ দিলেন মাটিতে শুয়ে পড়তে। আমরা সবাই সুশৃঙ্খলভাবে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর গুলি থামলে আবার উঠে দাঁড়িয়ে সায়েন্স অ্যানেক্সে যাই। এভাবেই সেদিনের কর্মসূচি শেষ হয়।

 

নির্বাচনের দিন সকালে সূর্যসেন হলে গেলাম,  ভিপি প্রার্থী মাহবুব ভাইকে সেখানে দেখলাম—তার পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা, আগের দিনের মিছিলে কোথাও কেটে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর আমরা ৮–১০ জন তার সঙ্গে বিভিন্ন হলে ভোট  কিরকম হচ্ছে দেখতে বের হলাম , বিভিন্ন হলে পরিদর্শন করে বুঝতে পারলাম ভোটের জোয়ার আমাদের দিকেই ।

 

দুপুরের দিকে সামসুন্নাহার হলের সামনে লেনিন ও গামাকে দেখলাম। তখন হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। আমরা স্লোগান দিলাম: “গামারে গামা, বৃষ্টি থামা।” শুধুই খুনসুটি, আনন্দের ছলে বলা স্লোগান। ভোটগ্রহণ শেষে কলাভবনের চতুর্থ তলায় গণনা শুরু হলো। আমরা জয়ের সংবাদ পাচ্ছিলাম, ফলাফল ঘোষণার অপেক্ষায় ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম কলাভবনের গাড়ি বারান্দার নিচে একটি সাদা গাড়ি ও একটি মাইক্রোবাস এসে দাঁড়াল। তখনো বুঝিনি কী হতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর খবর এলো—হলে হলে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে, কলাভবনের ব্যালটও লুট হয়েছে। আমাদের কয়েকজন সিনিয়র নেতা  আমাদেরকে  সরে গিয়ে ঢাকা মেডিকেলে কলেজের দিকে  অবস্থান নিতে বলল। সেখানে গিয়ে জানলাম, সত্যিই ব্যালট বাক্স হাইজ্যাক হয়েছে।  তখন সন্ধ্যা শেষে রাত হয়ে গেল ,  আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলাম  সেই রাতে আর কোনো কর্মসূচি হয়নি।

 

পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ভূতুড়ে নীরবতা নেমে এলো। পরের দিন ধানমণ্ডি এলাকার কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে শুনলাম— আবহনী  ফুটবল  ক্লাবের আশেপাশে ব্যালট বাক্স থেকে ছড়ানো ব্যালট কাগজ তারা দেখতে পেয়েছে। সাংবাদিক সম্মেলন করে আওয়ামীলীগ পন্থী ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা বৈজ্ঞানিক সমজতন্ত্র পন্থী ছাত্রলীগকে দায়ি করল ভোটের বাক্স ছিনতাইয়ের জন্য , কিন্তু গণকন্ঠ এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সংবাদ বের হোল , সরকারপন্থি ছত্রলিগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা ভোটের বাক্স ছিনতাই করেছে , সাম্প্রতিক সময়ে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম স্বীকারও করেছেন তারা ভোটের বাক্স ছিনতাই করেছিলেন । 

হাবিব বাবুল , প্রধান সম্পাদক

শুদ্ধস্বর ডটকম ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.