বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সাগর সমান রক্ত, ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে। অথচ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা বারবার অবমাননার শিকার হচ্ছে, আর যাঁদের জন্য এই দেশ, সেই মুক্তিযোদ্ধারাই প্রায়ই লাঞ্ছিত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা জাতিকে গভীরভাবে হতাশ করেছে এবং আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। গত শনিবার গভীর রাতে একটি নিন্দনীয় ঘটনা ঘটে টাঙ্গাইলে। বীর মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এর আগে দিনের বেলা কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে যিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন, তাঁর প্রতি এ ধরনের আক্রমণ মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। গত ২৮ আগস্ট ঢাকার প্রেস ক্লাবে ‘মঞ্চ ৭১’ এর মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মব তৈরি করা হয়। সেই মব সৃষ্টিকারীদের হাতে লাঞ্ছিত হন ৮০ বছরের বেশি বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হাফিজুর রহমান কার্জন ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ প্রায় ১৬ জন। পরদিন তাঁদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কারাগারে পাঠানো হয়। স্বাধীন দেশের বুকে মুক্তিযোদ্ধাদের এভাবে অপমানিত করা শুধু দুঃখজনক নয়, জাতি হিসেবে আমাদের জন্য এক কলঙ্ক। প্রেসক্লাবের মত স্থানে মুক্তিযুদ্ধের আলোচনা করতে বসা আর সেই অপরাধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে কারাগারে যাওয়া সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এবং আইনের অপপ্রয়োগ হিসেবে দেখছে নানা মহল। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
এর আগে এক প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা, বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান সাহেবকে তাঁর নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে “অবাঞ্ছিত” ঘোষণা করা হয়। শুধু তাই নয়, তাঁর ছবিতে গণজুতাপেটার মতো অপমানজনক কর্মসূচি পালন করা হয়। ঢাকায় তাঁর ভাড়া বাসার নিচে অশালীন শব্দে লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে অগ্রহণযোগ্য ভাষায় স্লোগান দেওয়া হয় তাঁর বিরুদ্ধে। একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি এমন আচরণ কেবল ব্যক্তিগত অপমান নয়—এটি পুরো জাতির আত্মমর্যাদাকে পদদলিত করার শামিল। গত এক বছরে মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদার অবমাননা ও মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্ছনার একাধিক দৃষ্টান্ত আমাদের দেখতে হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরানো হয়েছে, শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করা হয়েছে। যেন অদৃশ্য স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার প্রবণতা বেড়েছে, যা তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করছে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—যাঁরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, তাঁদের কারণেই আজ আমরা স্বাধীন আকাশের নিচে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। তাঁদের লাঞ্ছিত করা মানে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানিত করা হলে আগামী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ম্লান হয়ে যাবে, আর জাতির আত্মপরিচয় হয়ে পড়বে প্রশ্নবিদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ কোনো সাধারণ অধ্যায় নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়। মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা মানে জাতির আত্মাকে আঘাত করা। তাই আজই সময়, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ফিরিয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাহাত্ম্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে জীবন্ত করে তোলার।
-মুহাম্মদ ফারহান হোসেন ,লেখক ও বিশ্লেষক ।

