বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি মানেই এক রকম আয়না, যেখানে প্রতিবার ভেসে ওঠে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আদর্শিক টানাপোড়েন আর তরুণদের স্বপ্নভঙ্গ কিংবা উত্তেজনা। এক সময় ডাকসুতে জয় মানে ছিল জাতীয় রাজনীতিতে সম্ভাবনার আভাস। কিন্তু সেই ধারার ভেতরেও রয়েছে বহু বিস্ময়, উত্থান–পতন আর প্রজন্মভিত্তিক পরিবর্তনের গল্প। ডাকসু থেকে শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখা হয়েছে।
পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ–উত্তর বাংলাদেশ পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ীরা প্রমাণ করেছেন, তরুণদের মতামত বড় দলের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সবসময় মিলে যায় না। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে-পরে তোফায়েল আহমেদ ভিপি নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই ১৯৬৯-এর ছাত্র আন্দোলন চূড়ান্ত গতি পায়। এরপর ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগ থেকে আসম আব্দুর রব ভিপি ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন জিএস নির্বাচিত হন। তখন পুরো জাতি ছিল স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর। ছাত্রনেতাদের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে, কারণ তারা শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধি নয়, বরং স্বাধীনতার পথনির্দেশক।
স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার বড় দায়িত্ব নিলেও ছাত্রসংগঠনের মাঠের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ৭০ দশকের শুরুতেই দেখা যায়, জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ দেশের অধিকাংশ কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন দেশের অবিসংবাদিত নেতা, সময়ও ডাকসু নির্বাচনে জয় পায় ছাত্র ইউনিয়ন। ইতিহাস যেন বলছিল—ছাত্রসমাজ সবসময় আলাদা ব্যালটের হিসাব কষে।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ও ছাত্রদলের উত্থান আশির দশক ছিল ব্যক্তিত্বের রাজনীতি। মাহমুদুর রহমান মান্না কিংবা আখতারুজ্জামান দু’বার ডাকসুতে জয় পান মূলত ব্যক্তিগত কারিশমায়। কিন্তু নব্বইয়ের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদলের অগ্রণী ভূমিকায় তারা ডাকসুতে প্রথমবার শক্ত অবস্থান তৈরি করে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ছাত্রসমাজকে আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে দাঁড় করায়।ছাত্রদল আন্দোলনের জোয়ারে ডাকসুতে জয়লাভ করে ।
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণপন্থীদের উত্থান বর্তমান সময়ের ছাত্ররাজনীতি একেবারেই ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েছে। মাত্র এক বছর আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপেই আওয়ামী লীগ সরকারকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলো, তবে অপ্রকাশ্যে ইসলামি ছাত্রশিবিরও বড় ভূমিকা রেখেছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর সেটি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারই ধারাবাহিকতায় দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণপন্থীরা জাকসুসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদে টানা জয় পাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুতে জয় তাদের একধরনের বৈধতা দিয়েছে, আর জাকসু নির্বাচন সেই সাফল্যকে আরও শক্ত করেছে। কেন ভরসা হারাল বড় দলগুলোর ছাত্রসংগঠন ? বিএনপির ছাত্রদল কিংবা আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ—দুই সংগঠনই বহু বছর ধরে মূলত জাতীয় রাজনীতির এজেন্ডা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থেকেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের সমস্যাগুলো, যেমন—আবাসন, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা, টিউশন ফি বৃদ্ধি কিংবা গবেষণার সুযোগের মতো বাস্তব ইস্যুতে তাদের অবস্থান দুর্বল ছিল। ফলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক অঘোষিত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বড় রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছাত্রসংগঠনে ভোট এনে দেবে—এ ধারণা ভুল প্রমাণ হয়েছে বারবার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইতিহাস বারবার একই বার্তা দিচ্ছে। যেমন—১৯৭০ সালে যখন আওয়ামী লীগ জাতীয়ভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি, তখনও ছাত্রসমাজ বিকল্প শক্তিকে সমর্থন করেছে ছাত্রলীগের স্বাধীনতাপন্থী অংশের নেতা রব ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন । ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনেও ছাত্রদল অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল , ফলে তারা ডাকসুতে বিজয়ী হয়েছিলো । সাম্প্রতিক সময়ে ডাকসু এবং জাক্সুতে ডানপন্থীদের জয়কে সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায় বলা যায়।
কিন্তু “ছাত্রসংসদে ধারাবাহিক জয় মানে এই নয় যে জাতীয় রাজনীতিতেও তারা প্রধান শক্তি হয়ে উঠবে। তবে এটি প্রমাণ করে, ছাত্রসমাজ নিজেদের ইচ্ছা–অনিচ্ছার বার্তা স্পষ্টভাবে জানাতে জানে।” এখন প্রশ্ন—এ ধারাবাহিক জয় কি রাকসু, বাকসু কিংবা চাকসুতেও পৌঁছাবে ? অনেকেই মনে করছেন, হ্যাঁ। তবে এটিও সত্য যে ছাত্ররাজনীতির ফলাফল সবসময় জাতীয় রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে না। তারপরও, ইতিহাস যেমন সাক্ষ্য দিয়েছে, ছাত্রসমাজের মেজাজ ও রায়ের ভেতরেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতির আভাস অনেক সময় লুকিয়ে থাকে।
হাবিব বাবুল , রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং শুদ্ধস্বর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ।

