জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশের সুপারিশ করবে কমিশন

জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক বিষয়গুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাকি বিষয়গুলো তাঁরা নির্বাহী আদেশ ও অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন।

রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে গতকাল রোববার জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করা এবং বাস্তবায়নের উপায় ও পদ্ধতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানেই বিশেষজ্ঞরা তাঁদের পরামর্শ দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশন-সংশ্লিষ্ট একজন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা স্পেশাল কনস্টিটিউশনাল অর্ডারের (এসসিও) মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা সেটি আমলে নিয়েছি। এ ক্ষেত্রে বাংলা নামটা ঠিক হয়নি। সোমবার (আজ) তাঁরা আমাদের লিখিতভাবে দেবেন। এরপর জুলাই সনদ ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি দলগুলোর কাছে পাঠানো হবে।’

গতকাল বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে। আলোচনায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন মোহাম্মদ ইকরামুল হক, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরিফ ভূঁইয়া ও ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক।

সভায় বিশেষজ্ঞরা সনদের চূড়ান্ত খসড়া পর্যালোচনা করেন এবং বাস্তবায়নের সম্ভাব্য উপায় সম্পর্কে সাংবিধানিক, আইনগত ও রাজনৈতিক দিকগুলো নিয়ে মতামত দেন। এ সময় কমিশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ইফতেখারুজ্জামান, সফর রাজ হোসেন ও মো. আইয়ুব মিয়া।

এ ছাড়া জাতীয় ঐকমত্য গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার সভায় অংশগ্রহণ করেন।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথরেখা নিশ্চিত করতে এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করল কমিশন। প্রথমে গণভোট, বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামত এবং অধ্যাদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছিল তারা। কিন্তু ভালো ও মন্দ দিক বিবেচনা করে সর্বশেষ বিশেষ সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করা যায় না বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই নানান সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে সাংবিধানিক আদেশ জারির মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানান এক বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, তাঁরা সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত একটি আদেশের মাধ্যমে সাংবিধানিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমান সরকার সেটি জুলাই ঘোষণাপত্রের অধীনে জারি করবে। সেটা পরবর্তী সংসদ গ্রহণ করতে পারে, আবার না-ও পারে। অন্যদিকে আদালতেও চ্যালেঞ্জের সুযোগ থেকে যায়।

এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওই বিশেষজ্ঞ নাম না প্রকাশ করার শর্তে আজকের পত্রিকা’কে বলেন, ‘ঝুঁকি তো থাকবে। এটা ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব না। সে ক্ষেত্রে আরেকটা হলো, কিছু না করা। শুরুর দিকে আমরা গণভোটের কথা বললেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরে এসেছি। কারণ, একত্রে এতগুলো বিষয়ে গণভোটের পাশাপাশি বড় দল প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে গণভোটে জুলাই সনদ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। অন্যদিকে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবায়নও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। তাই সেটি বাদ দিয়েছি।’

সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে দলগুলোর কাছ থেকে লিখিত মতামত নিয়েছিল ঐকমত্য কমিশন। বিএনপি সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো আগামী সংসদ গঠনের দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের পক্ষে। তবে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশ কিছু দল আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায়। জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রপতির প্রোক্লেমেশন বা গণভোটের মাধ্যমে এবং এনসিপি গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেয়। এর বাইরে অন্তত ১২টি দল সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স নিয়ে সনদ বাস্তবায়নের পরামর্শ দেয়। এর আগে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠকেও এসব বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছিল।

সূত্র জানায়, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এর আগে উচ্চকক্ষের নির্বাচনী প্রক্রিয়াসহ কিছু বিষয়ে গণভোট দেওয়ার বিষয়টি চিন্তা করেছিল ঐকমত্য কমিশন। আলোচনায় এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা হয়। গণভোটের আইনি ও রাজনৈতিক দিক বিবেচনা করে এই পদ্ধতি সুপারিশ না করার পক্ষে মত আসে। ১০-১২টি দল সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন, এটি করা ঠিক হবে না। কারণ, এর আগেও সরকারের বিষয়ে রেফারেন্স নেওয়া হয়েছিল। পরে বিশেষ সংবিধান বা সাংবিধানিক সংস্কার আদেশ জারির মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে মত আসে।

এ ছাড়া যেসব সুপারিশ অধ্যাদেশ বা রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব, সেগুলোও বৈঠকে তোলা হয়। বিশেষজ্ঞরা সেগুলোও পর্যালোচনা করেছেন। সনদের অঙ্গীকারনামা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কিছু ভাষাগত পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেন। জুলাই সনদকে কোনোভাবে সংবিধানে যুক্ত করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়।

আলোচনার বিষয়ে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, প্রতিটি দলের পরামর্শ কমিশন অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে। সব ক্ষেত্রে আইনি ও রাজনৈতিক দিক, ভালো ও মন্দ দিক খতিয়ে দেখা হয়েছে। কমিশন চায় তাদের পরামর্শ যেন আইনি, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়।

আলী রীয়াজ জানান, বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে খসড়া পাওয়া গেলে কাল মঙ্গলবার জুলাই সনদ ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে কমিশনের সুপারিশ রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন।সুত্র : আজকের পত্রিকা ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.