দ্রব্যমূল্য ও দারিদ্র্য দুটোই বাড়ছে

নির্বাচনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক আলোচনা এখন নির্বাচন নিয়ে কেন্দ্রীভূত। কিন্তু যে মানুষের জন্য নির্বাচন, তাদের জীবন চলছে কেমন? মানুষ চায় দেশটা ভালো থাকুক, ভালো চলুক। পাশাপাশি চায় তার সংসারটাও ভালো চলুক, জীবনে স্বস্তি থাকুক। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে আড়াল হয়ে যাচ্ছে দ্রব্যমূল্য ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি। চাপা পড়ে যাচ্ছে, গণমানুষের সংকট। বাজারে জিনিস নেই, তাই দাম বাড়ছে এটা শুনে মানুষ অভ্যস্ত। কিন্তু বাজারে জিনিস আছে, তারপরও দাম বাড়ছে কেন? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে চায় মানুষ। মানুষ চায় বৃদ্ধি ঘটুক। কিন্তু সব বৃদ্ধি কি ভালো? দেশের জিডিপি, মাথাপিছু আয় বাড়ছে এগুলো উন্নতির লক্ষণ। আবার দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, দেশে বিগত তিন বছরে দারিদ্র্য বেড়েছে এগুলো সংকটের চিহ্ন। জরিপের রিপোর্টে প্রকাশ হয়েছে যে, দেশে প্রতি চারজনের একজন এখন গরিব। এর বাইরে আরও অনেক মানুষ এমন আর্থিক অবস্থায় রয়েছেন। কোনো মতে দিন কাটানোটাই তাদের জন্য কঠিন। ফলে আকস্মিক যে কোনো অসুস্থতা বা অন্য কোনো সংকটে, তারা গরিব হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ রকম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি। তাদের দিন কাটে কোনোমতে, দিন পার করার চিন্তায়। মানুষ কাজ করে, ভালোভাবে বাঁচার জন্য। কাজ করে মজুরি পায় বা আয় করে, সেই আয় দিয়ে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনে। কাজ না থাকলেও, মজুরি বা আয় না বাড়লেও, দ্রব্যমূল্য কিন্তু বেড়েই চলেছে। যেমন এখন ভরা বর্ষা। ইলিশ খাওয়ার ইচ্ছা কার না হয়? বাজারের কম দামের সবজিগুলোর একটি পটোল।

বর্ষায় ইলিশের সঙ্গে পটোলের তরকারি জনপ্রিয়। ইলিশের যা দাম, তাতে ইলিশ কেনা কঠিন। পটোলের দামও কম নয়। সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, প্রতি কেজি পটোল এখন ৬০ থেকে ৮০ টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি। শুধু পটোল নয়, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের বাজারদরের দৈনিক তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ২১ আগস্টের চেয়ে এ বছরের ২১ আগস্ট ১৬টি সবজির দাম গড়ে ২৬ শতাংশ বেশি। বাণিজ্য সচিব সে কথা স্বীকার করেছেন, কিন্তু কারণ হিসেবে যা বলেছেন তা সঠিক নয়। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর বর্ষা শেষের এ সময়ে শাকসবজির দাম একটু বেশি থাকে। রবিশস্য আসার আগে এমনটা মেনে নিতে হবে। তবে বাজার যাতে ঠিক থাকে, সে জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।’ কিন্তু সেই সর্বাত্মক চেষ্টার ফল কী? উত্তরবঙ্গ থেকে যে সবজি আসে, তা তিন চারগুণ বেশি দামে বিক্রি হয় কারওয়ান বাজারে। আবার সেখানে রাতে পাইকারিভাবে যে দামে সবজি বিক্রি হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি দরে বিক্রি হয় খুচরা পর্যায়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম ৩০ শতাংশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ এবং কোনো ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বা তার বেশি বাড়ে। এসব নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ কি আছে, থাকলে তার ফলাফল তো মানুষ দেখছে না।

অন্যদিকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষার স্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে এবার সবজির দাম বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এবার আগস্টে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টি কম হয়েছে। ফলে বর্ষাকে বলির পাঁঠা বানানোর কোনো মানে হয় না। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) জুন মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলেছে, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য, যথাযথ তথ্যের অভাব, চাঁদাবাজি ও পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচের কারণে খুচরা বাজারে সবজির দাম বাড়ার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ফলে মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিরূপ প্রকৃতি, ফসলের ফলন কম হওয়া যতটা যতটা দায়ী তার চেয়ে বেশি দায়ী সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বহীনতা। শুধু সবজি নয়, সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মাছ ও মাংসের গড় দাম। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, পাঁচ ধরনের মাছের দাম বেড়েছে গড়ে ১৮ শতাংশ। মাংস ও ডিম শ্রেণিতে গড় মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৭ শতাংশ। সবজি, মাছ ও মাংসের দাম বাড়লে তা সংসারের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এমনিতেই চাল, ডাল ও তেলের দাম কমছে না এর সঙ্গে সবজি ও মাছের বাড়তি দাম মানুষকে আরও চাপে ফেলছে। বাংলাদেশ বিশ্ববাজারের অংশ। ফলে বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে, বাংলাদেশেও বাড়বে এবং বিশ্ববাজারে দাম কমলে বাংলাদেশেও কমবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে দাম দ্রুত বাড়লেও, কমে খুব কম ক্ষেত্রে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্য চাল, অপরিশোধিত সয়াবিন, চিনি, জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম বেড়ে গিয়েছিল অস্বাভাবিক হারে। কিন্তু গত দুই-আড়াই বছরে বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের বেশির ভাগের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এলেও বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) ১৮ আগস্টের প্রতিবেদনে দেখা যায়, থাইল্যান্ডে এখন ৫ শতাংশ ভাঙা চালের মেট্রিক টনপ্রতি দর ৩৮১ মার্কিন ডলার (এফওবি মূল্য, অর্থাৎ জাহাজ ভাড়া ছাড়া), যা এক বছর আগে ছিল ৬১৬ ডলার। এক বছরে দাম কমেছে ৩৮ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে চালের দাম কমে নাই বরং বেড়েছে। ঘাটতি মেটাতে কম দামে বাংলাদেশ গত জুন পর্যন্ত এক বছরে ১৪ লাখ টন চাল আমদানি করেছে। তারপরও দাম কমে নাই। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী মে মাসের শেষ দিকে বাজারে মোটা চালের দাম ছিল ৫২-৫৫ টাকা কেজি, যা এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ মূল্যস্ফীতি নাটকীয়ভাবে কমাতে পারলেও বাংলাদেশ চলেছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ২০২২ সালে দেউলিয়া হওয়া শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি এখন ঋণাত্মক, অর্থাৎ সেখানে পণ্যের দাম আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম। অর্থনৈতিক সংকটে পড়া পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি ২০২৩ সালে ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়েছিল, যা নেমে দাঁড়িয়েছে ৪ শতাংশের কাছাকাছি। ভারতে মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ, নেপালে তা ২ দশমিক ৭২। এর বিপরীতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি গত জুলাই মাসে ছিল সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি। মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় বিপর্যস্ত নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রমজীবীদের জীবন। অথচ এরাই দেশের উৎপাদনের মূল কারিগর। আয় ও ব্যয়ের সমন্বয় করতে না পেরে হাঁসফাঁস করছে তাঁরা।

কয়েকটি আত্মহত্যার খবর লক্ষ্য করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। কুমিল্লার বুড়িচংয়ে, নিজ ঘর থেকে মা ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ ধারণা করছে, অভাব-অনটন, ঋণের চাপ আর দীর্ঘদিনের অসুস্থতার জেরে ওই মা তার মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। মারা যাওয়া নারীর নাম নমিতা রানী পাল (৪২) ও তার মেয়ে তন্বী রানী পাল (১৮)। রাজশাহীর মোহনপুরে আকবর হোসেন (৫০) নামের এক কৃষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিজের পানবরজ থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবার জানিয়েছে, এনজিও এবং স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে সুদে নেওয়া প্রায় সাত লাখ টাকার ঋণ পরিশোধের কোনো পথ না দেখে, আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। রাজশাহী পবায় ঋণের দায়ে এবং খাওয়ার অভাবে দুই সন্তানসহ স্ত্রীকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন এক ব্যক্তি। মিনারুল ইসলাম আত্মহত্যার আগে হত্যা করেছে তার স্ত্রী মনিরা বেগম, শিশু মিথিলা খাতুন ও মাহিমকে। এ সময় একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। এতে মিনারুল লিখেছেন, ‘আমি নিজ হাতে সবাইকে মারলাম। এই কারণে যে, আমি যদি মরে যাই, তাহলে আমার ছেলেমেয়ে কার আশায় বেঁচে থাকবে। কষ্ট আর দুঃখ ছাড়া কিছুই পাবে না। আমরা মরে গেলাম ঋণের দায় আর খাওয়ার অভাবে।’

দারিদ্র্য বাড়ছে, এ হিসাব উঠে এসেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় করা ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউসহোল্ড লেভেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক এ গবেষণায় বলা হয়, গত মে মাসে এসে দেশের দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। পিপিআরসি বলছে, দরিদ্রের বাইরে এখন দেশের ১৮ শতাংশ পরিবার হঠাৎ দুর্যোগে যেকোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিন বছরে অতি বা চরম দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। ২০২২ সালের অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। মাথাপিছু আয় বাড়লেও দেশে দরিদ্র এবং চরম দরিদ্র দুটোই বাড়ছে। দেশের ২৮ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। ২০২২ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। তখন পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ। জনসংখ্যার হিসাব বিবেচনায় আনলে দেশে এখন কমপক্ষে পৌনে পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। ফলে বৈষম্য প্রকট রূপ ধারণ করছে। দারিদ্র্য পরিমাপ করার ভিত্তি কি? খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয় ধরে দারিদ্র্য পরিমাপ করে বিবিএস। একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাদ্যগুণসম্পন্ন খাবার কিনতে এবং খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটাতে যত টাকা প্রয়োজন হয়, সেই পরিমাণ আয় না থাকলে তাকে দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়। জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় না বাড়লে, দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তেই থাকবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাবার, চিকিৎসা, বাসা ভাড়া ও শিক্ষা এমন প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে শুধু দরিদ্র নয়, মধ্যবিত্তরাও আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে পারছেন না। সাধারণ মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়া এই দুই আঘাতে বাড়ছে দারিদ্র্য। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আঘাত, দারিদ্র্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। দুর্নীতি আর সরকারের দায়হীনতা, এই সংকটকে তীব্র করে তুলছে। দীর্ঘদিনের দুষ্টচক্র থেকে মানুষ বাঁচবে কীভাবে?

রাজেকুজ্জামান রতন , কলাম লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.