‘জলের শ্যাওলা”- লেখার শুরুতেই শ্রদ্ধাভাজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল সায়েদ (মোহন ভাই) এর কথা উল্লেখ করছি। মোহন ভাই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বর্তমানে আমেরিকার বাসিন্দা। গত দুদিন পূর্বে মোহন ভাইয়ের একটি টেলিফৌন কল। কল করেই বললেন, মনটা ভাল নেই। মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে এতগুলো বাচ্চার মৃত্যু এই বয়সে নিতে পারছি না। তুমিতো মনোবিজ্ঞান পড়তে ভালবাসো। ওই বাচ্চাদের জীবনটা যেন স্বাভাবিকভাবে আগামীতে চলতে পারে, সে জন্য যে প্রকার ট্রমা কাউন্সেলিং (Trauma Counseling) প্রয়োজন হবে, জানি না আমাদের দেশে তেমন ব্যবস্থা কতটুকু আছে? তুমি সহজভাবে দু’কলম লিখো। যেন সহজভাবে বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধিতে আসে।
মোহন ভাই বলেছেন তাই বিষয়টি আমার জন্য অবশ্যই ভাবায়। তবে যে কোন বিষয়ে কাউন্সেলিং এর প্রশিক্ষিত কোচ হতে হয়। আমিতো সেটা নই। যদিও মোহন ভাই লিখতে বলেছিলেন কাউন্সেলিং এর প্রয়োজনীয়তা সহজ ভাষায় লেখার জন্য। আমাদের সময়কালে কাউন্সেলিং বলতে কিছু আছে, সেটাই জানতাম না এবং শুনিওনি কোন দিন। তবে বর্তমান বাংলাদেশে এই কাউন্সেলিং বিষয়টি বেশ পরিচিত হবে। তাই ধারণা করছি মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে শিক্ষকরা নিশ্চিত বিষয়টি জোর দিয়ে ভাববেন এবং কাউন্সেলিং এর বন্দোবস্ত নিশ্চিত করবেন। এমন একটি ট্রাজেডির পরে শিক্ষার্থীদের কেউ স্বস্তির সাথে ক্লাশ রুমে বসতে পারবে না, যা স্বাভাবিকও বটে। সেটা মাথায় রেখেই ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
যা হোক, যেহেতু মনোবিজ্ঞান পড়তে ভালবাসি এবং মনোবিজ্ঞান পড়তে গিয়েই নানান ধরনের ট্রমা নিয়ে বেশ পড়েছি, নিজের সেই অল্পবিস্তর পড়া ও অল্প জ্ঞানের আলোকে ট্রমা এবং কাউন্সেলিং নিয়ে কিছু লিখছি। হয়তো কোন কাজে আসলেও আসতেও পারে।
যেহেতু আমরা ট্রমা নিয়ে কথা বলছি, আসুন একটু সহজ ভাষায় বুঝার চেষ্টা করি ট্রমা কি? সহজ বাংলায় ট্রমা হলো “মানসিক আঘাত”। ট্রমার বহু প্রকারভেদ আছে মাত্রা ও ঘটনা অনুযায়ীই ঘটে। শিশু- কিশোর- বয়ষ্ক বা বৃদ্ধ যে কোন বয়সেই মানসিক আঘাত প্রাপ্ত (Traumatize) যে কেউ হতে পারে। তবে ব্যক্তি বিশেষে Traumatize হয়তো তেমনটা প্রকাশ না দেখা গেলেও, কাজে বা সাধারণ চলাফেরা অথবা ঘরে- বাহিরে কারণে বিনা কারণে Traumatize এর লক্ষণ থেকেই যায়। এটা বলছি বিশেষ ব্যক্তি বিশেষদের কথা। তবে সাধারণ মানুষের মাঝে Traumatize বিষয়টি সহজে এবং সবার নজরেই আসবে এবং শিশুদের ক্ষেত্রে, ওটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না কেননা শিশুরা কিছুই লুকাতে জানে না বলেই। শিশুদের সচল অভিব্যক্তিই বলে দেবে কতটা Traumatize হয়ে আছে।
যে কোন বয়সেই এবং ঘটনা নির্ভর কোন ট্রমাটাইজ এতটাই গভীরতায় পৌঁছে যেতে পারে যে, মৃত্যু পর্যন্ত সেই ট্রমাটাইজ শতভাগ উত্তরোণ অসম্ভব হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ কিছু ট্রমা আজীবন বহন করেই যেতে হয়। বিষয়টি অনেক অনেক বড় ব্যাখ্যার প্রয়োজন। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) ট্রমার বিভিন্ন ব্যাখ্যা করেছে এবং একটি অত্যন্ত নেতিবাচক ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসাবে ট্রমাকে সংজ্ঞায়িত করেছে। ট্রমা মূলত কোন একটি অপ্রীতিকর বা ভয়ঙ্কর ঘটনার একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, তবে এর প্রভাবগুলি গুরুতর হতে পারে এবং একজন ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাপন করার ক্ষমতাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে। যদিও ট্রমা নিয়ে বহু সংজ্ঞায়ন ও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এবং সবগুলোই প্রায় কাছাকাছি বটে। তবে ট্রমাটাইজদের কাউন্সেলিং স্থান- কাল- পাত্রভেদে এবং ঘটনা ও উপসর্গের তীব্রতা বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে, বয়স ও মানসিক তীব্রতাকে কাজে লাগিয়ে, বসবাসের সমাজের পরিবেশ- পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে, চলমান প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক মানে রেখেই করতে হয়। ঠিক এ বিষয়গুলোই দক্ষ কোচরা খুব দ্রুতই আয়ত্তে এনে ভাল ফলাফল দিতে সক্ষম হয়।
ট্রমাটাইজ শিশুদের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধে থাকে যে, শিশুদের নানান আগ্রহ ও উৎসাহ অতি দ্রুত আকর্ষণ করে বলেই, শিশুদের তৎপরতা ও শিশুসুলভ মনকে কাজে লাগিয়ে, ট্রমাটাইজ থেকে শিশুদের বাঁচানোর মোক্ষম সুযোগ থাকে। তবে অবশ্যই সেটা হতে হলে দক্ষতার সাথে প্রশিক্ষিত কোচ দ্বারা হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তবেই সহজে ফলাফল পাওয়া যাবার সম্ভাবনা থাকবে বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। যেহেতু আমাদের দেশে তেমন দক্ষ কোচ বা ট্রমাটাইজদের নিয়ে ভাল মানের কাজ করার ব্যবস্থা বর্তমান যুগেও নিশ্চিত কম, সেটা মাথায় রেখেই মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের মানসিকভাবে শক্তিধর শিক্ষকদের দ্বারাই ওই শিশুদের সাথে আত্মার সাথে মিলেমিশেই কাজটি করতেই হবে।
যে সব ঘটনা দ্বারা মানুষ ট্রমাটাইজ হতে পারে এমন বহু উপসর্গ আছে, যেমন ধর্ষণ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, গুরুতর অসুস্থতা বা আঘাত, সহিংসতার সাক্ষী, প্রিয়জনের মৃত্যু ইত্যাদি বহু কিছুতেই ঘটে। মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের ঘটনাটি কিন্ত এগুলোর চেয়েও দুই দিক থেকে কঠিন। এক, আগুনের লেলিহান ও আগুনে ভস্মীভূত হওয়া লাশের কয়লা, যা চোখকে আকস্মিক হীম করে দেয় এবং সেই হীম হওয়া চোখগুলো শিশুদের, যা চোখ থেকে মস্তিষ্ক হয়ে হৃদয়ে আঘাত করে স্তব্ধ করে দেয়। শিশুমন বলতে আমরা যা বুঝি, ওটা কিন্ত মোটেও মস্তিষ্কের বিষয় নয়, পুরোটাই হৃদয়ের বিষয়। সেই হৃদয়েই সেই আঘাত এবং ভয়।
উপরেই ট্রমার প্রভাব লেখায় কিছুটা এসেছে। আরও একটু সহজভাবে বুঝার চেষ্টা করি। ট্রমার প্রভাবগুলি হয় অল্প সময়ের মধ্যে বা কয়েক সপ্তাহ বা বছরের মধ্যে হতে পারে এবং কখনও কখনও মৃত্যু পর্যন্ত বহন হতে পারে। মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের অবস্থার স্থায়ীত্ব রোধ করার জন্য আঘাতের যেকোনো প্রভাবকে অবিলম্বে সমাধান করতেই হবে। যত তাড়াতাড়ি ট্রমা মোকাবেলা করা হয়, ক্ষতিগ্রস্থের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তত ভাল হয়। যদিও উভয়ের স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব একই রকম হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব প্রায়ই অনেক বেশি গুরুতর হয় এবং কাউন্সেলিং সেই ক্ষেত্রে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদীই
প্রয়োজন পড়ে।
যা হোক, মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তেই যা করা যেতে পারে বা প্রয়োজন, শিশুদের সাথে শিশুদের অভিভাবকসহ এবং শিক্ষকদের একটি বন্ধন গড়ে, সবাই মিলে একত্রিত কাজ করা। পড়াশোনা যদি ছয় মাস কিংবা এক বছর পিছিয়েও যায়, তাতেও কিছুই আসে যায় না। এ বছরের সিলেবাস অবশ্যই অনেকটা হাল্কা করে আনতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক বিষয়টিকে অতিমাত্রায় নজর দিতেই হবে। প্রয়োজনে এ বছরে শিক্ষার কিছু বিষয় আগামীর বছরে টেনে নেওয়া যাবে। তবে স্মরণে রাখুন সবার আগে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন তবেই যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আবার স্বাভাবিক শিক্ষার্থীর স্থানটি খুঁজে পাবে।
করণীয় বলতে আপাতত সহজ বিষয় হলো, কোন অবস্থাতেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিয়ে কোন প্রকার চাপ অনুভব করতে না দেওয়া। তাদের যে বিষয়গুলো বেশি ভাল লাগে, তেমন বিষয়গুলোকে গ্রুপ করে করে একত্রিত করতে দেওয়া। সেটা হতে পারে স্কুল এন্ড কলেজের যা বা যতটুকু সুযোগ- সুবিধে আছে, সেগুলোর বেশি মাত্রায় ব্যবহার করে, খেলাধুলায় বেশি সময় দেওয়া। বাসায় কোন পড়াশোনার কোন কিছুই আপাতত না রাখা। বিভিন্ন ধরণের সংস্কৃতির অনুষ্ঠান করে, যা শিক্ষার্থীরা হৃদয় থেকেই পছন্দ করে, তেমন কিছু বেশি মাত্রায় করে, শিক্ষার্থীদের মনকে ব্যস্ত রাখা। ঘণ ঘণ শিক্ষার্থীদের সাথে কারণে/ অকারণে শিক্ষকদের আলাপ আলোচনা করা, তবে কোন অবস্থাতেই ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে স্মৃতিচারণ না করা। শিক্ষকদের ভূমিকাটাই এখানে বড় হতে হবে। শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকদের মাঝে যে ভয় বা দুরত্ব স্বাভাবিক সময়ে থাকে, সেটাকে একেবারেই শূণ্যতে নামিয়ে আনা। এক্ষেত্রেও নীতি (principle) অবশ্যই ধরে রাখতে হবে তবে সেটা হতে হবে বেশ সাবধানতার সাথে। যে করেই হোক, শিক্ষার্থীদের মনে আনন্দের একটা পরিবেশ তৈরী করতেই হবে। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি সপ্তাহ পড়াশোনার বাহিরে কেবলই আনন্দের বন্দোবস্ত করা। যাতে করে শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে আবার নিজেদের মতন করে ফিরে পায়।
শেষে বলবো, অবশ্যই অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট ছক একেই এগুতে হবে। নিশ্চয়ই এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা অভিজ্ঞতার আলোকে ভাল ও যুক্তিসঙ্গত বিষয়াদী সংযুক্ত করতে পারবেন স্কুল এন্ড কলেজের সার্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে। হৃদয়ের কামনা থাকবে মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের এমন মর্মান্তিক মানসিক অবস্থা থেকে দ্রুত পুনরুদ্ধার (recover) করতে সক্ষম হবে।

বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

