গণঅভ্যুত্থানের এক বছর। ২০২৪ জুলাই থেকে ২০২৫ জুলাই। রক্তাক্ত জুলাই, প্রতিরোধের জুলাই, ১৫ বছরের আন্দোলনকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জুলাই। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বলতম মাসের নাম। জুলাই ছিল সাহস ও সংকল্পের মাস। বঞ্চিত মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের শক্তি যে কত প্রচণ্ড হতে পারে, তা দেখিয়েছে জুলাই। ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদের জন্য শিক্ষা আর আন্দোলনকারীদের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে জুলাই অভ্যুত্থান।
অভ্যুত্থানে জনগণের প্রতিরোধ যেমন সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে, আকাক্সক্ষাও তেমনি থাকে তীব্র। বঞ্চিত মানুষরা তাদের বঞ্চনার অবসানের জন্য দাবি জানাতে থাকে। ফলে অভ্যুত্থান-পরবর্তী নানা পদক্ষেপ প্রয়োজন হয়। সেগুলো হচ্ছে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটানো, ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে, নির্বাচন যেন সুষ্ঠু অবাধ হয়, ভোটে যেন জনমতের প্রতিফলন ঘটে, বিজয়ীদের হাতেই সব ক্ষমতা পরাজিত মানে শূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এ ধরনের পরিস্থিতি যেন না তৈরি হয়, বিরোধী মত যেন উপেক্ষিত, অপমানিত এবং আক্রান্ত না হয় বরং তাদের মত প্রকাশের সুযোগ যেন সংসদে থাকে, সংসদ যেন প্রাণহীন আর আজ্ঞা প্রতিপালনের আইনি সংস্থায় পরিণত না হয়, বিতর্ক যেন গালিগালাজ এবং আলোচনা যেন স্তুতি ও তোয়াজে পরিণত না হয়, সংসদ যেন সত্যিকারের আইন প্রণয়নের সংস্থা হিসেবে কাজ করে, সংসদ সদস্য হওয়া মানে আলাদিনের চেরাগ পাওয়া এই ব্যবস্থার যেন অবসান ঘটে, নির্বাচন যেন টাকার খেলা, ধর্মের আবেগ ব্যবহার আর প্রশাসন ও পেশিশক্তির ব্যবহার করার দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত থাকে, ৫ বছর পরপর নির্বাচন নিয়ে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি না হয় আর সংসদ যেন স্বেচ্ছাচার চর্চা করার ক্ষেত্রে না হয় এমন সব আলোচনা চলছে, বিতর্ক হচ্ছে, কিছুটা উত্তাপও তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে।
নির্বাচনের পথে হাঁটছে কি দেশ? বড় বড় সমাবেশ, পদযাত্রা, রোড মার্চ, গণসংযোগ হচ্ছে এবং সেসব সমাবেশে উত্তাপ বাড়ছে নেতাদের বক্তৃতায়। এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন হবে, এই ওয়াদা রক্ষা করলে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখলে ২০২৬-এর প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। সে হিসেবে নির্বাচনের আগে আগামী কয়েক মাস রাজনীতিতে একটা চরম উত্তেজনার সময়। বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচনপ্রিয় বলে সবাই মানেন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে যে দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছিল ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে তার ফলে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল নির্বাচন থেকে। ফলে অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ সরকারকে পদত্যাগ ও প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগ করতে হয়েছে। পালিয়েছেন সংসদ সদস্য, দলের শীর্ষনেতা, দল ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী-আমলা এমনকি মসজিদের ইমামও। এ থেকে রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষা নিয়েছে কি? এটি নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয় এবং অনাস্থা। আগামী নির্বাচন কীভাবে হবে? নির্বাচন কি সুষ্ঠু, অবাধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে? নির্বাচনকালীন সরকার কি পক্ষপাতমূলক আচরণ করবে, নির্বাচন কমিশন সরকারের অভিপ্রায় অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা ও ফল প্রকাশ করবে না তো? এই প্রশ্ন যেমন আছে অতীতের উদাহরণ দেখে সংশয় তেমনি আছে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও এবং দু-দুটি গণঅভ্যুত্থানের পরও দেশের নির্বাচন নিয়ে যত বিতর্ক হয়, তার বেশিরভাগ অংশ জুড়েই থাকে অতীতের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কি না এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে।
সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যে প্রশ্নে সব আন্দোলনকারী রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল, তা হলো নির্বাচনটা নিরপেক্ষ হতে হবে। সে কারণেই নির্বাচনকালীন সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে এই প্রশ্নে একমত হয়েছিলেন সবাই। ১৯৯১ সালে সেই সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্কের শেষ হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে বিএনপি প্রথমে সংবিধানের দোহাই দিয়ে সে দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, এটি সংবিধানে নেই। এরপর তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ আবার সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। তখন তারা বলেছিল সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই নির্বাচন হবে। সুতরাং এটা বাতিল। কিন্তু বিএনপিসহ অধিকাংশ দল তা মানেনি। তারা এটুকু বলেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আগ বাড়িয়ে আরও বলেছে যে, সংবিধান থেকে এক চুলও নড়বে না। যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের সংবিধান রক্ষা করার এই যে তাগিদ, তার ফলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে তারা কি আসলেই সংবিধান রক্ষা করতে চান, নাকি ক্ষমতা রক্ষায় ঢাল হিসেবে সংবিধানকে ব্যবহার করেন? কারণ জনগণের সংবিধানসম্মত অধিকারের প্রশ্নে তাদের ভূমিকা বা পদক্ষেপ তো দেখা যায়নি।
জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ফলে বাংলাদেশের জন্ম। ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯-এর আন্দোলন, পরবর্তী সময়ে ৭০-এর নির্বাচন এক্ষেত্রে এক মাইলফলকের মতো কাজ করলেও স্বাধীনতার পর থেকেই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা বরাবরই অনাগ্রহ দেখিয়ে আসছে। মাগুরা উপনির্বাচনের পর আন্দোলন গড়ে উঠে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে। যেহেতু সংবিধানে ছিল না, তাই সংবিধানের অসামঞ্জস্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছিল একটি রাজনৈতিক সমঝোতার ফল। ২০১১ সালের ৩০ জুন তারিখে সংবিধানের সংশোধনী একতরফাভাবে পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিধান বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করে। পরবর্তী সময়ে প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগসহ সর্বস্তরে যে সর্বগ্রাসী দলীয়করণ হয়েছিল, তার ফলে শুধু নির্বাচনীব্যবস্থা নয় প্রশাসনব্যবস্থাও আস্থা হারিয়েছে। ফলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে এক অমোচনীয় কলঙ্কের কালির দাগ রেখে গেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে যখন অভ্যুত্থান-পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কড়া নাড়ে তখন দেশের নির্বাচন পদ্ধতি, নির্বাচনকালীন সরকার, প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা এবং নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার সবকিছু নিয়েই সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাভিত্তিক নির্বাচন কি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত ধারণ করে? এই প্রশ্ন জোরেশোরে উঠছে। বিষয়টা একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।
বাংলাদেশে এ যাবৎকালে অনুষ্ঠিত বারোটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে চারটি নির্বাচনকে আপাত গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়। সেই নির্বাচনগুলো হচ্ছে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোট, আসন এবং ক্ষমতায় যাওয়ার মধ্যে একটা বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সরকার গঠনকারী দল বিএনপির প্রাপ্ত ভোট ৩০.৮১ শতাংশ এবং আসন সংখ্যা ১৪০ আর আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট ৩০.০৮ শতাংশ আর আসন ছিল ৮৮। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ৪৮.৯০ শতাংশ ভোট পেয়ে ২৩০ আসন আর বিএনপি ৩৭.২০ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পায় ৩২। তাহলে দেখা যাচ্ছে এই পদ্ধতিতে ভোটের সংখ্যা ও ভোটের হার নয়, কতটা আসনে বিজয়ী হলো, এটাই প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এক ভোটেও যদি কোনো প্রার্থী বিজয়ী হন, তাহলে বিপক্ষ প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের কোনো মূল্য থাকে না। সে কারণেই নির্দিষ্ট আসনে বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রার্থীরা যেকোনো পথ অবলম্বন করতে দ্বিধা করে না। অন্যদিকে ৩৩ থেকে ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে দেশ শাসন করার অর্থ, সংখ্যালঘিষ্ঠ মানুষের মতের ভিত্তিতে সংখ্যাগুরুকে শাসন করা। নির্বাচনী ব্যবস্থার এই দুর্বলতা সংশোধনের জন্য বামপন্থি দলগুলোসহ অনেক রাজনৈতিক দল সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা প্রপোরশোনাল রিপ্রেজেন্টেশন পদ্ধতির কথা বলছেন। এই পদ্ধতিতে নির্বাচনে প্রতিটি ভোট কাজে লাগে বা মূল্যায়িত হয়। বর্তমানে পৃথিবীর ৯২টি দেশে নানা পদ্ধতিতে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের নীতি অনুসরণ করে নির্বাচন পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে তিনটি পদ্ধতি চালু আছে। যেমন মুক্ত তালিকা, বদ্ধ তালিকা এবং মিশ্র তালিকা। মুক্ত তালিকায় একটি জাতীয় সংসদ বা আইনসভায় যত আসন থাকে, নির্বাচনের আগে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দল তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর প্রাপ্ত ভোটের হার অনুযায়ী, আনুপাতিক হারে ঘোষিত তালিকার প্রথম থেকে যত আসন যে দলের ভাগে পড়বে তারা সে আসনগুলো পূরণ করে নেবে। বদ্ধ তালিকায় সারাদেশের জন্য একটি তালিকা করা হয় না।
অঞ্চল বিশেষ, নানা জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক তালিকা এবং ভোট ও প্রার্থী তালিকা পৃথকভাবে করা হয়। আর মিশ্র তালিকায় সংখ্যানুপাতিক ও মেজরিটারিয়ান দুই পদ্ধতির মিশ্রণ করা হয়। কিছু আসনে সংখ্যানুপাতিক এবং কিছু আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়। যেমন নেপাল। নেপালে নিম্ন কক্ষের মোট আসন ২৭৫। সেখানে ১৬৫ আসনে সরাসরি এবং ১১০টি আসন সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব অনুসারে পূরণ করা হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির ফলে একক দলীয় আধিপত্য, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব হ্রাস পায় এবং সংখ্যাগুরুর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলেও সংখ্যালঘু উপেক্ষিত হয় না। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা এবং কীভাবে নির্বাচন হবে তা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। আগামী দিনে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা কীভাবে হবে সে বিষয়ে ভাবতে হলে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে ভাবতেই হবে। অতীতে নির্বাচন হয়েছে কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রথা এবং প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়নি বরং দুর্বল হয়েছে, গণমানুষের আস্থা হারিয়েছে। এর সঙ্গে আর একটি বিষয় কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সবকিছুকে টাকার মাপে দেখার যে সংস্কৃতি চালু হয়, সব সম্পর্ক যখন অর্থনৈতিক সম্পর্কে পরিণত হয়, তখন নির্বাচন কি তার বাইরে থাকতে পারে? শিক্ষা, চিকিৎসার মতো বিষয় যখন পণ্যে পরিণত হয়, তখন ভোটও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয় আর সংসদ পরিণত হয় ব্যবসায়ীদের ক্লাবে। ফলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে শুধু নির্বাচনের পদ্ধতি নয়, রাজনৈতিক পদ্ধতি পাল্টানোর সংগ্রামটাও জারি রাখা প্রয়োজন। জুলাই আন্দোলনের মর্মে ছিল বৈষম্যের বিরোধিতা, প্রতিপক্ষ ছিল ফ্যাসিবাদী শাসক আর আকাক্সক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ। সে কথা যেন ভুলে না যাই।
রাজেকুজ্জামান রতন
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

