শোনার কেউ নেই  

সাধারণভাবে দেখলে ‘পথে বসা’ এবং ‘পথে নামা’ এক নয়। পথে বসার পেছনের ইতিহাস বেদনার। প্রতারণা, বোকামি, অত্যাচার মানুষকে উপায়হীন করে দিতে পারে। তখন পথে বসা ছাড়া তার আর কিছু থাকে না। সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছে, এমন কথার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে সেই বেদনার ছবি। কিন্তু পথে নামা আবার ভিন্ন অর্থ বহন করে। নতুন কিছু পাওয়ার আশায় নতুন পথের সন্ধানে কিংবা প্রতিবাদ করার জন্য মানুষ পথে নামে। ‘পথ’ এক আশ্চর্য মিলনক্ষেত্র। এ যেমন ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে, তেমনি ঘরে ফেরার জন্যও তো পথ লাগে। পথেই দেখা মিলে যায়, সবধরনের মানুষের। দেখা যায়, মানুষের আশা এবং অসহায়ত্ব, বেদনা এবং বিক্ষোভ। পথে বসিয়ে দেওয়ার কারণ দূর করতে যখন মানুষ পথে নামে, তখন দেখা মেলে প্রতিবাদী মানুষের। এই প্রতিবাদ কখনো নীরব কখনো সরব, কখনো শান্তিপূর্ণ কখনো মারমুখী হতে পারে। কিন্তু সবসময়ই তা মানুষের বঞ্চনাকেই প্রতিফলিত করে। মানুষ চায় তার কষ্টের কথা রাষ্ট্র শুনুক, একটা প্রতিকার করুক। রাষ্ট্র যখন প্রতিকার না করে পীড়ন চালায় তখন মানুষের বিক্ষোভ বাড়ে। কিন্তু যখন উপেক্ষা করে, মানুষের বেদনার কথা কেউ যখন শোনে না কিংবা প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয় না তখন সে কী করবে?

ঢাকার একটা ছোট্ট সড়ক তোপখানা রোড। সড়কটি ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ। তার এক মাথায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফোয়ারা, অন্য মাথায় পুরানা পল্টন। এখানে রয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাব এবং বাংলাদেশ সচিবালয়। এই পথের দৈর্ঘ্য তেমন বড় নয়, কিন্তু এর ফুটপাত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের মানুষের বেদনা ও বিক্ষোভ প্রকাশের স্থান।  এখানেই দেখা মেলে অধিকার বঞ্চিত অসহায় এবং অধিকার পাওয়ার জন্য আন্দোলনকারী মানুষের। গত ২২ দিন ধরে এখানে ফুটপাতে ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী শত শত নারী বসে আছেন। প্রখর রোদে ঘামছেন। সেই ঘাম গায়েই শুকাচ্ছে। বৃষ্টিতে তারা ভিজছেন। সেই ভেজা কাপড় পরেই বসে আছেন। ওয়াশরুমে যেতে হবে বলে পানিও খাচ্ছেন না, বসে আছেন উপেক্ষা সহ্য করে। তাদের পরিচয়, তারা ‘তথ্য আপা’ নামে একটি প্রজেক্টে কাজ করছেন। তাদের কারও চাকরির বয়স ৫ বছর কারও আবার ১৩ বছর। তারা আতঙ্কে আছেন। কারণ ইতিমধ্যে তারা জানতে পেরেছেন যে, জুন মাসের ৩০ তারিখের পর তাদের চাকরি শেষ হয়ে যাবে। এরপর তাদের কী হবে? সংসার চালাবেন কী করে? চাকরি করতেন, চাকরি নেই এই ধাক্কা সামাল দেবেন কেমন করে? এরা ‘তথ্য আপা’, কিন্তু ভবিষ্যতের অন্ধকার কাটবে কীভাবে সে তথ্য নেই তাদের কাছে।

কতজন কাজ করেন এই প্রকল্পে, তারা কী ধরনের কাজ করেন, এর সুফল কারা পান সে বিষয়টা একটু খোলাসা হওয়া দরকার। তথ্য আপা প্রকল্পের অধীনে সারা দেশে ৪৯২ জন উপজেলা তথ্যসেবা কর্মকর্তা, ৯৮৪ জন সহকারী উপজেলা তথ্যসেবা কর্মকর্তা পদে নারীরা কাজ করছেন। ৪৯৭ জন অফিস সহায়ক পদে নারী ও পুরুষ উভয়েই কর্মরত রয়েছেন। ২০১১ সালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ের সফলতায় পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে সারা বাংলাদেশের ৪৯২টি উপজেলায় প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। ৪৯২টি উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত তথ্যসেবা কেন্দ্র থেকে গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য তিনটি মাধ্যমে ছয়টি বিষয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন, কৃষি, লিঙ্গসমতা এবং ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করে। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মতো এই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের কাজ নয়। এখানে সেবা গ্রহীতা নারীরা সেবা নেওয়ার জন্য অফিসে আসতেন না বরং তাদের সেবাগুলো তথ্যকেন্দ্র ও বাড়িতে গিয়ে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। ফলে নারীরা সহজ হতে পারেন কর্মীদের সঙ্গে, প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার মাধ্যমে জানতে পারেন এবং জানাতে পারেন তাদের সমস্যার কথা।

পাশাপাশি, তথ্যকেন্দ্রগুলো থেকে আরও কিছু সেবা এবং সহযোগিতা করা হতো গ্রামীণ নারীদের। যেমন, বিনামূল্যে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা, ওজন পরিমাপ, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ পরিমাপ, শরীরের তাপমাত্রা ও উচ্চতা পরিমাপসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা। ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন চাকরির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও বৃত্তি, প্রতিবন্ধীদের ভাতা ও বিভিন্ন চাকরির প্রশিক্ষণের তথ্য ও আবেদন, উদ্যোক্তাদের ই-লার্নিং প্রশিক্ষণ প্রদান, পরীক্ষাসহ অনলাইনে প্রাপ্ত বিভিন্ন বিষয়ের ফল অবহিতকরণ এবং ক্যারিয়ারবিষয়ক পরামর্শসহ তথ্য ও পরামর্শ সেবা দেওয়া হতো। এমনকি উঠান বৈঠকের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধান ও সচেতনতা তৈরি, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ, আইনগত সহায়তা প্রদানের কাজও করে থাকেন এসব তথ্য আপারা। তাদের কাজের মূল্যায়ন থেকে দেখা গেছে, এই সব কাজে দক্ষতার সঙ্গে তারা কাজ করেছেন। অর্পিত দায়িত্বের ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ পূরণ করেছেন তারা। তাদের বেতন ছিল দশম গ্রেডের কর্মকর্তার জন্য ২৭ হাজার ১০০ টাকা, তথ্যসেবা সহকারীদের বেতন ১৭ হাজার ৪৫ টাকা। এই বেতনে চাকরি করেও প্রকল্পের সাফল্য দেখে যেমন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় চালু হয়েছিল তেমনি এখানে কর্মরর্তারাও আশায় বুক বেঁধেছিলেন যে, তাদের চাকরি স্থায়ী হবে, বেতন-ভাতা বাড়বে। ফলে যোগ্যতা ও বয়স থাকা সত্ত্বেও অন্য কোথাও চাকরি করার কথা ভাবেননি তারা। এদের সবাই বাংলাদেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া শেষ করে এই চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। এখন নতুন চাকরি খোঁজা এবং পাওয়ার বয়স শেষ, চাকরি না থাকলে, তারা করবেন কী?

চাকরিরতদের প্রতিশ্রুত বেতনবৈষম্য ও উন্নয়ন প্রকল্পের চাকরি রাজস্বে স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে, ২০২৩ সালে উচ্চআদালতে একটি রিট পিটিশন করেন তথ্য আপারা। কারণ জানতে চেয়ে সরকারকে চার সপ্তাহের সময় বেঁধে দেয় আদালত। সময় পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে না সরকারি উদ্যোগ, না আদালতে সুরাহা কোনোটাই না হওয়ায়, পথে নামা ছাড়া উপায় ছিল না তাদের। কেউ কোলে বাচ্চা নিয়ে, কেউবা অসুস্থ শরীরে রাস্তার পাশে বসে আছেন। তাদের দাবির প্রতি কর্ণপাত না করে বরং রাস্তায় বসে থেকে তারা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন, এই অভিযোগ এখন তাদের বিরুদ্ধে। ভাবা যায়, রাজধানীতে একদল নারী পরিবার ছেড়ে রাস্তায় বসে আছেন ২২ দিন ধরে, কেউ আসছে না, কেউ খোঁজ নিচ্ছে না তাদের। কত টাকা লাগবে, তাদের চাকরি স্থায়ী করতে? গড়ে ২৫ হাজার টাকা বেতন হলে বছরে ৬০ কোটি টাকা আর আনুষঙ্গিক খরচ মিলে ১৫০ কোটি টাকা হলে এই সমস্যার সমাধান করা যায়। বাঁচার আশ্বাস পায় ২ হাজার কর্মী, যাদের ৯০ শতাংশই নারী। প্রায় দেড় কোটি সুবিধাভোগী গ্রামীণ নারী সেবা নিয়মিত পেতে থাকবেন এর ফলে। কিন্তু ‘অতীতের আবর্জনা’ বলে আখ্যা দিয়ে এই দক্ষ মানুষদের জীবিকার পথ রুদ্ধ করা কি উচিত? বিগত সরকারের আমলে যারা চাকরি পেয়েছেন, তারা কি চাকরি করছেন না? জীবিকার সঙ্গে দলবাজি মেশানোর বিষময় ফল আর কতদিন মানুষ ভোগ করবে?

একের পর এক সমাবেশ হচ্ছে। একপাশে বসে দাবি জানাচ্ছেন, কয়েকশ নন-এমপিও শিক্ষক। তারা কেউ ৫ বছর কেউ ৩০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। সারা দেশে ২ হাজার প্রতিষ্ঠানে ৩০ হাজার শিক্ষকের পক্ষ থেকে আবেদন জানাতে তারা এসেছেন। তাদের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাগুলো স্বীকৃতিপ্রাপ্ত, প্রতিষ্ঠানের জমি এবং ভবন আছে,  এসএসসি, এইচএসসি, দাখিল পরীক্ষা হয়, পাবলিক পরীক্ষা ও ভোটের কেন্দ্র বানানো হয় এসব প্রতিষ্ঠানকে। শিক্ষকরা এসব ক্ষেত্রে প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাবলিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ফলাফল সন্তোষজনক কিন্তু তাদের বেতন নেই। তারা মান্থলি পে-অর্ডার বা সরকারের কাছ থেকে কোনো বেতন পান না। প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিয়েও তারা রাষ্ট্রের কাছে এখনো তাদের কোনো অধিকার পাচ্ছেন না।

এইসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করে প্রধানত দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা। কিছুদিন আগে শিক্ষক নেতারা আলোচনা করেছিলেন, তাদের আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা যে, এসব প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হবে। জুন মাস থেকে তারা বেতন পাবেন। কিন্তু এখনো সেই আশ্বাসের কোনো বাস্তবায়ন নেই। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আশঙ্কায়  এবং অনিশ্চিত জীবনের চাপে সারা দেশ থেকে তারা এসে হাজির হয়েছেন প্রেস ক্লাবের সামনে। তাদের দাবি মেনে শিক্ষকতা জীবনে কিছুটা স্বস্তি দিতে কত টাকা লাগবে? বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলে তাদের শিক্ষকতা জীবনে কিছুটা সম্মান এবং স্বস্তি ফিরে আসত। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাজেট কম এটা যেমন সত্য, তেমনি বরাদ্দের টাকাও সবসময় খরচ হয় না, ফেরত দেওয়া হয় এটাও দেখা যাচ্ছে। তাহলে এমপিওভুক্তির জন্য টাকা খুব একটা সমস্যা নয়। শিক্ষার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিক্ষার জন্য আর্থিক দায় নেওয়ার মানসিকতা প্রধান বিষয়। একদিকে তথ্য আপা, অন্যদিকে নন-এমপিও শিক্ষক পাশাপাশি নানা ধরনের সংগঠনের দাবিতে মুখরিত প্রেস ক্লাবের সামনের এলাকা।

ফলে প্রেস ক্লাবের পাশ দিয়ে যে কেউ যাওয়ার সময় বলবেন, মাইকের আওয়াজে কান পাতা দায়। মানুষের সব কথা যেন তারা এখানে এসেই বলছেন। মানুষ তো বলছেন, কিন্তু যারা শোনার কথা তারা কি শুনছেন? কথা বলার অধিকার খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যাদের শোনার কথা তা না শুনলে অসহায় মানুষের কান্না একসময় কিন্তু ক্রোধে পরিণত হয়ে যায়।

রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক  ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.