মবের নামে কী হচ্ছে ?

সমাজে কত সংকট! তারপরও মানুষ একটু স্বস্তিতে থাকতে চায়। সমাজে বিরাজমান সংকটগুলোর কারণ সব হয়তো জানা নেই, এসবের সঙ্গে তিনি যুক্তও নন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার জীবনকে প্রভাবিত করে এমন অনেক সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় দেশের জনগণকে। দ্রব্যমূল্য স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনে সমস্যা, বেকারত্ব চাকরি প্রার্থীদের সমস্যা, কৃষকের সমস্যা, শ্রমিকের সমস্যা, নারীর সমস্যা, সংখ্যালঘুদের সমস্যা এ রকম অনেক সমস্যা আছে। কিন্তু যে সমস্যা সব মানুষকে প্রভাবিত করে, আতঙ্কিত করে তা হলো আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা। যার মুখোমুখি হচ্ছে দেশের মানুষ প্রতিদিন। এর নাম মব ভায়লেন্স বা মব সন্ত্রাস। দলবদ্ধ হয়ে একটা অজুহাতে হামলা করার প্রবণতা এবং পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এ ধরনের হামলার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অনেক সময় পুলিশের উপস্থিতিতেও এসব ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে গত দশ মাসে এ রকম ঘটনায় হামলা হয়েছে চিহ্নিত কোনো ব্যক্তির ওপর, কোনো অফিসে, চলেছে ঘরবাড়ি লুটপাট, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, মাজার, আখড়া ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে, বন্ধ হয়েছে নারীদের ফুটবল ম্যাচ। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হামলা ও নির্যাতন হচ্ছে। কেউ কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এসব সমর্থন করছেন না। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বলা হয়েছে, সরকার মব ভায়োলেন্স সমর্থন করে না। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, মব ভায়োলেন্স বন্ধ করতে হবে। বিএনপির নেতা বলেছেন, মব ভায়োলেন্স মানবতার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নেবেন। সভা-সমাবেশ করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ রাজনৈতিক দলগুলো।  মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে বহুদিন ধরে।

কিন্তু তারপরও মব ভায়োলেন্স বা সংঘবদ্ধ সহিংসতা ঘটছে। মবের কবলে পড়ে মানুষ মারা যাচ্ছে, আহত ও নিগৃহীত হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ৭ মাসে দেশে গণপিটুনির অন্তত ১১৪টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ১১৯ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হয়েছেন। এসব দেখে আতঙ্কিত মানুষ প্রশ্ন করছেন, তাহলে দেশে আইনের শাসন কোথায়? এই আক্রমণ ও হামলা থেকে উদ্ধারের উপায় কী? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও জনগণের নিরাপত্তা দিচ্ছেন। আছে তাদের বিচারিক ক্ষমতাও। তারপরও সংঘবদ্ধ শক্তির আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা থামছে না। জনমনে স্বস্তি বা মানুষকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব যার কাঁধে তিনিও খুব ভালো বার্তা দিতে পারছেন না। ‘মব ভায়োলেন্স’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণ) বন্ধ করা যাচ্ছে না, তবে কমিয়ে আনা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে মবের ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। ঘটনা যেখানেই ঘটুক না কেন, তার প্রভাব ছড়িয়ে পরে একেবারে ঘরের ভেতর পর্যন্ত। মব ভায়োলেন্সের অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ছে, যার অনেকই গা শিউরে ওঠার মতো। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ১০ মাসে মবের শিকার হয়ে এবং গণপিটুনিতে সারা দেশে ১৭৪ জন মারা গেছেন।

এর মধ্যে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনার অন্যতম হলো, ২০ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ এনে একদল লোক লালমনিরহাট শহরের একটি সেলুন থেকে পরেশ চন্দ্র শীল (৬৯) ও তার ছেলে বিষ্ণু চন্দ্র শীলকে (৩৫) মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এ ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এমনকি মবের শিকার হন দুই বিদেশি নাগরিক। গত মার্চ মাসে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের (ডলার বদলে টাকা নেওয়ার) সময় রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইরানের দুই নাগরিককে মারধর করা হয়। ওই সময় তাদের ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করা হয়। মারধরের একপর্যায়ে তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশও আহত হয়। যে পুলিশ অরাজকতা নিয়ন্ত্রণ করবে কিংবা নির্দোষকে রক্ষা করবে, সেই পুলিশও রেহাই পাচ্ছে না মব ভায়োলেন্স থেকে। আসামি ছাড়িয়ে নেওয়া এবং বেআইনি দাবিতে থানা ও পুলিশের যানবাহন ঘেরাও করে হামলা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র বলছে, ১০ মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৪৭৭টি মামলা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪১টি। আর সেপ্টেম্বরে ২৪, অক্টোবরে ৩৪, নভেম্বরে ৪৯ আর ডিসেম্বরে ৪৪টি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩৮, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭, মার্চে ৯৬, এপ্রিলে ৫২ এবং মে মাসে ৬২টি। হামলা বৃদ্ধির সংখ্যা উদ্বেগজনক। চলতি জুনে পরিস্থিতি কী হবে, বলা যাচ্ছে না। মব সন্ত্রাসের যেসব ঘটনা পত্রিকায় আসে, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগ মব সন্ত্রাস পরিকল্পিত। শুধু হামলা নয়, ভিডিও করে প্রচার করা হচ্ছে। মব হলো অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতো। জনবহুল রাস্তায় কয়েকজন মিলে কাউকে ধাওয়া দিলে, তার সঙ্গে না জেনেই জুটে যায় সাধারণ মানুষ। ফলে এখনই একে দমন করা না গেলে, এই পরিস্থিতির শিকার যে কেউ হতে পারেন। এমন আতঙ্কজনক পরিস্থিতি কেন হলো তার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ অনুসন্ধান করা খুবই জরুরি। সাধারণভাবে দেখা যাচ্ছে যে, গত পনেরো বছরে রাজনৈতিক কর্র্তৃত্বের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের পুলিশ ও প্রশাসনের শৃঙ্খলা। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যে রাষ্ট্রীয় এবং এখানে কর্মরতরা যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী তা ভুলিয়ে দিয়ে দলীয় কর্মীর মতো ভূমিকা আর দুর্নীতির অবাধ সুযোগের কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলো দমন-পীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে এই দুই প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষক সমাজের একটা বড় অংশকে এতটা অনৈতিক কাজে যুক্ত করা হয়েছিল, যার অতীত নজির নেই। প্রশাসনিক দায়িত্ব, সরকারের নির্দেশ মানতে গিয়ে মানবিক মূল্যবোধের যে অধঃপতন ঘটেছে, সেখান থেকে উত্তরণ না ঘটালে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে না। এ কথা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতেই হবে যে, যদি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল না হয়, তাহলে সংঘাত অনিবার্য। এই সংঘাত রাজনৈতিক রূপ নেবেই। যদি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন হয়, তাহলে যে সাময়িক শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা তৈরি হয়, সেই সময় এক ধরনের অরাজকতা চলে। আর এই সময়ে তাৎক্ষণিক সুবিধা নেওয়া, শত্রুতা, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা, জমি, বাড়ি, সম্পদ দখল করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। এসব যারা করে সেই মানুষগুলোর কোনো সামাজিক দায় নেই, থাকে না কোনো লজ্জা বা কোনো মানবিকবোধ। কাজেই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধান করা, দখলবাজি বন্ধ করা,  দেশকে আইনশৃঙ্খলার আওতায় নিয়ে আসার কাজটি প্রথম এবং প্রধান। দ্বিতীয় কাজটি হলো, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে অনিয়ন্ত্রিত বাজারের কারণে। চাহিদা-সরবরাহের সাধারণ নীতিকে পর্যুদস্ত করে বাজার সিন্ডিকেট সরবরাহ চেইনে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। ফলে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং দ্রব্যমূল্য সহনীয় করে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আনা অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

আর একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের চর্চা এবং জবাবদিহিতা না থাকায় গত পনেরো বছর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এমন দলীয়ভাবে কুক্ষিগত করা হয়েছিল, যা আগে কখনো হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠান  ভয়াবহ দুর্নীতি এবং দমনপীড়নের সংস্থায় পরিণত হয়েছিল। যোগ্যরা বিতাড়িত অথবা মাথা নিচু করে থেকেছে, আর দলীয় ব্যক্তিরা দুর্বিনীত হয়ে উঠেছিল। লুটপাট হয়েছে সীমাহীন। ফলে সব রকম সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়েছে।  পুলিশ এবং প্রশাসন তো বটেই, বিচার বিভাগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বলা হয় বিচার বিভাগ স্বাধীন, কিন্তু মানুষ দেখেছে আওয়ামী লীগের অধীনে স্বাধীন। আওয়ামী লীগ যেভাবে চেয়েছে, বিচারকাজ  সেভাবেই চলেছে। কাউকে জামিন দেওয়া বা শাস্তি দেওয়া ক্ষমতাসীন দলের চাওয়া বা ইচ্ছার ওপর নির্ভর করত। ফলে এখানে বড় ধরনের সংস্কার আনা অপরিহার্য ছিল। কারণ বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা দৃশ্যমান না হলে, মানুষের আস্থা ফিরবে না। কিন্তু গত দশ মাসে এক্ষেত্রে খুব কি অগ্রগতি ঘটেছে? একসময় শতাধিক মামলা কাঁধে নিয়ে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরেছেন যারা, তারা একসঙ্গেই সব মামলায় খালাস পেয়ে গেলেন। এর মধ্য দিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলো যে, আগে কেন জামিন বা খালাস পাননি? আইন ও বিচার তাহলে নিজের গতিতে চলেনি? এখন যেভাবে চলছে, সেটাও কি স্বাভাবিক গতি?

পুলিশ এবং প্রশাসন দিয়ে কি মব সন্ত্রাস বন্ধ করা যাবে? দেশে প্রতি ৮০০ জন মানুষের জন্য একজন পুলিশ আছে, তার ওপর সেই পুলিশের ওপর আস্থা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর কোনো দেশেই শুধু পুলিশ দিয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেউ অপরাধ করেছে বলে তার বাড়ি, অফিস দখল করা কি যুক্তিসংগত? অপরাধের বিচার না হলে যেমন অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যায়, তেমনি মব সন্ত্রাস চলতে থাকলে বিচারের গুরুত্ব হারায়। তখন যার শক্তি আছে সেই তা প্রয়োগ করতে থাকে আর সাধারণ মানুষ এর শিকার হয়। এত বিপুল জাগরণের মাধ্যমে যে অভ্যুত্থান হলো, তার অন্তর্নিহিত আকাক্সক্ষা কী ছিল? ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ছিল দেশে বৈষম্যের বেদনা থেকে মানুষ মুক্তি পাবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি-পেশা-লিঙ্গ নির্বিশেষে সব মানুষের মানবাধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষিত রাখা হবে। মব সন্ত্রাস ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারের কার্যকর ভূমিকার অভাবে সেই অঙ্গীকার প্রতিনিয়ত উদ্বেগজনকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। পরিবর্তনের আকাক্সক্ষায় মানুষের যে লড়াই অভ্যুত্থানের জন্ম দিল, বিজয়ের পর তা কেন উচ্ছৃঙ্খলতা, সন্ত্রাস, দখলবাজি ও সংকীর্ণ গোষ্ঠী স্বার্থের কাছে হেরে যাবে? অন্যায়ের পাল্টা অন্যায় করলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে কীভাবে? মবের নামে ভয়ের সংস্কৃতি ফিরে এলে ক্ষতি হবে সবার।

রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.