বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নানাজনের নানা কথা পড়ি, শুনি। কিন্তু আসল কথাটার ধারকাছ দিয়েও কেউ যাচ্ছেন না। জটটা বেধে আছে এক জায়গায়, পরের নির্বাচনে জিতে বিএনপির সরকারে যাওয়া। নির্বাচন যখনই হোক আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপিই সংখ্যাগড়িষ্ঠ হয়ে সরকার গঠন করবে এটা সবাই মনে করে। এখন পর্যন্ত তাদের যে মাঠের ভোট তাতে চোখ বুজে পৌনে দুই শ` থেকে দুই শ` আসন পেয়ে যাবে। আওয়ামী ভোট যদি তাদের বাক্সে যায় তাহলে সুনামী হবে। তার অর্থ ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকার মানেই বিএনপির সরকার। এটাই অনেকের গাত্রদাহের কারন। কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারছে না। মূল ঘটনাটা এখানেই। এরা কয়েক ভাগে বিভক্ত কিন্তু লক্ষ্য এক। এক ভাগ হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রুপ। তারা মনে করে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের এই আলগা ছড়ি ঘোরানোর মজা আর থাকবে না। কাজেই যতদিন ইউনুস সাহেবের নেতৃত্বে দুর্বল একটা সরকার চলবে ততদিন এদের কদর থাকবে। ইসলামপন্থীদের বেশীর ভাগই চায় এই চান্সেই দেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করে ফেলা যায় কি না। এদের মধ্যে জামাত এবং তাদের বাইপ্রডাক্ট বলে পরিচিত এনসিপির টার্গেট নির্বাচন যতটা বিলম্বিত করিয়ে, ইতিমধ্যে বিএনপিকে আরও পচিয়ে সরকারী নীল-নকশায় মেকানিজমের মাধ্যমে ফলাফল তাদের পক্ষে আনতে পারে কি না। আর একটা গ্রপ হচ্ছে সরকার সংশ্লিস্ট। নানা জায়গা থেকে টুকিয়েটাকিয়ে যাদেরকে জড়ো করেছেন। তারা জানে বিএনপি ক্ষমতায় এলে কারোরই চাকরি থাকবে না। কাউকে কাউকে বিদেশেও পালাতে হতে পারে। অতএব এমন মেকানিজম করা যাতে বিএনপি ভবিষ্যৎ সরকার গঠন করতে না পারে। বিএনপিকে ঠেকানোর কমন টার্গেট নিয়ে এই সমস্ত শক্তি যার যার অবস্থান থেকে নানা ভাষায় নানা কায়দায় বিএনপির বিরুদ্ধে প্রচারনা চালায়। তার কমন একটা ন্যারেটিভ হচ্ছে বিএনপি ভারতের দালাল হয়ে গেছে। তারেক রহমান দালাল মীর্জা ফখরুল দালাল সালাহউদ্দিন দালাল! ওরা ক্ষমতায় গেলে স্বৈরাচারকে আবার ফিরিয়ে আনবে। এসব প্রচারনার একটাই লক্ষ্য বিএনপি থেকে ভোটারদেরকে ফিরিয়ে আনা। আওয়ামী আমলে মতের সাথে না মিললেই রাজাকার ট্যাগ দেওয়ার রীতি ছিল, এখনও তাই। নির্বাচনের কথা মুখে আনলেই ভারতের দালাল। খুবই পরিকল্পিতভাবে এই প্রচারনা চালানো হচ্ছে যাতে মানুষ বিএনপিকে ভোট না দেয়। এ এক অতি সুক্ষ্ণ রাজনীতি। আমাদের অনেক মাথামোটা রাজনীতিক আর আবাল ফেসবুকীয়রা তা বুঝতে অক্ষম।
প্রফেসর সাহেবের পদত্যাগের নাটকটা জমলো না। মুখে যাই বলুন, সেদিন জেনারেল ওয়াকারের ওই মিটিংয়ে দেওয়া বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই যে তিনি অমন নাটক সাজাতে চেয়েছিলেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ওয়াকার সাহেবের বক্তৃতায় আপত্তিকর কি ছিল বুঝলাম না! ভদ্রলোক তো যৌক্তিক কথাই বলেছেন। সরকার চালাচ্ছেন নিজের বশংবদদের দিয়ে, বিদেশ থেকে লোক ডেকে এনে বড় বড় জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছেন। সেটাও মানা গেল কিন্তু নিরাপত্তা উপদেষ্টার মত গুরুত্বপূর্ণ পদে একজনকে নিয়োগ দিলেন, দেশের নিরাপত্তার ভার যাদের ওপর তাদের মতামত না নিয়েই! এটা নিয়ে তারা কথাটাও বলতে পারবেন না!
কোন একটা সেক্টর ঠিকমত ফাংশান করছে না। নয় মাস আর্মি মাঠে। আর কতদিন তারা চৌকিদার হাওলদারের ডিউটি করবে! তারা যদি বলে দ্রুত একটা নির্বাচিত সরকারের ব্যবস্থা করে আমাদেরকে আমাদের কাজে ফিরে আসতে দিন, অন্যায়টা কি বলেছে! সরকারের এক মহাপন্ডিতকে বলতে শুনলাম রাজনীতির বিষয়ে আর্মির নাক গলানো নাকি মেনে নেওয়া হবে না। কেন ভাই! আপনারা কারা? নির্বাচিত বা সাংবিধানিক? নানা জায়গা থেকে টুকিয়ে আনা—! আজ যারা বড় বড় কথা বলছেন ৫ই আগস্ট কে কোথায় ছিলেন। এই আর্মি এবং জেনারেল ওয়াকার যদি সেদিন বন্দুকের নল না ঘুরিয়ে ধরতেন পারতেন আজ গাড়ীতে পতাকা নিয়ে ঘুরতে! রাজনীতি নিয়ে তারাই তো কথা বলবে। ওয়াকারই সেদিন সব দলকে ডেকে এনে দেশ চালাতে বলেছিলেন! কেউ তো নিজ থেকে এগিয়ে আসেন নাই! জেনারেল ওয়াকার সেদিন যদি নিজেই সরকার গঠন করতেন কে ছিল না বলার! তিনি এবং অপর দুই বাহিনী প্রধান যদি উপদেষ্টা হতে চাইতেন কে ঠেকাতো!
সবচেয়ে বড় কথা এই সরকারের ক্ষমতার ভিত্তিই তো আর্মি। আর্মিই সরকার গঠনের ব্যবস্থা করেছে। তারা সমর্থন যুগিয়ে চলেছে বলেই সরকার টিকে আছে। বাস্তবতা হচ্ছে কাল আর্মি নল ঘুরিয়ে ধরলে সব খেলা শেষ! ওয়াকার যদি এতই অবাঞ্ছিত হয়ে থাকে প্রফেসর সাহেব তাকে স্যাক করতে পারছেন না কেন!
এটা কোন রেগুলার গভর্ণমেন্ট না। পুরোটাই গোজামিল আর জোরাতালি দেওয়া। উপদেষ্টা পরিষদে বাহিনী প্রধানরা থাকলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেতো না। বরঞ্চ সরকার শক্তিশালী হতো।
জেনারেল ওয়াকারের বিরুদ্ধে একটা মহল গোড়া থেকেই লেগে আছে। হাসিনার অ্যাপয়েন্টেড অতএব সে কলকাঠি নেড়ে একদিন হাসিনাকে আবার ফিরিয়ে আনবে- এমন একটা ন্যারেটিভ বানিয়ে বাজারে ছাড়া হয়েছে। কিছু মানুষ তা বিশ্বাষও করে। এই ছাগলের বাচ্চারা এটা বোঝে না ফিরিয়েই যদি আনবে তাহলে তাড়ালো কেন! অথচ বাস্তবতা হচ্ছে শেখ হাসিনা যদি কোনদিন সুযোগ পায় প্রথম ফাঁসিতে লটকাবে এই লোকটাকে।
দেশের ভেতরে এবং বাইরে থেকে কিছু তাত্বিক ও ইউটিউবার এই প্রচারণায় বাতাস যোগায়। কেউ কেউ জেনারেল ওয়াকারকে সড়িয়ে দিয়ে ক্যু করার প্ররোচনাও দিয়ে যাচ্ছে। একটি মহল চায় ওয়াকারকে বিতর্কিত করে তাড়িয়ে নিজেদের পছন্দের কাউকে আনা এবং পুরো আর্মি নিজেদের মত করে সাজানো। এরা কারা পাঠক নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারেন।
প্রফেসর ইউনুসের বড় ভুল হয়েছে ওই সব মতলবী প্রচারনা বিশ্বাষ করা এবং জেনারেল ওয়াকার থেকে নিজেকে দুরে থাকা। তিনি বাজারে প্রচলিত বয়ানটাকেই বড় করে দেখেছেন, আগস্ট বিপ্লবে সেনাবাহিনী এবং জেনারেল ওয়াকারের ভুমিকাকে তুচ্ছ মনে করেছেন।
আজ যে ক্রাইসিস, তা মুলত: জেনারেল ওয়াকার এবং প্রফেসর ইউনুসের মধ্যেকার বিরোধের ফসল। অথচ উভয়ে যদি গোড়া থেকে পরষ্পরকে আস্থায় নিতে পারতেন তাহলে এত গোল পাকাতো না।
শেষ পর্যন্ত অবস্থা যা দাঁড়ালো: প্রফেসর ইউনুস পদত্যাগ করছেন না- বরঞ্চ হুমকী এসেছে তার পরিকল্পনায় কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ালে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে, প্রেস সচিবের বয়ান অনুযায়ী বিএনপির দাবী মোতাবেক ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হচ্ছে না।
তাহলে দেখা যাচ্ছে জেনারেল ওয়াকার এবং প্রফেসর ইউনুস এখন মাঠের দুই কোনায়। অবধারিতভাবেই বলা যায় খেলা হবে এখন এই দুই পক্ষে। জেনারেল ওয়াকারের পক্ষে আছে সশস্ত্র বাহিনী এবং কাছাকাছি দাবী হবার কারনে বিএনপি এবং সমমনা কিছু দল, অপরদিকে প্রফেসর সাহেবের সাথে আছে তার আশীর্ব্বাদপুষ্ট নবীন দলটি, তাবৎ ইসলামপন্থী দল ও গোষ্ঠী, উপদেষ্টা পরিষদ এবং কিছু উগ্রবাদী বুদ্ধিজীবি ও ধান্ধাবাজ ইউটিউবার।
বোঝা যাচ্ছে খেলাটা কত গুরুত্বপূর্ণ! এবং এই খেলা আমাদেরকে শেষতক কোথায় নিয়ে ঠেকাবে!
সাঈদ তারেক , লেখক , সাংবাদিক , মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ।

