স্লোগান দেওয়া অনেকের পছন্দ না হলেও স্লোগানেই ফুটে ওঠে মানুষের মনের কথা। রাজনৈতিক আন্দোলনে তাই স্লোগান নির্ধারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই স্লোগানকে মানুষ গ্রহণ করছে কিনা, তা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দিন ধরে স্লোগান দিয়েও মানুষের জাগরণ ঘটে না এমন দৃষ্টান্ত যেমন আছে তেমনি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা স্লোগান যে জনগণকে রাজপথে টেনে আনে তার দৃষ্টান্তও আছে। সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হলো, বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্লোগান এবং ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান। প্রতিটি অভ্যুত্থানের আগে কিছু স্লোগান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৬৯-এর জনপ্রিয় স্লোগান ছিল ‘কেউ খাবে কেউ খাবে না তা হবে না, তা হবে না।’ ১৯৯০-এর স্লোগান ছিল ‘আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব।’ আর ২০২৪-এর স্লোগান, ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নেই।’ একদিকে শোষণ, দুর্নীতি যেমন বৈষম্য বাড়ায়, অন্যদিকে দুঃশাসন তেমনি জনগণের ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে। স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা হিসেবে সাম্য, মর্যাদা, সুবিচারের আশা পাকিস্তানি শাসন শোষণের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দেশের জনগণকে জীবনদানে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু সাম্যের পরিবর্তে বৈষম্য দেখেছে শুধু নয়, বৃদ্ধি পেতেও দেখেছে এই ভূখণ্ডের মানুষ। ফলে বারবার প্রতিবাদ গড়ে তোলার মাধ্যমে এর ফয়সালা করতে রাস্তায় নেমে আসে তারা। পনেরো বছরের আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এবারও সেটাই হয়েছে। কিন্তু সাত মাস পরে প্রত্যাশা পূরণের পথে কতটুকু এগোলাম তার হিসাব তো থাকা দরকার।
স্বাধীনতার পর মাত্র ৫ জন কোটিপতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশে প্রতি বছর কোটিপতির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি। তিন মাসে আগে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর শেষে যা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৭টি। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে কোটিপতি হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ৪ হাজার ৯৫৪টি। কোটিপতি বাড়ছে অর্থাৎ কিছু মানুষের আর্থিক ক্ষমতা বাড়ছে এটা বোঝা যায় বাজারে গেলে, রাস্তায় দামি গাড়ি আর গ্রাম শহরে কিছু মানুষের বিলাসবহুল বাড়ি দেখলে। এসব জৌলুসপূর্ণ জীবন আকর্ষণ করে অনেককেই। কিন্তু কৃষকের অবস্থা কেমন আর শ্রমজীবীদের জীবন কেমন কাটছে, সেই আলোচনাটা যেন আড়ালে না চলে যায়। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া এখনো দৌড়ে বেড়াচ্ছে। শীত মৌসুম শেষ বলে সবজির দাম কিছুটা কম, আলু নিয়ে কৃষকরা বিপাকে, টমেটোর অবস্থাও তাই। উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ করা কঠিন বলে কৃষক যা দাম পান তাতেই বিক্রি করে দিচ্ছেন। কিন্তু চালের দাম বেড়েই চলেছে।
অন্যদিকে চাল উৎপাদনের প্রধান দেশগুলোতে চালের দাম কমছে। ভারতে চালের রপ্তানি মূল্য এখনো ২১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। চাহিদা কমে যাওয়া এবং অন্যান্য চাল রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে চালের রপ্তানি মূল্য কমে আসছে। ভারতে ৫ শতাংশ খুদসহ চালের রপ্তানি মূল্য চলতি সপ্তাহে টনপ্রতি ৪০৩-৪১০ ডলার নির্ধারণ হয়েছে। গত সপ্তাহে এই দাম ছিল ৪০৯-৪১৫ ডলার। ভারতের সংবাদমাধ্যম লাইভ মিন্টের সংবাদে বলা হয়েছে, অন্যান্য দেশের চালের রপ্তানি মূল্য কমে যাওয়ায় ভারতের চালের দামও কমেছে। ভিয়েতনাম ফুড অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দেশটিতে ৫ শতাংশ খুদযুক্ত চালের দাম ছিল টনপ্রতি ৩৯২ ডলার, গত সপ্তাহে যা ছিল ৩৮৯ ডলার। ভিয়েতনামের মেকং ডেলটা অঞ্চলের কৃষকেরা তাদের শীত-বসন্ত মৌসুমের ফসলের প্রায় অর্ধেক তুলে ফেলেছেন। পুরো ফসল উঠে গেলে বাজারে তার প্রভাব আরও পড়বে এবং দাম কমবে। এদিকে থাইল্যান্ডেও চলতি সপ্তাহে নিম্নমুখী ছিল চালের দাম। দেশটিতে ৫ শতাংশ খুদযুক্ত চাল গত সপ্তাহে টনপ্রতি ৪১৫ ডলার থেকে কমে ৪০৫-৪০৮ ডলার হয়েছে। ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চাল রপ্তানিকারক দেশ। বিশ্ববাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ চাল তারা সরবরাহ করে। চালের আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের পরের চারটি অবস্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালে এ চারটি দেশ সম্মিলিতভাবে যত চাল রপ্তানি করে, ভারত একাই তার চেয়ে বেশি করে। ভারত সব মিলিয়ে ১৪০টি দেশে চাল রপ্তানি করে। সে জন্য ভারতের চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে চালের দামে প্রভাব ফেলে। গত বছরের অক্টোবর মাসে ভারত চাল রপ্তানি থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এরপর থেকে বিশ্ববাজারে চালের দাম কমতে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে শীত মৌসুম থেকেই চালের দাম বাড়তি। বিভিন্ন দেশে থেকে চাল আমদানি করা হলেও দাম কমছে না। টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, মাঝারি চালের দাম এক বছর আগের তুলনায় ১৪ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম ১৫ শতাংশ বেড়েছে। চালের পরই আলুর দাম মানুষকে ভোগায় বেশি। গত মৌসুমে আলুর ভালো দাম পাওয়ায় এবার দেশে আলুর আবাদ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি জমিতে। উৎপাদনও ১ কোটি ২০ লাখ টন ছাড়ানোর আশা করা হচ্ছে। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে আলুর উৎপাদন খরচও উঠছে না এখন। কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত হিমাগার ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ায় আলু রাখার খরচ বাড়বে। তাই মাঠেই কম দামে আলু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। ফলে এখন আলুর দাম খুচরা বাজারে কেজিতে ২০ টাকার নিচে নেমে এলেও মৌসুম শেষে আবার ৬০ থেকে ৮০ টাকা হয়ে যাবে আলুর দাম। সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার অভাবে একই অবস্থা পেঁয়াজ ও টমেটোর বাজারেও। গত ৮ ফেব্রুয়ারি আলু সংরক্ষণে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ)। সেখানে হিমাগারে সংরক্ষণে কেজিপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৮ টাকা। আর প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি আলু রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। যদিও আগে কৃষকরা ৭০ কেজির বস্তা ৩৫০ টাকায় কোল্ড স্টোরেজে রাখতেন। এতে কেজিপ্রতি ভাড়া পড়ত ৫ টাকা। কিন্তু নতুন নিয়মে কেজিপ্রতি ভাড়া ৬০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৮ টাকায়। ফলে মৌসুম শেষ হলেই আলুর দাম বাড়তে থাকবে। এ তো গেল দেশের কৃষকের কথা।
অন্যদিকে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ২৭ বিলিয়ন ডলার, এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে না। কারণ ঋণ শোধ করতে ডলার চলে যাচ্ছে। শর্ত সাপেক্ষে ঋণ নিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশ উন্নতি করতে পারেনি। ফলে ঋণ নেওয়া মানে শর্তের জালে বাঁধা পড়া। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা আইএমএফকে বলেছি, এত শর্ত এক সঙ্গে মানা যাবে না।… আপনারা তো ভাবছেন ভিক্ষা করে নিয়ে আসি, আসলে অনেক শর্ত মেনে এবং আমাদের নিজস্ব তাগিদে আনি। কিছু শর্ত আছে বললেই আমরা পালন করব তা নয়।’ কিন্তু বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ পরিষেবার দাম বাড়ানো, বেসরকারি এবং বাণিজ্যিক উদ্যোগকে পৃষ্ঠপোষকতা করার নীতি নিয়েই চলছে সরকার। এসব তো বিশ্বব্যাংক আর আইএমএফের প্রধান নীতি কৌশল। এর প্রভাব পড়বে জনগণের জীবনে। এখন বিদেশি বিনিয়োগ আনার প্রবল চেষ্টা চলছে। বিনিয়োগ হলেই হবে না, তাতে দেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, কর্মসংস্থান কতটুকু বৃদ্ধি পাবে এ নিয়ে বিতর্ক থাকা দেশের জন্যই প্রয়োজন। ইলন মাস্কের সঙ্গে আকাশ বাণিজ্যিক সমঝোতার চেয়েও দেশের বাজার ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগ দেওয়া বেশি দরকার। সামাজিক অস্থিরতা বাড়লে আর তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে নানাভাবে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন গড়ে ৫৬ জন আত্মহত্যা করে নিঃসঙ্গতা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও মানসিক ভারসাম্যহীনতায়। গত ৭ মাসে গণপিটুনির ঘটনায় ১১৯ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা হয়েছে ৭ মাসে ৬৮৬৭টি। বেকারত্ব ও অপরাধ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। পরিবেশ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণহীনতা অপরাধ উৎসাহ বাড়িয়ে চলেছে। ধর্ম ব্যবসায়ী শক্তি তাদের সামাজিক প্রতিপত্তি বাড়িয়ে তোলার জন্য ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে দুর্বল জায়গায় শক্তি প্রদর্শন করছে। ডাকাতি, ছিনতাই রোধে কার্যকর পদক্ষেপ এর দুর্বলতা মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।
এদেশ যেমন বারবার আন্দোলনে ফেটে পড়ার দেশ, তেমনি বিজয় হাতছাড়া হওয়ার দেশ। মানুষ বারবার অন্যায় শাসন-শোষণ-নিপীড়নবিরোধী সংগ্রামে বিজয়ী হয়। কিন্তু বিজয়ের আনন্দে উল্লসিত হতে না হতেই বিজয় হাতছাড়া হয়ে যায়। ১৫ বছরব্যাপী রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব গণজাগরণ ও গণ-অভ্যুত্থানের পর এখন চলছে অন্তর্বর্তী সরকারের কাল। রাজনীতির ওপরের স্তরে পরিবর্তন হলেও শোষণের ব্যবস্থা তো বহাল থাকছে। তাই বিপুল আকাক্সক্ষা আর সিমাহীন ত্যাগের পর পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তন না হলে জনগণের মধ্যে হতাশা আর অবসাদ নেমে আসে। তার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তিবাদী মন দুর্বল হয় আর সমাজে নানা নেতিবাচক ঘটনা ঘটতে থাকে। শোষণ-বৈষম্যের অবসান করতে হলে, আর্থসামাজিক ব্যবস্থার বদল করা দরকার। পুঁজিবাদের কারণে যে সংকটের জন্ম, সেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বহাল থাকলে বারবার একই শ্রেণির মধ্যে শুধু ক্ষমতার হাতবদল হতে থাকবে। বিজয়ী জনগণ বারবার পরাস্ত হবে। ভূলুণ্ঠিত হবে মানুষের মর্যাদা। দেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ শ্রমিক কৃষক নিম্নবিত্ত। শ্রমিক শ্রমের দাম পায় না, কৃষক ফসলের দাম পায় না অথচ কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে এটা কীসের প্রতিফলন? যুবকরা কাজ না পাওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে অথচ মাথাপিছু আয় বাড়ছে। একদল মানুষের কাজ নেই আর অন্যদের আয় বেড়েই চলেছে, এটা কীভাবে সম্ভব? মানুষ যা উৎপাদন করে তার দাম কম, শ্রমশক্তির দাম কম, অথচ উৎপাদিত দ্রব্য হাতবদল হলেই দাম বেড়ে যায় এটা কোনো জাদু নয়। এর নাম শোষণ আর প্রক্রিয়াটা হলো পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদের বৃদ্ধি তাই বৈষম্য বাড়াবেই। আর বৈষম্যের বৃদ্ধি অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলবে এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।
রাজেকুজ্জামান রতন
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

