“জলের শ্যাওলা”- জগদ্দল পাথরের মতন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে জনমানুষের যাপিত জীবনের দুঃসহ পরিস্থিতি যতটা না ছিল, তারচেয়েও বেশি জনমানুষের মনে ক্ষোভ ও বেদনা ছিল, নিজেদের ইচ্ছামত সরকার গঠন করতে না পারার আক্ষেপটাই সম্ভবত বেশি। বাস্তবতা হচ্ছে বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের সর্বত্রই সাধারণ মানুষেরা ক্ষুদ্র থেকেও ক্ষুদ্রতম শক্তি, যে কোন ক্ষমতার বিপরীতেই। অন্য ভার্সনে বলাই বাহুল্য যে, ক্ষমতার গোড়ার শক্তি আবার সেই ক্ষুদ্রতম জনশক্তিই। মূলত ক্ষমতা মানুষের শক্তিতেই গড়ে উঠে আবার সেই ক্ষমতা জনমানুষের কাছেই সময়ে নত হতে বাধ্য হয়। এই যে ক্ষমতার পালাবদল করার প্রক্রিয়া বা ক্ষমতা যা জনমানুষের হাতে কোন না কোনভাবে বহাল থাকে, সেটা রাজনীতির যে কোন ফর্মেই হোক, সেই ক্ষমতার অধিকার থেকে কোন রাষ্ট্রের জনগণই বিচ্যুত হতে চায় না কেননা কোন রাষ্ট্র যখন অধিক ক্ষমতা চর্চায় লিপ্ত হয়, তার বিপরীতে জনমানুষের হাতে ওই একটি মাত্র অস্ত্রই থাকে যা দ্বারা অন্তত পক্ষে নিজেদের শক্তির জানান দিতে পারে, হোক সেটা ভোটের মাধ্যমে অথবা অভ্যুত্থান বা বিপ্লবে। তাই স্বাভাবিক ভাবনাতেই বলা যায়, মূলত ক্ষমতাশূণ্য সাধারণ জনমানুষেরও কখনোই চাওয়া- পাওয়া হয় না। বিগত সরকার বাস্তবিক অর্থেই সাধারণ জনমানুষের সময়ে প্রয়োগ করার সাধারণ ক্ষমতাটুকুও হরণ করেছিল চরমভাবে এবং ঠিক সে কারণেই পাঁচ আগস্ট আওয়ামী সরকারের বিদায় ঘটে।
বাংলা রাষ্ট্রে হঠাৎ আসা আকর্ষণীয় সুযোগ বাস্তবিক অর্থে কোন পথে?
পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে শত হাজার উদহারণ সামনে চলে আসবে, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই বিপ্লব বলি, অভ্যুত্থান বলি বা যুদ্ধ বলি, সব কিছুর পেছনেই মূলত মানুষ এবং মানুষের সম্মিলিত শক্তি অতঃপর সেই শক্তির দ্বারাই ক্ষমতা। সেই মানুষের সাথে যে ক্রিয়া যে কোন ফর্মেই ঘটুক না কেন রাষ্ট থেকে, তার পেছনের উপসর্গ মূলত রাজনীতি কেননা বিশ্বব্যাপী সকল রাষ্ট্রই চলে রাজনীতি দ্বারাই। হাতে গুণে দু’চারটি উদহারণ অবশ্যই মিলবে যে সকল রাষ্ট্র রাজনীতি দ্বারা পরিচালিত হয় না বটে। তবে সেই সকল রাষ্ট্রকে আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞায়নে ফেলা বেশ মুশকিল এবং ভিন্নভাবে বললে বলতেই হয়, বিনা রাজনীতির রাষ্ট্রগুলোতেও মূলত রাজনীতির ছকেই পরিচালিত হয় তবে হ্যা সেটা আবার অবৈধ ও অনাকাঙ্খিত বা চতুরতা ও ছলনার রাজনীতিরই অংশ।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছয় মাস পাড় হবার পথে এবং সেই সময়ে এসে কেন জনমানুষের শক্তির কথা বলছি? কেনইবা পাঁচ আগস্ট সরকার পতনের কাহিনী সামনে চলে আসছে? কি তার উপসর্গ? এর সহজ ও এক কথার উত্তর হলো প্রত্যাশার পারদস্কেলে মাত্রায় বেশ গলদ পরিলক্ষিত হচ্ছে বলেই। ছয় মাসের মাথায় জনমানুষের রক্তের বিনিময়ে চাওয়া- পাওয়া ও আকাঙ্খায় যে মাত্রায় পারদস্কেলে একটি নিদর্শন থাকার কথা ছিল, সেই নিদর্শনটি বলাই বাহুল্য নিম্নমুখীতো বটেই উল্টো আশাহত হবার প্রয়াস বেশ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাস্তবিক অর্থেই রাষ্ট্রের কোন অংশেই মূলত সঠিক কর্মটি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। শত হাজার প্রশ্ন উত্থাপন হচ্ছে জনমানুষের মন থেকেই। এটা অস্বীকার করা আর কাকের মতন চক্ষুদয় বন্ধ করে মাংস লুকানো সমান হবে এবং সেগুলো কোন না কোনভাবে প্রকাশিতও হচ্ছে। আমি বলছি না যে সব শেষ হয়ে গেছে তবে প্রশ্ন উঠছে, এটা অস্বীকারকরার সুযোগ নেহায়েত কম কিন্ত। সাধারণ ভাবনায় একটি রাষ্ট্রের জনমানুষের প্রথম ও সাধারণ চাওয়টা হয়, আপন জীবনের স্বাভাবিক নিরাপত্তা ও জীবন বাঁচাতে স্বাভাবিক আয়ত্তে বাজার ব্যবস্থা। পাশাপাশি সাধারণ চাওয়ায় আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক কিছুই যোগ হয় তবে জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকলে তবেই ভিন্ন চাওয়া- পাওয়ার প্রশ্ন উঠবে। কঠিন সত্য হলো, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বারা জীবনের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলার অবস্থানটাই ট্যোটালি বেহাত হয়ে আছে। অন্য প্রশ্ন আপাতত পাশেই ঠেলে রাখলাম।
লক্ষ্যণীয যে, লেখার শুরুতেই আকর্ষণীয় সুযোগ শব্দটি প্রয়োগ করেছি। কিভাবে সেই আকর্ষণীয় সুযোগ হলো ? বাস্তবতা হচ্ছে পাঁচ আগস্ট বিগত সরকারের পতন ঘটেছে। কিভাবে ঘটেছে? কি তার উপসর্গ ছিল? দেশি বা বিদেশী শক্তির উৎস কি ছিল? অর্থের যোগান কত ছিল বা কোথা থেকে হলো? কারা বা কোন কোন রাজনৈতিক দল পিছনের উপসর্গ হয়ে কাজ করলো? জনমানুষের সম্পৃক্ততাই কেন হলো? কত রক্ত ঝরলো? কত অল্প বয়সিদের প্রাণ গেলো? রাষ্ট্রের কতটা বা কি পরিমান ক্ষতি সাধন হলো? এমন শত শত প্রশ্নগুলো সব এক সাথে পাশে ঠেলে রেখেই বলছি, পাঁচ আগস্টে জনমানুষের সম্পৃক্ততায় একপ্রকার “অনিশ্চিত তবে আকর্ষণীয় সুযোগ” (Uncertain but Attractive opportunity) কিন্ত এই রাষ্ট্রে তৈরী হয়। কেননা যে জনমানুষেরা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করলো এবং স্বাধীনতার মূল ইচ্ছা- আকাঙ্খার যা জনমানুষের বহুলাংশ ৭১ এ দেশ স্বাধীনতার পরে আমরা করতে পারিনি, ৯০ এর গণ অভ্যুত্থানের পরে পারিনি, এক এগারোর তথাকথিত সামরিক সরকারের পরে পারিনি, তেমন কিছু এই ২৪ এর গণ অভ্যুত্থানের পরে করার বিরাট একটি সুযোগ তৈরী হয়ছে। তবে সেই সুযোগ বাস্তবিক অর্থেই পূর্বের মতন পথহারা হচ্ছে কিনা? প্রশ্নটি ইতিমধ্যেই উঠতে শুরু করেছে।
বাস্তবতা হচ্ছে গত ছয় মাসে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে স্পষ্টতই বলা যায় যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে পূর্ববর্তী যে কোন আমলের যে কোন সরকারের সাথে মৌলিক (Fundamenta) কোন পার্থক্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সকল জনমানুষ সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায়ন করেছিল অন্তত পক্ষে মৌলিক (Fundamental) পার্থক্যগুলো বজায় থাকবে, এমনটা শতভাগ জনমানুষের ভাবনায় ছিল, এটা অস্বীকার করা নিশ্চিত অসত্য বলা হবে।
কিন্ত বাস্তবিক অর্থে কি পরিলক্ষিত হচ্ছে? যে কোটা দিয়ে আন্দোলন হলো, সরকার পতন হলো, সেই কোটার প্রয়োগ ঘোষণা দিয়েই হচ্ছে। পূর্বের সরকারগুলো রাষ্ট্রের পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে আপন স্বার্থে রাজনৈতিক দল গঠন করেছিল, বর্তমানেও সেটা ঘটছে। আইন- আদালতে পূর্বের সরকারগুলোর ক্ষেত্রে যেভাবে অপচর্চা হতো, একই হাল বর্তমানেও চলছে। ইচ্ছা ও প্রয়োজন হচ্ছেতো শত হাজার গায়েবি মামলা চলছে আবার স্বার্থের টানে একদিনেই শত শত মামলা খালাস হয়ে যাচ্ছে। বাজার ব্যবস্থায় পূর্বের ন্যায় চাঁদাবাজি আর সিন্ডিকেটের বাহার বহাল তবিয়তেই আছে, ফলাফল আলাদা করে লেখার প্রয়োজন নেই নিশ্চয়ই। আইনশৃঙ্খলার অবস্থা প্রতিনিয়তই বাজে থেকেও বাজে হচ্ছে অথচ সরকারের ভূমিকা কি? সেটা অনুধাবন করাও মুশকিল হয়ে উঠছে। গত ছয় মাসে রাষ্ট্রে নতুন বিনিয়োগ শূণ্য। এগুলো সাধারণ চোখেই দেখা যাচ্ছে এবং প্রতিনিয়তই দৈনিক খবরেই প্রকাশ পাচ্ছে। এই যে অভিযোগুলো লেখা, এগুলো সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্য নয় তবে এমন বিষয়গুলো সাথে রক্তের জুলাই- আগস্ট অভ্যুত্থানকে মেলানো বেশ কঠিন হয়ে উঠছে বলেই বলা। ঠিক সে কারণেই মৌলিক (Fundamental) পার্থক্যের কথাটি চলে আসে। নিম্নে পক্ষে মৌলিক পার্থক্যটা এত রক্তের বিনিময়ে আশা করা সাধারণ জনমানুষের নিশ্চয়ই অন্যায় হবার কথা নয়।
মৌলিক পার্থক্য ছাড়াও বর্তমানে চলছে সরকারের উপর স্তরের শক্তিধর চেয়ার থেকে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিনিয়তই একপ্রকার দন্দ ও দর্শনের দাম্ভিকতায় উদ্ভট লড়াই। জনমানুষের মনে ইতিমধ্যেই দেশের জন্মসূত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আভাস মিলছে নানাবিধ কর্মকাণ্ডের ফলেই। যা কখনোই রক্তের অভ্যুত্থানের পথকে সুগমতো করবেই না, উল্টো হবে কন্টকাকীর্ণ। ধীরে ধীরে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দূরত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং পাশাপাশি একপ্রকার রাজনৈতিক দর্প চলছে। যা দ্বারা রাষ্ট্র ভাল কিছু অর্জনে নির্ঘাত বেহাত হবে। একটি সরকারের জন্য ছয় মাস একান্তই কম সময় নয় কিন্ত। বাস্তবতা কঠিন হলেও সত্য যে, সরকার আজ অবধি অনুধাবন করতেই সক্ষম হলো না এটা বিপ্লবী সরকার, নাকি জনমানুষের চাওয়ায় রক্তের বিনিময়ে একটি অভ্যুত্থানের সরকার? কেন এমন প্রশ্ন চলে আসে? কেননা কখনও বলা হচ্ছে ঘোষণা আসছে। আবার বলা হচ্ছে সরকারের এর সাথে কোন সম্পৃক্ততা নেই। কেমন জানি একটি দোদুল্যমান অবস্থান। আরও কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে বিপ্লবী সরকার হবার সুযোগ সময়ের সাথেই ভেসে গেছে। ইহাই কঠিন সত্য।
সরকারের যখন এমন দোদুল্যমান অবস্থা চলছে তখন সরকার প্রধানের একপ্রকার হেয়ালিপনা বচন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে। সরকার প্রধান যখন নিজেই সাক্ষাৎকারে বলেন, “অভিজ্ঞতা নেই, ভাল হলে ভাল, আর না হলে মন্দ”। তখন যে কোন সাধারণ নাগরিক ভাবিত হবেই। কেননা ভূমির দিক থেকে ক্ষুদ্র, জনমানুষের দিক থেকে বৃহৎ জনগোষ্ঠী ও স্বপ্ন অর্থনীতির বাংলাদেশে ১৮ কোটি জনতার নেতৃত্বে থাকা সরকার প্রধান ভাল- মন্দের পাশার চালে চললে, ভরসা রাখাটাও বেশ মুশকিলের যে।
এত সব বিড়ম্বনা মাঝে তাহলে করণীয় কি হতে পারে ? মূলত এই করণীয় সমন্বে সাধারণ জনগণ বহু মত ও পথের কথা বলতেই পারে, প্রকাশও করতে পারে তবে মূলত করণীয়টা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলোকেই করতে হবে এবং সেটা একনিষ্ঠভাবেই। হোক সেটা বর্তমান সরকারের সাথে শত শত বৈঠকের মাধ্যমে দাবী দাওয়ার চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে অথবা রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের একতার মাধ্যমেই হোক। সরকারকেও বারংবার ভাবা উচিত এত রক্তের বিনিময়ে অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই এই সরকারের আগমন ঘটেছে এবং সেটা ছাত্র জনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়েই ঘটেছে। সুতরাং অবহেলা না করে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ বিবেচনায় গুরুত্ব দেওয়াটা সরকারের জন্য বাঞ্ছনীয়। সার্বিক পর্যবেক্ষণ করে বলাই যায়, সরকার সেই পথে মোটেও হাঁটছে না বলেই প্রতিয়মান হয়।
তবে সরকারকেও স্মরণে রাখা উচিত, যে জনতার কল্যাণেই আজকের সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, সেই সরকার প্রাথমিক অবস্থায় যদি জনমানুষের মৌলিক (Fundamenta) অধিকারকে কার্যকর রাখতে সক্ষম না হয়, তাহলে সেই মৌলিক অধিকারের সুরক্ষার জন্য জনমানুষের ভাবনা খুব দ্রুতই ঘুরে যেতে পারে এবং তখন সরকারের সার্বিক শক্তির সার্বিক ক্ষয় হবেই হবে। বাস্তবতা হলো সরকার সাধারণ জনমানুষের মৌলিক অধিকারগুলো কিন্ত সুরক্ষায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। এই মৌলিক অধিকারের কথাটি বারবার লিখছি, এটা দ্বারাই সরকারের বহুবিধ দূর্বলতার প্রকাশ পায়। সুতরাং সরকারের উচিত হবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া তবেই সহজ পথ সামনে চলে আসবে। নতুবা এই সরকারের হেলাফেলায় রাষ্ট্রকে ভয়ানক দুর্দশায় নিমজ্জিত হতে হবে যে। সুতরাং সরকার সহ সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে সময়েই রাষ্ট্রের কল্যাণের কথা ভেবেই পা ফেলা প্রয়োজন। সময়েই সাবধানতা জরুরী।
বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

