নিজেদের দোষেই সরকার সন্দিহান হচ্ছে বলেই প্রতিয়মান হয়

“জলের শ্যাওলা”-  বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরু থেকেই লিখে আসছি, সংস্কারের প্রয়োজন আবশ্যক তবে একটি টাইমফ্রেম বাতলিয়ে দিলে সব পক্ষই স্বস্তি পাবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিজেও স্বস্তির সাথে কাজ করতে পারবে কেননা জনমানুষের নিকট একটি পরিষ্কার ধারণা থাকবে, সরকার মূলত কি করতে চাচ্ছে? এবং জনমানুষেরা আরও পরিষ্কার ধারণা পাবে, হ্যা এই কাজের জন্য সত্যিই এতটা সময় প্রয়োজন এবং স্বাভাবিকও বটে।
সরকার আজ অবধি টাইমফ্রেমের বিষয়ে কোন নির্ধারিত শব্দ উচ্চারণ করলো না। উল্টো দেশের সেনা প্রধান যখন দেড় বছরের মতন একটি সময় বললো এবং উল্লেখ করলো ততদিন পর্যন্ত সেনা বাহিনী সরকারকে সহযোগিতা করবে। তখন আবার সরকার প্রধান নিজেই ভয়েজ অফ আমেরিকার সাক্ষাৎকারে জানিয়ে দিলেন, ওটা সেনা প্রধানের ব্যক্তিগত মতামত। সরকার বলবে কতদিন লাগবে ? অথচ সরকার কিছুই বলছে না এবং আজ অবধি বলেনি।
কেন আমি টাইমফ্রেমের কথা নতুন করে বলছি? এই সরকার আসার পর থেকেই রাজনীতির শুদ্ধতার নামে সংস্কারের প্লাকার্ড দিয়ে ৭১ কে প্রশ্নবিদ্ধ করেই চলছে। যত প্রকার সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো আইনগতভাবেই এই সরকারের বৈধতা নেই এবং ভবিষ্যতেও বৈধতা পাবে না। এটা অসম্ভব কেননা আইনি প্রশ্নে কোন রাজনৈতিক দলই ছাড় দেবে না। তবে হ্যা, এই সরকারের সাথে জামায়াতের যে দহরম মহরম স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, বলাই বাহুল্য জামায়াত একমাত্র দল যারা সমর্থন দিবে এবং দিচ্ছেও বটে প্রকাশ্য।
এই যে জামায়াতীরা যেভাবে সরকারের উপর প্রভাব ফেলে চলছে, সেখানেই যত প্রশ্ন উঠে এবং ধীরে ধীরে সরকারের বিরোধীতাও বেড়ে উঠছে। এটা অস্বীকার করা মানেই অসত্য বলা মাত্র। বেশ স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, সরকার জামায়াতীদের সমর্থনে নিজেদের বেশ শক্তিধর ভাবছে তবে বাস্তবতা হলো জামায়াতীদের উপর যত বেশি ভর করবে সরকার তত বেশি সমালোচিত হবেই হবে কেননা একসময়ে জনমানুষেরা ৭১ এই ফিরবে। কারণ এই জাতিগোষ্ঠীর জন্মসূত্র ওই ৭১ ই যে। এটা ভুলে থাকলে সরকারের মাঝে স্বস্তির বাতাসটুকুও বন্ধ হতে বাধ্য হবেই হবে।
আমরা যত কথাই বলি না কেন, মূলত এই সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার কোন অভিজ্ঞতাই নেই, এটা বাস্তবিক সত্য। তারমানে মোটেও নয় যে সরকার ফেল করুক, এমনটাই সবাই চায়। না, তা মোটেও নয় তবে জনমানুষ সহ আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্রটা বরাবরই অধৈর্যশীল এবং সেটাই বড় সমস্যার কারণ। সরকার এই ধৈর্য- অধৈর্য বিষয়টি যতটা বেশি মাথায় রাখবে ততটাই সরকারের জন্য মঙ্গলজনক বলেই মনে করি।
এই সরকারের শুরু থেকেই লিখে আসছি, বেশি গুড়ে তেতো হবে। সরকার মনে হচ্ছে সেই বেশি গুড় গিলেই চলছে এবং ঠিক সে কারণেই টাইমফ্রেমের ধারণাতেও নেই বলে লক্ষ্যণীয হচ্ছে। যত বেশি সংস্কারের দিকে হাঁটবে ততই জটিলতায় জড়াবে। কিছু সংস্কার নির্দিষ্ট করে দ্রুত শেষ করে আনলেই সরকার জনমানুষের আস্থা হারাবে না। আর কিছু সংস্কার জাতীয়ভাবে প্রস্তাবনার মাধ্যমে নির্বাচনের আগে প্রস্তুত করে জনমানুষের সামনে খোলাখুলি রেখে যাওয়া হবে উত্তম। যা পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার করতে বা মানতে বাধ্য হবে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ওটা করা তেমন কোন সমস্যাই হবার কথা নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনের পূর্বেই প্রতিশ্রুতিতে আনতে হবে এবং জনসম্মুখে প্রতিজ্ঞা প্রকাশ করাতে হবে মাত্র। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতায়ন হতে, জনমানুষের চাপেও সেটা সম্ভব নিশ্চয়ই। জনমানুষেরাও চাপ প্রয়োগ করবে কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মের প্রতিও তেমন বিশ্বাস কেউ রাখে না বলেই।
একটি বিষয় বেশ পরিষ্কার যে, এত বড় অভ্যুত্থানে, এত রক্তের পরে জনমানুষের যে আশা আকাঙ্খা এই সরকারের প্রতি ছিল, সেটার দেখা মিলছে না। এমনকি বলা যায় সরকার সেটা করতে সক্ষম হবে না বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। কারণ সরকার আসল কাজ ছেড়ে, অযাচিত কিছু কাজে বেশি মনোযোগী বলেই মনে হচ্ছে। যে কাজে সাধারণ জনমানুষের কোন উপকার হচ্ছে না। উল্টো সরকার নিজেদের কর্মের কল্যাণেই জনমানুষের নিকট স্বাধীনতার বিরোধী হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। এই যে সরকারের আচার আচরণে স্বাধীনতা বিরোধী মনোভাব ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে, সেখানেই যত সমস্যার সম্মুখীন হবে এই সরকার।
স্পষ্টতই লক্ষ্য করছি এবং সাথে স্পষ্টতই বলছি, এই সরকার যেদিন থেকে স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে নেতিবাচক বচন সহ নেতিবাচক কর্মের দিকে এগুচ্ছে এবং সাথে জামায়াতের উপর বেশি ভর করছে, সেদিন থেকে বহুজনমানুষ সহ রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখছি ধীরে ধীরে সরকারের বিরুদ্ধেই চলে যাচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে নিজের অবস্থানটাও একই পথে যাচ্ছে। এই যে সরকার বিরোধীতায় মতামত যাচ্ছে, এটার জন্য সরকার নিজেদের আয়নার সামনে দাঁড় করালেই উত্তর পেয়ে যাবে, কেন এমনটা হচ্ছে?
কঠিন ও সত্য বাস্তবতা হচ্ছে, এই সরকার নিজেদের এখন অনেকটাই স্বাধীনতা বিরোধী মত ও পথের পথিক হিসেবে জনমানুষের মাঝে বিশ্বাস যুগিয়েছে। ফলাফল এখন এমন যে, সরকার যত বেশি সংস্কারের কাজে হাত লাগাবে, মানুষ ততই সন্দেহের চোখে বেশি দেখবে কেননা বিশ্বাস একটি বড় বিষয় যে। মোদ্দাকথা সরকার নিজেই নিজেদের ইতিমধ্যেই সন্দিহান করে ফেলেছে। এমন অবস্থায় সরকার আগামীতে আর স্বস্তি পাবে না বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। স্পষ্টতই বলছি, সরকারের চুড়ান্ত সময় হয়ে গেছে বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দ্রুত নির্বাচনী সংস্কারের পথে হাঁটা। সেটাই হতে পারে সকলের জন্য সমাধান। নতুবা এই সরকারের তৈরী রিসেটবাটনে চাপ দেবার কথা জনগণ ভেবে বসলে, বেশি গুড়ে যে তেতো, সেটাই প্রমাণ হয়ে যাবে কিন্ত। সরকারের লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন যে,
“Stepdown” শব্দটি দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে কিন্ত।
বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.