শেখ হাসিনার টুকিয়ে আনা কদমবুছি প্রেসিডেন্ট কোন সময়ে যে একটা ঝামেলা বাঁধিয়ে ফেলতে পারে এটা আগে কেন বুঝলেন না! ৫ই আগষ্টই কেন ঠিক করতে পারলেন না এটা বিপ্লব না অভ্যুত্থান! কার সঙ্গে পরামর্শ করে একটা না ঘরকা না ঘাটকা সরকার বানালেন! সংবিধান লঙ্ঘন করে সরকার উৎখাত করে সেই সংবিধানের অধীনেই শপথ! যে সংবিধান বহাল রাখা হলো তাতে আবার তত্বাবধায়ক বা অন্তবর্তী কিছু নাই! শেষে ‘ডক্টরিন অভ নেসেসেটি’ বা ‘উদ্ভূত পরিস্থিতি’।
এত গোঁজামিল দিয়ে যখন শুরু হয়েছে বাকিটা গোজামিল দিয়েই তো শেষ করতে হবে! এই আড়াই মাস পরে এসে সংবিধান বাতিল বা বিপ্লবী সরকারের কথা বললে তো হবে না! এর মধ্যে পানি বেশ খানিকটা গড়িয়েছে। সরকারের দৌড়ও কিছুটা বোঝা হয়ে গেছে। রাজনীতিতে পক্ষ-বিপক্ষ মেরুকরন চলছে। নতুন নতুন অভিমত তৈরী হচ্ছে। এখন দফা ছুড়ে দিয়ে আল্টিমেটাম দিলেই সব হয়ে যাবে!
বন্ধু মতিউর রহমান চৌধুরী নাকি নিছক কৌতুহলের বশে পদত্যাগপত্রের তালাশ করতে গেছিলেন। ভাল কথা। কিন্তু এই সময়ে তার অমন একটা কৌতুহল হলো কেন বা নিউজটা ছেড়েছেন কোন উদ্দেশ্যে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। তার ওই নিউজের জেরেই ছুপ্পু সাহেবের গদী টলায়মান হয়ে পড়ে। তিনি কি বুঝতে পারেন নাই এই নিউজের কি রিপারকেশন হতে পারে! বা জেনে বুঝেই প্রকাশ করেছেন! পাঁচ দশকের ওপর সাংবাদিকতায় যুক্ত মতিউর রহমান চৌধুরী কোন নিউজের কি গুরুত্ব তা বুঝতে পারেন না এটা মনে করা তাকে অসম্মান করার নামান্তর। এই নিউজের জেরেই ছাত্ররা বঙ্গভবন ঘেরাও করে, পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেয়। আবার একটা অস্থিরতা তৈরী হয়।
যাই হোক, মনে হয় আপাতত: ক্রাইসিস কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া গেছে। আমাদের তো সব কিছু নিয়েই হৈ হৈ কান্ড রৈ রৈ ব্যপার! বিএনপির পক্ষ থেকে একটা প্রতিক্রিয়ার পর বিষয়টা থমকে দাঁড়ায়। প্রফেসর ইউনুস বা তার সরকারের পক্ষ থেকে নীরবতা পালন করা হয়। বলা হয় জাতীয় ঐকমত্যের কথা। মুখরক্ষা। সমন্বয়করা তারপরও দৌড়ঝাপ করছেন। কিন্তু প্রধান যে প্রশ্ন: প্রেসিডেন্ট সাহেব পদত্যাগপত্র দেবেনটা কার কাছে! সংবিধান আছে মানলে দেবেন স্পীকারের কাছে। স্পীকার নাই। তাহলে! পদত্যাগপত্র কি উনি হাওয়ায় উড়িয়ে দেবেন! দ্বিতীয়ত: প্রেসিডেন্ট না থাকলে উপদেষ্টা পরিষদও থাকে না। কারন এরা প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা এবং প্রেসিডেন্টকে উপদেশ দেওয়ার জন্যই তার কাছে শপথ নিয়েছেন! যে মূহুর্তে ছুপ্পু সাহেব পদত্যাগ করবেন পরের মূহুর্ত থেকে ইউনুস সরকার নাই! সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে অপসারনের কোন পথ নাই। একমাত্র উপায় তার পদত্যাগ। আর এ কাজ করলে দেশে কোন সরকার থাকবে না। তাহলে কেমনে কি!
নতুন সরকার গঠন করতে হলে সংবিধান বহির্ভূত ব্যবস্থায় যেতে হবে। তার একটা হচ্ছে মার্শাল ল’, দ্বিতীয়টা- বিপ্লবী সরকার। উভয় ক্ষেত্রেই সংবিধান রহিত বা স্থগিত অথবা বাতিল হয়ে যাবে। মার্শাল ল’ খুব সহজ পথ। এর একাধিক অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। জেনারেল ওয়াকার সে পথে যাবেন কিনা সেটা তার ব্যপার। তবে বিপ্লবী সরকার করতে গেলে প্রথমেই যা লাগবে তা হচ্ছে একটা প্রক্লেমেশন। এটা করবে কে বা কারা! করতে পারে জুলাই-আগষ্ট বিপ্লবে অংশগ্রহনকারিদের নিয়ে গঠিত একটা বিপ্লবী পরিষদ বা কমান্ড কাউন্সিল। এই আড়াই মাস পরে এসে কাদেরকে নিয়ে কমান্ড কাউন্সিল হবে! এর মধ্যে অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে নানা মতভেদ তৈরী হয়ে গেছে। এই কাউন্সিলে কারা থাকবে, কোন রাজনৈতিক দল থাকবে কি না, নাকি শুধু ছাত্ররাই বানাবে- সময়ের ব্যবধানে নানা জটীলতা তৈরী হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সমন্বয়কদের দুরত্ব বাড়ছে। এর মধ্যে তারা ঘোষনা করেছে পাঁচ দফা। এর কয়েকটা আমাদের স্বাধীনতার আবেগ অনুভূতির সাথে সাংঘর্ষিক। এ অবস্থায় কয়টা দল সমন্বয়কদের সাথে একমত হবে সে প্রশ্ন তো আছেই।
কাজেই ব্যপারটা যত সহজ মনে করা হচ্ছে ততটা না। বিএনপির কয়েক নেতা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা এ মূহুর্তে ছুপ্পু সাহেবকে বিদায় করে দেয়ার পক্ষে না। তারা রাজনীতি করেন। রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যেমন বোঝেন গুটি চালাচালিও ধরতে পারেন। এমনিতেই সরকার নির্বাচন নিয়ে কোন রা’ আওয়াজ দিচ্ছে না। ফলে কতদিন গদী আঁকড়ে থাকার অভিলাষ বোঝা যাচ্ছে না। এরপর ছুপ্পু সাহেবকে তাড়িয়ে সংবিধানহীনতায় কে কোন খেলা খেলে বা আর্মি অথবা বিপ্লবী, যে সরকারই আসুক- কতদিনের জন্য বসে যাবে, রাজনীতিকমাত্রেই সে আশংকা করতে পারেন। সে সরকার কবে নির্বাচন দেবে, নির্বাচনের আগে কোন কিংস পার্টি বানায় কি না, ইলেকশন ইঞ্জিনীয়ারিং করে পছন্দের দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয় কিনা, এ সব হিসাবকিতাব তো তারা করবেই।
এ অবস্থায় ভ্যাজাল না বাড়িয়ে সবার মতামতের ভিত্তিতে দ্রুত একটা নির্বাচনের পথে যাওয়াই সবার জন্য ভাল হবে। সংষ্কারের শেষ নাই। যতটা পারে এরা করে দিয়ে যাক, বাকিটা নির্বাচিত সরকারের জন্য থাক। সবচেয়ে বড় কথা মৌলিক কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কিত হওয়া ইউনুস সরকারের জন্য উচিত হবে না। সমন্বয়কদেরও এটা বুঝতে হবে।
সাঈদ তারেক , লেখক এবং সাংবাদিক ।

