ইলিশ সহ রাষ্ট্র পরিচালনায় প্যারাডক্স বায়ু

“জলের শ্যাওলা”- Paradox মূলত প্রচলিত চিন্তার বিপরীত চিন্তা। Paradoxical হলো দুটি বিপরীত ঘটনা বা বৈশিষ্ট্য। সহজভাবে বলা যায়, আপাতবিরোধী বা প্রচলিত মতবিরোধী। বর্তমানে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মে বহুবিধ প্রচলিত মতবিরোধ বেশ লক্ষ্যণীয বটে। বহু উদহারণ রয়েছে তবে একটু ইলিশ কিচ্ছায় উদহারণটি দেই।
বাস্তবতা হচ্ছে এই সরকার ক্ষমতায়ন হয়েছে জনমানুষের আত্মায় একপ্রকার ভারত বিরোধীতার ফসলের ক্ষেতে। পূর্বের সরকারের ভারত তোষণনীতির কল্যাণেই জনমানুষের মনে ভারত বিরোধীতার ফলনটি বেশ বাম্পার হয়েছে বিগত ১৬ বছর। এমন ফসলের ক্ষেতে বসে বর্তমান সরকার বাহাদুরের ইচ্ছা থাকুক আর নাইবা থাকুক অথবা বাধ্য বাধ্যতামূলক থাকুক তবুও সরকারকে ভারত বিরোধীতার একটি রূপ দেখাতেই হয়। হোক সেটা ন্যায্যতার কথা বলে অথবা জাতির স্বার্থের কথা বলে। যতই লুকায়ীত হোক, কোন একটি পথে সরকারকে ভাবতেই হয় জনমানুষের প্রাণের শক্তিকে উজ্জীবিত রাখতেই। কেননা জনমানুষের কোন এক সুপ্ত চাওয়া পাওয়ার কল্যাণেই যে এই সরকার।
এই সরকারের যাত্রার সপ্তাহ দুয়েক পরেই সরকারের উপদেষ্টাদের কাছ থেকে স্পষ্ট বচন এলো, আগে দেশের মানুষ খাবে ইলিশ অতঃপর উপ্রী থাকলেই রপ্তানি। আমরা জনমানুষেরা সাবাসী দিতে কার্পণ্য করলাম না। এমনকি ডিজিটালের মাধ্যমে ছড়িয়ে গেল সাবাস সাবাস রব। দেখো দেখো এটাই হলো আসল দেশপ্রেম। এই সরকার পারবে পারবে বলে উল্লসিত হলাম এবং মনে মনে বাসনা এলো সঠিক সরকার পেয়েছি। ভারতের মতন এত্ত বড় দেশকে তোয়াক্কা করে না এই সরকার। কেননা দেখতে হবে না সরকার প্রধান কে? উনি বললেই বিশ্ব ঝাঁপিয়ে পড়বে এই দেশের জন্য। আহ্ কি শান্তি আকাশে- বাতাসে।
তবে সেই সাবাসীতে হঠাৎই Paradox এর প্রচলিত চিন্তার বিপরীত চিন্তা সামনে এসে হাজির। কেননা বাস্তবতা একেবারেই যে ভিন্ন। ইলিশ না হয় বন্ধ করলাম পাঠানো। যদি বিপরীতে ভারত কোন কিছু পাঠানো বন্ধ করে দেয় তখনতো ১৮ কোটি জনতার ৩৬ কোটি চোখে সর্ষের ফুল দেখা দেবে যে। এক পেঁয়াজের ঝাঁঝই আমরা সইতে পারি না। অতঃপর সরকার বাহাদুরের সেই উপদেষ্টা সহ ভিন্ন উপদেষ্টাদেরও দেখলাম ইলিশ রপ্তানির সুফল নিয়ে বয়ান দিচ্ছেন কেননা paradox মাথায় উপস্থিত হলো। অবস্থা এখন এমন যে বিগত ১৬ বছরের সরকার যে পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি করেছিল বর্তমান সরকার তার তিন ভাগের চেয়েও বেশি পরিমাণ ইলিশ দেড় মাসেই রপ্তানির সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করেছে সরকারী ভাবেই।
সাধারণ (common) কথা লিখতে গেলে বহুকিছুই লেখা যায় তবে পড়শীদেশ হিসেবে ভারতকে বাস্তবতার নিরিখেই মূল্যায়ন করতেই হবে কেননা এর বাহিরে যাবার সুযোগ কম। আমাদের দেশের আসল খাবার চাউল। সেই চাউলেই আমরা স্বয়ং সম্পন্ন নই। মোট খাদ্যের অধিকাংশই আসে ভারত থেকে। সেই ভারত বিষয়ে স্রেফ পাবলিকের আবেগি মনোভাবকে প্রশ্রয় দিয়ে এগুতে চাইলে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমাধানতো হবেই না উল্টো হীতে বিপরীত হবেই হবে। কারণ স্মরণে রাখা ভাল যে, আমরা কখনোই স্বয়ং সম্পন্ন জাতি ছিলাম না এবং বর্তমানেও আমরা নির্ভরশীল জাতি। হোক সেটা ভারতের উপর বা ভিন্ন দেশের সাথে। সুতরাং বাস্তবতার নিরিখেই এগুনো উচিত, আবেগে নয় এবং সে পথেই সরকারের পা এগুচ্ছে বটে।
এই সরকার শুরু থেকেই Paradox সমস্যায় জর্জরিত। হতে পারে অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শীতার অভাব। দেশের বর্তমান বড় সমস্যার একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা। সে দিকে সরকারের নজর নেই বললেও ভুল বলা হবে না। দ্রব্যমূল্যের বিষয়েও বেশ খাপছাড়া ভাব। এই আইনশৃঙ্খলা আর দ্রব্যমূল্য প্রাধান্য দেওয়াটাই বর্তমানে মূল বিবেচ্য বিষয় হবার কথা। তবে সেদিকে ভাটার প্রভাব বেশ লক্ষ্যণীয।
তবে সংস্কার সংস্কার বলে মাকড়সার মতন ছয় ঠ্যাংয়ের ছয় কমিশন তৈরী করছে বটে। সেখানেও বেশ ছন্নছাড়া। শুরুতেই সংবিধানের পুনর্লিখনের একটি প্যারাফ্রেজ মেশিন চালু রাখতে বেশ তৎপর এবং কমিশন বদলে হোঁচট। অথচ সাধারণ ভাবনায় হওয়া উচিত বা বেশি গুরুত্ব দিয়ে ছয় কমিশনকে একত্রিত করে নির্বাচন কমিশন সংশোধন ও পূনব্যবস্থার পথে হাঁটাটাই হতো উত্তম ভাবনা এবং সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কেননা সংবিধান পূনর্লিখন নিয়ে বাস্তবিক অর্থেই জনমানুষের কত পার্সেন্টের মাথা ব্যথা রয়েছে ? সেটার একটি জরিপ করলে ফলাফল হবে প্রায় শূণ্য। এটা বিনা জরিপেও বলাই যায়।
জনগণ মূলত কি চায় ? এটা অনুমেয় যে, জনগণ সংবিধান পূনর্লিখনের চেয়েও নিশ্চিত সুষ্ঠ রাজনীতি চায়। চায় হারিয়ে যাওয়া ভোটের অধিকার। চায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য সংস্কার। চায় রাজনৈতিক সুষ্ঠ প্রতিযোগিতা। চায় রাজনৈতিক দল দ্বারাই সুষ্ঠ গণতন্ত্র। উড়ে আসা সরকারের নিকট নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের চর্চা কেউ আশা করে না। কেননা যত কথাই আমরা বলি না কেন, এই সরকার আইনগতও বৈধ সরকার নয় এবং গণতান্ত্রিক’তো অবশ্যই নয়। বলাই বাহুল্য এই সরকার রাষ্ট্রের জনগণের প্রয়োজনের একটি বিশেষ সরকার এবং বিশেষ সরকারের বিশেষ কাজেই মনোনিবেশ করাটাই বাঞ্ছনীয়।
বারবার বলি এবং লিখি। বিশ্ব চলে রাজনীতি দ্বারা এবং রাষ্ট্র ও বিশ্ব পরিচালনার ওটাই সর্বোচ্চ পরীক্ষিত ও সুস্থ ব্যবস্থা। আমাদের দেশে সেই সুস্থ ও সুষ্ঠ রাজনীতির চর্চার অভাব। যে কোন হিসেবেই একটি রাষ্ট্রের সুস্থ- সুষ্ঠ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেবলমাত্র রাজনৈতিক দল ও রাজনীতির দ্বারাই ঘটে। বিশেষ সরকার দ্বারাই কখনোই ওমনটা ঘটে না এবং আমাদের দেশেও সেটা ঘটার কোন সুযোগ নেই। সুতরাং Paradox ভাবনায় অযথাই দ্বিধান্বিত না হয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা ভেবে, একটি সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত
পদ্ধতিতে দ্রুত নির্বাচনের পথে হাঁটলেই রাষ্ট্র ও জাতি সর্বোচ্চ মঙ্গল। মাকড়সার ছয় ঠ্যাং কমিশন হীতে বিপরীত হতে পারে। ছয় ঠ্যাংকে এক ঠ্যাংক করুন সেটা শক্ত ও পোক্ত বেশি হবে এবং কার্যকর হবে বেশি ও গ্রহণযোগ্যতা’ও।
বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.