কিছু উত্তরহীন প্রশ্ন

অল্পবয়সী মা তার শিশুসন্তানকে হারিয়ে সমাধির এপিটাফে লিখেছিলেন, কেন? এই ‘কেন’ শব্দটির মধ্যে তার প্রশ্ন, ক্ষোভ, হতাশা, বেদনা আর অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছিল। বাংলাদেশের গত কয়েক দিনের আন্দোলনে নিহত কিশোর তাওমিদ বা ফারহানের মা যদি এমন প্রশ্ন করেন, কেন? কেন? তাহলে তার কোনো উত্তর কি আছে?

কোনো আন্দোলনে এত মৃত্যু কি বাংলাদেশ দেখেছে কখনো? স্বাধীনতার আগে বা পরে কোনো আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি। সংখ্যাটা এখন পর্যন্ত ২ শতাধিক। মৃত্যুর সংখ্যা এখানেই থামবে নাকি আরও বেশি হবে? এই প্রশ্নের উত্তর, হয়তো আরও বাড়বে। রাস্তায় সেনাবাহিনীর টহল, রাতে কারফিউ, কয়েক দিন মিছিল নেই, কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। কারণ আহত অনেকেই মৃত্যুপথযাত্রী। যারা বেঁচে থাকবে তাদের অনেকের চোখ অন্ধ হয়ে যাবে বা পঙ্গু হয়ে থাকবে। তাদের বাকি জীবন কাটবে একটা যুক্তিসঙ্গত দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে নির্মম হামলার স্মৃতিচারণ করে। এই দুঃখের ভার একান্তই নিজের। কিন্তু কোটা সংস্কারের সুফল পাবে অনেকেই, অনেক দিন। সরকার শেষ পর্যন্ত কারফিউ দিয়ে, সেনাসদস্যদের মাঠে নামিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট, ছররা গুলি, টিয়ার গ্যাস, লাঠিপেটা তো ছিলই। সঙ্গে গণগ্রেপ্তার চলেছে। কিন্তু কী দাঁড়াল? সরকারের এক ধরনের জেদ, গুটিকয় মন্ত্রীর কিছুটা দম্ভ, ছাত্রলীগের আন্দোলনকারীদের ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এবং ন্যক্কারজনক আক্রমণ, পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ, ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ  সবকিছুর শেষে কোটা সংস্কার ঠিকই হলো, কিন্তু অনেক মানুষকে প্রাণ দিতে হলো। এখন শুরু হয়েছে নতুন আক্রমণ। যারা আন্দোলনে ছিল, অভিযোগ রয়েছে তাদের অনেককেই হয়রানি করা হচ্ছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেরই আশঙ্কা, তারা শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারবে কিনা? গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেকেই বাড়িতে অবস্থান করতে পারছে না। কয়েকটি ঘটনার মধ্য দিয়ে বুঝতে অসুবিধা হবে না, শুধু শিক্ষার্থী নয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে আন্দোলন দমন করতে গিয়ে। যে শোকের কোনো সান্ত¡না নেই, আজীবনে শেষ হবে না যে শোক, স্বজনরা বেদনা বহন করবে আমৃত্যু। দুপুরে খাওয়ার পর ছাদে খেলতে গিয়েছিল মেয়েটি। রাস্তায় চলছিল সংঘর্ষ। বাবা ছাদে গিয়ে মেয়েকে কোলে নিতেই একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় মাথায়। হাসপাতালে অস্ত্রোপচার, আইসিইউতে নেওয়ার পর সবাইকে কাঁদিয়ে মেয়েটি চলে যায় বাবা-মাকে ছেড়ে। সাড়ে ৬ বছর বয়সী মেয়েটির নাম রিয়া গোপ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিয়ার মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে, ‘গানশট ইনজুরি’।

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে নিহত সাইমনের লাশ দাফন হয়েছে সন্দ্বীপে তার নিজ বাড়িতে। তার মা রহিমা বেগমের বুকফাটা আর্তনাদ বেদনাহত করেছে সবাইকে। সন্দ্বীপের হারামিয়া ইউনিয়নে সাইমনদের জরাজীর্ণ ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল মা রহিমার বিলাপের শব্দ। অতিদরিদ্র রহিমার পুরনো টিনের চাল থেকে পানি পড়া রোধ করতে ঢেকে রাখা হয়েছে ত্রিপল দিয়ে। সেটা দেখিয়ে রহিমা বেগম বলছিলেন, এই ত্রিপল কিনতে সাইমন ৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছিল মাস দেড়েক আগে। অফিস থেকে কল পেয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ১৯ জুলাই (শুক্রবার) সকালে ঢাকার উত্তর বাড্ডার গুপীপাড়ার বাসা থেকে গুলশান ২-এ কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন আবদুল গণি (৪৫)। শাহজাদপুর বাঁশতলা এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে তার মাথার ডান পাশে গুলি লেগে বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তিনি গুলশান ২-এর একটি আবাসিক হোটেলের কারিগরি বিভাগে কাজ করতেন। আবদুল গণির স্ত্রী লাকি আক্তার ২ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমার স্বামী তো রাজনীতি করেন না, তাহলে কেন তাকে মারা হলো?’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রংপুরের সাঈদের মৃত্যুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই (মঙ্গলবার) ৬, ১৮ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ৪১, ১৯ জুলাই ৮৪, ২০ জুলাই ৩৮, ২১ জুলাই ২১, ২২ জুলাই ৫, ২৩ জুলাই ৩, ২৪ জুলাই ৪, ২৫ জুলাই ২ জনের মৃত্যু হয়। উল্লেখ্য, ২২ জুলাইয়ের পর থেকে চিকিৎসাধীন আহতরা মৃত্যুবরণ করেছে। এই আন্দোলনে ৩ জন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ১১১৭ জন আহত হয়েছেন। ফলে সংঘর্ষের ব্যাপকতা বুঝতে অসুবিধা হয় না। আন্দোলন দমনে যে শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে তাতে শত শত মৃত্যু ও হাজার হাজার মানুষ আহত হওয়ার খবর যেমন উদ্বেগজনক, অন্যদিকে সহিংসতা ও নাশকতার মাত্রাও উদ্বেগজনক। এসব কারা করছে, তা তদন্ত করে বের করতে হবে। কিন্তু  সরকারি দল তদন্তের আগেই স্বভাবতই বিরোধী রাজনৈতিক দলকে দায়ী করছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষও রাজনৈতিক দলের ভাষায় কথা বলছেন। এতে  সঠিক তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। দেশ জুড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে  পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় চোখে আঘাত পেয়েছেন অসংখ্য মানুষ। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ জুলাই (বুধবার) থেকে গত ২৩ জুলাই (মঙ্গলবার) পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়েছেন ৪২৯ জন। তাদের মধ্যে ভর্তি করা হয়েছে ৩২৩ জনকে। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে ২৯১ জনের। আর পঙ্গু হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৭ জুলাইয়ের পর পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন ১ হাজার ৬৯৩ রোগী। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ রোগী ২৪১। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ২১৪ গুলিবিদ্ধ রোগী গিয়েছিল ১৯ থেকে ২১ জুলাইয়ের মধ্যে। পাশাপাশি আরও একটা বিষয় লক্ষণীয়। যেসব প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়েছে, যেমন বন ভবন ও ইন্টারনেট ডেটা সেন্টার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিআরটিএ ও বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন, মেট্রো স্টেশন এগুলো সবই স্পর্শকাতর স্থাপনা। আন্দোলনে সহিংসতা যোগ হওয়ার কয়েক দিন পর এসব স্থাপনায় হামলা এবং আগুন দেওয়া হয়েছে। এগুলো সবই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বিশেষ করে বিটিভি ভবন ও ডেটা সেন্টার রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ (কেপিআই) ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সেখানে তা ছিল কি? স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মহাখালী, যেখানে ১৯ জুলাই আগুন দেওয়া হয়েছিল। রাস্তার আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ব্যবহার (?) করা হলেও এগুলো রক্ষায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে কত মামলা হয়েছে এবং কতজনকে আসামি করা হয়েছে তা এখনো পুরোপুরি জানা না গেলেও, রাজধানীর শাহবাগ থানায় ১১টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া যেখানেই আন্দোলনের তীব্রতা ছিল সেখানেই মামলা হয়েছে। প্রায় ৮০ হাজারের মতো অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে এসব মামলা। প্রশ্ন হলো, কোটা সংস্কারের মতো নির্দোষ আন্দোলন, যেখানে একটা নির্দিষ্ট দাবি ছিল, সেই দাবিকে কেন্দ্র করে এত বড় একটা ঘটনা কেন এবং কীভাবে ঘটল? শুধু দোষারোপের খেলা বা বিরোধীদের ষড়যন্ত্র খোঁজার পুরনো পথে হাঁটলে প্রকৃত বিষয় আড়ালে থেকে যাবে। এ দেশে এমন কোনো আন্দোলন কি হয়েছে, যেখানে বিরোধী দলকে দোষারোপ করা বা তাদের ঘাড়ে দোষ চাপানো হয়নি? প্রথম থেকে ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছে, কোনো রকম সহিংসতায় জড়ায়নি। ছাত্রদের ওপর যখন বাইরে থেকে আক্রমণ এলো, তখন তাদের প্রতিবাদটাও আর অহিংস থাকেনি। আন্দোলনকে দমন করার জন্য সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন, যুবসংগঠনকে ব্যবহার করা হয়েছে। ছাত্রদের নিয়ে উপহাস, ব্যঙ্গ ও কটূক্তি করা হয়েছে, যা ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ছাত্রদের এই ক্ষোভের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের বেদনা ও অপমান। গেস্টরুমের অত্যাচার, সিট বণ্টনের নৈরাজ্য, ছাত্রলীগের মিছিলে-মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য চাপ, না গেলে নানা ধরনের অত্যাচার এসব ক্ষোভ ছাত্রদের মধ্যে ছিল। সরকার কেন এই দমন-নিপীড়নের পথে গেল? এটা পরিষ্কার যে, কর্র্তৃত্ববাদী এই সরকার শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে কি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয় না? সেখানে সবসময়ই শক্তিপ্রয়োগের বদলে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার পথকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। তাহলে কী করণীয় এখন? আন্দোলনকারীদের আস্থা অর্জন করতে হলে পুলিশের গুলিতে রংপুরের আবু সাঈদের মৃত্যু এবং আন্দোলনের সমন্বয়কারীদের কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যে অত্যাচার করা হয়েছে, তার তদন্ত করে বিচার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া, আবাসিক হলগুলোয় প্রশাসনিকভাবে সিট বরাদ্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দখলদারি বন্ধ করা ও ছাত্র সংসদ চালু, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা সব মামলা প্রত্যাহার, শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক, আইনি বা প্রশাসনিক হয়রানি না করার নিশ্চয়তাসহ আনুষঙ্গিক দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। প্রজ্ঞাপনে একটা দুর্বলতা থেকে গেছে, সেটা হলো নারীদের কোটা নেই। সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন থাকবে, রাজনৈতিক দলে থাকবে আর তাদের কর্মজীবনে কোটা থাকবে না, এটা তো হতে পারে না। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য কতটা কোটা থাকবে, সেটাও আলোচনা করা দরকার। একটা চাপা ক্ষোভ দিনের পর দিন পুঞ্জীভূত হয়েছিল অনেক কারণেই। বেকারত্ব, চাকরি পেতে নানা ধরনের দুর্নীতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন দলের দমন-পীড়ন, মূল্যস্ফীতি, দুর্নীতি, গরিবে-ধনীতে বৈষম্য, জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যাওয়া থেকে শুরু করে ভোট দিতে না পারা ও পুলিশ এবং প্রশাসনের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার ফলে ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করতে না পারা সব ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে বিক্ষোভে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে এই আন্দোলনে সমর্থন ছিল প্রায় সব স্তরের মানুষের। অন্যায় দেখে মানুষ চুপ করে থাকে, দীর্ঘদিন সহ্য করে। তার অর্থ এই নয় যে, তারা সব কিছু মেনে নেন। শাসকরা মানুষের এই মনোভাব বুঝতে চায় না। তাই বিক্ষোভের প্রকাশ ঘটে সীমাহীনভাবে। এবারের ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া গেলেও, প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া হবে কি?

লেখক :    রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.