প্রতি বছর ঈদের আগে পত্রিকায় প্রধান খবর থাকে কত বড় গরু কত লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে আর পরের খবর হলো চামড়ার দাম না পেয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে মানুষ। এ বছর ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৮টি পশু কোরবানি হয়েছে বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ দপ্তর জানিয়েছে। কোরবানি হওয়া পশুর মধ্যে ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫৯টি গরু। ১ লাখ ১২ হাজার ৯১৮টি মহিষ। ৫০ লাখ ৫৬ হাজার ৭১৯টি ছাগল এবং ৪ লাখ ৭১ হাজার ১৪৯টি ভেড়া। এর বাইরে উট, দুম্বাসহ ১ হাজার ২৭৩টি অন্যান্য পশু রয়েছে। এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি। ধারণা করা হয়, দেশে প্রান্তিক কৃষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে ১৫ লাখ ছোট-বড় খামার আছে। যার মধ্যে ১২ লাখ হলেন প্রান্তিক কৃষক। সব মিলে এই খামার অর্থনীতিতে প্রায় ১ কোটি লোক যুক্ত। দেশে সারা বছরে ১ কোটি ২০ লাখ গরুর চাহিদা আছে। তার মধ্যে ৫০ লাখের মতো ঈদের সময় জবাই করা হয়। সব মিলে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে কোরবানির জন্য গবাদি পশুকেন্দ্রিক। অর্থনীতির নানা দিক অন্তর্ভুক্ত করলে দেখা যাবে, কোরবানির ঈদের অর্থনীতির আকার ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ৭৫ হাজার কোটি টাকা তো ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের পুরনো হিসাব। শুধু গবাদি পশুর দাম নয়, এর সঙ্গে আরও অনেক বিষয় যুক্ত আছে। মসলার বাজার আছে, কসাইদের আয় আছে, পশুখাদ্যের ব্যবসা আছে। আর কম হলেও এই ঈদেও মানুষ নতুন পোশাক, জুতা ও সাংসারিক ব্যবহার্য জিনিস কেনে। ফ্রিজ বিক্রিও বাড়ে। অন্যদিকে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকের কাছে কোরবানির পশু যেন ফিক্সড ডিপোজিট। তারা ৬ থেকে ৮ মাস ধরে গরু লালন-পালন করে কোরবানির বাজারে বিক্রির উপযুক্ত করে। খাদ্যের দাম, গরু কেনার দাম আর নিজের শ্রমের দাম বাদ দিয়ে তারা একটু ভালো আয় করার স্বপ্ন দেখে। যা তার সংসার আর গ্রামীণ অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। গ্রামীণ নারীরা এতে উৎসাহিত হচ্ছেন আর যত্ন নিয়ে পালন করায় পশুর মান ভালো হচ্ছে। পুঁজিবাদের কাছে ঈদ ত্যাগ নয়, অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি। কোরবানির ঈদের বিশেষত্ব হলো শিল্পপণ্য, খাদ্যসামগ্রী, রেমিট্যান্স প্রবাহ, কৃষকের গবাদি পশু বিক্রি, চামড়ার সরবরাহ মিলে এই উৎসব গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনে। আমাদের চামড়া শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে প্রায় ৫০ ভাগ চামড়াই এই ঈদের সময় সংগ্রহ করা হয়। ক্রেতারা ভালো গরু কিনতে চান, খামারিরা যত্ন নিয়ে পশুকে বড় করে, ফলে মানসম্পন্ন চামড়ার বিপুল সরবরাহ এ সময় ঘটে। গত বছর ৮৫ লাখ চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছিল কোরবানির ঈদে। বিলিয়ন ডলার রপ্তানি পণ্যের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বছরে ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের মতো আয় হয়। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে গরুর কোনো অংশই ফেলনা নয়। এখন গরুর ফেলে দেওয়া নাড়িভুঁড়িসহ বিভিন্ন অংশও বিদেশে রপ্তানি হয়। প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করে এই খাত অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির নতুন খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কোরবানির ঈদের আগে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে গেছে।
ঈদের আগে জুন মাসের প্রথম ১২ দিনেই ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে ১৪৬ কোটি ডলার। আর গত মে মাসে এসেছে ২২৫ কোটি ডলার, যা ছিল গত ৪৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই ডলার সংকটের কালে রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার শক্তিশালী করে তাই নয়, গ্রামীণ জনপদে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে খানিকটা। এই হার অব্যাহত থাকলে জুন মাসে রেমিট্যান্স আসবে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। ১ বছরে আইএমএফ যা ঋণ দেবে ঈদের সময় এক মাসেই তার চেয়ে বেশি ডলার পাঠাবেন দেশের প্রবাসীরা। কোরবানির সময় মাংস রান্নার কাজে ব্যবহৃত মসলা বাবদ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। মসলার দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার ঘটনা তো নিত্যবছরের। এ উপলক্ষে হাজার কোটি টাকার মসলা অবৈধভাবে বাংলাদেশে আসে। ঈদ উপলক্ষে প্রায় ১ কোটি মানুষ শহর থেকে গ্রামে যায়, ফলে পরিবহন ব্যবস্থায় বা ব্যবসায় ব্যাপক কর্মতৎপরতা বেড়ে যায়। বাস ট্রেন লঞ্চ থেকে শুরু করে রিকশা চলাচলেও এর প্রভাবে পড়ে এবং অর্থনীতিতে গতি বাড়ে। কিন্তু দায়হীন সড়ক ব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের দুর্ভোগ কমে না। কোরবানির পশু বিক্রির পর আসে চামড়া বিক্রির জটিলতা। এ বছর লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত বছরের চেয়ে এবারের দাম ছিল বর্গফুটে ৫ টাকা বেশি। অন্যদিকে খাসি ২০ থেকে ২৫ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু গরুর চামড়া ৭০০- ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। খাসির চামড়া বিক্রি হয়েছে ১০ টাকায়। একটা ব্যাপার অদ্ভুত। চামড়ার দাম এত কম হলেও দেশের বাজারে চামড়া পণ্য জুতা, ব্যাগ বা বেল্টের দাম কিন্তু কম নয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব আর আবহাওয়ার কারণে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের সমস্যা হয়ে থাকে আর এবার ঈদ গরমের সময় হয়েছে। ফলে দ্রুত কীভাবে চামড়া সংরক্ষণ করা যায় সেটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপকরণ লবণ। প্রতিটি গরু, মহিষের জন্য ১০ কেজি এবং ছাগল, ভেড়ার জন্য ৫ কেজি করে লবণ প্রয়োজন হয়। গত বছরের চেয়ে এ বছর ২ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন বেশি লবণ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু ঈদের আগে চট্টগ্রামে ১৫ দিনের ব্যবধানে লবণের মণপ্রতি দাম বেড়েছে দেড়শ থেকে দুইশ টাকা পর্যন্ত, বিক্রি হয়েছে ৯৮০ থেকে ১০২০ টাকায়। গত ১৫ থেকে ২০ দিন আগেও লবণের দাম ছিল ৮শ থেকে ৮৭০ টাকা মণ। ঈদের দিন অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকে এই অজুহাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে লবণের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে সরকারি তথ্য বলছে, লবণের মজুদ যথেষ্ট রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও লবণ পাওয়া যাচ্ছে না, লবণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এমন কথা বলার সুযোগ কি থাকে? কারণ দীর্ঘ খরার কারণে বিগত ৬৩ বছরের ইতিহাসে এ বছর সর্বোচ্চ ২৪ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে। তারপরও লবণ নিয়ে কারসাজি চলেছে। রপ্তানি আয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত দেশের চামড়া শিল্পের ব্যবসার আকার প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার। এর প্রায় অর্ধেকই আসে বিদেশের বাজার থেকে। অথচ দেশের রপ্তানি ঘুরপাক খাচ্ছে এক বিলিয়ন ডলারের ঘরে। কারণ আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজি সনদের অভাবসহ নানা কারণে ধুঁকছে এই শিল্প। এর দায় নেবে কে? রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ১৪ শতাংশ কমে শূন্য দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। যেখানে বৈশ্বিক বাজার এখন ৪৬৮ বিলিয়ন ডলারের। চামড়ার মান ভালো, সরবরাহ প্রচুর তবুও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জায়গা এত কম কেন? চামড়া শিল্প সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন, কমপ্লায়েন্সের অভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্য এখন দাম পাচ্ছে না। কারণ মানহীন পণ্যের চাহিদা থাকে না। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ বা এলডব্লিউজি সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য কারখানা কমপ্লায়েন্ট কিনা, কারখানা পরিবেশবান্ধব কিনা, শ্রমিকদের সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স যথাযথভাবে পালন করা হয় কিনা, আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করা হয় কিনা, এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যার বহুমাত্রিকতা তো বোঝা গেল কিন্তু সমাধানের দায়িত্ব কে নেবে? চামড়া শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছে, এ জন্য ট্যানারি মালিকদের দায় যেমন আছে, সরকারের নজরদারির অবহেলা এবং দায়িত্ব পালনের দুর্বলতাও কম নয়। দেশে তামাক বোর্ড, চা বোর্ড আছে। কিন্তু চামড়া খাতে বর্তমানে যে রপ্তানি এবং দেশীয় চাহিদা তা এসবের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় অথচ একটি চামড়া বোর্ড স্থাপিত হয়নি। বিশ্বজুড়ে চামড়াজাত পণ্যের বিশাল বাজারের ৩০ শতাংশ আছে চীনের দখলে, এরপর আছে ভিয়েতনাম, ভারত, ইতালি ও ফ্রান্স। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ১ শতাংশের ৪ ভাগের ১ ভাগও নয়। অথচ বিশ্বের মোট গবাদিপশুর প্রায় ২ শতাংশ লালন-পালন করা হয় বাংলাদেশে। অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ-এলডব্লিউজি সনদ থেকে স্বীকৃতি পাচ্ছে না ট্যানারি শিল্প। দেশে প্রায় ২০০টির বেশি ট্যানারি থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠান এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। কিন্তু শিল্পনগরীর কোনো প্রতিষ্ঠান ট্যানারি শিল্পের মানসনদ প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ থেকে স্বীকৃতি পাচ্ছে না। একমাত্র এলডব্লিউজি ছাড়া চামড়া কিনছে চীন। ফলে সস্তায় চামড়া কেনার এই সুযোগটা তারা নিচ্ছে। সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি কার্যকর না হওয়ায় দূষণের শিকার হচ্ছে ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, কালিগঙ্গা, বালু, তুরাগ। এ ছাড়াও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে গাফিলতি। আন্তর্জাতিক মান তো দূরের কথা, সাধারণ ব্যবস্থাপনাও গড়ে তোলা হয়নি এতদিনেও। ঈদ সবার জীবনে আনন্দ আনুক, এ কথা বলেছেন সবাই। কিন্তু প্রান্তিক খামারি, মধ্যবিত্ত ক্রেতা, চামড়া বিক্রেতা, চামড়া শিল্পের শ্রমিক আর দূষণের শিকার নদী ও পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই সংকট। ঈদের অর্থনীতি টাকার অঙ্কে গতি বাড়ায় কিন্তু দুর্ভোগ কমায় না কেন? স্বল্প মজুরির শ্রমিক, স্বল্প দামের চামড়া পাওয়া সত্ত্বেও সম্ভাবনাগুলো কেন অধরা?
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
rratan.spb@gmail.com

