রেলের ভাড়া এবং মেট্রোরেলে ভ্যাট

বাংলাদেশ সম্ভবত একমাত্র দেশ যে দেশে সরকারিভাবে দাম বাড়ে না, ভাড়া বাড়ে না। এখানে হয় মূল্য সমন্বয় আর ভর্তুকি প্রত্যাহার। কিন্তু ওই যে আমরা জেনেছি, গোলাপকে যে নামেই ডাকো না কেন সে গোলাপ। তেমনি সরকার যাই বলুক না কেন, আম জনতা দেখছে দাম বাড়ছে, ভাড়া বাড়ছে। এবার তারা তা প্রত্যক্ষ করবে, রেল এবং মেট্রোর ভাড়ার ক্ষেত্রে। রেলের ভাড়া বাড়ছে ৪ মে থেকে আর মেট্রোর বাড়বে জুলাই থেকে।

রেলের ক্ষেত্রে তো বটেই, সারা বিশ্বেই সব ধরনের পরিবহনে বেশি দূরত্বের ভ্রমণে উৎসাহী করতে ছাড় দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও রেলে ১৯৯২ সাল থেকেই বেশি দূরত্বের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু পথে ভাড়া ছাড় দেওয়া হতো। ২০১২ সালে রেলের ভাড়া গড়ে ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়। ২০১৬ সালে আরেক দফা সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভাড়া বাড়ানো হয়। তবে বেশি দূরত্বে ভ্রমণের রেয়াত বহাল ছিল। রেলে প্রতি কিলোমিটারে ভিত্তি ভাড়া ৩৯ পয়সা। এর সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) ও অন্যান্য উচ্চ শ্রেণির বিভিন্ন হারে ভাড়া, ভ্যাট যোগ করে মোট ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এখন থেকে ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে বাড়তি ভাড়া যোগ হবে। এর ফলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, শোভন শ্রেণির ভাড়া বাড়বে ৬০ টাকা। এসি স্নিগ্ধা শ্রেণির ভাড়া ১২১ টাকা আর এসি (বার্থ) ভাড়া বাড়বে ২১৬ টাকা। ঢাকা কুড়িগ্রাম শোভন চেয়ারে ভাড়া  ১৩৫ টাকা বেড়ে ৬৪৫ টাকা, এসি চেয়ারে ২৬৫ টাকা বেড়ে হবে ১২৩৭ টাকা। এমন করে সব রুটেই ভাড়া বাড়বে এবং বাস আর ট্রেনের ভাড়া প্রায় সমান হয়ে যাবে।

পরিবহন হিসেবে ঢাকা মহানগরের মানুষের আগ্রহ ও পছন্দের তালিকায় এখন মেট্রোরেল। যানজটের ঢাকা, গণপরিবহন হিসেবে ট্রেন না থাকা এবং লক্কড়ঝক্কড় বাসের বিপরীতে মেট্রোরেল কিছু মানুষের কাছে একটি স্বস্তির বাহন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যে কারণে ভাড়া বেশি হলেও মানুষ মেনে নিচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, মেট্রোকে বিলাসী পরিবহন হিসেবে দেখিয়ে (যেহেতু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত) এর ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে যে, মেট্রো কি তাহলে গণপরিবহন হিসেবে থাকছে না, বাণিজ্যিক পরিবহনে পরিণত হতে যাচ্ছে?

১৮২৪ সালে রেল চালু করার পর পৃথিবীর প্রথম মেট্রোরেল চালু হয়েছিল লন্ডনে, ১৮৬৩ সালের ১০ জানুয়ারি। বাষ্পীয় ইঞ্জিনচালিত মেট্রোরেল ব্যাপক ধোঁয়া তৈরি করলেও সে সময়ে তা জনপ্রিয় হয়েছিল। এরপর মেট্রোরেলে বিদ্যুৎ যোগ হয় ১৮৯০ সালে এবং ধোঁয়াবিহীন ও গতিময় মেট্রো লন্ডন নগরবাসীর কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। পৃথিবীর ৬২টি দেশের ১০৬টি শহরে মেট্রোরেল চালু আছে, সর্বশেষ হিসাবে বাংলাদেশের পর নাইজেরিয়াতে ২০২৩ সালে মেট্রোরেল চালু হয়। সময়ের হিসেবে লন্ডনে মেট্রোরেল চালুর ১৫৯ বছর ১১ মাস ১৮ দিন পর গত ২৮ ডিসেম্বর ঢাকায় চালু হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল। শুরুতে ঢাকা মেট্রোরেল চলেছে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত। এখন চলছে মতিঝিল পর্যন্ত। ২০২৫ সালে উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত চলবে। মেট্রোর মাধ্যমে ঢাকার এক অংশের মানুষের চলাচলে একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্য শুধু ঢাকাবাসী নয়, সারা দেশের জনগণকেই আর্থিক দায় নিতে হচ্ছে। এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই গণপরিবহন নির্মাণে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্মাণ ব্যয় হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত লাইন সম্প্রসারণের জন্য আরও ব্যয় হবে ১১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা, মোট ৩২ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প এটি। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি জাইকা থেকে ৭৫.৪৫ শতাংশ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে ঢাকায় যখন মেট্রোরেলের কাজ শুরু হয়, তখন খোঁড়াখুঁড়ি করার ফলে রাস্তা সরু হয়ে যায়। বর্ষায় কাদাপানি ও জলজট, শীতে ধুলাবালি আর সারা বছর যানজট পাঁচটি বছর মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ ছিল না। সেই ভোগান্তির শেষ হয়েছে মেট্রোরেল উদ্বোধনের মাধ্যমে। এখনো মানুষ মেট্রোরেলে চড়তে, দেখতে স্টেশনগুলোতে ভিড় করছে। মানুষের যাত্রা স্বস্তিদায়ক হচ্ছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আশঙ্কাও জন্ম নিচ্ছে মেট্রো কি আর্থিকভাবে সহজ পরিবহন থাকছে না?

মেট্রোরেল গণমানুষের গণপরিবহন না হয়ে সচ্ছলদের পরিবহন হয়ে উঠছে কি না এই প্রশ্নের কারণ এর ভাড়া। মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। এর মানে হলো, মিরপুর-১০ নম্বর সেকশন থেকে উঠে কাজীপাড়ায় নামলে কিংবা সচিবালয় স্টেশনে উঠে শাহবাগে নামলে একজন যাত্রীকে ২০ টাকা দিতে হয়। অথচ বাসে এই দূরত্ব ১০ টাকা দিয়েই যাওয়া যায়। আর উত্তরা থেকে কমলাপুর যেতে ভাড়া লাগে ১০০ টাকা। বাসের ক্ষেত্রে যা ৫০ টাকা। মেট্রোরেলের প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ টাকা। ঢাকায় বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪৫ পয়সা। মেট্রোরেলে তিন ফুটের কম উচ্চতার শিশুদের ক্ষেত্রে ভাড়া নেওয়া হবে না। সাধারণত তিন বছর বয়স হলেই শিশুর উচ্চতা তিন ফুট হয়, ফলে তাদের ভাড়া দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য মেট্রোরেলে ছাড় নেই। বাসে শিক্ষার্থীরা অর্ধেক ভাড়া দিয়েই চলাচল করে। ঢাকায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর আগে (২ ডিসেম্বর, ২০২১) সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বাস মালিকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে হাফ ভাড়ার সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করুন।’ এক বছর পর মেট্রোরেল উদ্বোধনের আগে সংবাদ সম্মেলনে সড়কমন্ত্রী বলেন, মেট্রোরেলে কোনো হাফ ভাড়া নেই। বাস মালিকদের উদ্দেশে যে সংবেদনশীলতার কথা তিনি বলেছিলেন, সরকারি মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে তা দেখা গেল না। মিরপুরের পল্লবী থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী যদি মেট্রোরেলে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চান, তাহলে তার ভাড়া দিতে হবে ৬০ টাকা। আসা-যাওয়ায় ১২০ টাকা। মাসে তার ব্যয় হবে ৩ হাজার টাকার বেশি। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও অনেক বেশি ব্যয় হবে।

উল্লেখ্য, বাসে অর্ধেক ভাড়ার বিষয়টি চালু হয় স্বাধীনতার আগে। ১৯৬৯ সালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ যে ঐতিহাসিক ১১ দফা দাবি ঘোষণা করেছিল, তার অন্যতম দাবি ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়া চালু করা। মেট্রোরেলের ভাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মেট্রোর চেয়ে বেশি। যেমন কলকাতা মেট্রো রেলওয়ের উত্তর-দক্ষিণ করিডরের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ রুপি (৬ টাকা ২ পয়সা)। এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে দুই কিলোমিটার যাওয়া যায়। আবার ২০ কিলোমিটারের বেশি যেতে ২৫ রুপি (৩১ টাকা) লাগে। পূর্ব-পশ্চিম করিডরের ক্ষেত্রেও সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ রুপি। সর্বোচ্চ ভাড়া ৩০ রুপি (৩৭ টাকা), যা দিয়ে ভ্রমণ করা যায় ১০ থেকে সাড়ে ১৬ কিলোমিটার। তাহলে দেখা যাচ্ছে, মেট্রোরেলে কলকাতার তুলনায় তিন গুণ ভাড়া বাংলাদেশে।

পাকিস্তানের লাহোরে ২০২০ সালে চালু হয়েছে মেট্রোরেল (অরেঞ্জ লাইন), যার দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার। অরেঞ্জ লাইনে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ৪০ রুপি (১৮ টাকা)। সম্প্রতি দূরত্বভিত্তিক ভাড়া ঠিক করেছে প্রাদেশিক সরকার। এখন সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ রুপি (৯ টাকা), সর্বোচ্চ ৪০ রুপি (১৮ টাকা)। অর্থাৎ লাহোরের মানুষ ১৮ টাকা দিয়ে ২৭ কিলোমিটার পথে ভ্রমণ করতে পারে। দিল্লির মেট্রোরেলের ভাড়া বেশ কম। প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ১০ রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ টাকার সমান। আর ২১ থেকে ৩২ কিলোমিটার ভ্রমণে ভাড়া ৫০ রুপি (৬২ টাকা)।

মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় মেট্রোরেলের ভাড়া  বাংলাদেশের চেয়ে কম। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় সরকারি গণপরিবহন ব্যবস্থার সমন্বিত ভাড়া কার্যকর আছে। এর মধ্যে মেট্রোরেল ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে সর্বনিম্ন ভাড়া আড়াই হাজার রুপিয়া, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৬ টাকার মতো। আর কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২৫০ রুপিয়া (১ টাকা ৬৪ পয়সা)। জাকার্তার মেট্রোরেলে প্রবীণ, শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধীদের ভাড়ায় ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়। কুয়ালালামপুরে ৫০ রিঙ্গিত ব্যয় করে পুরো মাস শহরজুড়ে চলা গণপরিবহন ব্যবহার করা যায়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ হাজার ১৬৩ টাকা। এই গণপরিবহনের মধ্যে মেট্রোরেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ও বড় স্টেশনের সঙ্গে সংযোগকারী (ফিডার) বাস সেবা রয়েছে। ফলে মাসে বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ হাজার ২০০ টাকার কম ব্যয়ে সারা মাস শহর জুড়ে চলাচল করা যায়। মেট্রোরেল এমন একটি গণপরিবহন, যেটি কখনো যানজটে পড়বে না, গরমে আরামদায়ক, দ্রুতগতির, নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছার নিশ্চয়তা আছে। রাজধানীর একাংশের জনগণ তাই খুশি। এই আপাত খুশিকে ব্যবসার হাতিয়ার বানিয়ে গণপরিবহনের চরিত্র ধ্বংস করে তাকে বাণিজ্যিক পরিবহন বানানোর চেষ্টা খুবই নিন্দনীয়।

ঢাকায় যারা গাড়িতে চড়েন, একা সিএনজিতে চড়েন, তাদের জন্য মেট্রোরেল সাশ্রয়ী। কিন্তু তারা রাজধানীর কত শতাংশ এবং কেমন আয়ের মানুষ? জাইকার এক সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজধানীর মানুষের ৬৭ শতাংশই বাস ও মিনিবাসে চলাচল করেন। দেখা যায়, বাসে বাড়তি ভাড়া নিয়ে ঝগড়া, মারামারি হয়। কারণ, দুই টাকা, পাঁচ টাকাও তাদের কাছে অনেক কিছু। তাদের কাছে মেট্রোরেল বিলাসিতা। যদিও মেট্রোর জন্য ঋণের দায় তারাও বহন করবেন। ভ্যাট আরোপ হলে ভাড়া বাড়বে ফলে মেট্রো তাদের বাহন হবে না।  রেলের লোকসান নাকি বছরে দুই হাজার কোটি টাকা। রেয়াত বাতিল করে বছরে ৩০০ কোটি টাকা বাড়তি আয় হবে। মেট্রোরেলে প্রতিদিন নাকি লোকসান দেড় কোটি টাকা। ভ্যাট আরোপ করে আয় বাড়বে বছরে ৭৯ কোটি টাকা। ফলে এই ভাড়া বৃদ্ধি করে জনগণের কাঁধে বোঝা চাপালেও  তো লাভ হবে না, যদি লোকসানের কারণ বন্ধ করা না যায়।

রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.