বিদ্যুত’তো নয় এ যেন বিজলী

‘জলের শ্যাওলা” আকাশ যখন মেঘলা থাকে, মেঘগুলো এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে। ফলাফল এত ছোটাছুটির কারণে মেঘে মেঘে ঘর্ষণ এবং মেঘলা অন্ধকার আকাশ চমকিয়ে উঠে। মানে তড়িৎ বা বিদ্যুত উৎপাদন হয়। মেঘগুলোর ধ্বনাত্বক আধান আর পৃথিবীর ধ্বনাত্বক আধান হওয়া বিজলীগুলো খুব দ্রুতই মাটিতে ফিরে আসে, বলাই বাহুল্য বিদ্যুতগতিতেই। ঘর্ষণের কারণে বিকট শব্দ যা আমরা ঠাটা বলি। ঠাটায় মৃত্যুর সংখ্যা দেশে প্রতিনিয়তই উপরমুখী। মূলত ওই বিজলী থেকেই মৃত্যু হয়।

বিজলীতে মৃত্যুর কথা বলছি কারণ সরকারের একপ্রকার ধ্বনাত্বক আধান আছে (উপমাস্বরূপ বলছি/ আছে বটে) আবার জনমানুষেরও একপ্রকার ঋণাত্বক অর্থে ধ্বনাত্বক আধান আছে। ঘর্ষণতো লাগবেই এবং জনমানুষের মাঝে অর্থনৈতিক যে বিজলীর ঝলক লাগবে, সেটাই জনগণের ঋণাত্বক আধানের রূপ লাভ করবে। ফলাফল হবে জনগণ মূলত এক চক্রবৃদ্ধির চক্রে পড়ে যাবে। সহজ হিসেব, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবেতো সব কিছুর দাম বৃদ্ধি পাবে। এটা আর আলাদা হিসেব কষার প্রয়োজন নেই, নিশ্চয়ই।

প্রয়োজনে যে কোন কিছুর দাম বৃদ্ধি হতেই পারে। সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না। তবে সরকার থেকে যে সমন্বয়ের কথা বলা হচ্ছে, সেখানেই যত ফাঁকফোকর আর বাঁধাবিপত্তি। সমন্বয়ের সাধারণ বাংলা অভিধান অর্থ সামঞ্জস্য রাখা। প্রশ্নটি ঠিক সেখানেই সামঞ্জস্যটা কিসের ভিত্তিতে ?

একটু দেখা প্রয়োজন সরকারের বিদ্যুতবিভাগ সামঞ্জস্যতা নিয়ে কি বয়ান দিয়েছে ? বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রথম কারণ বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। প্রশ্ন হলো যে সময়ে মূল্যবৃদ্ধি করা হলো, ঠিক এই সময়ে বিশ্ববাজারের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি চলছে কি ?

আসুন দেখি, রয়টার্স নিউজ কি বলছে ? গত সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে তেলের দাম কমেছে। গত সপ্তাহে তেলের দাম ২ থেকে ৩ শতাংশ কমেছিল, আজ আবার দাম কমার মধ্য দিয়ে চলতি সপ্তাহটাও শুরু হলো তার জের দিয়ে।আজ সকালে এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৪ সেন্ট কমে ৮১ দশমিক ২৮ ডলারে নেমে এসেছে; অন্যদিকে ইউএস টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৩৩ সেন্ট কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৬ দশমিক ১৬ ডলারে নেমে এসেছে- খবর রয়টার্স।

বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ রয়টার্সের খবরের পরেরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিদ্যুত বিক্রি করা হয়। ঘাটতি মেটাতে দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। আগামী তিন বছর ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করা হবে। প্রতিমন্ত্রী একে মূল্যবৃদ্ধি বলতে নারাজ। তিনি বলেন, খরচের চেয়ে বেশি দাম নিলে মূল্যবৃদ্ধি বলা যেত। এখন ঘাটতি অনেক, তাই দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে তা খুবই কম পরিমাণে। তিনি উদহারণস্বরূপ উল্লেখ করেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঙ্গরাজ্যর কথা। সেখানে প্রতিদিন দাম সমন্বয় করা হয়। তবে কিসের ভিত্তিতে করা হয় ? কতটা বাড়ে বা কতটা কমে ? সেটা অবশ্য উল্লেখ করেননি (মন্ত্রীর বচনের ভিডিও প্রমাণ আছে)।
এখানেও প্রশ্ন থেকেই যায়, যতবার দাম সমন্বয় করা হয়েছে এবং করা হচ্ছে, প্রতিবারই একই বচন চর্বিত চর্বণ করা হয়েছে বললে খুব বেশি ভুল বলা হবে না, নিশ্চয়ই।

এখানে আরও একটু উল্লেখ করা প্রয়োজন পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন কি বলেছেন ? সেই পুরান কাসুন্দি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। ১৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছিল, সেখানে মাত্র বাড়ানো হয়েছে ৫ শতাংশ। আর এটা গ্রাহকদের অনুকূলে গেছে।

লক্ষ্য করুন, ১৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠবেই কারা করেছিল ? বাংলার মুখের ভাষায় যদি বলি, ” আমি আর মামু” তাহলেতো আর কথাই থাকে না। আরও প্রশ্ন উঠে, বিইআরটিসিকে সরাসরি পাশ কিটিয়ে কেন নির্বাহী আদেশে দাম বৃদ্ধি করা প্রয়োজন হলো ? আরও লক্ষ্যণীয় যে, সরকার কিন্ত বেশ দয়াময় কেননা যেখানে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির কথা সেখানে করেছে মাত্র ৫ শতাংশ। এতো দেখি সেই বায়োষ্কপ, ” কি সুন্দর দেখা গেল অতঃপর চলিয়া গেল” একেবারে মন্দ নয়।

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পূর্বে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সাথে বাহাস করেই দাম বৃদ্ধির কথা তবে বিইআরসির সাথে তেমন কোন বাহাসের কথা শুনেছেন কি ? বা পত্র পত্রিকায় দেখেছেন কি ? আমার নজরে আসেনি।কেউ দেখে থাকলে প্রকাশ করতে পারেন। তবে ওটা সম্ভব হবে না কারণ এবারও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে সরাসরি বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে। সরাসরি নির্বাহী আদেশে দাম ঠিক করার বিষয়ে নানা কথা ওঠছে তবে সেগুলোর কোন তোয়াক্কা বিদ্যুত বিভাগ করেনি। উল্টো বিদ্যুৎ বিভাগের স্পষ্ট বক্তব্য বলেছে, “গ্রাহকের স্বার্থ বিবেচনা করেই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে” তবে কি স্বার্থ? সেটা বুঝা বড়ই মুশকিল বটে।

যেহেতু ইউরোপে বসবাস করি, এখানে আপন অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতেই পারি এবং সেটাই বলি। আমার বসবাসের দেশ থেকে রাশিয়া- ইউক্রেন যত দূরত্ব তার চেয়ে বাংলাদেশের দূরত্ব বহু বহুগুণ বেশি। মজার বিষয় হলো, যুদ্ধ শুরু থেকে আজ অবধি (একান্তই অল্প কিছুটা সময় বাদে) এই যুদ্ধের ডামাডোল ইউরোপবাসী কিছুই দেখতে পায়নি যতটা আমাদের দেশ দেখতে পায়। এমনকি পেঁয়াজ আসে ভারত থেকে তবে যত দোষ নন্দঘোষের মতন রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধ দোষী কেননা সেই একই কাসুন্দি, জ্বালানি। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতেই হয়, করোনা সময়কালে ইউরোপ ভুগছে বটে তবে রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধে মোটেও নয়। এখানে আরও বলা প্রয়োজন যে, ইউরোপের প্রায় সব দেশই রাশিয়ার জ্বালানির উপর অনেকখানি নির্ভরশীল কিন্ত।

এবারের দাম বৃদ্ধির পেছনে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি করা ব্যয়বহুল তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ব্যবহার বাড়া, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও ডলারের বিপরীতে টাকা অবমূল্যায়নকে কারণ হিসেবে তুলে ধরছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন কি শুধুমাত্র আমদানির উপর নির্ভরশীল বা রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধের উপর ? এমন প্রশ্নের উত্তর নেই। জ্বালানি মন্ত্রী আরও বলেন, বিদ্যুতখাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়। এমনকি মূল্যবৃদ্ধির পরও বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে দিতে হবে বড় অঙ্কের ভর্তুকি। প্রশ্ন থেকেই যায় বিদ্যুতের এত ঘণ ঘণ দাম বৃদ্ধির পরেও কেন বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয় ? তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, এই ভর্তুকি যায় কোথায় ? তাহলে কি সরিষাতেই ভুত ?

আচ্ছা একটু ভাবুনতো, আমরা এত খারাপ অবস্থায় আসলাম কেন? সেই বিবেচনাটি সরকার বাহাদুর কখনো করেন কি ? সহজভাবে বলা যায় আমাদের খারাপ অবস্থায় মূল কারণ, আমরা নিজেদের অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর করে ফেলছি বলেই। নিজেদের গ্যাস ঠিকমতো আহরণ করিনি এবং গ্যাস কোথায় বেশি আর কোথায় কম ব্যবহার করা প্রয়োজন বা জরুরী, সেই বিষয়গুলো মূলত কখনোই সঠিকভাবে ঠিক করা হয়নি।

এখানে আবার বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী ছোট্ট একটি বয়ান তুলে আনতে হয়। প্রতিমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, সরকারের পরিকল্পনায় এখন প্রতি মাসেই গ্যাস- বিদ্যুৎসহ জ্বালানি পণ্যের দাম সমন্বয় করা হবে। সে লক্ষ্যে চূড়ান্ত হচ্ছে নীতিমালাও। সমন্বয় হবে এটাতো ভাল কথা এবং যুক্তিযুক্তও বটে। তবে সেই সমন্বয় যদি কেবল মূল্যবৃদ্ধিতে থাকে তাহলেতো জনগণের নাভিশ্বাস উঠবে যে। কেননা সমন্বয়ের নামে আজ অবধি একটি পয়সা দাম কমেছে, সেটার কোন উদহারণ আছে কি ? নাকি, সরকারের সমন্বয় মানেই মূল্যবৃদ্ধি ?

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বারবার বলছেন, সামান্য যে ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির বৃদ্ধি পেয়েছে (লক্ষ্যকরুন শব্দটি/ সামান্য), সেটা নাকি নগণ্য এবং এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। সরকার বলে কথা, আশ্বস্ত না হয়ে কি আর উপায় আছে ? ভালতো বেশ ভালো। জনগণের দ্বারা (!) নির্বাচিত সরকার, ভরসা জনগণ নিশ্চয়ই রাখে। তবে আইএমএফ/ বিশ্বব্যাংক বা দাতা সংস্থাগুলোর এই মূল্যবৃদ্ধির পিছনে কতটা হাত আছে বা কি উপসর্গ আছে, আমদের মতন আম জনতার সেগুলো জানার কোন সুযোগই যে নেই। সুতারাং সরকার যে মাথায় হাত বুলাচ্ছে, প্রভাব পড়বে না বলে, সেটা এখন একমাত্র ভরসা। তবে একটি কথা বলেই হয়, বাজার সার্কেলের বৃত্ত এই বিদ্যুতেই ঘুরে কিন্ত

লেখার শুরুতেই লিখেছিলাম, এ তো বিদ্যুত নয়, এ যেন ঠাটার বিজলী। ঠাটার বিজলী কিন্ত মৃত্যুকুপ। সরকার সমন্বয়ের নামে জনগণকে বারবার সেই মৃত্যকুপেই ঠেলে দিচ্ছে নাতো ? কেননা জনগণের বাজারের থলি বর্তমানে ভরে বাসায় ফিরে না কিন্ত।

 

 

বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.