বাঙ্গালী সংষ্কৃতিতে হোটেল রেস্তোরায় খাওয়ার চলটা খুব বেশীদিনের না। ছোটবেলা মফস্বল শহরে কাটিয়েছি। তখনও দেখেছি হোটেল রেস্তোরায় খাওয়াকে খুব একটা ভাল চোখে দেখা হতো না। শহরে খাওয়ার হোটেল ছিল হাতেগোনা দুইএকটা। যাদের বাসাবাড়ী ছিল তাদের সেখানে গিয়ে ভাত খাওয়ার প্রশ্নই আসতো না। একে মনে করা হতো খুবই অসম্মানের কাজ। নেহায়েত ঠেকায় না পড়লে কেউ এসব জায়গায় গিয়ে খেতো না। তাও গোপনে, কেউ যেন দেখে না ফেলে! মূলত: আগন্তুক, ব্যবসা বা বিভিন্ন কাজে যারা সাময়িক সময়ের জন্য শহরে আসতেন, চাকুরে ইন্স্যুরেন্সের এজেন্ট বা পাটের দালাল ফড়িয়া কিসিমের লোক- শহরে যাদের কোন আত্মীয়স্বজন বা নিকট বন্ধু থাকতো না তারাই বোর্ডিং নামের এক ধরনের ঘরে থাকতেন, রান্নাবান্নার আয়োজন না থাকলে এরাই হোটেলে গিয়ে খাওয়ার কাজ সাড়তেন। এদেরকে দেখা হতো অনেকটা করুনার চোখে। আহারে কেমন হতভাগা বেচারা, খাওয়ার ব্যবস্থা নাই! বড় রাস্তার মোড়গুলোয় একদুইটা করে চায়ের দোকান দেখা যেতো। এসব জায়গায় প্রধানত: কিছু লোক আড্ডা দিতো। রাজনীতির লোক কলেজ পড়ুয়া বা ষন্ডা মাস্তান টাইপের যুবকরাই মূলত: ছিল চায়ের দোকানের খদ্দের। সাধারন মানুষ এদেরকে এড়িয়ে চলতো।
এককালে পদযাত্রী আগন্তুক বা মুসাফিরদের জন্য সড়াইখানা অতিথিশালা বা মুসাফিরখানা নামে এক ধরনের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সম্রাট বাদশা বা নগরপতিদের সৌজন্যে এসব আশ্রয়স্থলে আগতদেরকে বিনামূল্যে অতিথিসেবা দেওয়া হতো। নবাবী আমল পর্যন্ত এই ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন ছিল। ইংরেজরা আসার পর ইউরোপীয়ান স্টাইলে হোটেল রেস্টুরেন্টের চল শুরু হয়। পাকিস্তান আমলের গোড়ার দিকে শুধুমাত্র শহরগুলোয় দুইএকটা করে হোটেল রেস্তোরার অস্তিত্ব দেখা যেতো। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে মেহমানদারীর সেই সনাতনী প্রথাই অব্যাহত থাকে। অতিথি অভ্যাগতদের জন্য অবস্থাপন্নদের বাড়ীর বৈঠকখানা প্রায় অবারিতই থাকতো। অতিথি মুসাফির বা অভ্যাগতরা কারও বাড়ীর বৈঠকখানায় বিনা খরচে থাকা এবং খাওয়ার সুবিধা পেতেন। অতিথি আপ্যায়ন সমাজে বেশ গৌরবজনক কাজ বলে বিবেচিত হতো। গ্রামের হাট বাজারগুলোয় খাওয়ার দোকানের মধ্যে বড়জোর ময়রার দোকান থাকতো। এতে দধি মাঠা ঘোল ঘি মিষ্টান্ন বিক্রি হতো। কেউ পানি খেতে চাইলে খাওয়ানোর জন্য মানুষ অস্থির হয়ে উঠতো। পানি বিক্রি বা পানি খাইয়ে পয়সা নেওয়া গর্হিত কাজ বলে বিবেচিত হতো। অবশ্য পানি খাইয়ে তখন কেউ কোন টাকা পয়সা চাইতোও না।
স্বাধীনতার পর থেকে মূলত: সাড়া দেশে হোটেল রেস্তোরার আধিক্য বেড়ে চলে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের চলাফেরা বেড়ে যাওয়া, নগরজীবনে আসক্তি, ব্যস্ততা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, আত্মকেন্দ্রিক সমাজজীবন, পারিবারিক বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে যাওয়া- ইত্যাদী নানা কারনে মানুষ বাহিরমুখী হয়ে পড়তে থাকে। ঘাট অঘাট হয়ে যাওয়া, অজাত-কুজাতের জাতে ওঠা, ফকিন্নির পুত রাতারাতি রাজপুত বনে যাওয়া, নষ্ট রাজনীতির সুবাদে এবং অবাধ লুন্ঠনযজ্ঞের বদৌলতে রাতারাতি আঙুল ফুলে তালগাছ বনেযাওয়া হঠাৎ ভদ্দরলোকরা ওয়েস্টার্ণ কালচার প্রাকটিস শুরু করেন। সেই কালীপ্রসন্ন সিংহের কথায় অনেকটা ‘ওরা কমোডে হাগেন কাগজে পোদ পোছেনের’ মত। বাসাবাড়ীতে রান্নাবান্নার পাট চুকে যেতে থাকে। গড়ে উঠতে থাকে পার্টি কালচার। কিছু একটা অকেশন এলেই পার্টি, রিসেপশন, ট্রিট, অনুষ্ঠান। টাকা ওড়ানোর একটা বড় মাধ্যম হয়ে ওঠে বিলাশবহুল হোটেল এবং রেস্তোরা। সেই সাথে আদেখলেপনা। এমনিতেই হুজুগে বাঙাল বলে বাঙ্গালীদের একটা সুখ্যাতি আছে। হালে এর নাম হয়েছে ট্রেন্ড। কোন একটা কিছুর নাম ফাটলে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়া এক শ্রেণীর মানুষের খাইছলত। ক্যাটারিং সার্ভিসে এক সময় ফখরুদ্দিন বাবুর্চির নাম ফাটলো, মানুষ সব হুমড়ি খেয়ে পড়লো। তার পর হাজীর বিরিয়ানি। সে অমৃত না খেলে জীবন বৃথা। হঠাৎ একবার শোনা গেল মামার বিরিয়ানি। এলো নান্না। হুজুগের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন কাচ্চি ভাই!
নগর জীবনে হোটেল রেস্তোরা থাকবে। নানা কাজে মানুষ বাইরে থেকে শহরে আসে। তাদেরকে আবাসিক হোটেলে থাকতে হয়, রেস্টুরেন্টে খেতে হয়। এ ছাড়া ভাসমান জনগোষ্ঠী যাদের চালচুলো নাই তাদেরকেও আহার বাসস্থানের জন্য এই হোটেল রেস্তোরার ওপরই নির্ভর করতে হয়। দিনে যারা কাজে থাকেন তাদের অনেককে দুপুরের খাবার রেস্টুরেন্টে সেড়ে নিতে হয়। এগুলো হচ্ছে প্রয়োজন। কিন্তু বাসাবাড়ীতে রান্নাবাড়া বন্ধ করে দিয়ে, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে পার্টি ট্রিট রুচীবদল টেস্ট করে দেখা বা বড়লোকি দেখাতে দামী রেস্টুরেন্টে গিয়ে টাকা ঢালা এক শ্রেণীর মানুষের কালচারে পরিনত হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। এদের জন্যই রাজধানী শহর তো বটেই সারা দেশে এমন কি গ্রামগঞ্জেও ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে নানা নামের নানা কিছিমের বাহারি সব রেস্টুরেন্ট। ঢাকায় এমন কোন আবাসিক এলাকা পাড়া মহল্লা নাই যেখানে এগুলো পাওয়া যাবে না। ধানমন্ডি এলাকার জিগাতলার মোড় থেকে মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে কম করে হলেও অর্দ্ধ শতাধিক রেস্টুরেন্ট ফাস্ট ফুডের দোকান আছে। সবগুলোই এক্সপেন্সিভ। অথচ ভীড় সব সময় লেগেই আছে। সন্ধ্যার পর অনেক রেস্টুরেন্টে জায়গা পাওয়াই ভার। মনে হবে সব হাভাতে!
এদেরই রসনা বিলাসের যোগান দিতে কোনরূপ নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এক শ্রেণীর লোভী ব্যবসায়ী যত্রতত্র হোটেল রেস্টুরেন্ট খুলে বসেছে। সহযোগী সরকারের লোকজন। নিয়মিত প্যাকেট পায়। আর এদের এই অর্থলিপ্সার বলি হয় কিছু হতভাগা মানুষ। বেইলি রোডের কাচ্চি ভাই আপাতত: যার সর্বশেষ নজীর।
কি পাপ যে করেছিলো বাঙালী!
সাঈদ তারেক , লেখক, সাংবাদিক ।

