বেইলি রোডে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পুড়ে যাওয়া মানুষ, স্বজনদের হাহাকার ও আহতদের আর্তনাদে স্তম্ভিত দেশের মানুষ। ছয়তলা ভবনের পুড়ে যাওয়া কাঠামো দেখে প্রশ্ন জাগে, এই উচ্চমধ্যবিত্ত অভিজাত এলাকায় এমন একটি ভবনে এত খাবার, পোশাকের দোকান কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে এত দুর্বল, তা এত মৃত্যুর বিনিময়ে বুঝতে হলো? এর আগে বড় কয়েকটি অগ্নিকান্ড যেমন ২০১০ সালে নিমতলীতে ১২৪ জন, তাজরীন অগ্নিকা-ে ২০১২ সালে ১১২ জন, চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ২০১৯ সালে ৭১ জনের মৃত্যু কি অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করেনি কর্র্তৃপক্ষকে? জীবন হারিয়ে হাহাকার করেই কি বারবার স্বজনরা জীবনের মূল্য খুঁজতে থাকবে? দায় নেবে না কেউ? ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, বেইলি রোডের যে ভবনে আগুন লেগেছিল তার নিচতলায় দুটি ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বিক্রির দোকান ও একটি জুসবার (ফলের রস বিক্রির দোকান) ছিল। দ্বিতীয় তলায় ‘কাচ্চি ভাই’ নামের একটি রেস্তোরাঁ, তৃতীয় তলায় ‘ইলিয়ন’ নামের একটি পোশাকের ব্র্যান্ডের দোকান, চতুর্থ তলায় ‘খানাস’ ও ‘ফুকো’ নামের দুটি রেস্তোরাঁ, পঞ্চম তলায় ‘পিৎজা ইন’ নামের একটি রেস্তোরাঁ, ষষ্ঠ তলায় ‘জেস্টি’ ও ‘স্ট্রিট ওভেন’ নামের দুটি রেস্তোরাঁ এবং ছাদের একাংশে ‘অ্যামবেশিয়া’ নামের একটি রেস্তোরাঁ ছিল। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানান, ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তা ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে ভবন কর্র্তৃপক্ষকে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, নোটিস দেওয়ার পর ভবন মালিক যেমন ত্রুটি সংশোধন করেনি, কর্র্তৃপক্ষও তেমনি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। লিফট ছিল দুটি কিন্তু সিঁড়ি ছিল একটি। আগুন লাগার পর বিদ্যুৎ চলে যায়, লিফট বন্ধ হয়ে যায়, মানুষের দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। কী নিদারুণ অবহেলা আর অসহায় মৃত্যু!
অন্যদিকে জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে এবং অতীতের মতোই সেই ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। ২৯ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই নতুন দাম কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। অর্থাৎ ঘোষণার আগেই মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হয়ে গেছে। তার ঘোষণা অনুযায়ী, বিদ্যুতের দাম পাইকারিতে বাড়বে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ পাইকারির প্রতি ইউনিটের গড় দাম ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বেড়ে হবে ৭ টাকা ০৪ পয়সা। আর খুচরা পর্যায়ে দামে বাড়ানো হবে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এর ফলে খুচরা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ৮ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। মাসের শেষে গ্রাহকের ওপর কি বোঝা আর সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর কতখানি চাপ পড়বে, তা নিয়ে আলোচনা হলে তাতে কিছু আসে যায় না। সরকার দাম বাড়াবেই। আধুনিকতা এবং উন্নয়নের সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কোন দেশ কত উন্নত তা বোঝার অন্যতম মাপকাঠি সে দেশের জনগণের মাথাপিছু বিদ্যুতের ব্যবহার। আজকের বিশ্ব পরিপূর্ণভাবে বিদ্যুৎনির্ভর। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার, বিদ্যুতের আবিষ্কার, কম্পিউটারের আবিষ্কার পরবর্তী সময় এখন যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কথা বলা হচ্ছে সেখানে বিদ্যুৎ হলো প্রধান নিয়ামক শক্তি। এই বিদ্যুৎ কি কয়লা, গ্যাস, তেলসহ জীবাশ্ম জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি নাকি পানি, সৌর, বাতাসের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্বারা উৎপাদিত হবে তা নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক থাকলেও বিদ্যুৎ যে প্রয়োজন তা নিয়ে বিতর্ক নেই।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্য নিয়ে সরকারি মহলে আত্মতৃপ্তি আছে। সরকারি হিসাবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ২৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন কিন্তু অনেক কম। যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ অর্থাৎ গ্রীষ্মে উৎপাদন করা হয় ১৩ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট আর শীতে সেটা নেমে আসে ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াটে। এ যাবৎকালে দিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে গত বছরের ১৯ এপ্রিল, সেদিন উৎপাদন হয়েছিল ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট। যেসব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ব্যবহার করার ধরনটা বিবেচনা করলে দেখা যায়, মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪২ শতাংশ গ্যাস, ২৪ শতাংশ ফার্নেস তেল ও ১৭ শতাংশ কয়লাভিত্তিক। বাকি যে পরিমাণ বিদ্যুৎ তার মধ্যে আমদানি করা বিদ্যুৎ ১১ শতাংশ এবং ডিজেল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩ শতাংশ করে। এই যে প্রয়োজনের দ্বিগুণ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তার ফলাফল কী? দেখা যাচ্ছে সারা বছরই বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অলস থাকে। কিন্তু বসে থাকলেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে চুক্তি অনুযায়ী বিপুল অঙ্কের কেন্দ্র ভাড়া দিতে হয়, যা ক্যাপাসিটি চার্জ নামে পরিচিত। বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশ্লেষণ বলছে, গত বছর সক্ষমতার ৪১ শতাংশ অলস ছিল। এদিকে গত অর্থবছরে ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ দিতে হয়েছে। যা তার আগের বছরে ছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরেই ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র বলছে, ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে এখন ১ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে জ্বালানি খরচ গড়ে ১৭ টাকা। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ দাঁড়ায় চার টাকার আশপাশে। কয়লা ব্যবহার করলে ব্যয় দাঁড়ায় ছয় টাকার মতো। এই হিসাব জানা সত্ত্বেও বেশি ব্যয় করে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট বিদ্যুতের ২৩ শতাংশ উৎপাদন করা হয়েছে তেল ব্যবহার করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ২৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৫২ পয়সায়। একটা হিসাব করে দেখা যাচ্ছে যে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন যদি ১০ শতাংশ কমিয়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তাহলে বছরে সাশ্রয় হতে পারে অন্তত ৯ হাজার কোটি টাকা। আর দাম বাড়িয়ে সরকার আয় বাড়াবে ৬ হাজার কোটি টাকা। জনগণের কথা ভাবলে কোনটা হবে যৌক্তিক পদক্ষেপ?
বিশেষজ্ঞদের কথা না হয় বাদ দেওয়া যাক। স্বয়ং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, চাহিদা মতো গ্যাস পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে। আমদানি করে গ্যাস দিলেও খরচ অনেক কমবে। তিনি আরও বলেছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও খরচ অনেক কমেছে। কিন্তু গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। তার এই বক্তব্য শুনে কেউ কি জানতে চাইতে পারে যে, কেন বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না? তিনি কি উত্তর দিতে বাধ্য? অথবা সমাধানের পথ জানা থাকলেও সে পথে তারা না হাঁটার কারণে যে ব্যয় বৃদ্ধি হলো, রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হলো, জনগণকে বিদ্যুতের জন্য বর্ধিত মূল্য দিতে হলো তার দায় কে নেবে? অন্যদিকে সাধারণ জনগণ সময়মতো বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলেও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ বকেয়া। এই বকেয়া রেখেছে কারা? গ্যাস ও কয়লা কিনতে গিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে যেসব দেনা সেগুলোও পরিশোধ করতে পারছে না সরকার, সে কারণেই গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোদমে চালানো যাচ্ছে না। তাই প্রতিমন্ত্রীর যুক্তি দিয়েছেন, বাধ্য হয়েই তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হচ্ছে। ভর্তুকি বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থ এবং আমদানির জন্য মার্কিন ডলার পাওয়া গেলে গ্যাস ও কয়লা আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যাবে। এই কথায় বোঝা গেল, বিদ্যুতে ভর্তুকির যে কথা বলা হয়েছে সেই টাকাও বিদ্যুৎ খাতে দেওয়া হয়নি। এ এক অদ্ভুত যুক্তির গোলকধাঁধা। ভর্তুকি দিতে হয় বলে সরকারের ওপর চাপ পড়ে, চাপ কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় কিন্তু আবার যে টাকা ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ থাকে, সেটা পরিশোধ করা হয় না। আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার পাওয়া যাচ্ছে না, এর জন্য দায়ী কারা? উত্তর জানা থাকলেও দায় নেবে কে?
কয়লা কেনা গেল না, গ্যাস কেনা গেল না ডলারের অভাবে। সমাধান হিসেবে জ্বালানি তেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। কিন্তু সহজ প্রশ্ন তো যে কেউ করতেই পারেন, জ্বালানি তেল আমদানি করতে কি ডলার লাগে না? তাহলে সেই ডলার দিয়ে গ্যাস ও কয়লা আমদানি করা যায়নি কেন? কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এম শামসুল আলম বলেছেন, ‘২০২২ সালে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে গণশুনানিতে আমরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলাম, বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) যে দামে ফার্নেস তেল আমদানি করে, তার চেয়ে প্রতি লিটারে ১৮ টাকা বেশি দর দেখিয়ে বিল নেয় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। এতে বাড়তি ব্যয় আট হাজার কোটি টাকা। এই ব্যয়ের কারণেই ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো হয়।’ উৎপাদন ব্যয় বাড়ে বাড়ুক, দাম তো দেবে জনগণ। বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়বে কৃষি, শিল্পসহ পারিবারিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে। সরকার কমাবে ভর্তুকি, বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা বাড়াবে মুনাফা আর জনগণের বাড়বে ব্যয়ের বোঝা। জনগণ সব ক্ষমতার উৎস এই আপ্তবাক্য এখন রূপান্তরিত হয়েছে, জনগণ বইবে সব অপকর্মের বোঝা, এই কথায়। ফলে ব্যবসায়ীদের মুনাফার উৎস হয়েছে জনগণ। শাসকদের লুটপাট, দুর্নীতি ও ভুলনীতির সব দায় কি শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধেই চাপবে? ত্রুটিপূর্ণ ভবন নির্মাণ, অগ্নি সুরক্ষার অভাব এগুলো দেখার প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও জবাবদিহিতা কবে প্রতিষ্ঠিত হবে?আগুনে পুড়ে যাওয়া ৪৬ জন মানুষ, মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা আরও ২৫ জন মানুষসহ আহত ৭৫ জন মানুষ, ভস্মীভূত ভবনের ব্যবসায়ী আর চার ঘণ্টা নরক যন্ত্রণা ভোগ করা শত শত মানুষ কি কেবল সংখ্যা? কদিন পর বেইলি রোডের ঘটনা ভুলে নতুন মর্মান্তিক মৃত্যু দেখার অপেক্ষা?
লেখক:রাজেকুজ্জামান রতন, রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
rratan.spb@gmail.com

