কি শোনার কথা কি শুনছি/ কি দেখার কথা কি দেখছি- হায়দার হোসেনের এই গানের কলি দুটো বাংলাদেশের জন্য মনে হয় চিরন্তন বাস্তবিক গান। হায়দার হোসেন গানটি গেয়েছিলেন স্বাধীনতার বিষয়ে আজ থেকেও ১৬ বছর আগে সেই ২০০৭ সালে অথচ আজও ১৬ বছর পরে বাস্তবিক। কতটাই চমৎকার, তাই না ?
লক্ষ্য করে থাকবেন, যে দিকেই তাকাবেন কেমন জানি শূণ্যতায় ভরপুর। চলছে চলুক। কোন ব্যাপারই নয়। চারিদিকে যা হচ্ছে, যা ঘটচ্ছে, সবই যেন নিয়তি। কারো কিছু যায় আসে না। কারো কোন দায়িত্ব নেই। হোক সেটা রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি, শিক্ষানীতি কিংবা যে কোন বিষয়। সর্বত্রই একপ্রকার অবহেলা আর হালছাড়া ভাব। সব নষ্টে যাক, আমার কি। ভাবখানা এমন নিজের চলছেতো, সুতরাং
কারোপ্রতি কারো সম্মান নেই, নেই বিবেকের বাঁধা। ভুয়া ভুয়া শব্দে আকাশ কাঁপছে অথচ নিজে কি? তার নেই হিসেব। অপরকে অপমান- অপদস্থ করাটাই যেন বর্তমানে প্রতিযোগিতার বাজার। যেদিকে তাকাবেন সেদিকেই এমনটা চলছে। খেলার মাঠে যাবেন, নিজ দেশের গর্বিত খেলোয়াড়দের ভুয়া ভুয়া বলে চিৎকার চেচামেচি হচ্ছে। তাদের অর্জনের কোন মূল্য নেই। বইমেলায় ঘটে গেলো কত ভুয়া শব্দের আকাশ ছোঁয়া ধ্বনি। নাম ধরে বলবো না কেননা লজ্জাস্কর বিষয় এড়িয়ে যাওয়াই মঙ্গলজনক।
একটু পান থেকে চুন খসলেই হল, তুই ভুয়া আমি/ আমরাই সঠিক। শুধুকি খেলার মাঠে বা বইমেলায় এমনটা হচ্ছে, মোটেও না। শান্তির নামে ধর্মের বয়ানেও চলছে একে অপরের প্রতি তেড়েফেড়ে মাযহাবের পর মাযহাবের সৃষ্টি। ও কাফের তো সে মুর্তাদ, অমুকে নাস্তিক তো তমুকে শয়তান। লক্ষ্য করে থাকবেন, ধর্মের বহু বাতায়নের এক বাতায়ন তাবলিক জামাত।
সেই কবে থেকে শান্তিপূর্ণ দ্বিতীয় হজ্জ নামের এজতেমা হয়ে আসছিল দীর্ঘদিন যাবৎ। না, সেটাও আর শান্তিতে নেই। মাওলানা শাদ আর মাওলানা জুবায়ের দুইভাগে বিভক্ত হয়ে শান্তিপূর্ণ এজতেমাকেও দুইভাগে ভাগ করে ফেলেছে। এইতো গতবছর এই দুইভাগের মাঝে মারামারি কাটাকাটিতে একজন খুন হলো। তাও আবার এজতেমার মাঠেই প্রস্তুতির কাজের সময়। এ বছর খুন না হলেও, তুমুল মারামারি কাটাকাটিতে সমাপ্ত হয়েছে।
তথাকথিত শান্তির এজতেমা এখন দুইভাগে হয়। এতে কার লাভ হলো? কি লাভ হলো? কেউ জানে না। সাধারণত ধর্মপ্রাণ মুমিনেরা দল মত বা মাযহাব নির্বিশেষে সবাই এজতেমায় অংশগ্রহণ করতো অথচ এখন সেই এজতেমাও রক্তলালে রঞ্জিত। আরও লক্ষ্যণীয়, এদের সবার ধর্ম এক, ধর্মের আদর্শ এক, লক্ষ্য- উদ্দেশ্য এক, এবাদত এক, এমনকি আসমানি কিতাব কোরআনও এক। শুধুমাত্র এক নয় নগ্ন ও জঞ্জাল মানসিকতা। এই যে আমি এগুলো লিখছি, হয়তো কেউ এসে আমাকেই ভুয়া বলে গালাগাল করতে কার্পণ্য করবে না। সমাজ বা রাষ্ট্রটাই যেন এখন ভুয়ার আস্তানা।
কোথায় তাকাবেন ? রাজনীতির দিকে তাকান, সব খামখেয়ালি আর নষ্টের বাজার। নির্বাচনের নামে ১৪/ ১৮/ ২৪ এ ভোট হয়ে গেল অথচ ভোটারদের মুখের বাণী শুনুন কান পেতে, কি শুনতে পান ? সেই একই আফসোস, চলছেতো চলছেই। থামবার কোন প্রক্রিয়াই নেই। সব যেন পথহারা। সরকার তার সত্য(!) বয়ানে অটুট। রাজপথের বিরোধী দলও তাদের সত্য(!) প্রচারে অটুট অথচ সংবিধানের মূল স্পিরিট ভোট/ নির্বাচন নিয়ে কি বলে ? সাধারণ জনগনের ভূমিকা সংবিধান অনুযায়ী ভোট/ নির্বাচনে কি হবার কথা? সব উহ্যই থেকে যাচ্ছে, তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায়। তাতে কি যায় আসে ? চলছেতো সব, চলছে।
দেশ ধনী হচ্ছে, কিছু মানুষ ধনী হচ্ছে, কিছু মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে, কিছু মানুষ মধ্যবিত্তের নামে মান হারাচ্ছে, মাথাপিছু আয়ের হিসেব চলছে, উন্নয়ন হচ্ছে, বড় বড়, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে, হাইওয়ে হচ্ছে, ব্রিজ হচ্ছে, মেট্রোরেল হচ্ছে, নদীভেদ করে সুরঙ্গপথ হচ্ছে, রাজপথে প্রাইভেটকার বৃদ্ধি পাচ্ছে অথচ রাজপথের ভীড় যে গোয়ালে ছিল, সেই গোয়ালেই আছে। ফুটপাথ দিনকে দিন দখলে যাচ্ছে, মানুষ তাদের স্বাভাবিক চলাফেরায় বিকলঙ্গ হচ্ছে, তাতে কি ? চলছেতো সব, চলছে।
বায়ুদূষণ বেড়েই চলছে, শব্দদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে, নদী- খাল সব হজম হচ্ছে, সবুজ সব ধ্বংস হচ্ছে, প্রকৃতি বিলিন হচ্ছে, ইট- পাথরের দালান- কোঠা যত্রতত্র হচ্ছে, সৌন্দর্যের নামে সব নষ্ট হচ্ছে, মানুষজনের চরিত্রের সৌন্দর্য হারিয়ে কৃত্রিমতা বা মেকী, অসত্য, মাত্রা ছাড়িয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে, সবাই যেন দূষণের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেদের দূষণে নেমেছে, তাতে কি ? চলছেতো সব, চলছে।
কেমিক্যালের ছড়াছড়ি, ভাল- মন্দের বাছবিচার নেই, স্বাস্থ্য ঝুকিতে, সেদিকে নজর নেই, হাসপাতালে চিকিৎসা নেই, ডাক্তারে বিশ্বাস নেই, নিজ দেশ ছেড়ে সব ভারতে চিকিৎসায় ছুটছে, তাতে স্বাস্থ্যখাতের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, দেশের টাকা চিকিৎসার নামে ভিন্ন দেশে যাচ্ছে, সরকারের কোন পদক্ষেপ নেই, চলছেতো সব, চলছে।
দেশের টাকা বৈদেশে পাচার হচ্ছে, কেরানির চাকুরি করে কোটিপতি হচ্ছে, চল্লিশ হাজারটাকা বেতন পেয়ে, চার’শ কোটি টাকার মালিক হচ্ছে, ব্যাংকগুলো সব লুট হচ্ছে, দূর্ণীতির মাত্রা ছাড়িয়ে সিন্দাবাদের ভুত হয়ে ঘাড়ে বসেছে, ব্যবসার নামে গুণ্ডামি- রাহাজানি চলছে, জোর জবরদস্তির সিন্ডিকেট চলছে, যেমন খুশি তেমন বাজারদর বাড়চ্ছে, পথে- ঘাটে চান্দাবাজি চলছে, টেবিলে টেবিলে ঘুষ বানিজ্য চলছে অথচ শহরের মাঝখানেই আবার আইনের সংসদ চলছে, তাতে কি ? কারো কিছুই যায় আসে না। চলছেতো সব, চলছে।
শিক্ষার নামে জাতির মেরুদন্ড ভাঙ্গছে, বহু পদ্ধতির শিক্ষা চলছে, মাদ্রাসাগুলো তাদের আপন দর্শনে চলছে, ইংরেজীর নামে যেভাবে খুশি সেভাবেই চলছে, বিদ্যা বিক্রির হাটবাজার চলছে, শিক্ষা- সংস্কৃতি- ঐতিহ্য ধ্বংসে যাক, তাতে কি, চলছেতো সব, চলছে।
এই যে সব চলছে যেমন খুশি তেমন সাজে। একদিন এই চলার পথ আচমকাই থমকে যাবে, এটা নিশ্চিত হয়েই বলা যায় কেননা এটা একটি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক চলার পথ মোটেও নয় তবে সেদিন আর চলার পথ থাকবে না। সব নষ্টদের দখলে চলে যাবে। নষ্টদের দখলে চলে গেলে, সেদিন নিজের চলার পথও রুদ্ধ হবেই হবে। বিন্দু বিন্দু জল সিন্ধু গড়ে। এই রাষ্টটির উপরে আজ সত্যিই কালো হাতের আছর পড়েছে। এই কালো হাতের থাবা এক্ষুনি রুখতে না পারলে, সবাইকে মিলেই এর মূল্য পরিশোধ করতে হবে। হে রাষ্ট্র নায়কেরা তোমরা আজ অনুধাবন করতে সক্ষম হচ্ছো না, তবে এই কালো থাবা থেকে তোমরাও রেহাই পাবে না। এটাই হবে নিয়তি। সময় থাকতে সাধন করে শোধরাও নতুবা তৈরী হয় অসাড় হতে।

বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

