মাঝে মাঝে হতাশা পেয়ে বসে। মনে হয় কি করলাম এ জীবনে? যে সব স্বপ্ন দেখেছিলাম তার কিছুই তো পূরণ হলো না। ঘৃণা সংঘাতহীন সুস্থ সুন্দর মানবিক গুণাবলীতে ভরপুর ন্যায়ভিত্তিক একটা শোষণহীন প্রগতিশীল পৃথিবী তৈরি করার সংগ্রামে নেমেছিলাম। তার কিছুই হলো না। বরং যান্ত্রিক ও আর্থিক উন্নতির পাশাপাশি পৃথিবী অতীতের চেয়ে আরো বেশি হিংসাশ্রয়ী শোষণপরায়ন ও নানা স্বার্থে বিভক্ত এক অবাসযোগ্য গ্রহে পরিনত হয়েছে। তখন একবার মনে হয়, জন্মটা বুঝি একেবারেই বৃথা গেল! যা করলাম সব বুঝি নেহাৎই পণ্ডশ্রম!
এভাবে যখন খুব হতাশ হয়ে যাই, নিজেকে নিজে কৃপা করতে শুরু করি তখন এক অথৈ অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকি। ডুবে যেতে যেতে আর তল খুঁজে পাই না। তখন ঘুমের মতো নিস্তেজ একটা ভাব আসে। মনে হয় আমি আছি, আবার নাইও। এটা এক অতিন্দ্রীয় অনুভূতি। মনে হয় এভাবে ডুবতে ডুবতে বুঝি একেবারে ডুবেই যাবো। কখনো আর ভেসে উঠবো না।
ঠিক তখন আবার আমার চোখ খুলে যায়। দেখি: নাঃ, ঠিকইতো আছে সব। এই তো চার দিকে কত আলো। মনে হয়: না, ব্যর্থতা কোথায়? কী করিনি এ জীবনে? আমার যে যোগ্যতা তার চেয়ে অনেক বেশিইতো করেছি এ জীবনে। আমি যা পাবার যোগ্য তার চেয়ে অনেক বেশিই তো পেয়েছি।
এই পৃথিবীতে, এই পৃথিবীর ইতিহাসে, কে বা কারা কবে আমার চেয়ে বেশি কিছু করতে পেরেছে? নিজের চেষ্টা ও সাধনায় এক জীবনে আমার চাইতে বেশি কিছু কে কোথায় অর্জন করেছে?
পিতার সরকারি চাকুরির কারণে পূর্বপাকিস্তানের সতের জেলার আট জেলায় ঘু্রে ঘুরে কেটেছে স্বপ্নময় শৈশব-কৈশোর। এসএসসি পাশ করেছি এগারো নম্বর স্কুল থেকে। দেশের শ্রেষ্ঠ স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছি। ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলনে (বরিশাল ও যশোর), ১৯৬৬-‘৬৭র ৬-দফা আন্দোলনে (চট্টগ্রাম), ১৯৬৯-এর ১১-দফা আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে বটতলা থেকে রাজপথ সবখানে সামনের কাতারে থেকেছি, স্লোগান দিতে দিতে গলা দিয়ে তাজা রক্ত বেরিয়েছে, ১৯৭১-এর ১লা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হলের নাম পাল্টে মাস্টার দা সূর্য সেন হল করেছি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ও প্রেরণায়, এবং সিরাজুল আলম খানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ও তাঁর সাথে থেকে এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করেছি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পরশুরাম, ফুলগাজি, ছাগলনাইয়া ও সোনাগাজি – এই চার থানা নিয়ে গঠিত বিএলএফ- নোয়াখালি ‘সি’ কম্পানির (৩৯ জন যোদ্ধা, ৩৯টি এসএলআর, ৩টি এলএমজি, ১টি এসএমসি, ১৯৫টি HE36 গ্রেনেড, ১৯৫০ রাউন্ড বুলেট ও যথেষ্ট পরিমাণ প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ) কমান্ডার হিসাবে পুরো টীমসহ আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি। নভেম্বরে মিজোরামের দেমাগিরি বেইস ক্যাম্পে শেখ ফজলুল হক মণি ও জেনারেল সুজন সিং উবানের যৌথ কমান্ডের অধীনে এসএফএফ (স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স)-এর সাথে মিলে পার্বত্য চট্রগ্রামের ছোট হরিণা, বড় হরিণা, বরকল, কুতুগছড়ি, চংরাছড়ি, ফরামন পাহাড় ও কাউখালী অঞ্চলে পাক হানাদার বাহিনী ও ভারতের মিজো বিদ্রোহীদের একের পর এক সম্মুখ যুদ্ধে পরাস্ত করে আমি ও মণীশ দেওয়ান ১৭ ডিসেম্বর সকালে রাঙামাটি শহরকে হানাদারমুক্ত করি এবং সহস্রাধিক মানুষের সামনে বাঙলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম মুক্ত ঘোষণা করি।
বন্ধু আফতাবের সাথে মিলে দেশ স্বাধীন হবার ১৫ দিনের মাথায় — তখনও আমরা অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র — বাঙলাদেশের ইতিহাসের প্রথম ও আজ পর্যন্ত একমাত্র শতভাগ মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ও সামাজিক বিপ্লবের সপক্ষে সরাসরি ঘোষণা দিয়ে প্রকাশিত সাহসী সংবাদপত্র দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ প্রকাশনার প্রস্তুতি নেই এবং ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে সেটিকে নিয়মিত পাঠকের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হই।
সে সময়ে দেশে ব্যাপক লুটপাট, সশস্ত্র সন্ত্রাস, প্রতিপক্ষদলন ও রাজাকার পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু হলে দৈনিক গণকণ্ঠ সরকারের এসব নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সমালোচনায় সোচ্চার হয় এবং প্রতিদিনের সংবাদ, শিরোনাম ও সম্পাদকীয় মন্তব্যে তার কঠোর সমালোচনা করতে থাকে। এক সময়ে গণকণ্ঠ দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় পত্রিকা হয়ে ওঠে। ১৯৭৩ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আমি সে পত্রিকার যুগ্মসম্পাদক পদে উন্নীত হই এবং সম্পাদক আল মাহমুদ গ্রেফতার হলে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি।
তেইশ বছরের একটা ছেলের জীবনে এর চেয়ে বেশি আর কি হতে পারতো?
আমার যা পাবার তার সব কিছু ১৯৭৪ সালের আগেই পাওয়া হয়ে গেছে। আমার মতো লোক যদি জীবন নিয়ে আফসোস করে তা’হলে উল্লাস করবে কে?
আল মাহমুদ গণকণ্ঠ-র সম্পাদক থাকাকালীন তাঁর কক্ষে বসে একটা কবিতা লিখে সোৎসাহে আমাদের ডেকে শুনিয়েছিলেন যার শুরু হয়েছিল এভাবে:
“হতাশা কই? হতাশ নইতো
হতাশা আজ বাতাসে মেলে ধরি…”
অতএব, কোনও হতাশা নেই। চারদিকে এত আশা, এত ভালবাসা, এত প্রাপ্তি, এত প্রাচুর্য, এতো আনন্দ। আর কি চাই? না, আর কিছু চাই না। মানুষ যা দিতে পারে, মানুষ যা পেতে পারে — দুটোর চাইতে হাজার গুণ পাওয়া আমার হয়ে গেছে। আমি ক্ষুধার্ত বাঘ নই, পরিতৃপ্ত সিংহ। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই তাই। জয় বাঙলা।
-শামসুদ্দিন পেয়ারা

