এক ব্যক্তির কাছ থেকে চড়া সুদে এক কোটি ৭৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে না পেরে ফেসবুক লাইভে এসে চলন্ত লঞ্চ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন এক যুবক। তিনি বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের রাজারচর গ্রামের এমদাদুল্লাহর ছেলে রাজা আসাদুল্লাহ। চরমোনাইতে রাজা অ্যাগ্রো নামের পোল্ট্রি খামার রয়েছে তার। ঋণদাতা হচ্ছেন একই গ্রামের বাসিন্দা মো. মঞ্জুর মোর্শেদ।
এদিকে দীর্ঘ ১১ দিন ধরে নিখোঁজ রাজার সন্ধানে বুধবার বিকালে কোতোয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন তার স্ত্রী সালমা আক্তার।
লাইভে আসার আগে আদালত বরাবর একটি চিঠি লিখেছিলেন তিনি। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, পোল্ট্রি খামার পরিচালনার জন্য মঞ্জুর মোর্শেদের কাছ থেকে এক কোটি টাকা ঋণ নেন। এ জন্য প্রতি বছর তাকে ২০ লাখ টাকা সুদ গুনতে হতো। ইতোমধ্যে তিন কিস্তিতে ৬০ লাখ টাকা সুদ দিয়েছেন। পরে লাভের টাকা দেওয়া লাগবে আগামী বছরের মার্চে। ওই টাকা ছাড়াও আলাদা চুক্তিতে আরও টাকা ঋণ নেন। ২৯ লাখ টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে সুদ গুনতে হয়েছে দুই লাখ টাকা করে। ১৫ লাখ টাকার বিপরীতে প্রতিমাসে ৬০ হাজার টাকা করে। ৩০ লাখ টাকার বিপরীতে সুদ দিতে হয়েছে ৯০ হাজার টাকা করে।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে তার ফার্মের ২১ হাজার মুরগি মারা যায়। এতে ব্যবসায়ীকভাবে মারাত্মক সমস্যায় পড়েন। এরপর বিভিন্ন স্থান থেকে ধারদেনা করে এক কোটি এবং পৃথকভাবে আনা আরও ৭৪ লাখ টাকার সুদ চালিয়ে আসছিলেন। ফার্মের অবস্থা ভালো না থাকায় মঞ্জুর মোর্শেদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে পৃথকভাবে নেওয়া ৭৪ লাখ টাকার জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকা সুদ এবং তার সঙ্গে আসল ৭৪ লাখ টাকা দিতে বলেন। আর ফার্ম বিক্রি করলে সুদ আসলে সব টাকা পরিশোধ করতে হবে।
টাকা পরিশোধের জন্য ফার্মের জমি বিক্রির জন্য এলাকায় প্রচার করে দেন রাজা। এমনকি দুই লাখ টাকা শতাংশ বিক্রি করা হবে তাও জানিয়ে দেন। এরপর মঞ্জুর মোর্শেদ ওই জমি স্বল্প মূল্যে কিনতে রাজার বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু করে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন। একপর্যায়ে ফার্মের জমিতে মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন মঞ্জুর মোর্শেদ। এতে ক্ষুব্ধ হন রাজা। কোনোভাবেই তার জমিতে সাইনবোর্ড মেনে নিতে পারেননি। চিঠির শেষে রাজা উল্লেখ করেছেন, তার কাছ থেকে নেওয়া টাকার সুদ ঠিকমতো চলছিল। এরপরও ওই জমির মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড দেওয়ায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। যা লাইভে প্রমাণ থাকবে।
মঙ্গলবার রাত ১টায় তার ফেসবুক আইডি থেকে করা ১১ মিনিটি ৫১ সেকেন্ডের ওই লাইভে দেখা যায়, কোনও একটি যাত্রীবাহী লঞ্চের নিচতলার পেছনের অংশে মোবাইল নিয়ে অবস্থান করছিলেন। লাইভে এসে শুরুতে বলতে থাকেন- যতক্ষণ শ্বাস থাকবে ততক্ষণ হাত জাগাইয়া ধইরা রাখবো, আমার যারা আত্মীয়স্বজন রয়েছে তারা আর অপেক্ষা করবেন না, যে আমি কোনোদিন ফিরে আসবো, কোনোদিন ফোন দেবো না। এরপর দীর্ঘসময় ভিডিওটি চলতে থাকলেও তিনি আর কোনও কথা বলেননি। শেষের দিকে এসে কালেমা পাঠসহ বিভিন্ন দোয়া পড়তে থাকেন। আর বলেন, মৃত্যুর কারণ হিসেবে আমি একটি লিখিত পোস্ট দিয়ে রাখছি।
তার স্ত্রী সালমা আক্তার বলেন, ১১ দিন আগে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর মাঝেমধ্যে রাতের বেলায় কল দিয়ে কথা বলতো। তবে পাওনাদারদের ভয়ে মোবাইল ফোন বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ রাখতো। হঠাৎ মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে রাজার ভাগ্নি আঁখি জানান, তার মামা ফেসবুক লাইভে এসে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন। এরপর স্বজনরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করলেও কোনও সন্ধান পায়নি। তাই কোতোয়ালি মডেল থানায় নিখোঁজের জিডি করেছে বলে জানান তিনি।
সালমা আক্তার আরও বলেন, ২১ হাজার মুরগি মারা যাওয়ার পর থেকে ব্যবসায়িকভাবে খারাপ অবস্থা চলছিল। এরমধ্যে পাওনাদাররা দিনরাত সমানে তাগাদা করতো। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এরপর হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। এর বেশি কিছু তিনি জানেন না বলে জানান।
চরমোনাই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর শাকিল রাঢ়ী বলেন, পোল্ট্রি ফার্ম করতে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন রাজা। বিশেষ করে ২১ হাজার মুরগি মারা গেলে ব্যবসায় ধস নামে। ফার্মটি চলমান রাখতে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ আনেন। কিন্তু ফার্ম থেকে একেবারে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন। বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছি, রাজা ১১ দিন ধরে নিখোঁজ। পরে জানতে পেরেছি, লঞ্চ থেকে ফেসবুকে লাইভে এসে আত্মহত্যার জন্য নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন। তা সত্য না মিথ্যা তা জানি না। তবে অন্য মাধ্যমে জানতে পেরেছি, বিএনপি নেতা আবু নাসের মো. রহমতুল্লাহ আত্মীয়। তার ঢাকার বাসায় আছেন রাজা।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু নাসের মো. রহমতুল্লাহ বলেন, ৫/৬ দিন আগে একবার এসেছিল তার ফুফাতো ভাই রাজা। ঢাকার বাসায় আসার পর তাকে বুঝিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। মঙ্গলবার জানতে পারি, চলন্ত লঞ্চে ফেসবুক লাইভে এসে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে। এরপর জানাশোনা সবার মোবাইলে কল করে রাজার অবস্থান জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ খবর জানতে পারেননি।
এ বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আনোয়ার হোসেন বলেন, রাজা ফেসবুক লাইভে এসে চলন্ত লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিয়েছে বলে তার স্ত্রী জানিয়েছে। তাছাড়া ১১ দিন ধরে রাজা নিখোঁজ। নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন তার স্ত্রী। এখন রাজার মোবাইল নম্বর ট্র্যাকিং করে তার সন্ধান চালানো হবে। সুত্র, বাংলা ট্রিবিউন ।

