গণতন্ত্র ও সুশাসন বাইডেন শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার- এটি স্মরণ করিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চা, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে গেলেন দেশটির বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বের প্রতিও সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে নিজ দেশের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, শক্তিশালী গণতন্ত্র এবং ভোটে সবার অংশগ্রহণের ওপর বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি নির্ভর করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উজরা জেয়া পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন তাদের চাওয়া। আর রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে সেটিও বলেছেন। তারা একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চায়, সে বার্তাও দিয়ে গেছেন।
বাংলাদেশ সফরকালে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এবং বাংলাদেশ সরকারের অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়াও তিনি শ্রমিক আন্দোলন-কর্মী, নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ এবং মানবাধিকার রক্ষাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রতিটি বৈঠকে উজরা জেয়া মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সুশাসনের ওপর জোর দিয়েছেন।
পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন উজরা জেয়া। তা ছাড়া স্বতন্ত্র টুইট বার্তায়ও নির্বাচন নিয়ে ওয়াশিংটনের প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেন তিনি। বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক মানবাধিকার নীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। প্রশ্নোত্তর-পর্বেও বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চা, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। তার সফরকালে কাছাকাছি ভেন্যু সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শান্তিপূর্ণ বড় সমাবেশ অনুষ্ঠানে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। এছাড়া তিনি বলেন, সর্বত্র মুক্তভাবে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাবে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ভীতি, প্রতিশোধ ও ভয়ভীতিহীনভাবে সংবাদ পরিবেশনে সক্ষম হতে হবে। গণতন্ত্রে নাগরিক সমাজের কথা বলার জায়গা থাকতে হবে।
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মতবিরোধ নিরসনে সংলাপ অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়ে উজরা জেয়া বলেন, আমরা সবাই সংলাপ চাই, তবে এই প্রক্রিয়ায় আমরা সরাসরি যুক্ত নই। তিনি বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের সব মন্ত্রীর কাছ থেকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতির কথা শুনেছি। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতি অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এটি নিশ্চিত আমরা বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ের অংশীদার হিসেবে এখানে আমাদের ভূমিকাটা পালন করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে জানিয়ে টুইট বার্তায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের একটি সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা করে যুক্তরাষ্ট্র।
উজরা জেয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন চায়। জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন নয়। তবে এর জন্য মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখনো অনুকূল নয়। প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় এবং আতিথেয়তার জন্য বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, আমি কক্সবাজারস্থ রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলে উদ্বাস্তু এবং আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর
সহায়তায় ২.১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মানবিক সহায়তা প্রদান করেছে। এতে অতিরিক্ত আরও ৭৪ মিলিয়ন ডলার প্রদানের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশে এটি ব্যবহৃত হবে। এ সময় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দাতাদের অব্যাহত সমর্থনের কথাও জানান।
উজরা জেয়ার সফর নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবীর আমাদের সময়কে বলেন, উজরা পরিষ্কার বার্তা দিয়ে গেছেন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন তারা চায়। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ওপরই যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেটিও বলেছেন। নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য তিনি আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন। এ ছাড়া আরেকটি জিনিস তিনি পরিষ্কার করেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, একটা জিনিস পরিষ্কার হলো যে, সংবিধান পরিবর্তনের মধ্যে তারা নেই। সুষ্ঠু নির্বাচন যদি হয়, ভোটের দিন যদি জনগণ স্বতস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারে, সেটাই তাদের চাওয়া। সেটা তো সরকার নিজেও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু বিরোধী দলের যে দাবি, বিশেষ করে তত্ত্বাবধায় সরকার, সংবিধান পরিবর্তন, ইত্যাদি আমার মনে হয়, সেগুলোর ব্যাপারে তারা নেই, তা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছে। তারা তো যথেষ্ট প্রশংসা করল যে দুই দলের বড় সমাবেশ হলো, তারা থাকার সময় দুই দলের আচরণে খুশি। তারা এর প্রশংসা করল। তাতে বোঝা গেল যে, এখন বিরোধী দলকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তারা যে একদফার কথা বলছে সেই আন্দোলনে যাবে কিনা। নাকি তারা যে কাঠামো আছে সেই কাঠমোর অধীনে নির্বাচনে যাবে। হয়তো তফসিল ঘোষণা না হওয়ার পর্যন্ত তারা হয়তো আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
উজরা জেয়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক ও মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে আইনি সুরক্ষাসহ নানা বিষয়ে জানতে চান। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের গণমাধ্যম এবং পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন করেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কাছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে বৈঠকে যোগ দেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি-বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক ও টেলিভিশন টকশো তৃতীয় মাত্রার সঞ্চালক জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি কল্পনা আক্তার, চাকমা রানী ইয়েন ইয়েন এবং বেসরকারি সংস্থা সলিডারিটি সেন্টার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর একেএম নাসিম। মতবিনিময় অনুষ্ঠানে উজরা জেয়া বাংলাদেশের অধিকারকর্মীদের কাজের পরিবেশ এবং সমস্যা সম্পর্কে জানতে চান।
সফরের শেষ দিন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের গুলশানের বাসায় নৈশভোজে অংশ নেন মার্কিন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। নৈশভোজে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও অংশ নেন। বৈঠক শেষে সালমান এফ রহমান সাংবাদিকদের জানান, তারা (যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল) বলেছে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন যাতে হয়। আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। আমরা আশা করি, নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে। প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। গাজীপুরে শ্রমিক নেতা হত্যার বিষয়ে সরকার আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে। ভিসানীতির ব্যাপারে তারা বারবার একই কথা বলেছেন যে ভিসানীতি করেছে কোনো দলকে লক্ষ্য করে নয়।
উজরার এ সফর নিয়ে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বের প্রতি অব্যাহত সমর্থন জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়ার নেতৃত্বে একটি দল বাংলাদেশ সফর করেছে। এতে জানানো হয়, আন্ডার সেক্রেটারি বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। গণতন্ত্র সমুন্নত রাখা ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বৈঠকগুলোতে উজরা জেয়া বাংলাদেশের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও শ্রমিক আন্দোলন কর্মীদের নিরাপত্তার গুরুত্ব; মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহিতা থাকা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা ছাড়াও ফ্রিডম ফান্ড এবং এর অংশীদারদের জন্য স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ১০ লাখ ডলার অনুদান ঘোষণা করেন। এই টাকা মানব পাচারকারীদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া পাঁচ শতাধিক শিশুকে সমাজে পুনঃএকত্রীকরণের কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হবে। মার্কিন প্রতিনিধি দলটি গতকাল শুক্রবার ঢাকা ছাড়ে। সুত্র, আমাদের সময় ।

