চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংলাপ বিষয়ে ‘পক্ষে-বিপক্ষে’ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যকে বিভ্রান্তিমূলক বলে মনে করছে বিএনপি। আন্দোলনরত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতেই ক্ষমতাসীনরা এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে বলে মনে করে দলটি। ২০১৪ সালের ‘একতরফা’ ও ২০১৮ সালের ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো বক্তব্যের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না দলটি। এ অবস্থায় গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো আলোচনায় যাবে না বলে সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা।
দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ মুখে যা বলে, কাজ করে উল্টো। তবে ইদানীং ক্ষমতাসীনদের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন তারা দেখতে পাচ্ছেন। দেশের রাজনৈতিক চিত্রও ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ইস্যুতে গত ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি ঘোষণার পর ক্ষমতাসীনরা চাপে পড়েছে।
তাদের কথাবার্তা এবং কর্মকাণ্ডে এমন চিত্র প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। বিরোধী দলের কর্মসূচিতেও সরকারের দিক থেকে আগের মতো বাধার হারও কমতে শুরু করেছে। ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও তাদের নেতাদের বক্তব্যেও নতুনত্ব এসেছে। বিশেষ করে, কোনো কোনো নেতা সংলাপের ওপর জোর দিয়ে বক্তব্য রাখছেন। আবার তারা নিজেরাই পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য দিয়ে রাজনীতিতে আলোচনার ঝড় তুলেছেন। এই ঝড়ের মধ্যেও নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে অনড় অবস্থানে রয়েছে বিএনপি।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, দেশে নির্বাচন হতে গেলে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’
গত মঙ্গলবার ১৪ দলীয় জোটের এক সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সংলাপ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন। এর একদিন পর গতকাল এই বক্তব্যের ‘পক্ষে-বিপক্ষে’ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের দিক থেকে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও বক্তব্য দেন। এর আগে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বক্তব্য দেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের কোন কথা আমলে নেব? তাদের প্রধানমন্ত্রী বলেন এক কথা, তাদের সিনিয়র নেতা আমির হোসেন আমু বলেন আরেক কথা। আবার তাদের সাধারণ সম্পাদক বলেন ভিন্ন কথা, আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন আরেক কথা। তাদের বক্তব্যই তো ঠিক নেই। কে কোথায় কী বলল, তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া বা জবাব দেওয়ার কথা ভাবছি না।
আমির খসরু মাহমুদ আরও বলেন, বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার, দেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। তার আগে সংসদ বিলুপ্ত এবং শেখ হাসিনা সরকারকে পদত্যাগ করে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে আলোচনা চায়, তাহলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কীভাবে হবে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
গতকাল এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন- বিএনপি হলো একটি সন্ত্রাসী দল, এরা সন্ত্রাস করে এদের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় বসার প্রশ্নই ওঠে না। মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু বলেন, বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করার জন্য প্রস্তুত আছে জাতিসংঘের সমঝোতার মাধ্যমে। ওবায়দুল কাদের (আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) বলেছেন, না এটা সঠিক না। আসলে এরা এলোমেলো হয়ে গেছে। তিনি বলেন, সময় যখন শেষ হয়ে যায় তখন কিন্তু কথা এলোমেলো হতে বাধ্য।
বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল বাধা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। এই বাধা দূর করতে হলে সরকারকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
বিএনপির এক নেতা বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের মধ্যস্থতায় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে ওই নির্বাচনের পর দ্রুত আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে কথা রাখেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপে বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার না করার প্রস্তাব দিলেও তা রাখা হয়নি। বরং ওই নির্বাচন দিনের ভোট রাতে হয়েছে। ফলে দেশে-বিদেশে সব দিক থেকে এ সরকার আস্থা হারিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভারত থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সঙ্গে যতগুলো বৈঠক হয়েছে সেখানেও ২০১৪ ও ২০১৮ সালের অনুষ্ঠিত নির্বাচন এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরে বিএনপি। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের কাছেও এই চিত্র তুলে ধরা হয়। সুত্র, আমাদের সময় ।

