সিদ্ধার্থ সিংহ রচিত নাটক “শ্বশুরবাড়ির জামাই আদর”

শ্বশুরবাড়ির জামাই আদর

 

চরিত্র

অর্কাংশু, তিস্তা, শাশুড়ি, শ্বশুর, রীঝা, প্রথম বাচ্চা, দ্বিতীয় বাচ্চা ও বড় মেয়ে।

 

(জোরে টিভি চলছে)

অর্কাংশু : এগুলি কাল রাতে গুছিয়ে রাখতে পারোনি? তিস্তা : গোছাবার কী আছে? যাচ্ছি তো এক বেলার জন্য। তোমার একটা চোস্তা-পাঞ্জাবি, আমার একটা শাড়ি আর রীঝার দুটো জামাপ্যান্ট, ব্যাস।

অর্কাংশু : বলছ তো এই ক’টা। কিন্তু গোছাচ্ছ তো সেই সকাল থেকেই।

তিস্তা : সকাল থেকে গোছাচ্ছি‌? তোমাকে চা করে দিল কে? রীঝার ব্রেকফাস্ট রেডি করে দিল কে? তুমি?

অর্কাংশু : কথা বাড়িও না। তাড়াতাড়ি করো।

তিস্তা : ওফ্ বাবা, শ্বশুরবাড়ি যাবার জন্য একেবারে পাগল হয়ে গেছে। যেন জীবনে কোনও দিন জামাইষষ্ঠী খায়নি!

অর্কাংশু : খেয়েছি, কিন্তু ক’বার? বিয়ে করার দু’সপ্তাহের মধ্যেই তো ভুবনেশ্বরে চলে গেলাম। টানা দু’বছর ওখানেই পোস্টিং। তার পরের তিন বছর আলিপুরদুয়ার। আসতে পেরেছি? পাঁচ বছর তো ওখানেই কেটে গেল। আর গত বছর? মেয়ের ধুম জ্বর। সেই নিয়ে যখন গিয়ে পৌঁছলাম, তখন মধ্যদুপুর। খাবার পাট প্রায় শেষ।

তিস্তা : এ রকম পেটুক জামাই আমি জীবনে দেখিনি। দ্যাখো তো, এই শাড়িটা নেব?

অর্কাংশু : এই তো বললে একটা শাড়ি নেবে? এখনও নাওনি?

তিস্তা : নিয়েছিলাম। কিন্তু যেটাই ব্যাগে ঢোকাচ্ছি, খানিক পরেই মনে হচ্ছে, ওটা ভাল নয়, তার চেয়ে এটা ভাল

অর্কাংশু : তাই বারবার ব্যাগ খুলছ আর রিপ্লেসমেন্ট করছ তাই তো?

তিস্তা : আমি একা না। সব মেয়েই তা করে, বুঝেছ?

অর্কাংশু : রীঝাকে রেডি করেছ?

তিস্তা : হ্যাঁ, ও রেডিই আছে। যাওয়ার সময় শুধু জামাটা পরিয়ে নেব, ব্যাস।

অর্কাংশু : কী করছে ও?

তিস্তা : টিভি দেখছে।

অর্কাংশু: টিভি?

তিস্তা : হ্যাঁ ওই… কার্টুন দেখছে…

অর্কাংশু : কার্টুনটাই ওর মাথা খাবে। কে চালিয়েছে?

তিস্তা : আমি।

অর্কাংশু : টিভি চালিয়েছ, না মাইক চালিয়েছ?

তিস্তা : ও-ই তো বলল, একটু জোরে করে দাও।

অর্কাংশু : ও বলল আর তুমিও গা গা করে চালিয়ে দিলে? আশেপাশের লোকদের উত্যক্ত না করলেই নয়, না?

তিস্তা : উত্ত্যক্ত করার কী আছে? সবাই টিডি চালায়। তোমার মতো কেউ টিভি মিউট করে দিয়ে শুধু ছবি দেখে না, বুঝেছ?

অর্কাংশু : তা বলে এত জোরে? চার রাস্তার মোড় থেকে শোনা যাচ্ছে!

তিস্তা : কমিয়ে দেব?

অর্কাংশু : না, বন্ধ করে দাও। সক্কালবেলায় উঠেই…

তিস্তা : বন্ধ করলেই তো ও আবার কান্না জুড়ে দেবে। অর্কাংশু : কাঁদুক। কতক্ষণ কাঁদবে? এই তো বেরুব।

তিস্তা : এক্ষুনি বেরোবে?

অর্কাংশু : না। সন্ধেবেলায়।

তিস্তা : সন্ধেবেলায়? আমাদের নেমন্তন্ন তো দুপুরে।

অর্কাংশু : দুপুরে মানে কি বেলা দুটোয়? গাড়ি ভাড়া খরচা করে যাব। একটু আগে গেলে ক্ষতি কী? সবার সঙ্গে তো একটু কথাবার্তা তো বলা যায়, না কি?

তিস্তা : কেউ আগে যাবে না, দেখবে।

অর্কাংশু : হ্যাঁ, তুমি একেবারে জেনে বসে আছ। জ্যোতিষী তো…

তিস্তা : গিয়ে দেখতে পাবে।

অর্কাংশু : আমি তো গিয়েই দেখতে চাই। তার জন্যই তো যেতে হবে। তুমি কি যাবে?

তিস্তা : যাচ্ছি রে বাবা, যাচ্ছি। আর ঠিক দু’মিনিট। মেয়েটাকে জামা পরিয়ে নিই।

অর্কাংশু : দু’মিনিট? আমি তোমাকে কুড়ি মিনিট দিলাম। তার মধ্যে যদি বেরুতে পারো, ভাল। না হলে আমি কিন্তু একাই চলে যাব। তুমি তোমার মতো যাবে। এই বলে দিলাম। সেই কোন সকাল থেকে জামাপ্যান্ট পরে, সেন্টটেন্ট মেখে রেডি হয়ে বসে আছি, গন্ধটা বুঝি এতক্ষণে উঠেই গেল! আবার লাগাতে হবে।

(তিস্তা ততক্ষণে পাশের ঘরে চলে গেছে। তাই পাশের ঘর থেকে শোনা যেতে পারে এমন জোরে অর্কাংশু বলে উঠল) তিস্তা, সেন্টের শিশিটা আর একবার দিও…

তিস্তা : দিই… (বিড়বিড় করে) কেন যে দেরি করে যেতে চাইছিলাম, আজ বুঝবে…

 

(যানবাহনের শব্দ ক্ষীণ থেকে জোরে। আবার জোরে থেকে মিলিয়ে যায়)

 

শাশুড়ি : ওই তো ওরা আইসা গেছে।

শ্বশুর : আইসা গেছে? খুব ভাল হইসে। খুব ভাল হইসে। আমি তোমার কথাই চিন্তা করতা ছিলাম বাবা।

অর্কাংশু : এখনও কেউ আসেনি?

শ্বশুর : আইবো আইবো। হকলের ঘরেই তো কাজকম্ম আছে। চইলা আইবো। আসো আসো, ভেতরে আসো। আর কইও না, সক্কাল থিকা পায়ের ব্যাথাটা আবার জ্বালাইতাছে। ভাবতাছিলাম, সক্কালবেলায় গিয়া মাংসটা নিয়ে আসুম। তার আর উপায় আছে? তুমি আইসো, খুব ভাল হইসে। ঠাকুর যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন। চট কইরা মাংসটা এট্টু লইয়া আসবা?

শাশুড়ি : ওরে পাঠাও কেন?

শ্বশুর : ক্যান পাঠামু না? ও কি পর নাকি? ও তো আমার পোলাই। কি, তাই না?

অর্কাংশু : না না, সে তো ঠিকই।

শাশুড়ি : অত দূর থিকা আইসে। আগে একটু জিরাক। তার পর না হয় যাইবো।

শ্বশুর : না না, ইয়ং বয়েস, জিরাবার কী আছে? দরকার হইলে আইসা জিরাইবো। দেরি করলে, ও দিকে আবার মাংস নাও পাইতে পারে। আজ জামাইষষ্ঠী না?

শাশুড়ি : তা হইলে একটু চা খাইয়া যাক। চা বসাই?

অর্কাংশু : না থাক, এসে খাবো। ব্যাগ দিন।

শ্বশুর : ওরে ব্যাগটা দাও তো…

অর্কাংশু : কতটা আনব?

শ্বশুর : আনো না চার-পাঁচ কিলো। ছয় কিলোও আনতে পারো…

অর্কাংশু : পাঁচ কিলো! অত লাগবে?

শ্বশুর : লাগবো না? আমাগো সময় তো আমরা একেক জনেই এক-একটা গোটা পাঁঠা খাইয়া ফেলতাম। সে দিন তো আর নাই। তাও হিসেব কইরা দ্যাখো… ক’টা মাথা। চার মাইয়ার চার জামাই। মানে আট জন। বড় মাইয়ার এক পোলা এক মাইয়া, তা হল গিয়া দশ জন। মেজোটার এক পোলা, এগারো। সেজোটার এক মাইয়া, মানে বারো। আর তোমাগো একটা। এখানেই তো তেরো জন। তার পর আমরা বুড়োবুড়ি আছি। আমাগো কথা না-হয় বাদই দিলাম।

অর্কাংশু : হ্যাঁ, সব মিলিয়ে যদি পনেরো জনও হয়, তার মধ্যে পাঁচ জনই তো বাচ্চা।

শ্বশুর : বাচ্চারাই তো বেশি মাংস খাইবো।

অর্কাংশু : হ্যাঁ, তার হলেও মাথা পিছু গড়পড়তা যদি দুশো গ্রাম করেও ধরি, পনেরো জনের জন্য লাগবে তিন কিলো। চার-পাঁচ কিলো এনে কী করব? শুধু শুধু নষ্ট হবে।

শ্বশুর : কিচ্ছু নষ্ট হইবো না। যদি বাইচা যায়, বড় ছেলে ফ্রিজ কিনছে তো, ওর ফ্রিজে রাইখা দিমু। কাল, পরশু তরশু খামু। কিন্তু নষ্টের ভয়ে কম আইনো না। যদি কেউ চায়, তারে দিতে না পারলে…

তিস্তা : (হঠাৎ তিস্তা এসেই) কী গো, এখানে দাঁড়িয়ে আছ?

অর্কাংশু : ও বাবা, এর মধ্যে তোমার শাড়ি ছাড়া হয়ে গেল?

তিস্তা : মা একা-একা রান্না করছে। হাতে হাতে একটু না করলে হয়, এত লোকের রান্না…

অর্কাংশু : সে তো ঠিকই। মেয়ে কোথায়?

তিস্তা : ও এখন ভিডিওগেম খেলছে।

শাশুড়ি : এই নাও ব্যাগ। আমি ভিতরে যাই। মাংসের আলুটা কাইটা ফেলি গিয়া।

তিস্তা : ব্যাগ নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?

অর্কাংশু : বাবা বললেন মাংস আনতে…

তিস্তা : মাংস? এখন! পাবে?

শ্বশুর : পাইবো পাইবো। খুব পাইবো। আজ জামাইষষ্ঠী না? প্রচুর পাঁঠা কাটসে।

তিস্তা : এত বেলায় মাংস আনলে রান্না করবে কখন?

শ্বশুর : সে হইয়া যাইবো। তোর মারে তুই চেনস না?একাই একশো। চিন্তা করিস না।

অর্কাংশু : তা হলে ওই পাঁচ কিলোই আনি, নাকি?

শ্বশুর : পাঁচ কিলো আনবা? ঠিক আছে, তাই আনো। কম-বেশি কইরা হইয়া যাইবো মনে হয়!

তিস্তা : ওকে মাংস আনার টাকা দিয়েছে বাবা?

শ্বশুর : টাকা!

অর্কাংশু : না না, ঠিক আছে…

তিস্তা : ঠিক আছে মানে? নেমন্তন্ন করেছে বাবা, আর মাংস আনবে তুমি?

শ্বশুর : শোন, ওরে তো আমরা জামাইয়ের মতো দেখি না। ও আমাগো পোলা। ঘরের জন্য একটু মাংস আনব, তো কী হইসে?

তিস্তা : না না, তুমি ওকে টাকা দাও।

অর্কাংশু : কী হচ্ছে কি তিস্তা?

তিস্তা : প্লিজ, তুমি চুপ করো

শ্বশুর : শোন, ওরে তো টাকা দিতেই পারি। কিন্তু শ্বশুর হইছি বইলা সামান্য ক’টা টাকা দিয়া ওরে অপমান করার কোনও অধিকার আমার নাই।

তিস্তা : তোমাকে মাংস আনতে হবে না। এসো তো…

অর্কাংশু : তিস্তা…

শ্বশুর : আমি কি কইসি টাকা দিমু না? দিমু। আনুক না। ঠিক দিয়া দিমু। ও তো এখুনই চইলা যাইতাছে না…

তিস্তা : দেবে তো?

শ্বশুর : দিমু রে বাবা, দিমু। অমন করস ক্যান?

অর্কাংশু : তুমি রীঝাকে খেয়াল রেখো। খেলতে আবার রাস্তায় না বেরিয়ে পড়ে। আমি আসি।

 

(রাস্তায় যানবাহনের শব্দ)

তিস্তা : শোনো শোনো, এই শোনো…

অর্কাংশু : কী হল? তুমি আবার পেছনে পেছনে?

তিস্তা : তোমাকে একটা কথা বলব…

অর্কাংশু : এতক্ষণ ওখানে ছিলাম, মনে পড়েনি? যেই বেরিয়েছি অমনি… যেটা বলার সেটা তো ফোন করেই বলতে পারতে।

তিস্তা : মোবাইলটা তো ব্যাগের ভেতরে। তা ছাড়া বাবা ঘরের মধ্যে ঘুরঘুর করছে। কথা বলতে পারতাম না।

অর্কাংশু : এ কি! খালি পায়ে? চটি পরোনি?

তিস্তা : আরে বাবা, চটি পরতে গেলে তোমাকে আর ধরতে পারতাম না।

অর্কাংশু : আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না। এলেও তো বলতে পারতে!

তিস্তা : আসার পরে বলে কী লাভ?

অর্কাংশু : আচ্ছা, এ বার বলো কী বলবে…

তিস্তা : বলছিলাম কি… বাবা ক’কিলো মাংস আনতে বলেছে?

অর্কাংশু : বাবা তো বললেন পাঁচ কিলো আনতে।

তিস্তা : খেপেছ? অত মাংস দিয়ে কী হবে? ক’জন খাবে?

অর্কাংশু : বাবা তো হিসেব করে বললেন পনেরো জনের মতো হবে।

তিস্তা : পনেরো জন হলেও, অত মাংস লাগে? নিজেকে আনতে হলে বুঝত। তখন দেড়-দু’কিলোর ওপরে আর উঠত না। তুমি তিন কিলোর বেশি একদম আনবে না। বুঝেছ?

অর্কাংশু : ওতে হবে? যদি কম পড়ে?

তিস্তা : কিচ্ছু কম পড়বে না। খেতে তো দেবো আমি। তুমি তিন কিলোই এনো। তাতেও দেখবে অনেক মাংস বেচে যাবে।

অর্কাংশু : ঠিক আছে, আমার কী! তিন কিলো আনলে যদি কুলিয়ে যায়, তিন কিলোই আনছি।

 

(যানবাহনের আওয়াজ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে রান্নার ছ্যাঁক-ছোঁক শব্দ)

 

শাশুড়ি : আইসা গেছ? এইখানে রাখো। এইখানে রাখো। তুমি ভেতরে গিয়ে বসো, আমি চা নিয়া আইতাছি। ওরে এট্টু পাঠাইয়া দিও তো… বলল মা আইতাছি, সেই যে ঘরে ঢুকসে… কতবার ডাকলাম…

অর্কাংশু : সে কি! ও তো নিজেই বলল মা একা একা রান্না করছে, হাতে হাতে না করলে হয়… অথচ একবারও আসেনি?

শাশুড়ি : কই আইল?

অর্কাংশু : ঠিক আছে, আমি এক্ষুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

 

( মৃদু যন্ত্রসংগীত)

 

রীঝা : বাবা বাবা, দেখো কত খেলনা…

অর্কাংশু : খেলা খেলো…

তিস্তা : তুমি ও ঘরে গিয়ে জামাপ্যান্ট ছেড়ে এসো। খাটের উপরে চোস্তা-পাঞ্জাবি রাখা আছে।

অর্কাংশু : এখনও কেউ আসেনি?

তিস্তা : তোমাকে কী বলেছিলাম?

শ্বশুর : কী? নিয়া আইস?

অর্কাংশু : হ্যাঁ বাবা, নিয়ে এসেছি।

শ্বশুর : ক’কিলো আনলা?

তিস্তা : পাঁচ কিলো। পাঁচ কিলো।

শ্বশুর : পাঁচ কিলো আনস?

অর্কাংশু : না, মানে… হ্যাঁ…

শ্বশুর : হ্যাঁ হ্যাঁ, কম-বেশি কইরা ওতেই হইয়া যাইবো। বলতেছিলাম কি, ওরা তো এখনও কেউই আইলো না। একটা কাজ করতে পারবা?

শাশুড়ি : এই নাও চা। কী রে? তোরে কতবার ডাকলাম…

অর্কাংশু : ওহোঃ, একদম বলতে ভুলে গেছি। মা তোমাকে পাঠিয়ে দিতে বলেছিলেন…

তিস্তা : যাচ্ছি যাচ্ছি।

রীঝা : দিদুন, আমি চাউমিন খাবো।

তিস্তা : এই তো খেয়ে এলি…

শাশুড়ি : খাউক না, বাচ্চা মানুষ! কথায় কথায় অত বকস ক্যান? চাওমিন খাবা?

রীঝা : হ্যাঁ।

শাশুড়ি : ঠিক আছে, কইরা দিতাছি।

রীঝা : এগ চাউমিন কিন্তু…

শাশুড়ি : ঠিক আছে। তুমি একটা ডিম আর এক প্যাকেট চাওমিন আইনা দাও না মাইয়াটার জন্য। তিস্তা ওরে কইরা দিক।

শ্বশুর : তোমারে কী কইলাম? সক্কাল থিকা পা ফেলতে পারতাছি না। ইউরিক অ্যাসিডটা বোধহয় বাড়ছে।

শাশুড়ি : বাড়ব না? ইউরিক অ্যাসিডের আর দোষ কী? কোনও কিছু মানো? জানস, ডাক্তার বারবার কইরা কইয়া দিসে লালশাক, দানাওয়ালা সবজি, টমাটো, পাঁঠার মাংস যেন না খায়। তবু শোনে? সে দিন বিয়াবাড়ি গিয়া শুধু গাদা গাদা মাংস নেয় আর খায়। যত চোখ গরম করি, একবারও তাকায়?

শ্বশুর : তুমি জামাপ্যান্ট ছাড়বা তো?

অর্কাংশু : হ্যাঁ।

শ্বশুর : তার আগে একটা কাজ করবা? আমি টাকা দিতাসি। একটা চাওমিনের প্যাকেট আর একটি ডিম আইনা দিবা?

অর্কাংশু : একটু পরেই তো ভাত খাবি মা। এখন আবার চাউমিন খেতে হবে?

রীঝা : হ্যাঁ, হবে। আমাকে চাউমিন এনে দাও।

শ্বশুর : আইনা দাও, আইনা দাও। বাচ্চা মানুষ। খাইতে চাইসে… এই তিস্তা…

তিস্তা : কী?

শ্বশুর : তর কাছে টাকা আছে!

তিস্তা : কত.?

শ্বশুর : দে না, পনেরো কুড়ি টাকা দে, তোরে দিতাসি।

তিস্তা : দেখো, ও ঘরে বিছানার উপরে ওর চোস্তা-পাঞ্জাবির পাশে আমার মানিব্যাগটা আছে। নিয়ে নাও।

শ্বশুর : আসো আসো, নিয়ে যাও।

অর্কাংশু : না থাক, আমার কাছে আছে তো…

শ্বশুর : না না, নিয়া যাও। ও মা, এখানে তো খুচরা টাকাই নাই। পঞ্চাশ আর একশো টাকার নোট। আর খুচরা পয়সা যা আছে, তাতে তিন-চার টাকার বেশি হইবো না। একটা কাজ করো, পঞ্চাশ টাকা নিয়া যাও। এক প্যাকেট চাওমিন আর সাতটা ডিম নিয়া আইসো।

অর্কাংশু : সাতটা ডিম!

শ্বশুর : হ্যাঁ, সাতটা। আইনা রাখতে অসুবিধা কী? ঘরে থাকলে তো আর পচবো না। একটা কাজ কইরো, সাতটা না, দশটা ডিমই নিয়া আইসো।

অর্কাংশু : ঠিক আছে, দশটা ডিম আর এক প্যাকেট চাউমিন। তাই তো?

শ্বশুর : হ্যাঁ, তোমার আর একটা কথা কমু?

অর্কাংশু : কী?

শ্বশুর : দোকানে যাইতাছই যখন, এট্টু চাল নিয়া আইবা?

অর্কাংশু : চাল?

শ্বশুর : আস্তে কও, আস্তে কও। ওই ঘরে আবার তিস্তা আছে। শুনতে পাইলেই খ্যাঁকখ্যাঁক কইরা উঠবো।

অর্কাংশু : কতটা চাল আনব?

শ্বশুর : ঘরে খাওনের চাল আছে। কিন্তু সেই চালের ভাত তো আর তোমাগো খাওয়ান যাইব না। এট্টু ভালো চালই আইনো।

অর্কাংশু : ভাল চাল? কতটা?

শ্বশুর : অল্প কইরাই আনো। পাঁচ কিলো আনলেই হইবো।

অর্কাংশু : পাঁচ কিলো তো? ঠিক আছে।

শ্বশুর : আর পারলে এট্টু গোবিন্দভোগ চালও নিয়ে আইসো।

অর্কাংশু : গোবিন্দভোগ?

শ্বশুর : হ্যাঁ, যদি পায়েস-টায়েস করে… কী করব, তা তো আমি জানি না। দুম কইরা হয়তো এমন সময় কইল, যখন দোকানপাট সব বন্ধ। তখন? তার চাইতে আগে থিকা আইনা রাখা ভালো না? কও, তুমি কি কও, আর হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে যা কথা হইল, তিস্তারে গিয়ে আবার কইয়া দিও না। শাশুড়ির কাছ থিকা ব্যাগ নিয়ে যাইও।

অর্কাংশু : ঠিক আছে।

তিস্তা : চাউমিন আনতে যাচ্ছ?

শ্বশুর : হ্যাঁ শোন, তর ব্যাগে খুচরা টাকা ছিল না। পঞ্চাশ টাকা নিলাম। যাওয়ার সময় কিন্তু মনে কইরা নিয়া যাস।

অর্কাংশু : তোমাকে মা ডেকে গেল না?

তিস্তা : যাচ্ছি রে বাবা, যাচ্ছি। দেখছ না, মেয়ে আমাকে ছাড়ছে না…

অর্কাংশু : মা একা একা করছে।

শ্বশুর : যাইবো যাইবো। তুমি চট কইরা ঘুইরা আসো। আইসা দেখবা, তোমার বউ রান্নাঘরে। যাও যাও, চট কইরা ঘুইরা আসো। বাচ্চাটা কখন হইসে চাওমিনের কথা…

তিস্তা : তাড়াতাড়ি এসো।

অর্কাংশু : হ্যাঁ হ্যাঁ, তাড়াতাড়িই আসব।

 

(যানবাহনের আওয়াজ জোরে থেকে ক্ষীণ)

 

অর্কাংশু : এ কী বাবা! আপনি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন?

শ্বশুর : তোমার বউ বারবার জিগাইতাছে ওরে কোথায় পাঠাইছ? সেই কখন গেছে, ডিম আর চাওমিন আনতে কি এতক্ষণ লাগে নাকি? ও সন্দেহ করতাসে দেইখা আমি এইখানে তোমার জন্য খাঁড়াইয়া আছি। দাও দাও, চালের একটা দাও। আর ডিমের ঠোঙাটাও দাও। দশটা আনছ তো?

অর্কাংশু : ও কোথায়?

শ্বশুর : তিস্তা?

অর্কাংশু : হ্যাঁ।

শ্বশুর : ওরে তো আমি ওর মেয়ের কাছেই বসাইয়া রাখসি। তুমি সোজা ওই ঘরে গিয়া ঢোকো। অর হাতে চাওমিন আর এই একটা ডিম দাও…

অর্কাংশু : চালের ব্যাগের মধ্যে ওই ভাবে ডিমগুলো রাখছেন, ফেটে যাবে না?

শ্বশুর : না রে বাবা, না। ফাটব না। এই নাও… কও, মাইয়াটারে চাওমিন কইরা দিতে…

অর্কাংশু : ঠিক আছে।

(চাবি দেওয়া পুতুলের বাজনা বাজানোর শব্দ)

 

রীঝা : বাবা, দেখো দেখো, এই জোকারটা কেমন তবলা আর করতাল একসঙ্গে বাজাচ্ছে।

অর্কাংশু : বাবা… এ কী করেছ মা? একেবারে সব খেলনা নামিয়ে নিয়ে বসেছ?

তিস্তা : এত দেরি হল?

অর্কাংশু : আশেপাশের কোনও দোকানে ডিম পেলাম না। ওই, ও দিকের দোকানে যেতে হল। এই নাও।

তিস্তা : বাব্বা, একটা ডিমের জন্য এত বড় ঠোঙা! এতে তো হাফ কিলো মুড়ি ধরে যাবে গো!

অর্কাংশু : ওরা কেউ আসেনি?

তিস্তা : না, এলে তো দেখতেই পেতে।

অর্কাংশু : আসবে না?

তিস্তা : আসবে আসবে। ওরা তো আর তোমার মতো বোকা না যে, সাতসকালে শ্বশুরবাড়ি এসে হাজির হবে। ওরা ঠিক সময় আসবে।

অর্কাংশু : যাও, মেয়েকে চাউমিন করে দাও।

তিস্তা : মা কী করছে?

অর্কাংশু : সে আমি কী করে জানব? যাও, গিয়ে দেখো।

তিস্তা : যাচ্ছি।

রীঝা : মা, তুমি যেও না।

তিস্তা : আমি না গেলে হবে? বাবা এসে গেছে। এখন বাবার সঙ্গে খেলো। আমি একটু ও দিকে যাই। তোমার জন্য চাউমিন করতে হবে না?

রীঝা : চাউমিন? তাড়াতাড়ি কোরো কিন্তু। খুব খিদে পেয়ে গেছে…

তিস্তা : তোমার তো যখন যেটা চোখে লাগে, তখন সেটা খাবার জন্য পেট একবার চুঁইচুঁই করে, তাই না?

অর্কাংশু : যাও না, তাড়াতাড়ি করে নিয়ে এসো।

তিস্তা : যেমনি মেয়ে তার তেমনি বাপ।

রীঝা : বাবা, এটায় চাবি দিচ্ছি, তবু চলছে না কেন গো?

অর্কাংশু : কোনটা?

রীঝা : এইটা।

অর্কাংশু : দেখি। হুঁ। এটার তো চাবি কেটে গেছে।

রীঝা : আর চলবে না?

অর্কাংশু : না।

রীঝা : তুমিও ঠিক করতে পারবে না?

অর্কাংশু : উঁহু।

প্রথম বাচ্চা : ও দাদু দাদু, ও দিদা, কী করছ গো? শাশুড়ি : রান্না করছি বাবা। দাদু ভেতরে… কী রে, জামাই এল না?

বড় মেয়ে : আসবে। ওর হঠাৎ একটা কাজ পড়ে গেছে। সেটা করে আসছে।

শাশুড়ি : বাড়ির বড় জামাই বইলা কথা, দেরি কইরা আইলে হয়?

তিস্তা : আগে ওকে বাড়িতে ঢুকতে দাও। শাড়িটাড়ি ছাড়ুক…

বড় মেয়ে : বাবা, ভেতরটা কী অন্ধকার রে! তোকে তো দেখাই যাচ্ছে না! কী করছিস?

তিস্তা : আর বলিস কেন, দেখ না, মেয়ে এখন বায়না ধরেছে চাউমিন খাবে…

বড় মেয়ে : কর কর, আমি ভেতরে যাই। এই ব্যাগগুলো নিয়ে আর দাঁড়াতে পারছি না, যা ভারী!

তিস্তা : যা, তুই যা। আমি আসছি।

 

(যন্ত্রসংগীত)

 

দ্বিতীয় বাচ্চা : ওই তো ছোট বোনু বসে গেছে।

প্রথম বাচ্চা : এই আমাকে পুতুল দে।

রীঝা : এগুলো আমার। খাটের তলা থেকে খুঁজে খুঁজে আমি বের করেছি।

অর্কাংশু : কী হচ্ছে রীঝা? ও রকম করতে নেই। সবাই মিলে খেলতে হয়।

 

(বাচ্চাদের চিৎকার, কথাবার্তা)

 

বড় মেয়ে : কখন এলে?

অর্কাংশু : এই সাড়ে ন’টা-দশটা নাগাদ।

শ্বশুর : কী রে, জামাই আইলো না?

বড় মেয়ে : আসবে, একটু দেরি হবে।

শ্বশুর : ওই প্রথম দু’-একবারই ও সকাল সকাল আইছিল। তার পর থিকা তো বেলা না পড়লে ও আর আসেই না। কখন আইবো?

বড় মেয়ে : কেন? কোনও কিছু আনা বাকি আছে কি? শ্বশুর : না, সবই আনছি। শুধু মিষ্টিটা…

বড় মেয়ে : দাও, আমি নিয়ে আসছি।

অর্কাংশু : এইমাত্র তো এলেন। এখনই আবার দোকানে ছুটবেন? আপনি বসুন। আমি যাচ্ছি। বলুন, কী আনতে হবে?

শ্বশুর : এমনি কিছু আনতে হইবো না। শুধু এট্টু দই আর ক’খানা রসগোল্লা। রসগোল্লা না পাইলে কমলাভোগ। মাথা পিছু দুই-তিন পিস কইরা আনলেই হইবো।

অর্কাংশু : ঠিক আছে, আমি নিয়ে আসছি।

বড় মেয়ে : বাবা, আর কিছু আনতে হলে একেবারে বলে দাও। বারবার যাবে নাকি?

শ্বশুর : না না, সব কিছু একজনরে দিয়া…

অর্কাংশু : বলুন না…

শ্বশুর : সকাল থিকা একের পর এক কাজ কইরা যাইতাছ, আমার বলতেও খারাপ লাগে…

বড় মেয়ে : তোমার ও সব লাগে? এই ভয়ে তোমার জামাই সকালে আসতে চায় না…

অর্কাংশু : খারাপ লাগার কী আছে? আমি আমার বাড়ির জন্য দোকানে যাই না? তবে? কী আনতে হবে বলুন… যাচ্ছি যখন, যা যা আনতে হবে, একেবারেই নিয়ে আসি।

শ্বশুর : বলতে ছিলাম কি… ক’টা পান যদি আনতে পারতা… ওই খানদশেক মিঠা পাতা মিঠা পান…

অর্কাংশু : ঠিক আছে, নিয়ে আসছি। রীনা, তুমি খেলা করো, আমি একটু আসছি।

রীঝা : বাবা, আমি যাব।

অর্কাংশু : না, তোমার মা চাউমিন করছে। এক্ষুনি হয়ে যাবে। ঠান্ডা হয়ে গেলে আর খেতে পারবে না।

রীঝা : ঠিক আছে, যাও।

বড় মেয়ে : বাবা, আর কিছু আনার বাকি আছে নাকি?

শ্বশুর : নাঃ, ওই মিষ্টি পানটাই বাকি ছিল, হইয়া গেল…

বড় মেয়ে : ঠিক তো? তা হলে তোমার জামাইকে ফোন করি। হ্যালো, তুমি কোথায়? না না, সব কেনাকাটা হয়ে গেছে। তুমি চলে এসো…

তিস্তা : রীঝা, এই নাও, ঝপ করে খেয়ে নাও তো মা…

রীঝা : উপর, কী গরম…

তিস্তা : ওই চামচটা দিয়ে একটু নাড়াচাড়া করো, এক্ষুনি ঠান্ডা হয়ে যাবে।

বড় মেয়ে : আর কেউ আসেনি?

তিস্তা : না রে, এখনও কেউ আসেনি। বড় জামাইবাবু কখন আসবে?

বড় মেয়ে : এই এসে যাবে এক্ষুনি। ফোন করেছিলাম…

তিস্তা : ও কোথায় গেল?

বড় মেয়ে : বাবা পাঠাল। পান আনতে…

তিস্তা : বাবা না… সত্যি, পানটাও…

 

(কোলাহল, অনেক লোকের কথাবার্তা)

 

অর্কাংশু : বাবা তা হলে আমরা আসি?

শ্বশুর : এখনই যাইবা?

অর্কাংশু : অনেক আগে এসেছি তো…

রীঝা : ও দাদু, দাদু…

শ্বশুর : তাই, কী মা?

 

(অনেক লোকের কথাবার্তা, গুঞ্জন)

 

বড় মেয়ে : এই প্রথমবার বোধহয় জামাইষষ্ঠীতে সকালে এলে, না?

অর্কাংশু : হ্যাঁ।

বড় মেয়ে : এর পর থেকে নিশ্চয়ই বেলা গড়িয়ে যাওয়ার পরে আসবে?

অর্কাংশু : কেন?

বড় মেয়ে : কারণ, আমরাও প্রথমবার সকাল-সকাল এসেছিলাম তো… তাতে ওর যা অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তার পর থেকে আমাকে আগে পাঠিয়ে দিলেও, ও আসে ঠিক খাবার সময়…

শ্বশুর : তোমার মেয়ে কী বলতাছে দেখো…

অর্কাংশু : কী বলছে?

শ্বশুর : বলতাছে ও থাকবো।

অর্কাংশু : না না, কাল স্কুল আছে। খালি ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা।

তিস্তা : কীগো, তোমার হল?

অর্কাংশু : হ্যাঁ, হয়েছে।

তিস্তা : বাবা, তা হলে আমরা যাই?

শ্বশুর : হ্যাঁ, আবার আইসো।

তিস্তা : আসি?

শ্বশুর : হ্যাঁ, আয়। সাবধানে যাইস।

তিস্তা : না, বলছিলাম কি… তুমি বলেছিলে না?

শ্বশুর : কী?

তিস্তা : যাওয়ার সময় মনে করিয়ে দিতে…

শ্বশুর : কী বল তো?

তিস্তা : ওই পঞ্চাশ…

শ্বশুর : পঞ্চাশ!

তিস্তা : তখন তুমি নিলে না… বললে, যাবার সময় মনে করে চেয়ে নিস…

শশুর : ও হোঃ, দেখছস…

তিস্তা : তুমি বলেছিলে বলে মনে করিয়ে দিলাম।

শ্বশুর : এমন ভুলো মন আমার… ঠিক আছে, আমি জামাইয়ের হাতে দিয়া দিতাছি, আসো বাবা, এট্টু আসো তো…

তিস্তা : ওর সঙ্গে মাংস আর পানেরটাও দিয়ে দিও।

অর্কাংশু : বলুন…

শ্বশুর : ওফ্, কোথায় কী রাখসি… কাজের বাড়িতে না কিচ্ছু খুঁইজা পাওয়া যায় না।

অর্কাংশু : কী?

শ্বশুর : আরে, আমার পয়সার থলিটা… কোথায় যে রাখসি…

অর্কাংশু : না পেলে থাক না…

শ্বশুর : ক্যান? থাকব ক্যান? তুমি যা পোলা, মাংসের দামটা যে তুমি নিবা না, সেটা আমি জানি। চাউলের দাম দিতে গেলে তুমি রাগ করবা। মিষ্টির দাম দিতে গেলে তুমি বাড়ি গিয়ে বলবা শ্বশুরমশাই আমারে অপমান করছে। আর পানের দাম দিতে গেলে তুমি নিশ্চয়ই কইবা, সামান্য ক’টা পান আনসি, তার আবার দাম দিতাছেন? না, আমি ওই সব দিয়া তোমারে ছোট করুম না। কিন্তু ওরে যখন কইসি, দিমু, তখন ওর ব্যাগ থিকা যে টাকাটা নিছি, সেটা তোমারে নিতেই হইবো। কত যেন? পঞ্চাশ, না? টাকার থলিটা যে কই রাখসি! এই তাকেও তো নাই! অত ভিতরেও লুকাইয়া রাখি নাই যে, হাত ঢুকাইয়া খুঁজতে হইবো। একটু খাঁড়াও, কই যে রাখছি, এই তো পাইসি। ওফ্, কখন যে কোথায় কী রাখি! ভাগ্যিস পাইলাম, না হইলে যে কী হইত! এ কী! এর মধ্যে কিছু নাই ক্যান? ও, এইটা তো পুরানো থলিটা! দেখস, এইটা হারাইয়া গেসিল। একটা খুঁজতে খুঁজতে আরেকটা পাইয়া গেলাম। যাক, দেখি ভিতরে কত আছে। এই তো, পাইসি। চোখেও ঠিক মতো দেখতে পাই না। দেখো তো বাবা কত আছে…

অর্কাংশু : ও বাবা, এগুলো কী? টাকা না অন্য কিছু? এত ময়লা! এগুলির তো চেহারাই পাল্টে গেছে। মনে হচ্ছে ছাতকুড়া পড়েছে! বোঝাই যাচ্ছে না কোনটা কত টাকার নোট!

শ্বশুর : অনেকদিন ধইরা পইড়া আছে তো… দ্যাখো এট্টু কষ্ট কইরা দ্যাখো…

অর্কাংশু : হ্যাঁ হ্যাঁ দেখছি। এটা বোধহয় দশ টাকা, এটা… হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ, হ্যাঁ… পাঁচ টাকা। আর এটা! এটা মনে হচ্ছে দু’টাকার নোট…

শ্বশুর : থলিটায় খুচরা কিছু পয়সাও আছে। দেখতাছো ঝনঝন করতাছে? কিন্তু এগুলি আর বাইর করুন না। থাউক। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার খালি রাইখতে নাই। তাইলে সবই খালি হইয়া যায়। মোট কত হইলো তাইলে? অর্কাংশু : সাতচল্লিশ টাকা।

শ্বশুর : সাতচল্লিশ? ঠিক আছে, তুমি একটা কাজ করো… বাচ্চা নিয়া অত দূর যাইবা তো? কতক্ষণই বা অপেক্ষা করবা? যা পাইস, এইটা আপাতত রাইখা দাও। পরে আবার যখন আইবা, মনে কইরা বাকিটা চাইয়া নিয়া যাইবা। চাইয়া নিয়ো কিন্তু। আমার তো বয়স হইসে, সব কথা সব সময় আবার মনে রাখতে পারি না। বুঝছো?

অর্কাংশু : আরে, রাখুন না বাবা। সামান্য ক’টা টাকা… শ্বশুর : সে তো জানি। তুমি যা রোজগার করো, তার কাছে পঞ্চাশ-একশো টাকা কিস্যু না। কিন্তু আমার মাইয়াটা? ছাড়বো?

অর্কাংশু : ওকে কিছু বলতে হবে না। ও যদি কিছু বলে, বলবেন দিয়ে দিয়েছি।

শ্বশুর : এটা কী কও? মাইয়ারে মিথ্যা কমু?

তিস্তা : কী গো, কতক্ষণ লাগবে?

অর্কাংশু : আসছি আসছি, তুমি ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়াও। আমি আসছি।

শ্বশুর : তোমারটা না-হয় মিটলো, কিন্তু টাকার থলিটা যে কই রাখলাম…

অর্কাংশু : ও ঠিক পেয়ে যাবেন।

শ্বশুর : পরে পাইয়া তো লাভ নাই। দরকার তো এখন…

অর্কাংশু : এখন টাকা দিয়ে কী করবেন?

শ্বশুর : বাচ্চাগুলি আইসে, ওদের হাতে কিছু না দিলে হয়?

অর্কাংশু : না না, কিছু দিতে হবে না।

শ্বশুর : সে তুমি কইতাছো। কিন্তু আমার তো একটা বিবেক আছে… আমি তো দাদু। আমারোও তো নাতি-নাতনিগো কিছু দিতে ইচ্ছা করে, না কি? একটা কাজ করো, তোমার কাছে কি এক্সটা টাকা পয়সা আছে?

অর্কাংশু : তা আছে।

শ্বশুর : তা হইলে একটা কাজ করো। অনেকগুলি বাচ্চা তো! আমারে তুমি শ’দুই টাকা দিয়ে যাও। হিসাব রাইখো, পাঠাইয়া দিমু। বা যখন আইবা, মনে ক‌ইরা নিয়া নিও।

অর্কাংশু : ঠিক আছে, ঠিক আছে। আ… আ… আ… আপনার কাছে কি তিনশো টাকা আছে?

শ্বশুর : ক্যান?

অর্কাংশু : না, আমার ব্যাগে দেখছি একশো টাকার নোট নেই। সবই পাঁচশোর…

শ্বশুর : সবই পাঁচশো? তিনটা একশো টাকার নোট হইব না? ভালো কইরা দ্যাখো, ভালো কইরা দ্যাখো…

অর্কাংশু : ভাল করেই দেখেছি, নেই।

শ্বশুর : তা হলে আর কী করবা? পাঁচশোই দিয়া যাও। হিসাব রাখতে সুবিধা হইবো। রাউন্ড ফিগার তো…

তিস্তা : কী গো, ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে আর কতক্ষণ রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে থাকব?

অর্কাংশু : যাচ্ছি যাচ্ছি…

শ্বশুর : সাবধানে যাইও।

অর্কাংশু : দাও, বড় ব্যাগটা আমাকে দাও।

তিস্তা : বাবার সঙ্গে কী এত কথা বলছিলে?

অর্কাংশু : কই? কিছু না তো…

তিস্তা : কী? আর কোনও দিন জামাইষষ্ঠীতে সকাল বেলায় শ্বশুরবাড়িতে আসবে?

অর্কাংশু : না, সকালে নয়। এর পর থেকে জামাইষষ্ঠীর আগের দিন রাত্রেই চলে আসব।

তিস্তা : রাত্রে? কেন?

অর্কাংশু : একজন বাবা কতটা অসহায় হলে এ রকম করে, তা জানো?

তিস্তা : মানে?

অর্কাংশু : আসবার সময় তোমার বাবার চোখের দিকে কি একবারও তাকিয়েছিলে?

তিস্তা : কই, না তো…

অর্কাংশু : তাকালে বুঝতে পারতে। তা হলে আর এ সব কথা বলতে না…

রীঝা : বাবা, ওই যে ট্যাক্সি…

অর্কাংশু : তুমি উবের বা ওলা বুক করনি তো?

তিস্তা : না।

অর্কাংশু : ট্যাক্সি ট্যাক্সি… অ্যাই ট্যাক্সি… এ দিকে… এ দিকে… ঘোরান, ও দিকে যাব, ও দিকে…

 

 

(রাস্তায় গাড়ির শব্দ)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.