ব্রিটেনের রাস্তায় নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তুমুল উদ্বেগের মধ্যেই আবারও লন্ডনের রাস্তায় একজন পুরুষের হাতে একজন নারীর হত্যাকাণ্ড লন্ডন জুড়ে বসবাসকারী নারীদের মধ্যে মারাত্মক ভীতির সৃষ্টি করেছে। লন্ডনের রাজধানীতে নারীরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন। যেমন ছিলেন সারা এভারার্ড ও সাবিনা নেসা হত্যার পর। বিবিসি রিপোর্ট অনুযায়ী সাবিনা নেসার খুনের পর কমিউনিটিতে, কাউন্সিলে, কিংবা পুলিশের হাতে কোথাও নারীরা নিরাপদ বোধ করছেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য ২৭ জুন ভোরে ইলফোর্ডের গ্যান্টস হিল স্টেশনের দিকে ক্র্যানব্রুক রোড ধরে হাঁটার সময় “একটি ভয়ঙ্কর আক্রমণে” মাথায় গুরুতর আঘাত পান ৩৫ বছর বয়সী জারা আলেনা, পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। সোমবার মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে যে ২৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে হত্যার সন্দেহে ইলফোর্ড এলাকায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মেট পুলিশের বিশ্বাস জারা আলেনা একটি “সুবিধাবাদী অপরিচিত আক্রমণের” শিকার হয়েছেন।
ইন্ডিপেনডেন্ট দ্বারা পরিসংখ্যান অনুসারে সারাহ এভারার্ডকে অপহরণ ও হত্যার পর গত বছর যুক্তরাজ্যে অন্তত ১২৫ জনেরও বেশি নারী নিহত হয়েছেন পুরুষের হাতে। এই ‘সহিংসতার মহামারী’ প্রমাণ করে যে আমরা নারীরা কোথাও নিরাপদ বোধ করি না।
যেখানে গত বছরে ১২৫ জন নারী প্রাণ হারিয়েছেন, হাজার হাজার নারী ও মেয়েরা তাদের জীবনের প্রতিটি দিনে পুরুষ সহিংসতার শিকার হচ্ছে। নারীদের বিরুদ্ধে পুরুষ সহিংসতার মাত্রা ও তার শেষ কোথায়? আমরা নারীরা কি কখনো রাস্তায় বা আমাদের নিজের ঘরে নিরাপদ বোধ করবো? এই প্রশ্ন আজ আমাদের অনেকের মনে।
সাম্প্রতিক একটি সেন্সাসে দেখা গেছে যে যুক্তরাজ্যে গত এক দশকে প্রতি তিন দিনে একজন নারী একজন পুরুষের হাতে খুন হন, যেখানে যুক্তরাজ্যে প্রতি চার দিনে একজন প্রাক্তন বা বর্তমান সঙ্গীর হাতে একজন নারী নিহত হন। সেন্সাসে দেখা গেছে যে সকল নারীর এক চতুর্থাংশেরও বেশি তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যেখানে ৭১% নারীরা জনসমক্ষে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
নারীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির “মহামারী” মারাত্মক রুপ ধারণ করেছে। এটি কেবল হয়রানি এবং হামলা পর্যন্ত থেমে নেই, এটি নারীদের বিরুদ্ধে মারাত্মক সহিংসতা। লিঙ্গ বৈষম্য এবং নেতিবাচক স্টেরিওটাইপের ফলে নারীদের সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হচ্ছে। তারা তাদের পরিবারের, ঘনিষ্ঠজনদের, এবং তাদের পরিচিত লোকদের দ্বারা নিহত হচ্ছেন।
আমরা যারা মনে করে থাকি যে মহিলারা বাইরে বা রাস্তায় নিরাপদ নয়, তারা ঘরেই বেশি নিরাপদ এবং একজন নারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা হচ্ছে রাস্তা কিংবা বাড়ির বাইরে তাহলে আমাদের সেই ধারনাটি ভুল কারণ নারীরা ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়। অনেক নারীরা নিজেদের ঘরে নিরাপদ নয় এবং তারা তাদের নিজের বাড়িতে সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সম্প্রতি – ২৪শে মার্চ ২০২২, পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রীনের গ্লোব রোডে, নিজ বাড়িতে খুন হন চল্লিশ বছর বয়সী, দুই সন্তানের মা, ইয়াসমিন বেগম। ২৪শে মার্চ, ইয়াসমিন বেগম তার দুই সন্তানদের স্কুলে দিয়ে বাড়ি ফেরেন, কিন্তু স্কুল ছুটির পর ইয়াসমিন বেগম তার সন্তানদের নিতে যাননি দেখে স্কুল কর্তিপক্ষ ফোনে যোগাযোগ করতে ব্যার্থ হলে তারা বিষয়টি পুলিশকে জানান, পুলিশ বাসায় গিয়ে ইয়াসমিন বেগমের লাশ দেখতে পায়।
২৬ মার্চ পোস্টমর্টেমের মাধ্যমে একাধিক ছুরিকাঘাতের কারণে মৃত্যুর কারণ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ইয়াসমিন বেগমকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগে ৪০ বছর বয়সী কাইয়ুম মিয়াকে (প্রায় এক বছর ধরে এই দম্পতির বিচ্ছেদ ছিল), ২৭ মার্চ গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরের দিন হত্যার অভিযোগ আনা হয়। তাকে বার্কিংসাইড ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয় ২৮ মার্চ – এবং ওল্ড বেইলি ৩০ মার্চ। রিমান্ডে নিয়ে আবেদনের শুনানির জন্য ১৫ জুন উলউইচ ক্রাউন কোর্টে উপস্থিতির সময় আসামী খুনের জন্য দোষ স্বীকার করেননি। এই বছরের ৫ ডিসেম্বরের জন্য একটি ট্রায়ালের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে, এবং প্রি-ট্রায়াল পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হবে ২১ নভেম্বর।
মাত্র এক সপ্তাহের ব্যাবধানে, ২ এপ্রিল নিউহ্যামের মেনর পার্কে নিজ বাড়িতে খুন হন ৮০ বছর বয়সী মহিলা সুরেতা বিবি, ৩ এপ্রিল পোস্টমর্টেমের মাধ্যমে বুকে ছুরিকাঘাতের কারণে মৃত্যুর কারণ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ৩৩ বছর বয়সী শেবুল আলীকে স্টারফর্ড মেগিস্ট্রে কোর্টে হাজির করা হয় এবং হত্যার অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়। মৃত বৃদ্ধা এবং আটককৃত শেবুল আলী পূর্ব পরিচিত ছিলেন বলে জানা যায়।
রাজধানীতে হাই-প্রোফাইল হামলার মধ্যে রয়েছে মার্চ মাসে লন্ডনের প্রাক্তন পুলিশ অফিসার ওয়েন কুজেনস কর্তৃক ৩৩ বছর বয়সী সারাহ এভারার্ডকে অপহরণ, ধর্ষণ এবং হত্যা, এবং সেপ্টেম্বরে ২৮ বছর বয়সী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সাবিনা নেসাকে হত্যা।
অনেকটা সারা এভারার্ডের মতোই, ২৮ বছর বয়সী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সাবিনা নেসার হত্যা কাণ্ডের ঘটনাটি গত বছর উল্লেখযোগ্য মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। কোচি সেলমাজ, পূর্ব সাসেক্সের সমুদ্রতীরবর্তী শহর ইস্টবোর্নের একজন গ্যারেজ কর্মীকে গত ৮ই এপ্রিল সাবিনা নেসাকে হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। উল্লেখ্য,
গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে আটটার দিকে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফেরার পথে পূর্ব লন্ডনের কিডব্রুকের একটি পার্কে খুন হন সাবিনা নেসা।
রিপোর্ট অনুযায়ী একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে আক্রমণ করার জন্য পূর্ব সাসেক্স থেকে গাড়ি চালিয়ে (যৌন উদ্দেশ্য প্রণোদিত) লন্ডনে আসেন কোচি সেলমাজ। ২ ফিট দীর্ঘ অস্ত্র দিয়ে সাবিনা নেসাকে বারবার আঘাত করার অভিযোগ উঠে আদালতে। খুনী ব্যাক্তি সাবিনা নেসার মাথায় ততক্ষণ পর্যন্ত আঘাত করতে থাকে যতক্ষণ না সে অজ্ঞান হয়ে যায়, এরপর সে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।, পরের দিন কিডব্রুকের ক্যাটর পার্কে সাবিনা নেসার দেহ পাতায় আবৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
বিচারপতি সুইনি “বর্বর” এই আক্রমণকে যৌন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে মিসেস নেসা “একটি সম্পূর্ণ ভয়ঙ্কর হত্যার সম্পূর্ণ নির্দোষ শিকার যা সম্পূর্ণভাবে আসামীর দোষ”।
তার পরের দিনই সারাহ এভারার্ডের নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্টে মহিলারা আরও বেশি আতঙ্কিত হোন এবং দুঃখ প্রকাশ করেন।
সারার নিখোঁজ হওয়া এবং শুক্রবার ১২ই মার্চ ২০২১ কেন্টের বনভূমিতে পাওয়া তার মৃতদেহের নিশ্চিতকরণ বিশ্বজুড়ে শিরোনাম করেছে। সারাহ এভারার্ডের হত্যাকাণ্ড আমাদের নারীদের বিরুদ্ধে পুরুষ সহিংসতার ও হয়রানির সংস্কৃতির উপর আলোকপাত করে, প্রতিবাদ ছড়ায় এবং সংস্কারের আহ্বান জানায়। এখন সাবিনা নেসার হত্যাকাণ্ড আমাদেরকে হতবাক করেছে।
উল্লেখ্য ৩ মার্চ ২০২১, সন্ধ্যায় দক্ষিণ লন্ডনে এক বন্ধুর বাড়ি থেকে বাড়ি যাওয়ার সময় ৩৩ বয়সী সারাহ এভারার্ডকে অপহরণ, ধর্ষণ এবং হত্যার দায়ে পুলিশ অফিসার ওয়েইন কুজেন্সকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, (সে কখনই কারাগার থেকে মুক্তি পাবে না এবং কারাগারেই মরবে সে) ওল্ড বেইলিতে সাজা দেওয়ার সময়, লর্ড জাস্টিস ফুলফোর্ড হত্যার ঘটনাগুলোকে “জঘন্য” বলে বর্ণনা করেছিলেন।
সারা এভারার্ড‘এর ঘটনা মানুষের মধ্যে নানা প্রস্নের ঝড় তুলে, যেমন ওয়েন কুজেন একজন পুলিশ অফিসার হয়ে সারার সাথে কিভাবে এই জঘন্য আচরণ করতে পারলো? কেন তাকে আগে থামানো হয়নি? সে কীভাবে একজন পুলিশ অফিসার হতে পারে?
নারীরা পুলিশের হাতে কেন এখনো নিরাপদ নয় ইত্যাদি। আমরা নারীদের কাছ থেকে রাগ, ক্ষোভ এবং দুঃখের বহিঃপ্রকাশ দেখেছি কারণ তাদের নিজস্ব ব্যথা এবং অভিজ্ঞতা সারাহ এভারার্ড সম্পর্কে সাম্প্রতিক ভয়াবহ সংবাদে প্রতিফলিত হয়েছে।
সেই সপ্তাহটি আমাদের মহিলাদের জন্য একটি devastating সপ্তাহ ছিল।বিলেতের প্রতিটি নিউজ চ্যানেল, খবরের কাগজের হেডলাইনে সারা এভারার্ড এবং সাবিনা নেসা হত্যার রিপোর্ট, যে সমস্ত মহিলারা এই খবর গুলো দেখেছেন বা পড়েছেন তাদের জন্য নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে দাড়ায় এবং আমি নিজেও একসময় খবর দেখার মনোবল ও হারিয়ে ফেলি, বিস্মিত হই এই ভেবে যে শুধু নারী বলেই আমরা আজ ঘরে কিংবা বাইরে কোথাও নিরাপদ নই।
মহিলারা সোসিয়াল মিডিয়াতে, টুইটারে, রাস্তা-ঘাটে তাদের হুমকি অনুভব করার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন যা খুবই উদ্বেগজনক ছিল।
বিবিসি নিউজ ০৫/০৯/২১ অনুযায়ী পুলিশ পরিদর্শক বলেছেন যে নারীর প্রতি সহিংসতার একটি মহামারী রূপ ধারন করেছে এবং এটিকে সন্ত্রাসবাদের মতোই গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা দরকার।
লন্ডনের মেয়র সাদিক খান সারা এভারার্ডের নিখোঁজ হওয়ার পরে স্বীকার করেছেন যে শহরের রাস্তাগুলি “মহিলা বা মেয়েদের জন্য” নিরাপদ নয় – সঙ্কট মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানান তিনি।
লন্ডনের ভিকটিমস কমিশনার, ক্লেয়ার ওয়াক্সম্যান বলেছেন “এটি পরিষ্কার যে লন্ডনের অনেক মহিলা বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা হারিয়েছেন যেটি খুবই বেদনাদায়ক”।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি এটা স্পষ্ট করে তুলেছে যে নারীরা ঘরে কিংবা বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়। তারা যেমন তাদের নিজের বাড়িতে সহিংসতার ঝুঁকিতে আছেন তেমনই তারা রাস্তায় ও নিরাপদ নয়। এতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে আমাদের আইন ব্যবস্থা ঠিক মতো কাজ করছে না, আমাদের পুলিশ এবং অনেক রাজনীতিবিদদেরও ব্যার্থতা রয়েছে।
সরকার নারীদের আশ্বাস প্রদানের জন্য পরিকল্পিত পদক্ষেপের একটি সিরিজও ঘোষণা করেছে (৪৫ মিলিওন পাউন্ড প্রদান করে) যার মধ্যে রয়েছে নিরাপদ রাস্তার তহবিলের আকার দ্বিগুণ করা, নির্দিষ্ট এলাকায় আলো এবং সিসিটিভির উন্নতির দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।
১৫ ই জুন ২০২২, লন্ডন মেয়র সাদিক খান ‘নারীদের প্রতি সহিংসতার’ মোকাবেলায় ১৮ মিলিয়ন প্যাকেজ উন্মোচন করেছেন। এই কৌশলের অংশে নারী ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য ‘পুলিশ এবং ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা’ পুনর্গঠন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
নারীদের বিরুদ্ধে হয়রানির “মহামারী” মোকাবেলায় ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম ও বিচার ব্যবস্থার সহ ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী, কমিউনিটির লোকদের অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে এবং নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করার লক্ষে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে সবাইকে একসাথে মিলে কাজ করতে হবে।
হুসনা খান হাসি, লেখক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক ।
লন্ডন
৩০/০৬/২২

