[১৯৫০-এর গণতান্ত্রিক ভুমি-সংস্কারের জন্যে বাংলাদেশাঞ্চলের হাজার বছরের ‘প্রজারা’ ভুমি-মালিকানাসহ ‘জনতায়’ পরিণত হয়। এতে আঞ্চলিক জাতীয়তাসহ অধিকার রক্ষার ভিত মজবুদ হয়। এর প্রথম বহিঃপ্রকাশ হলো, ১৯৫২-এর ভাষা গণঅভ্যূত্থান(প্রগতিশীল গণতন্ত্র, ১৯৯১ ও সংবিধান সংশোধনের বিবেচ্য বিয়ষগুলো, ২০১০)। দ্বিতীয় বহিঃপ্রকাশ হলো, ১৯৭১-এ পাকসেনাদের বর্বর আঘাতোত্তর পৃথকরাষ্ট্র গঠণে গণবিদ্রোহ। ১৯৫০-এ গণতান্ত্রিক ভুমি-সংস্কার হলো, বাংলাদেশের জন্যে ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক বিপ্লব। বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতিকরা মার্ক্সবাদী এবং ব্যক্তিমালিকানার বিরোধী হওয়ায় বিষয়টি সনাক্ত করতে সমর্থ হয়নি।]
সরকারী অফিসে ব্যবহৃত রাষ্ট্রের লিখিত-ভাষা হলো রাষ্ট্র-ভাষা। পাটনা-দিল্লী কেন্দ্রিক হিন্দু, বৌদ্ধ বা মুসলিম সম্রাটের শাসনামলে ভারতে অফিসে রাষ্ট্র-ভাষা হিসেবে যথাক্রমে সংস্কৃতি, পালি বা পার্সী ভাষা প্রচলিত ছিল। স্থানীয় শব্দের সমন্বয়ে পার্সীভাষা কয়েক শতাব্দীতে উর্দূভাষায় রূপ পায়। সংস্কৃতবর্ণে লিখে বাহ্মণগণ তা হিন্দু/হিন্দি ভাষায় রূপ দেয়। উর্দূ ও হিন্দী ভাষা পশ্চিম-উত্তর-মধ্য ভারতে কথ্যভাষা হিসেবেও প্রসার পায়। বৃটিশ শাসনামলে দক্ষিণ-ভারতেও প্রসার হয়।
১৮৩৫ সালে পার্সীর বদলে ইংরেজী ভারতের সরকারী-ভাষা হিসেবে চালু করা হয়। সরকারীকর্ম ও শিক্ষায় প্রচলিত থাকায় শতবছরে ভারতে উচ্চ-মধ্যস্তরের জনতার মধ্য ইংরেজী দ্বিতীয়ভাষা হিসেবে প্রসার হয়। বাস্তবতার নিরিখে বহুভাষী বৃহত্তর রাষ্ট্র হওয়ায় সরকারীকর্ম ও শিক্ষায় ইংরেজী চালু রাখা হয়। স্বাধীনতার উষালঘ্নে ভারত ও পাকিস্তানের আওতাভুক্ত প্রদেশগুলোর জাতীয় সমন্বয়ের জন্যে সাম্প্রদায়িক চেতনায় রাষ্ট্রভাষা হিন্দী ও উর্দূ চালুর বিষয়টি যথেষ্ঠ গুরুত্ব পায়।
১৯৪৭ পূর্ব বা উত্তর কিছু সমালোচনা ও প্রতিবাদ হলেও ১৯৪৯-এ হিন্দীকে “একমাত্র রাষ্ট্রভাষা” হিসেবে সংবিধানিক করাতে কংগ্রেস-নেতাদের বিঘ্ন ঘটেনি। তাছাড়া, পার্সী/উর্দূ বর্ণমালায় লেখা আঞ্চলিক ভাষাগুলো হিন্দিবর্ণে লেখাসহ প্রাথমিক-জুনিয়র স্কুলে হিন্দিভাষা চালু করা হয়। অন্যদিকে প্রতিবাদসহ বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা দাবী করায় পাকিস্তানের স্থপতিনেতা জিন্নাহ উর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা নিয়ে আগাননি। ১৯৫৬-এ উর্দূ ও বাংলা উভয়ই সংবিধানিক রাষ্ট্রভাষা হয়।
ভারত ও পাকিস্তানের স্থপতিনেতাদের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে ভাবনা, উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য, ভারতের স্থপতি-নেতারা স্বার্থক হলেও পাকিস্তানের স্থপতি-নেতাদেরা পশ্চাৎপদ বাংলাদেশাঞ্চলে কেন শুরুতেই চালুতেই ব্যর্থ হলো? জনদৃষ্টিতে বলা যায়, ৪ জন শহীদের রক্তে বাংলাদেশাঞ্চলের জনতা ভাষা-অধিকার রক্ষায় সমর্থ হলেও ভারতে ৬৩ জন (মতান্তরে ৯১) জনতার প্রাণ দিতে কেন হলো?
বাংলাভাষার উৎপত্তি ও প্রসার
পলিমাটির কৃষি-প্রকৃতির জন্যে গঙ্গা-যমুনা-মেঘনা নদীর অববাহিকার জনগোষ্ঠীর আঞ্চলিক-বর্ণিক বৈশিষ্ট্যে দেহ-মন-চেতনা উদার। বহুরাজ্যে বিভক্ত হলেও ভারত-সম্রাজ্যের সংলগ্ন/অংশ হওয়ায় এ অঞ্চলের নিরুষ্কুশ জনগোষ্ঠী হিন্দুধর্মের অনুসারী এবং ধর্মীয় বিধি-বিধানে বহু সামাজিক-গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। প্রায় একই জীবনদর্শন-বিধান হলেও ত্রিবর্ণিক সামাজিক-গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রধর্ম হওয়ায় খৃষ্টপূর্ব ৩য় শতকে সিন্ধু-গঙ্গা-যমুনা-মেঘনা অববাহিকায় বৌদ্ধধর্মের প্রসার হয়।
বৌদ্ধধর্মে ইশ্বরবাদ না থাকায়, যুগোপযোগী সংস্কার ও পুনরায় রাজধর্ম হলে ভারতে হিন্দুধর্মের পূণর্জগরণ হয়। সম্রাজ্যের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৌদ্ধরা বঙ্গাঞ্চলের উত্তর ও পূর্বে বৌদ্ধাঞ্চলে অভিবাসী হয়। ৮ম শতকে রাজধর্ম বৌদ্ধসহ উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে পালসম্রাজ্য গড়ে উঠে যা পশ্চিমেও বিস্তৃত হয়। দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের হিন্দু রাজ্যগুলো দক্ষিন-ভারতের সম্রাজ্যে সংযুক্ত হয়। ধর্মভাষা ও রাজভাষা হিসাবে স্বকীয় বর্ণমালায় হিন্দু-অঞ্চলে সংস্কৃত এবং বৌদ্ধাঞ্চলে পালিভাষা প্রচলিত ছিল।
অসীম একেশ্বরবাদ, সুষম সামাজিক বিধান ও শান্তিবাদী জীবনদর্শনের জন্যে ৭ম শতাব্দী শেষ থেকে বৌদ্ধাঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রসার শুরু হয়। আরবীভাষা সম্পুর্ণ ভিন্ন বর্ণ-শব্দ মালায়। সুলতানীমলে বঙ্গদেশে প্রচার-আচারের জন্যে সংস্কৃত-পালি থেকে উদ্ভুত স্থানীয় ‘কুটিলালিপির’ সহজ-সরল-শীলিত বঙ্গলিপি ও স্থানীয় শব্দামালা নিয়ে নুতন বঙ্গভাষায় ইসলামধর্মের দর্শন-বিধানগুলো লেখা হয়। ইসলামধর্মের প্রসারের সাথে সাথে সহজপাঠ্য বঙ্গভাষাও বিস্তার হতে থাকে।
সুলতানীমলের নবগঠিত বঙ্গদেশ (পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশাঞ্চল ও অসমবঙ্গ) ১২/১৩টি জেলা ও বহু পরগনা/থানা ভিত্তিক হওয়ায় রাষ্ট্র-অবকাঠামোগত কারণে জনগোষ্ঠীর চেতনা উদারমুখীসহ রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের বহুমুখী পারষ্পারিক নির্ভরশীল সমন্বয়ের ধারা সৃষ্টি করে। সহজপাঠ্য ও আরবী-পার্সী-উর্দু বর্ণে না হওয়ায় হিন্দু-বৌদ্ধরাও গ্রহণ করায় সমগ্র বঙ্গদেশে বাংলাভাষার গণপ্রসার হয়।
১৯৪৭ পূর্ব বাংলাভাষার পরিস্থিতি
হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান নির্বিশেষে বঙ্গদেশে সহজবাংলা গণভাষায় পরিনত হতে থাকে। তবে সুলতানামলে অফিসে রাষ্ট্র-ভাষা “পার্সীই” চালু ছিল। মোঘল সম্রাজ্যেভুক্তি হওয়ার পরে অফিস-আদালতের রাষ্ট্র-ভাষা হিসেবে ছাড়াও পার্সী-উর্দু ভাষার প্রভাব দৈনিন্দিন জীবনেও বাড়তে থাকে। রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর (১৭০৩), বিহার-উড়িষ্যা-বঙ্গের সমন্বয়ে সুবে-বঙ্গ গঠিত হলে রাষ্ট্র-অবকাঠামো শীথিল হয় এবং বঙ্গাঞ্চল অবনতিশীল হলে বিনগরায়ণ বাড়ে।
রাজধানী মুর্শিদাবাদ হওয়ায় উত্তর-পশ্চিম বঙ্গাঞ্চলে পার্সী-উর্দূ ভাষার প্রচলন বাড়ে। অতঃপর রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে কোলকাতায় স্থানান্তর হওয়ায় বৃটিশের কোম্পানী শাসনামলের দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গাঞ্চলে শহরায়ণ ও পার্সী-উর্দূ ভাষার প্রচলন বাড়ে। তবে সংযুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থায় বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বে প্রেসিডেন্সীর সমন্বয়-কেন্দ্র হওয়ায় কোলকাতা শহরে ইংরেজী ভাষাশিক্ষা, ব্যবসায় ও অফিসকর্মে ব্যবহার বাড়তে থাকে।
১৮৩৫ সালে অফিসকর্মে পার্সীর বদলে ইংরেজীকে সরকারীভাষা হিসেবে চালু করা হয়। ১৮৫৭ উত্তর যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বৃটিশভারতের কেন্দ্র হওয়ায় কোলকাতায় অফিস-ব্যবসাসহ শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজী ভাষার শিক্ষা ও চর্চ্চা বাড়তে থাকে। অফিস ছাড়াও বৃটিশ-ভারতে বিভাগ-জেলা-মহকুমা শহরে স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থে ইংরেজী ভাষার ব্যবহার বাড়ন্ত হয়। তবে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের জনতার বসবাস বাড়ায় কথ্যভাষা হিসেবে কোলকাতায় উর্দূ-হিন্দি ভাষার প্রচলনও বাড়ে।
১৯১২ সালে বিহার-উড়িষ্যাকে পৃথক প্রদেশ এবং বৃটিশভারতের রাজধানী দিল্লীতে স্থানান্তর হলে কোলকাতা থেকে উর্দূ-হিন্দি ভাষী জনতা দ্রুত হ্রাস পায়। পূর্বেই অফিস-আদালতসহ শিক্ষালয়ে পার্সী ভাষা সীমিত হয়। ১৯১২ উত্তর কোলকাতায় দৈনিন্দিন জীবনেও উর্দূ-হিন্দি সীমিত হতে থাকে। তবে দৈনিন্দিন জীবনে বাংলাভাষার ব্যবহার বাড়ন্ত হয়। রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর ও দূরবর্তী হওয়ায় বাংলাদেশাঞ্চলে বাংলাভাষার ব্যবহার বাড়ন্ত ছিল। ১৯১২ উত্তর তা আরও বাড়ে।
১৭৯৩-এর ভূমিব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদী চেতনা ও বাংলাভাষার বিকাশ
পূর্বের প্রান্তিক অঞ্চল এবং ১৭০৩ উত্তর ‘জাতীয়শক্তি’ হ্রাসমুখী থাকায় বৃটিশরা ‘সুবেবঙ্গ’কে প্রথম ও সহজে ‘ভারতীয় বাণিজ্য উপনিবেশ’-এ পরিনত করে (১৭৭২)। বাণিজ্যস্বার্থে আইন-শৃঙ্খলা উন্নতি করার জন্যে গ্রেটবৃটেনের আলোকে সুবেবঙ্গ বা ‘বঙ্গপ্রেসিডেন্সী’র রাষ্ট্র-অবকাঠামো (বিভাগ-জেলা-থানা) পুনর্গঠণ (১৭৮৪-৮৭) করা হয়। ভূমি, খাজনা ও কৃষি ব্যবস্থা ছাড়াও গ্রামীন পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্যে সামন্তাদলে চিরস্থায়ী ভূমিব্যবস্থা প্রচলন (১৭৯৩) করা হয়।
সামন্তাদলে হলেও ভূমির চিরস্থায়ী ব্যক্তি-মালিকানা হলো বঙ্গপ্রেসিডেন্সীতে বৈপ্লবিক সংস্কার। হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম শাসনামলে ভূমিসহ রাজ্য-সম্রাজ্যের মালিকানা ছিল রাজা-সম্রাটদের। ভূমি-প্রশাসক বা জায়গীদার ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমি বিধিকরণ ও খাজনা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। প্রজাশর্তে উত্তরাধিকার বিধানানাবলী অগ্রাধিকার হিসেবে চালু থাকায় প্রজাদের ক্ষেত্রেও আধা-মালিকানার মতো কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। তবে সমগ্র ভারতবর্শে একই ধরণের ব্যবস্থা চালু ছিল না।
১৭৯৩-এর ব্যক্তিমালিকানা ব্যবস্থায় সামন্ত-জমিদারগণ বেঙ্গল-প্রেসীডেন্সী/প্রদেশের মালিক হয়। বৃটিশরা প্রকৃত ঔপনিবেসিক ও বিদেশী শাসকে পরিনত হয়। পরবর্তীতে প্রজাবিক্ষোভের প্রেক্ষিতে প্রজাশর্তে উত্তরাধিকার বিধানানাবলী অগ্রাধিকার হিসেবে চালু হয় এবং প্রজারা আধা-মালিক বৈশিষ্ট্য ফিরে পায়। এতে বঙ্গ-জনতার আঞ্চলিক জাতিসত্ত্বা ও স্বদেশী চেতনার ভিত মজবুদ হয়। কতিপয় পরগণা নিয়ে জেলায় একাধিক মহকুমা গঠণে সমন্বয়ের শীথিলতা কমায় তা আরও বিকাশশীল হয়।
বৃটিশের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রনীতিতে বঙ্গাঞ্চলে বাঙালী মুসলমানরা প্রজাজীবনসহ প্রধানতঃ নিম্ন ও নিম্নমধ্য বিত্তে আবদ্ধ হয়। বাঙালী হিন্দুরা ক্রমে অধিকতর হারে মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তভুক্ত হয়। নুতন রাষ্ট্র-অবকাঠামোতে ঊনবিংশ শতাব্দী ধরে বৈপ্লবিক ধারায় উদারচেতনাসহ বঙ্গীয় জাতিসত্ত্বার বিকাশ হতে থাকে। গ্রেটবৃটেনসহ ইউরোপের জ্ঞান-দর্শন-সাহিত্যের সংস্পর্শে আসায় বাংলা ভাষা-সাহিত্য বৈপ্লবিক উৎকর্ষ হয়। বাঙালী হিন্দুরা রাজনৈতিক জাতিতে পরিনত হয়।
১৯৪৭ উত্তর বাংলাদেশাঞ্চল
মুসলমান শাসকদের থেকে ব্রিটিশরা সুবে-বঙ্গ দখল নেয়। সাম্প্রদায়িক রাষ্টনীতির অধীনে প্রায় সাত প্রজন্মকাল হিন্দু-বাঙালিরা বাড়তি সুবিধাপ্রাপ্ত এবং মুসলমান-বাঙালিরা বঞ্চিত ছিল। বৃটিশভারতের রাজধানী দিল্লীতে স্থানান্তর এবং আসাম ও বিহার-উড়িষ্যাকে আলাদা প্রদেশ হলে (১৯১২) বঙ্গপ্রদেশে মুসলমান-বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়। প্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয়-প্রাদেশিক সরকারব্যবস্থা চালুতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বাড়ন্ত ও সাংঘর্ষিক হলে বঙ্গপ্রদেশ বিভক্তি অনিবার্য হয় (১৯৪৭)। বিভাজনকালে বঙ্গপ্রদেশে হিন্দু ও মুসলমান বাঙালির অনুপাত প্রায় ৪৪% ও ৫৬% এবং পূর্ববঙ্গে ২৯% ও ৭১% ছিল। আসাম থেকে সিলেটযুক্ত হলে তা ২৬% ও ৭৪% হয়। হিন্দু-বাঙালিরা মূলতঃ সামন্ত-জমি, শিল্প, ব্যাংক, ব্যবসা, ইত্যাদির মালিকানাসহ উচ্চতর আয়ভভুক্ত ছিল। মুসলমান-বাঙালিরা ছিল প্রধানতঃ নিম্নতর আয়ভুক্ত প্রজা-কৃষিজীবি। ১৯৪১-এ পশ্চিমবঙ্গের ২১.৭%-এর তুলনায় পূর্ববঙ্গের শহুরায়ণ ছিল মাত্র ৩.৬%। এর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ছিল মুসলমান বাঙালি! পূর্ববঙ্গ ছিল কৃষিভিত্তিক এবং বিত্তহীন নিম্ন ও নিম্নমধ্য আয়ে আবদ্ধ মুসলমান-বাঙালিদের বসবাসকারী অঞ্চল। উপরের তিন আয়গোষ্ঠীতে বঞ্চিতের হার ছিল নিজস্ব জনসংখ্যার অংশীদারীত্ব থেকে প্রায় ৯৩%, ৬২% ও ৩১% কম। ভূমি-সম্পদ-পুঁজির মালিকানায় বঞ্চিতের হার আরও কম ছিল। শহুর, শিল্প ও সামাজিক সেবাখাতে নেতা-উদ্যোক্তা-শিক্ষিত জনতা ছিল অতি নগন্য। বাংলাদেশাঞ্চলের শুরু হয়েছিল “বাড়ন্ত অদ্ভুত দরিদ্র” প্রদেশ হিসেবে।
বৃটিশের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের জনতা ১৭৯৩ থেকে ‘নিজভূমিতে পরবাসী’ ছিল। ১৯৪৭-এর বঙ্গপ্রদেশ বিভাজন ও স্বাধীনতা এবং ১৯৫০-এ গণতান্ত্রিক ভুমি-বন্টনের পরে ‘গণপ্রজা’ থেকে ‘গণজনতা’য় রূপান্তরিত হয়। ভূমির ব্যক্তিমালিকানা জাতিসত্ত্বার আঞ্চলিক চেতনা-শক্তির ভিত মজবুদ করে। আর গণতান্ত্রিক ভুমি-বন্টন ও সুষম-গণতান্ত্রিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠানে ‘আঞ্চলিক জাতিসত্ত্বা’র উদার জাতীয়তাবাদী বিকাশের ধারা দেয়।
১৯৫০-এর গণতান্ত্রিক ভূমি-সংস্কার ও ভাষা-আন্দোলন
১৯৪৭ উত্তর ভারতনেতারা হিন্দিকে ভারতের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা চালুর প্রস্তাবনা রেখে কম বিঘ্নে ১৯৪৯-এ সাংবিধানিক রূপ দেন। ১৯৪৭-এর আগেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনায় প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ হওয়ায় পাকিস্তানের স্থপতিনেতা প্রজ্ঞাবান জিন্নাহ উর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়টি নিয়ে আর আগাননি। করাচী ফিরে কেবল মন্তব্য করেছেন, ‘রাষ্ট্রভাষা চাপিয়ে দেবার বিষয় নয়। উর্দূ একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হলে সমন্বয়ের ভিত্তি বাড়তো’।
উর্দূ একমাত্র রাষ্ট্রভাষার প্রস্তাবনা হলেই বিতর্ক বেড়ে উঠে। ডঃ শহীদুল্লাহসহ তমুদ্দনিক মজলিসের নেতৃত্বে ক্রমশঃ মুসলিম লীগসহ অন্যান্য দলের জাতীয়তাবাদী বয়স্ক-যুব-ছাত্ররা উর্দূর সাথে বৃহত্তর জনতার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানায় এবং তা দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপান্তরিত করে। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতোত্তর বৃটিশ-শাসনমুক্ত হলেও ১৯৫০-এ গণতান্ত্রিক ভুমি-সংস্কারের আগে প্রজা হিসেবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার দাবী ও আন্দোলনকে জোড়দার করার শক্তি ছিল না।
বাংলাদেশাঞ্চলের মানুষ ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা পরে বৃটিশ-শাসনের প্রজামুক্ত হয়। আর ১৯৪৭-এর বঙ্গপ্রদেশ বিভাজনসহ ১৯৫০-এ গণতান্ত্রিক ভুমি-সংস্কারের পরে স্থানীয় জমিদারদের প্রজামুক্ত হয়। উভয়মিলে হাজার বছরের প্রজাদের আঞ্চলিক জাতিসত্ত্বা ও অধিকার রক্ষার ভিত দ্রুত মজবুদ হতে থাকে। তাই ১৯৫২ সালে ‘মাতৃভাষা গণ-অভ্যূত্থান’ হয়। তাই ১৯৫০-এ ভুমি-সংস্কার ছিল বাংলাদেশাঞ্চলের জন্যে “ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক বিপ্লব”।
বৃটিশ-ভারতে একইধরণের ভূমিব্যবস্থা চালু না থাকায় ১৯৪৭ উত্তর ভারতে একইধরণের ভুমি-সংস্কারের প্রয়োজন হয়তো ছিল না। একত্রে ভুমি-সংস্কার হলে পরিস্থিতিও অস্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী তাই ভুমি-সংস্কার নীতিসহ ১৯৫০ দশকের শেষভাগ থেকে পর্যায়ক্রমে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়। এজন্যে ভারত-জনতার ভাষা-অধিকার রক্ষার ভিত মজবুদ ছিল না। তবে ভাষার জন্যে নিজদেশে ৬৩ বা ৯১ জন প্রাণ দেওয়া কতটুক গ্রহণযোগ্য?
শেষের কথাঃ
লাহোর প্রস্তাবনা আন্দোলন ও গণম্যান্ডেটে ১৯৪৭-এর বঙ্গপ্রদেশ বিভাজন হয় যা আজকের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অঞ্চল ও জনতা দিয়েছে (সংবিধানের ২ নং বিধান)। আর ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা ও ১৯৫০-এ গণতান্ত্রিক ভুমি-সংস্কার মিলে আঞ্চলিকসহ গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার ভিত মজবুদ করেছে। এর বিকাশশীল জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারাবাহিকতায় লাহোর প্রস্তাবনা ভিত্তিক ৬ দফা আন্দোলন, গণম্যান্ডেট ও গণশক্তিতে ১৯৭১-এ নুতন পতাকাসহ বাংলাদেশ।
প্রাপ্তির নিরিখে ১৯৪৭-এর বঙ্গপ্রদেশ বিভাজন ও স্বাধীনতার হলো ১৯৭১-এ স্বাধীনতার প্রাপ্তি কেবল বেশী নয়, কয়েকগুণ। ব্যক্তি-মালিকানার বিরোধী হওয়ায় বাংলাদেশের মার্ক্সবাদীদের কাছে ১৯৪৭-এর বঙ্গপ্রদেশ বিভাজন ও স্বাধীনতা এবং ১৯৫০-এ গণতান্ত্রিক ভুমি-সংস্কারের মূল্য উপলব্ধিযোগ্য নয়। ৭০ বছরের পরে এখনও মার্ক্সবাদীরা সর্বত্র লেখেন, “১৯৪৭-এর দেশভাগ”! তাহলে, তাদের দেশ কোনটি এবং ভিত্তি কি? মার্ক্সবাদীরা কি পর্যায়ক্রমে ১৯৪৭ ও ১৯৭১-এর স্বাধীনতার সমর্থক?
লাহোর প্রস্তাবনা ভিত্তিক ৬ দফার রাষ্ট্রদর্শনের আন্দোলন ও গণম্যান্ডেটে ধারাবাহিকতায় ১৯৭১-এর স্বাধীনতা/মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার হলো, সাম্য. মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারসহ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা (স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র)। স্বাধীনতোত্তর স্বৈরক্ষমতার স্বার্থে স্বাধীনতা/মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার বিরোধী জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ভিত্তিক সংবিধান চালু করা হয়্ এবং ১৯৭৫-একদলীয় রাজনীতির অবসানের পরে মুজিব-অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হয়।
দ্বিতীয়-অধ্যায়ে ৬ দফার রাষ্ট্রদর্শন, গণম্যান্ডেট ও মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের আলোকে এবং গ্রেটবৃটেন-জাপান-কোরিয়ার অভিজ্ঞতায় ১৯৮২ থেকে রাষ্ট্র-বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আহ্সানুল করিমের গণতন্ত্রমুখী রাষ্ট্রচিন্তা, পূনর্গঠনের প্রস্তাবানা ও উদ্যোগগুলো থেকে “উচ্চতর সম্মৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে উঠছে (প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেথা, ১৯৮৫, প্রগতিশীল গণতন্ত্র, ১৯৯১, সংবিধান সংশোধনের দিকগুলো, ২০১০ ও সুপ্রীমকোর্টে পেশকৃত প্রতিবেদন, ২০১১)।
বাকী কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ, সুষমমখী জাতীয় বেতন স্কেল, দুইকক্ষ সংসদ, দ্বিতীয়কক্ষ ভিত্তিক নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সরকার প্রধানপদে কারও দুইবারের বেশী না হওয়ার ব্যবস্থা চালু হলে “উচ্চতর সমৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ” গড়ার ১ম-পর্ব শেষ হবে। ২য়-পর্ব হবে ৯টি প্রদেশ ও ১টি ফেডারেল অঞ্চল ভিত্তিক বাংলাদেশ। তাহলে ৫ শতাব্দী বাংলাদেশ “উচ্চতর সমৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” থাকবে।

মোহাম্মদ আহসানুল করিম
===========================
*মোহাম্মদ আহসানুল করিম ১৯৮২ সাল থেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠণ/সংস্কারের উদ্যোক্তা। তিনি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরখা (১৯৮৫), প্রগতিশীল গণতন্ত্র (১৯৯১), সংবিধান সংশোধনের দিকগুলো (২০১০), সুপ্রিমকোর্টে পেকৃত প্রতিবেদন (২০১১) এবং গণতান্ত্রিক সংস্কার সম্পর্কিত বই-নিবন্ধের লেখক। তিনি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ); আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর (টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র) এবং পাবলিক এফেয়ার্সে স্নাতকোত্তর (টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)। তিনি ১৯৮২ ব্যাচে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে ছিলেন।

