আরাকান ইউনাইটেড লীগ এবং সংহতির বিবৃতি

জলের শ্যাওলা

রাহুল- নাম তো শোনাই হোগা ? এটা হিন্দি সিনেমার বাদশাহ্ শাহরুখ খানের কমন একটি ডায়লগ।  রাহুল তো শুনেছি এবং আরাকানের জনগণ শুনেছি, আরাকান গোষ্ঠী বলে শুনেছি, আরাকান জঙ্গী বলে শুনছি, আরাকান আর্মি নাম টি বেশি শুনেছি।  আরাকান ইউনাইটেড লীগ ( ইউএলএ = ইউনাইটেড লীগ অফ আরাকান) এমন নামটিও শুনেছি তবে কখনো কাউকে লিখতে বা ডাকতে শুনছি খুবই কম।

প্রশ্ন  হলো : আরাকান ইউনাইটেড লীগ এবং সংহতির বিবৃতির রাজনৈতিক তাৎপর্য কী ? এবং আদৌও আছে কী ?

আরাকানের জনগণদের তাদের দেশে নিজেদের  অধিকারের বিষয়ে লড়াইয়ের কথা প্রায়শই শুনি। সেই লড়াইয়ে আজ অব্দি আরাকানের জনগণদের একাট্টা  হয়ে লড়াইয়ে সামিল হয়েছিলো, তেমনটা শোনা যায় না।  আরাকানদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে আছে সেই কবে থেকেই এবং একাট্টা হয়েই ২০০৯ সালে ইউনাইটেড লীগ হয়েছিলো। তবে কিভাবে এবং কি উপসর্গ নিয়ে এবং কাদের সহয়তায় ? সেটাই একটু বিশ্লেষণ প্রয়োজন।  তাহলেই রাজনৈতিক তাৎপর্যটি অনেকটাই  পরিষ্কার হবে সামনে আসবে ।

আরাকানদের বিভিন্ন সংগঠনের কার্যকলাপ তাদের দেশে জঙ্গীপনা হিসেবেই খ্যাত। আমি বলছি না যে আরাকানরা জঙ্গী । তবে আরাকানের জনগণ বা তথাকথিত নানান সংগঠনের অস্ত্রধারীরা যতটা না তাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অধিকারের লড়াইয়ে সামিল হয়, তারচেও অনেক বেশিগুণ আমাদের স্বাধীন ভূমিতে অস্ত্রবাজীতে নিমিত্ত ছিলো।

প্রশ্ন হলো, হঠাৎ কোথা থেকে বাংলা ভাষার একুশকে সামনে রেখে, ইউনাইটেডের সংহতির উৎপত্তি হলো ? কারা এই ইউনাইটেডের সদস্য ? কী তাদের কাজ ? কেনোই বা এমন ইউনাইটেডের সংহতির ডাক ? তাদের মূল ভীষণ বা লক্ষ্য কী ?  আমাদের দেশের কাছে কী তাদের প্রত্যাশা ? আন্তর্জাতিক না হউক অন্তত এশিয়া অঞ্চলে তাদের অবস্থান কতটুকু পোক্ত? ভিন্ন কোনো দেশ তাদের কর্মের সাথে সংহতি রাখে কিনা ? বাংলাদেশের সাথে সংহতির ডাক এলো কেনো ? তথাকথিত আরাকানের অস্ত্রধারী সংগঠনগুলো বাংলাদেশের ভূমির এক অংশকে তাদের অধিকার বা বাপ- দাদাদের  ভাবতো, এখনও কী সেই ভাবনা ক্রিয়া করে কিনা ? বাংলাদেশের ভূমিতে তাদের ইতিপূর্বের অরাজকতার জন্য মর্মাহত কিনা ? বাংলাদেশের ভূমি যে সার্বভৌম ও স্বাধীন এবং সীমানা নির্ধারণ করা, সেটার বিপরীতে এখন তাদের পূর্বের অবস্থান রোহিত করবে কিনা ? প্রশ্নগুলো স্বাভাবিক কারণেই মনে এলো এবং এমন প্রশ্ন সংহতির বিবৃতির পড়ে উঠাই স্বাভাবিক। সেই বিবৃতিতে আবার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, সংস্কৃতিক বন্ধন, ভাষার বন্ধনের কথাও উল্লেখ করা।

এমন সব প্রশ্নের উত্তর সহজভাবে অনুধাবন করা সহজ মোটেও নয় কেননা এতে ভূরাজনৈতিক ও সীমান্ত সমস্যা জড়িয়ে। এমন ভূরাজনৈতিক বিষয় বুঝতে হলে, আরাকানে ভারতের উপস্থিতিকে চীন কিভাবে দেখে? এবং চীনকে ভারত কিভাবে দেখে, সেটা অনুধাবন করাটা আগে জরুরী।

চীন আরাকানে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প- কিয়াকফু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্র বন্দর ও সিনো-মিয়ানমার পাইপলাইনে আনুমানিক ৪২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। ভারতের কালাদান প্রকল্প থেকে কিয়াকফুর দূরত্ব আনুমানিক ১০৫ কি.মি.। স্বাভাবিকভাবে ধারণা করা যায়, বেইজিং আরাকানে ভারতের উপস্থিতি সুনজরে দেখে না। এখন প্রশ্ন হতে পারে আরাকানে চীন ভারতকে কিভাবে মোকাবেলা করবে? এর উত্তর হতে পারে, প্রচলিত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশল এবং এসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার। প্রচলিত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশল সম্পর্কে আমরা অবগত অবশ্যই। কিন্তু চীনের এসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ারের ধরন কেমন হতে পারে? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আরাকান আর্মি, জমি রেভুল্যুশনারি আর্মি, উলফা বা এনএসসিএন চীনের প্রক্সি হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে সক্ষম। প্রয়োজনে চীন এ প্রক্সিদের ব্যবহার করবে। ভারতসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমও দাবি করছে বেইজিং জমি রেভ্যুলুশনারী আর্মি, উলফা, এনএসসিএন সহ বেশ কয়েকটি বিদ্রোহী গ্রুপকে অস্ত্র দিয়ে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। চীন এ অভিযোগ সম্পর্কে কোন মন্তব্য না করলেও গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয় পাতায়- “চীন চাইলে বিদ্যমান চোরাচালানের রাস্তা দিয়ে বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ করতে পারে” বলে মতামত দেওয়া হয়। এ থেকে ধারণা করা যায় চীন প্রয়োজনে আরাকানকে ভারতের জন্য বেশ জটিল করে তুলবে।

ভারতের সেভেন সিস্টার্স’ এর সাথে যোগাযোগের জন্য একটি ট্রানজিট প্রকল্প প্রস্তাব করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাবেক প্রয়াত তথ্য উপদেষ্টা জর্জ ভার্গেস, বঙ্গোপসাগর ও মিয়ানমারের কালাদান নদী পথে । পরবর্তীতে সেই প্রকল্পটিই কালাদান মাল্টিমডেল ‘ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ভার্গেসের প্রকল্পটি ছিল কলকাতা থেকে আরাকান পর্যন্ত সমুদ্র পথ, আরাকানের কালাদান নদী হয়ে চিন প্রদেশ পর্যন্ত নদী পথ এবং সেখান থেকে মিজোরাম পর্যন্ত সড়ক পথ।

ইন্দিরা গান্ধী মিয়ানমারের সেসময়কার সামরিক শাসক জেনারেল নি উইনকে প্রকল্পটির ব্যাপারে প্রস্তাব দেন। প্রকল্পটি রাখাইন ও চিন প্রদেশের উন্নয়ন ও বিদ্রোহ দমনে সহায়ক হবে ভেবে জেনারেল উইনও সেসময় প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আশ্বাস দেন। বিধিবাম হয় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে।  ভারত কালাদান প্রকল্পের ব্যাপারে তাদের  আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্কের কারণে ট্রানজিটসহ বিভিন্ন সুবিধা পায়। ভারতের জন্য বিপত্তি ঘটে  ২০০১ সালের পর এ সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়নে ।  বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে ভারতের সাথে ট্রানজিট চুক্তি ও মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত গ্যাস পাইপলাইন চুক্তি বাতিল করে। মূলত সেই সময়েই ভারত নতুন করে কালাদান প্রকল্পের ব্যাপারে পুনরায় আগ্রহী হয়ে উঠে। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০০৮ সালে তারা মিয়ানমারের সাথে কালাদান প্রকল্পের চুক্তি সই করে ২০১০ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু করে ২০০৯ সালে ইউনাইটেড লীগ অফ আরাকান গঠনের মধ্য দিয়ে। এটাই সেই ইউএলএ।

কালাদান মাল্টি মডেল ট্রানজিট প্রকল্পটি মূলত কলকাতা হলদিয়া বন্দর থেকে আরাকানের সিতওয়ে বন্দর পর্যন্ত ৫৩৯ কি.মি. সমুদ্র পথ, সিতওয়ে বন্দর থেকে কালাদান নদী বেয়ে মিয়ানমারের চিন রাজ্যের পালেতওয়া শহর পর্যন্ত ১৫৮ কি.মি. নৌপথ পথ, সেখান থেকে মিজোরাম রাজ্যের আইজাওয়াল পর্যন্ত ১৯৭ কি.মি. সড়ক পথ। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে কলকাতা থেকে আইজাওয়াল পৌঁছাতে যাতায়াত পথ মাত্র ৮৯৫ কি.মি.  হবে। বর্তমানে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে মিজোরামের আইজাওয়াল শহরে পৌঁছাতে ১৮৮০ কি.মি. পথ পাড়ি দিতে হয়। কালাদান প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে শুধু শিলিগুড়ি করিডরের উপর নির্ভরতা কমবে না, দূরত্ব ও ভ্রমণ সময়ও অর্ধেকের কমে নেমে আসবে।

ভারত যে কারণে কালাদান প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে এবং ২০২৩ সালের মধ্যেই সমাপ্তি হবার কথা যদি আরাকানের পরিবেশ শান্ত থাকে। করাণটি একেবারেই স্বচ্ছ, কেননা সীমান্ত বিরোধ ভারত- চীনের দীর্ঘদিনের। ভারতের আকসাই চিন অঞ্চল ও অরুণাচল প্রদেশকে চীন  নিজেদের এলাকা মনে করে। সেকারণে ভারত লাদাখ ও সেভেন সিস্টার্স নিয়ে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বরাবরই ছিলো। এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে থাকা শিলিগুড়ি করিডোর। ৬০ কি.মি. লম্বা ও ২২ কি.মি. প্রস্থের সরু এ করিডোরটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে সেভেন সিস্টার্সে যোগাযোগের একমাত্র পথ। চীনের দোকলাম থেকে যার দূরত্ব মাত্র ১৩০ কি.মি.। দুর্যোগপূর্ণ সময়ে চীনের চুম্বী ভ্যালিতে সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকা সেনাদল  শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে পুরো সেভেন সিস্টার্স ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। নিরাপত্তা ও যোগাযোগের কথা চিন্তা করে ভারত কালাদান প্রকল্পের মাধ্যমে সেভেন সিস্টার্সে প্রবেশের বিকল্প পথ তৈরিতে উদ্যোগী হয়।

সেভেন সিস্টার্স এর কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ভারতকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ডের (এনএসসিএন) ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম-ইন্ডিপেন্ডেন্ট (উলফা-আই) মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। এ সংগঠনগুলো সাধারণত মিয়ানমার সীমান্ত বা দেশটির ভেতর থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। সম্প্রতি তাদের তৎপরতা কিছুটা হ্রাস পেলেও ( বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা এখানে বেশ উল্লেখযোগ্য) ভূরাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তন হলে সংগঠনগুলো নতুন উদ্দীপনায় জেগে উঠতে পারে। ভারত বিশ্বাস করে, কালাদান প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে মিজোরাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতিতে মেকং উপ-অঞ্চল (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম) বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সে কারণে কালাদান প্রকল্পটি ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যন্ড ত্রিদেশীয় হাই ওয়ের সাথে সংযুক্ত করতে চায় যাতে দেশটি মেকং উপ-অঞ্চলসহ আসিয়ানভুক্ত অন্য দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি  ভূরাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে পারে এবং চীনকে একহাত নিতে পারে।

চীন রাখাইনের কিয়াকফুতে গভীর সমুদ্র বন্দর, সিনো-মিয়ানমার তেল-গ্যাস পাইপলাইন ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে। ভারত চীনের এমন  কর্মযজ্ঞকে বঙ্গোপসাগরে কর্তৃত্ব স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদী কৌশল মনে করে। কালাদান প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত বঙ্গোপসাগরের অবস্থান আরও সংহত রাখতে  চায়। উল্লেখ্য যে,  আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে ভারতের ভারী সামরিক স্থাপনা ও বিমানঘাঁটি রয়েছে, যা মালাক্কা প্রণালী ও থাইল্যান্ডে প্রস্তাবিত ক্রা- ক্যানেলে নজর রাখতে সক্ষম।  আরাকানকে ঘিরে মিয়ানমার, চীন ও ভারতের জটিল সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। মিয়ানমারের ধামাকা সংকটে চীন বেশ খোলামেলাভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশটির অর্থনীতিতেও চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। খালি চোখে মিয়ানমারকে চীনের ‘ক্লায়েন্ট স্টেইট’ মনে হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে দেশ দুটোর মধ্যে সম্পর্ক বেশ কৌশলী ও জটিল এবং গভীর।

আরাকান আর্মি, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মিসহ বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন চীনের কাছ থেকে অর্থ, অস্ত্র ও আশ্রয় পায় বলে অভিযোগ রয়েছে এবং প্রমাণও রয়েছে। এথনিক আর্মিদের বেইজিং মূলত নেইপিডো-র (মিয়ানমারের রাজধানী) সাথে ‘বার্গেইনিং চিপ’ হিসেবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে মিয়ানমারও চীনের ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক’ পন্থা মোকাবেলায় ও একচ্ছত্র কতৃত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে ভারত, জাপান ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক গড়েছে। উদাহরণ হিসেবে রাশিয়ার সাথে সামরিক চুক্তি ও জাপানের সাথে উন্নয়ন চুক্তির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। কালাদান প্রকল্প ও ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় হাই ওয়ে প্রকল্পও মিয়ানমারের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশল মনে করা হয়।

মিয়ানমারের ব্যাপারে চীন কার্যত ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক’ পন্থা অবলম্বন করে। অর্থাৎ, চীন মিয়ানমারের সামরিক ও বেসামরিক সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবাদী এথনিক সশস্ত্র গোষ্ঠিদেরও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। উদাহরণ হিসেবে  মিয়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বৃহৎ এথনিক আর্মি ‘দ্য ইউনাইটেড ওয়া স্টেইট আর্মি’র কথা উল্লেখ করা যায়। চীন বেশ খোলামেলাভাবেই এই সশস্ত্র দলটিকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে।

কুইনুন জ্বর সাড়ালেও কুইনুন সাড়বে কে ? কথাটি কেনো বলছি ? আরাকান আর্মি ভারতের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে কেননা ভারতের সাথে আরাকানিদের নিকট অতীতের সম্পর্ক সুখকর নয়। এর মূল কারণ হচ্ছে দিল্লীর সাথে নেপিডো জেনারেলদের সুসম্পর্ক। নেপিডোর অনুরোধে ভারতীয় সেনারা আরাকানি বিদ্রোহীদের কখনো রাজনৈতিক বা সামরিকভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়নি। ১৯৯৮ সালে ভারতীয় সেনারা আন্দামানে ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি অব আরাকানের (এনইউপিএ) ৭ জন শীর্ষ নেতা ও ৫০ জন বিদ্রোহীকে গ্রেপ্তার করে। ভারতীয় সেনারা এনইউপিএ-র ৭ জন শীর্ষ নেতাকে বিনা বিচারে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে খুন করে ও ৩৪ জন বিদ্রোহীদের বন্দি করে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন ভারতের কর্নেল ভি জে এস গ্রিওয়াল। তার এ অপারেশনের পর এনইউপিএ ও তাদের রোহিঙ্গা সহযোগী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন আক্ষরিক অর্থে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমান আরাকান আর্মি সেই এনইউপিএ-র উত্তরসূরী। পরবর্তীতে আরাকান আর্মি সংগঠিত হলে ভারতীয় সেনা বা তাদের স্বার্থের উপর আক্রমণ করেনি। কিন্তু  ২০১৫ সাল থেকে ভারত ও মিয়ানমারের সেনারা আরাকান আর্মির ওপর একের পর এক সমন্বিত আক্রমণ চালায়। ২০১৮-১৯ সালে মিয়ানমার সরকারের অনুরোধ ভারতীয় সেনারা মিজোরামে আরাকান আর্মির ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে ও সব ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়।

প্রতিদান হিসেবে মিয়ানমারের সেনারা সাগাইং প্রদেশে ভারতের নাগা, মিজো ও আসামীয়া বিদ্রোহীদের ওপর আক্রমণ চালায়। ভারতের রক্তক্ষয়ী আক্রমণের পরও আরাকান আর্মি কৌশলগত কারণে আরাকান বা চিন প্রদেশে ভারতের কোন প্রকল্পে বাধা সৃষ্টি করেনি। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে এসে তারা কালাদান প্রকল্পের ৫ জন ভারতীয় কর্মীকে অপহরণ করে। ডিসেম্বরে আরাকান আর্মি  দিল্লীকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়- আরাকানে কালাদান প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে তাদের কর দিতে হবে। আরাকান আর্মি কালাদান প্রকল্পের কাজে বাধা দেয়, কিন্তু কিয়াকফুতে চীনাদের কোন কাজে তারা বাঁধা দেয়না, এ নিয়ে আরাকান আর্মি বেশ খোলামেলাভাবে বলেছে, “চীন আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে, ভারত দেয়নি”।আরাকান আর্মির নেতা জেনারেল তোয়ান ম্রেট নায়েংও বিভিন্ন সময় বিনিয়োগ ও বিভিন্ন অবদানের কথা স্মরণ করে চীনের প্রশংসা করেন। এ থেকে ধারণা করা যায়, ভবিষ্যতে আরাকান আর্মি ভারতের সাথে কঠিন দরকষাকষি করবে। (তথ্যসুত্র: বিবিসি এবং ভারতীয় বাংলা পত্রিকা)।

আরাকান এবং বাংলাদেশ সম্পর্ক কী ? এই প্রশ্নটির উত্তর আরাকানরা প্রায়শই তাদের নিজেদের মতন করে দেয় । বা বলা যায় আপন স্বার্থ এবং তাদের সাথে পৃর্বে ভারত এবং বর্তমান চীনের ওপর নির্ভর করেই সাজায়। আরাকান ইউনাইটেড লীগের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আরাকানের সাথে বাংলা ও বাঙালির সম্পর্ক বেশ পুরনো ( বিবৃতিটির ইংরেজি ভার্সন বাংলায় করার কোনো প্রয়োজনবোধ করছি না)

আরাকানরা ১৭ শতাব্দীতেও চট্টগ্রামের ফেনী পর্যন্ত আরাকান রাজ্যের অধীনে ছিলো বলে প্রায়শই দাবীর খাতা খুলে বসে। তারা ভিন্ দেশের খুঁটার জোরে ভুলে বসে যে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম ও সীমানা নির্ধারিত করা স্বাধীন রাষ্ট্র। এ কথা সত্য যে, ভৌগলিক কারণেই চট্রগ্রাম অঞ্চলের বাঙালিদের সাথে আরাকানিদের যোগাযোগ ছিলো । তবে সেটা কখনোই স্টেট ট্যু স্টেট পর্যায়ের নয়। ৭১ এ গণহত্যার সময় চট্রগ্রামের বাঙালিদের সাথে আরাকানিদের একটা ভালো সম্পর্ক ছিলো, এটাও সত্য। তবে ২০১৭ সালে বাঙালিরা আরাকানিদের রাষ্ট্রিয় সমস্যা বা তাদের আপন রাষ্ট্রিয় দন্দের সময় দুই হাত বাড়িয়ে ১৪ লাখের মতন রোহিঙ্গা আরাকানিদের সাদরে গ্রহণ করেছে এবং তাদের ভরণ- পোষণ সব কিছুর দায়িত্ব নিয়ে শতভাগ পালনও করে যাচ্ছে। এ বিয়য়ে আরাকানিদের কৃতজ্ঞতা বলতে কোনো বচন নেই।

বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে আরাকানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার অধিকার অবশ্যই রাখে এবং রাখতেও হবে কেননা আরাকানের প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা আমাদের ওপর এখন বিষফোঁড়া হয়ে আছে এমনকি পূর্বেও যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন কম ছিলো না। এর সমাধান হতেই হবে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বার্মীজদের সাথে রাখাইনদের বিষয়ে আলোচনা, রাজনীতি, সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে আরাকানে আরও বেশি কৌশলি হতে হবে । এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে  মিয়ানমারের জাতিগত সংঘাত বেশ জটিল। এ জটিল সংকটে বাংলাদেশকে ভেবেচিন্তে সিন্ধান্ত নিতে হবে। মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে বাংলাদেশ নিশ্চিত কিছুই করতে পারবে না, তবে আরাকানে ভৌগলিক কারণেই বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে থাকবে । তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, ভারত- মিয়ানমার,  মিয়ানমার- ভারত সম্পর্ক, মিয়ানমারের চীন প্রদেশে  মিয়ানমারের সশস্ত্র রোহিঙ্গা দল অযথা বাংলাদেশের জন্য মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে।

লেখার শেষে আমাদের সংবিধানে ছোট্ট করে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিতে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির উন্নয়নে (ক) তে বলা আছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রকরণের জন্য চেষ্টা করিবে। এবার আরাকান ইউনাইটেড লীগের বিবৃতিটি বিবেচনায় নিলে তাদেরকে সমর্থন জোগানোর কোনোও সুযোগ থাকে কী ? তাছাড়াও আমাদের রাষ্ট্রকে আরও গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন যে, অত্র অঞ্চলে ভারতের শক্তির প্রদর্শন এবং চীনের অতী আগ্রাসন এই দুইয়ের মাঝে যেনো সাপ- লুডো খেলার ছকে না আঁটকাই। শেষ কথা, আরাকানদের বিশ্বাস করার কোনো যুক্তি আছে কী ? আরও একটি কথা বলা প্রয়োজন, অদূর ভবিষ্যতে অত্র অঞ্চলে মার্কিন মুল্লক থেকে শুরু করে চীন- ভারতে নানান গুটির চাল ভৌগলিক কারণে চলবে। সুতরাং সময়ে সাধু সাবধান ।

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর.কম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.