বিষয়টা হাসি ঠাট্টা বা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার নয় !

বিস্তারিত করেই লেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু পাঠক বুঝতেই পারছেন সঙ্গত কারনে সব কথা বলা যাবে না। তারপরও যেটুকু না বললেই নয়, পরিস্থিতিকে অত হালকা করে দেখার অবকাশ নাই। সরকারের লোকেরা সাফাই গাইছেন, কেউ কেউ যুক্তরাস্ট্রে পুলিশের গুলীতে নিহতের পরিসংখ্যান দিয়ে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এ প্রয়াস প্রকৃত অর্থে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা ছাড়া বৈ তো কিছু না। বাংলাদেশে কে কি বললো যুক্তরাস্ট্র এ সবের থোড়াই কেয়ার করে। বিশ্বব্যপী মানবাধিকার লঙ্ঘনের হাজারো অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে, নিজ দেশে হানাহানি গোলাগুলি নিত্য ঘটনা। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রই, বিশ্ব মোড়ল। আমেরিকাকে এড়িয়ে তাদেরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজকের বিশ্বে টিকে থাকা খুবই দৃরূহ, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোর জন্য তা প্রায় অসম্ভব। উত্তর কোরিয়া কিউবাসহ হাতেগোনা যে দুইচারটা দেশ টিকে আছে অন্য পরাশক্তির সমর্থনে বা নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার দৃঢ়তার কারনে।
আপাত: মনে হচ্ছে কয়েকজন ব্যক্তি বা কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্যাংশন আরোপ- এ আর এমন কি। কিন্তু পর্যবেক্ষক মহল বলছে এর প্রভাব সুদুর প্রসারী। এ ধরনের স্যাংশন শুধু যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমন নিষেধাজ্ঞা না, যার নামে স্যাংশন তার ইম্মেডিয়েট রিশেলশন বা স্ত্রী/স্বামী পুত্র কন্যা ভাইবোন পিতামাতারাও এতে বিভিন্ন জটীলতার সম্মুখিন হতে পারেন। যে বাহিনীর নামে স্যাংশন তার সকল সদস্যই এর আওতায় এসে যেতে পারেন। এর প্রতিক্রিয়া শান্তিরক্ষী মিশন পর্যন্ত গিয়ে ঠেকতে পারে বলেও কেউ কেউ আশংকা করছেন।
আমেরিকার সবচাইতে বড় হাতিযার হচ্ছে ডলার। বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত ডলারই হচ্ছে একমাত্র লেনদেন মাধ্যম। আর এই লেনদেন পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ হয় আমেরিকা থেকে। বিভিন্ন দেশের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভও মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে গচ্ছিত থাকে। অবাধ্য কোন জাতিকে শায়েস্তা করতে ওই একটা অস্ত্রই যথেষ্ঠ। শুধু তাই না, তারা চাইলে ডলারের মাধ্যমে রেমিটেন্স পাঠানোও বন্ধ করে দিতে পারে। পণ্য আমদানী রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিতে পারে। আমেরিকার প্রশাসনিক সিস্টেম খুবই জটীল। নানা প্যাচগোচ। কোন প্যাচে কোনটা ধরে বসে বলা মুশকিল। এইযে বাংলাদেশের জন্য ফুল ব্রাইট স্কলারশীপটা বন্ধ করে দিল, এর সাথে সাম্প্রতিক এই স্যাংশনের কোন যোগসূত্র আছে কিনা কেই বা জানে!
এসব কারনে সাধারনত: মাজায় জোর না থাকলে কেউ আমেরিকাকে ঘাটাতে যায় না।
আমরা যে আমেরিকাকে চটিয়েছি তেমন কিন্তু না, খুবই ভাল সম্পর্ক। সরকারের দায়িত্বশীল লোকেরা রাষ্ট্রদূতকে ‘কাজের মেয়ে মর্জিনা’ বা আমেরিকার মন্ত্রীকে ‘দুই ট্যাকার মন্ত্রী’ বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করলেও ওরা সেসব গায়ে মেখেছে বলে মনে হয় না। বা সেসব কারনে যে এই স্যাংশন তাও না। বলা হচ্ছে বিদেশে বসে কিছু লোক সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, করতেই পারে। এরা কেউ কেউ বিতাড়িত নির্বাসিত, কেউ কেউ হয়তো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। প্রতিশোধ নেবে দেশে ফিরে আসার চেষ্টা করবে এটা তো স্বাভাবিক। কিন্তু জনগনের কষ্টের টাকায় প্রতিপালিত রাষ্ট্রদূতগুলো কি করছে! কয়েকদিন ধরে এই ধরনের কিছু সাবেকের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে টিভি টক শো’তে। কাল এমন একজনকে বলতে শুনলাম- কোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে নাই, দেশে কোন সংকট নাই, চমৎকার গনতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে- অগায়রাবগায়রা! স্টেট ডিপার্টমেন্টে গিয়ে এসব বললে চলবে! প্রতি বছর মানবাধিকার কমিশনগুলো রিপোর্ট দিয়ে এসেছে, সরকারের দায়িত্বশীল লোকগুলো গৎবাধা বুলি আউড়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় কি হতে পারে সেটা আগেই অনুমান করা উচিত ছিল। সেই বুদ্ধিমত্তা এবং ধীশক্তির মানুষ কই! কিছুটা ব্যবস্থা নিলে হয়তো আজকের এই পরিস্থিতির সৃস্টি হতো না। সরকারের এই ব্যর্থতার খেসারত আজ দেশ এবং গোটা জাতির ওপর এসে চেপেছে।
এটা খুবই লজ্জার বিষয় যে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে স্যাংশন নামের একটা কালো স্ট্যাম্প কপালে সেঁটে গেল। এতে গোটা বিশ্বে শুধু দেশের ভাবমূর্তিই যে ক্ষুন্ন হয়েছে তাই নয়, একই সাথে বড় কোন ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয় কিনা তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরী হয়েছে। সেই সাথে মানুষের মনে নানা আশংকার জন্ম দিয়েছে। অনেককেই নানা কাজে ইওরোপ আমেরিকা যাতায়ত করতে হয়। অনেকের ব্যবসা সহায় সম্পত্তি আছে সে সব দেশে। আত্মীয় পরিজনও সেটেল্ড। এখন ভয় পেতে শুরু করেছে এর পর আরও এমন কোন স্ট্যান্ড আসে কিনা যাতে লেখাপড়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়, ভিসা পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে বা ইমিগ্রেশন চেকপয়েন্টে হেনস্থার শিকার হতে হয়! অভিবাসনের সুযোগ রহিত হয়ে যায়।
তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় সরকারের মন্ত্রীরা নানা কথা বলেছেন। সর্বশেষ জানা গেল স্যাংশন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কথা বলা হবে। জনগনকে আশ্বস্ত  করা হয়েছে এই ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কের কোন অবনতি হবে না। খুবই ভাল কথা। মানুষ এই কথার ওপর আস্থা রাখতে চায়। বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ক্ষোভ প্রশমনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহন করে, সেই সাথে দেশে গনতন্ত্র এবং আইনের শাষন, স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করলে জাতি আবার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে বলে আমার বিশ্বাস ।
সাঈদ তারেক, লেখক এবং  সাংবাদিক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.