১৫
টুম্পার মা টুম্পাকে সাধারণত বাজারে পাঠাতে চান না। ও নাকি কোনও দরদাম করে না। উল্টে লঙ্কা, ঢেঁড়শ, পটলের দাম শুনে দোকানদারকে বলে, এত সস্তায় কী করে দাও গো?
একবার মায়ের সঙ্গে বাজার করতে করতে ও-কথা বলতেই ওর মা বড় বড় চোখ করে ওর দিকে তাকিয়েছিলেন। ও তখন মাকে বলেছিল, মা, আমাকে যদি কেউ বলে, এখানে দাঁড়িয়েই গাছ থেকে একশো গ্রাম লঙ্কা ছিঁড়ে দাও তো… একশো গ্রাম লঙ্কার এখানে যা দাম, আমি তো তার দ্বিগুণেরও বেশি টাকা চাইব শুধু গাছ থেকে লঙ্কা পাড়ার জন্য। আর ওরা সেই কোন রাত থাকতে উঠে গাছ থেকে একটা একটা করে লঙ্কা পেড়ে, কোন অজ পাড়াগাঁ থেকে ট্রেনে করে এত দূরে বয়ে নিয়ে আসে। ওরা যে দামে বিক্রি করে, আমার তো মনে হয়, ক্রেতাদেরই উপযাচক হয়ে তার থেকে অন্তত দশ গুণ বেশি দাম ওদের দেওয়া উচিত।
আজ নয়, আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে, ওর বাবা যখন খুব অসুস্থ ছিলেন, বিছানা থেকে উঠতেই পারতেন না, তখন টুম্পার মা টুম্পাকে নিয়ে মাঝে মাঝেই বাজারে যেতেন। আর তিনি মাছের বাজারে কিংবা আনাজের দোকানে দরদাম করতে গেলেই টুম্পা ওর মায়ের হাত ধরে টানাটানি করত।
— কী হয়েছে? জিজ্ঞেস করলেই টুম্পা বলত, ও তো অনেক কম দাম বলছে মা… তুমি আবার কমাচ্ছ কেন?
প্রথম দিন ওখানে কিছু বলেননি ঠিকই, কিন্তু বাড়ি ফিরে এসে ছেলের কীর্তির কথা ওর বাবাকে বলায় ওর বাবা বলেছিলেন, এখন এ সব কথা বলছে তো, আর ক’টা বছর যাক, একটু বড় হোক, রোজগারপাতি করুক, তখন বুঝবে কত ধানে কত চাল…
দিনে দিনে টুম্পা যথেষ্ট বড় হয়েছে। রোজগারপাতিও করছে। কিন্তু ছোটবেলাকার সেই অভ্যাস তার এখনও যায়নি। ওর মা একদিন ওকে বলেছিলন, যখন বাজারে যাবি একটু দরদাম করবি। তার পর কিনবি।
ও বলেছিল, তা হলে আমাকে আর বাজারে পাঠিয়ো না। তাই বেশির ভাগ সময়ই ওর বাবাকে, কখনও-সখনও ওর বোন রিচিকেই বাজারে পাঠাতেন টুম্পার মা। যে দিন কোনও উপায় থাকত না, একমাত্র সে দিনই টুম্পাকে বাজারে পাঠাতেন তিনি। আর ও বাজারে গেলে প্রথমেই এমন দোকান খুঁজত, যেখানে সব জিনিস পাওয়া যায়। সব পাওয়া না গেলেও যত বেশি রকমের জিনিস যেখানে পাওয়া যায়, ও সেই দোকানেই যেত। এবং যেটা যতটা নিতে চায়, আগে সেটা নিয়ে নিত। তার পর দোকানদারকে জিজ্ঞেস করত, কত হল?
সেই টুম্পাকে আজ বাজারে পাঠিয়েছেন টুম্পার মা। যেহেতু ওকে আমআদা কিনতে বললে ও আদা নিয়ে আসে। রাঙালু আনতে বললে আলু নিয়ে আসে। শাঁকালু আনতে বললে শাক নিয়ে আসে। তাই ওকে বাজারে পাঠানোর সময় কী কী লাগবে তার একটা ফর্দ লিখে ওর হাতে ধরিয়ে দেন ওর মা। ও সেটা দেখে দেখে কেনে। আর কেনা হলেই, সঙ্গে নিয়ে যাওয়া কলম দিয়ে সেটার পাশে টিক চিহ্ন মেরে দেয়। সব কেনা হয়ে গেলে বাজার থেকে বেরোনোর আগে ফর্দটায় একবার ভাল করে চোখ বুলিয়ে নেয়, কোনও কিছু বাদ পড়ে গেল না তো!
বাজারে ঢোকার আগেই টুম্পা ঠিক করেছিল, আগে মাছ কিনবে। তার পর আনাজপত্র। কারণ, বেশি দেরি করলে টাটকা মাছ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। টাটকা পাওয়া গেলেও অন্যরা বাছাই করে নিয়ে যাওয়ার পরে যা ঝড়তিপড়তি থাকবে, সেটাই তার ভাগ্যে জুটবে।
কিন্তু মাছপট্টিতে ঢুকে মাছ কিনতে যাওয়ার আগেই ও দেখল, একটা ছোট্ট বেড়ালছানা সামনের সরু নালায় পড়ে একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছে এবং ওঠার জন্য হাঁকপাঁক করছে। না তুললে এক্ষুনি মারা যাবে। ও সঙ্গে সঙ্গে বেড়ালছানাটাকে তুলে বাজারের থলেটা দিয়ে খুব ভাল করে মুছল। থলেটা ভাগ্যিস কাপড়ের ছিল! নয়তো রুমাল দিয়েই মুছতে হত।
ও জানে, এমন বহু লোক আছে, যারা বাড়িতে শখ করে বেড়াল পোষে। কিন্তু যে-ই তার বাচ্চাকাচ্চা হয়, প্রথম দু’-তিন বার তাও কেউ কেউ মেনে নেয়, কিন্তু তার পরেও যখন আবার বাচ্চাকাচ্চা দেয়, তখন সেই বাচ্চার চোখ ফুটলেই হয় বাড়ি থেকে দূরে কারও বাড়ির দরজার সামনে, কিংবা বাজারের মাছপট্টিতে ছেড়ে দিয়ে যায়। তাদের ধারণা, যাদের বাড়ির গেটের সামনে ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছে, তারা কেউ না কেউ ঠিকই বাচ্চাগুলোকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে খাবারদাবার দেবে। পুষবে। সব ক’টাকে না হলেও অন্তত একটাকে তো পুষবেই! এই ভাবে চার জন যদি চারটেকে পোষে তা হলেই হয়ে গেল, আর কোনও চিন্তা নেই।
আর মাছপট্টিতে ছাড়লে, চার দিকে এত মাছ, ছোটখাটো এক-আধটা টুকরোও কি তার ভাগ্যে জুটবে না! যারা মাছ কাটে, মাছ না হোক, একটা-দুটো কানকোও কি তার দিকে ছুড়ে দেবে না! নিশ্চয়ই দেবে। আর যদি নাও দেয়, কোনও অসুবিধে নেই। মাছের গন্ধেই ওদের পেট ভরে যাবে।
যারা এগুলো ভাবে, তারা একবারও ভাবে না, একদম অচেনা-অজানা জায়গায়, বিশেষ করে যে মুখগুলোকে এত দিন ধরে যে ছানাগুলো দেখে এসেছে, যাদের স্পর্শ না হোক, অন্তত উপস্থিতি টের পেয়েছে, সেগুলো না পেলে ওরা কতটা অসহায় হয়ে পড়বে!
মা যা লিস্ট দিয়েছে, সেগুলো কিনতে গেলে হাতের থলেটা তো উপচে পড়বেই, সেটা নেওয়ার পরেও, এটা ওটা সেটা ভরা খানকতক ভারী ভারী পলিপ্যাক ঝুলিয়ে নেওয়ার জন্য তার বাকি হাতটাও আটকে থাকবে। তা হলে বেড়ালছানাটাকে সে নেবে কী করে! একে তো আর এ ভাবে ফেলে রেখে যাওয়া যাবে না! তা হলে তো আবার নালার মধ্যে পড়ে যেতে পারে। আর নালায় যদি নাও পড়ে ও এমনিই মরে যাবে!
মামি যেহেতু বেড়ালভালবাসে এবং বেড়াল পোষে, তাই মামির সঙ্গে থেকে থেকে ওরও মধ্যে বুঝি বেড়ালের প্রতি একটা দরদ গড়ে উঠেছে। না হলে বাজার করা ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ করে ও কেন এই বেড়ালছানাটার কথা ভাবতে শুরু করেছে!
টুম্পা ঠিক করল, পরে এসে নাহয় বাজার করে নিয়ে যাবে। তার আগে বেড়ালছানাটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কী করবে ও! একে নিয়ে তো বাড়ি ঢুকতে পারবে না। তা হলে একেবারে কেলেঙ্কারি কাণ্ড বেধে যাবে। মা ওকেই বাড়ি থেকে বের করে দেবে
টুম্পার মা মনে করেন, বেড়াল বড় অলক্ষুনে জিনিস। বেড়াল নাকি মনে মনে চায়, গৃহকর্তার চোখ অন্ধ হোক। আমি চুরি করে মাছ খাই। শেফালি বেড়াল পোষে দেখেই নাকি ক’বছর পরপরই তাঁর ভাইয়ের অফিস লক আউট হয়ে যায়। গেটের সামনে সাসপেনশন নোটিশ টাঙিয়ে দেয় মালিকপক্ষ। বেড়াল যারা পোষে, তাদের নাকি কোনও দিনও ভাল হয় না
টুম্পা ওর মাকে বহু বার বোঝাতে চেয়েছে, মামার অফিসে তো শুধু মামা একাই কাজ করেন না। কাজ করেন আরও অনেকে। লক আউট হলে মামার মতো তাঁরাও তো অসুবিধেয় পড়েন। তা হলে কি ওঁরা সবাই বেড়াল পোষেন? আবার এমন বহু লোক আছেন, যাঁরা বহু দিন আগে থেকেই বেড়াল পুষছেন অথচ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা সফল। প্রচুর টাকা রোজগার করেন। খুব শান্তিতে আছেন। তাঁদের ক্ষেত্রে কী বলবে
ওর মা বলেছিলেন, আমি এ রকম কোনও কাউকে দেখিনি
টুম্পা মনে মনে বলেছিল, দেখবে কী করে! তুমি কি কোনও সফল লোককে কোনও দিন দেখেছ? না কি, অগাধ টাকার কোনও মালিককে দেখেছ? না কি, খুব সুখে-শান্তিতে আছে, এমন কাউকে দেখেছ? দেখছ তো শুধু বাবাকে আর আশপাশের দিন-আনা দিন-খাওয়া, নানা সমস্যায় জর্জরিত কিছু ছাপোষা মানুষকে। ফলে এ কথা বলার জন্য তোমাকে আমি দোষ দেব না। তোমাকে বোঝাতেও যাব না
টুম্পা পড়েছে এখন মহা সমস্যায়। ও এই বেড়ালছানাটাকে বাড়িও নিয়ে যেতে পারছে না। আবার একে যে এখানে ফেলে রেখে যাবে, তাতেও মন সায় দিচ্ছে না। মনের ভিতরে কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। কী করবে ও! কী করবে
হঠাৎ ওর মাথার মধ্যে কী যেন একটা ঝিলিক দিয়ে গেল। মনে হল, মামির বাড়িতে নিয়ে গেলে কেমন হয়! মামি তো বেড়াল ভালবাসে। একেবারে নিজের সন্তানের মতো। যদি শোনে, নর্দমায় পড়ে যাওয়া একটা ছোট্ট বেড়ালকে দেখেও আমি ফেলে রেখে এসেছি, তা হলে হয়তো আমাকেই যা-তা বলবে। বলবে, ওটাকে নিয়ে এলে না কেন? বরং নিয়ে গেলে হয়তো খুশিই হবে। নির্ঘাৎ মৃত্যুর হাত থেকে একটা বেড়ালছানাকে বাঁচাতে পেরে আনন্দই পাবে
মামির বাড়িতে প্রচুর বেড়াল আছে। মা-বেড়ালও কম নেই। নিজের ছানা না হলেও ওই মা-বেড়ালগুলোই হয়তো এই ছানাটাকে দুধ দেবে। চেটেপুটে একদম সাফ করে দেবে। এরা তো আর মানুষের মতো স্বার্থপর নয়! হ্যাঁ, তাই করি। আগে তো নিয়ে যাই। তার পর দেখা যাবে। যদি বলে, কেন নিয়ে এলে? তখন নাহয় আবার বাজারে ছেড়ে দিয়ে যাব। আমার তো বাজার করা হয়নি। আবার আসতেই হবে। তখন নাহয়… দেখি না কী হয়, সবটাই ওর ভাগ্য
কাঁথায় মুড়িয়ে বাচ্চা নেওয়ার মতো করে বাজারের থলেটায় বেড়ালছানাটাকে শুইয়ে, কোলে করে মামির বাড়ির দিকে হাঁটা দিল টুম্পা। বেড়ালছানাটা চুপটি করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ওকে আঁকড়ে ধর
যাকে কলেজের সহপাঠীরা বারবার বোকা বানাত। যে বোকার মতো সবাইকে বলত, দরকার হলে ব্যবসা বন্ধ করে দেব, তাও স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ে যাব না। যে একদিন কলেজেরই এক বন্ধু অমলের জন্মদিন সেলিব্রেট করতে গিয়ে তিন-চার জন বন্ধুর পাল্লায় পড়ে মিষ্টির দোকানে গিয়ে কম্পিটিশন করে মিষ্টি খেয়েছিল এবং খাওয়ার শেষে ওকে দেখিয়ে সেই বন্ধুগুলো দোকানদারকে বলেছিল, ও টাকা দেবে। বলেই, তাকে একা ফেলে হাসতে হাসতে চলে গিয়েছিল। অথচ সে দিন যার কাছে কোনও টাকাই ছিল না। টুম্পা না এলে তার যে কী হত, কে জানে
সে দিন টুম্পার দেওয়া সেই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য যে টুম্পার বাড়ি গিয়েছিল এবং সেখানে টুম্পার বোন রিচিকে দেখে যার বেশ ভাল লেগে গিয়েছিল, এই তিমির আর সেই তিমির নে
তবুও ও কাউকেই কোনও দিন বলতে পারেনি, ও কেন ব্লক প্রিন্ট ছাড়তে চায় না। আসলে ছোটবেলা থেকেই আঁকার প্রতি ছিল ওর প্রবল টান। ছেলেবেলা থেকেই লক্ষ্মীপুজোর দিন কোনও বাড়িতে ভাল কোনও আলপনা দেখলেই বাড়িতে এসে মনে করে করে ও সেটা হুবহু এঁকে ফেলত। কোথাও কোনও ভাল নকশা দেখলে তার থেকে কিছুটা নিয়ে আর বাকিটা নিজের মন থেকে বানিয়ে বানিয়ে নতুন এক-একটা ডিজাইন বানিয়ে ফেলত। কখনও কখনও হঠাৎ হঠাৎ ওর চোখের সামনে ভেসে উঠত একেবারে নতুন আনকোরা এক-একটা লতাপাতার নকশা
বড়বাজারে যার কাছ থেকে ও রং কিনত, সে-ই একদিন বলেছিল, একই রকম ডিজাইন আর কত দিন চালাবেন? নতুন কিছু ভাবুন, মাথা থেকে নতুন কিছু বের করেন। দরকার হলে ভাল কোনও শিল্পীকে দিয়ে ডিজাইন করান
ওই দোকানদারই হদিশ দিয়েছিল জাহাঙ্গিরের। যে কিনা যে-কোনও ডিজাইন একবার দেখলেই কাঠখোদাই করে একেবারে নিখুঁত ব্লক বানিয়ে দিতে পারে। ও নিজে থেকেই ব্লকে এমন পয়েন্ট করে দেয়, যা মিলিয়ে মিলিয়ে করলে, সে যতগুলো রঙেরই ডিজাইন হোক না কেন, কোনও রঙের ওপরে কোনও রং চাপবে না। সে যত আনাড়ি কারিগরই হোক না কেন
না। কোনও শিল্পীকে দিয়ে নয়, যে আলপনা আর নকশাগুলো তিমির ছোটবেলা থেকে এঁকে এঁকে জমিয়ে রেখেছিল আলমারির ভিতরে, সেগুলোই একদিন বের করে তার মধ্য থেকে কয়েকটা বেছে, একটু এ-দিক ও-দিক করে নতুন এক-একটা নকশা বানাতে লাগল সে। এমন নকশা, যার জুড়ি মেলা ভার। অন্য কোনও দোকানে শুধু ও রকম কেন, ওর ধারেকাছে যায়, এমন ডিজাইন, মাথা কুটলেও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সেগুলো জাহাঙ্গিরকে দিয়ে কাঠের ব্লক বানিয়ে নিয়েছিল তিমির। জাহাঙ্গির বলেছিল, কোনও কানা উঁচু টিনের ট্রে-তে গাড়ির পোড়া মোবাইল ঢেলে তার মধ্যে এই ব্লকগুলো চুবিয়ে রাখবেন। অন্তত চব্বিশ ঘণ্টা। তা হলে এমন শক্তপোক্ত হয়ে যাবে যে, ব্যবহারের পরে ব্রাশ দিয়ে যতই ঘষে ঘষে সূক্ষ্ণ নকশার খাঁজে খাঁজে ভরাট হয়ে থাকা জমাট রং তুলুন না কেন, এই ব্লকের কারুকাজের ওপরে কোনও আঁচড় পড়বে না।
কিন্তু না। গাড়ির পোড়া সস্তার মোবাইল নয়, নিজের আঁকা বলে কথা! তার প্রতি তিমিরের মমতাই আলাদা। তাই ও ব্লকগুলো একদিন নয়, দু’দিনও নয়, টানা তিন দিন চুবিয়ে রাখত একদম একশো পারসেন্ট খাঁটি সরষের তেলে। যেটা কেউ করে না।
যত যত্ন করে ব্লকগুলোকে ছাপার যোগ্য করা হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি যত্ন করে প্রতিদিন ধুয়েমুছে রাখা হত সেগুলোকে। আর যখন সেই ব্লকে ছাপা শাড়ি পরে কেউ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেত, তিমিরের বুকের ভিতরটা যেন কেমন করে উঠত। মনে হত, তার আঁকা নকশা যেন শাড়িটাকে নয়, মেয়েটাকেই রাঙিয়ে দিয়েছে। তখন যে কী আনন্দ হত, তিমির কাউকে সেটা বলে বোঝাতে পারত না।
মাঝে মাঝেই ও এমন এক-একটা নকশা তৈরি করে যে, শাড়ি ছাপার পর ওর মনে হয়, যাই, টুম্পার বাড়ি গিয়ে তার বোনকে একটা দিয়ে আসি। দেখি, তাকে কেমন লাগে। কিন্তু কথা নেই বার্তা নেই, হুট করে কি এ ভাবে কারও বাড়ি যাওয়া যায়! যখন এটা মনে হয়, ও একদম দমে যায়। টুম্পার বাড়ি আর যাওয়া হয় না।
কিছু দিন আগে একটা বাসের মধ্যে টুম্পার সঙ্গে ওর দেখা হয়েছিল। ও বুঝতে পারেনি যে, এত তাড়াতাড়ি সে নেমে যাবে। তাই অন্যান্য কথা হলেও তার বোনের কথা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। এমনকী, বলা হয়নি রাস্তার ধারের টয়লেটের দেওয়ালে মারা সেই পোস্টারটার কথাও। যেটার ছবি ও মোবাইলে তুলে নিয়েছিল।
আচ্ছা, রিচি কি আগের মতো ও-রকমই আছে! ছটফটে, সুন্দর, হাসিখুশি, মিশুকে। না কি একেবারে আপাদমস্তক পাল্টে গেছে! ওকে মুখোমুখি দেখলেও হুট করে আর চিনতে পারবে না! কে জানে! মাঝে তো অনেকগুলো বছর কেটে গেছে!
এর মধ্যেই একদিন স্বপ্নের ভিতরে তিমির একটা অদ্ভুত মন্দির দেখেছিল। অসম্ভব সুন্দর কারুকাজ করা একটা মন্দির। সম্পূর্ণ পাথরের। তার সারা গায়ে ছিল নানা রকম নকশা। যেমন ছিল রথের চাকা, পেখম মেলা ময়ূর, তেমনই ছিল অদ্ভুত অদ্ভুত সব ফুলের কারুকাজ। ছিল বিমূর্ত মূর্তি। আদিবাসীদের নৃত্য। প্রাগৈতিহাসিক যুগের নানা রকম বল্লম নিয়ে যুদ্ধের ছবি। তার মধ্যে ওকে সবচেয়ে বেশি যেটা টেনেছিল, সেটা হল একটা থান ইটের মধ্যে ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটা চতুর্ভুজ।
ঘুম থেকে উঠেও সেটার কথা ও ভুলতে পারেনি। চোখের সামনে যেন ভাসছিল। পাছে ভুলে যায়, তাই ও সেটা সঙ্গে সঙ্গে এঁকে নিয়েছিল। কিন্তু অতি সাধারণ, ছাপোষা কয়েকটা চতুর্ভুজ ওকে এ ভাবে টানছে কেন! ওই চতুর্ভুজের মধ্যে সূক্ষ্ম, অতি সূক্ষ্ম কোনও কারুকাজ লুকোনো ছিল কি!
অনেক ভেবেও তা মনে করতে পারল না ও। তখন মনে করে করে আর একখানা নয়, একটা পুরো থান ইটের মধ্যে যে ক’টা চতুর্ভুজ ও দেখেছিল, হুবহু সে ক’টাই এঁকেছিল। আঁকার পরেও তেমন অভিনব কিছু মনে না হওয়ায় প্রত্যেকটা চৌকো খোপকে ও আলাদা আলাদা রঙে ভরাট করেছিল। আর যে-ই না নানা রঙে ভরাট করা হল, ও একেবারে চমকে উঠল। মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এল কয়েকটা শব্দ— বাঃ। দারুণ তো! এই থান ইট মার্কা নকশাটা দিয়ে যদি শাড়ি ছাপি, তা হলে কেমন হবে!
তিমির সেই ডিজাইনের শাড়ি কল্পনা করে মনে মনে তার চেনাজানা, পরিচিত মেয়েদের একে একে পরাতে লাগল। লম্বা টানটান চেহারা হলে ভালই লাগছে। আবার একটু খাটো হলেই অতটা লাগছে না। মেয়েটার শরীরের সঙ্গে ডিজাইনটা গেলেও কেন যেন মুখের সঙ্গে মিলছে না। দাঁড়িয়ে থাকলে এই ডিজাইনটা এক রকম লাগছে, অথচ হাঁটলেই কী রকম যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। দিনের বেলায় পরলে এক রকম লাগছে, কিন্তু রাত হলেই পুরো বদলে যাচ্ছে। মেজাজ খারাপ থাকলে এক রকম লাগছে, ফুচকা খাওয়ার সময় আর এক রকম লাগছে। ভারী অদ্ভুত ব্যাপার তো! এর আগে তার ছাপা কোনও শাড়ি নিয়ে এ রকম তো হয়নি! তা হলে! কাউকে পরিয়েই যেন শান্তি পাচ্ছে না তিমির। কেমন যেন খামতি-খামতি লাগছে। অবশেষে মনে মনে ভেবে নিল টুম্পার বোন রিচিকে।
রিচিকে শাড়িটা পরাতেই সারা ঘর যেন আলোয় ঝলমল করে উঠল। চারিদিকে তিরতির করে বইতে লাগল শীতল বাতাস। অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ ম’ ম’ করতে লাগল এ-পাশে ও-পাশে। তিমিরের মন খুশিতে ভরে যেতে লাগল। তাই ও ঠিক করল, যে ভাবেই হোক, ও এই ডিজাইনটা শাড়িতে ছেপে প্রথম শাড়িটা রিচিকেই দেবে। কিন্তু কী ভাবে দেবে!
এখন তো টুম্পার সঙ্গে ওর দেখাই হয় না। সেই কবে একদিন দেখা হয়েছিল! ওর অফিসটাও চেনে না যে, ছুটির সময় ওর অফিসের সামনে গিয়ে একটু ঘোরাঘুরি করবে। দূর থেকে দেখতে পেলেই এমন ভান করবে যেন, এ দিক দিয়েই যাচ্ছিল, হঠাৎই দেখা হয়ে গেল। ইনিয়ে বিনিয়ে নানা গল্প করবে। পারলে কোনও চায়ের দোকানে টেনে নিয়ে গিয়ে দু’জনে মিলে চা খাবে। তার পর সুযোগ-সুবিধে বুঝে বলবে, কত দিন তোর সঙ্গে কথা হয় না… আয় না একদিন আমাদের বাড়িতে। সারা দুপুর চুটিয়ে আড্ডা মারা যাবেখ’ন।
তিমিরের দৃঢ় বিশ্বাস, টুম্পা যে ধরনের ছেলে, তাকে ওর বাড়িতে আসতে বললেই, সেও সঙ্গে সঙ্গে তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য বলবে। বলবে, তুই তো আমাদের বাড়ি চিনিস। কলেজে পড়ার সময় তো একদিন গিয়েওছিলি। তুই আগে আয়, তার পর নাহয় আমি যাব। আর ওটা বললেই, পরদিন… না না, বলার দু’-একদিনের মধ্যে গেলেই টুম্পার সন্দেহ হতে পারে, তাই তার দু’দিন পরে, না না, তার সাত দিন পরে ও টুম্পার বাড়ি গিয়ে হাজির হবে।
তবে হ্যাঁ, শুধু রিচির জন্য শাড়ি নিয়ে গেলে ভাল দেখাবে না। ওর মায়ের জন্যও একটা নিয়ে যেতে হবে। মামির জন্য নিলেও ভাল হয়। আর সব ক’টা শাড়িই যেন একটু অন্য রকমের হয়। ওরা কিছু বললে, বলা যাবে— আমার তো শাড়ির কারবার। নতুন এই ডিজাইনটা বানিয়েছি, তাই নিয়ে এলাম। আপনারা পরলে আমার ভাল লাগবে।
আর বেরিয়ে আসার সময় ওর মা যদি একবার বলে ফেলেন, এসো বাবা। আবার এসো। ব্যস। তখন আর টুম্পাকে লাগবে না। টুম্পার ছাড়পত্র ছাড়াই ও যেতে পারবে। টুম্পার মাকে ও তখন বলবে, নিশ্চয়ই আসব মাসিমা। টুম্পার সঙ্গে তো আমার আজকের সম্পর্ক না। সেই কলেজ লাইফ থেকে। অনেক দিন কোনও যোগাযোগ ছিল না, তাই… না হলে কবেই আসতাম…
তার পর থেকে মাঝে মাঝেই ও চলে যাবে টুম্পাদের বাড়ি। তিমিরের মনে হয়, ও যদি দু’-চার দিন যায়, টুম্পা বুঝতে না পারলেও রিচি ঠিকই বুঝতে পারবে, ও কেন যাচ্ছে এবং সে যদি সামান্যতম ইঙ্গিতও দেয়— ব্যস, কেল্লা ফতে! মিয়া বিবি রাজি তো কেয়া করেগা কাজি। টুম্পা আর টুম্পার মা-বাবাকে ম্যানেজ করতে তার এক মিনিটও লাগবে না। তবে তার আগে যে করেই হোক, টুম্পার সঙ্গে একবার দেখা করতে হবে। করতেই হবে। এখনও না করলে এর পরে সত্যি সত্যিই অনেক দেরি হয়ে যাবে। তখন আর কোনও উপায় থাকবে না। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটা করে ফেলতে হবে। এটাই এখন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং প্রথম কাজ। কিন্তু কী ভাবে করবে ও!
চলবে………..

