‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি’ : অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

হেমন্তের গোধূলি আর সন্ধ্যার ভেতরে তেমন তো কোনো ফাঁক থাকে না। গত ১৭ নভেম্বর, ২০২০ হির্শবার্গের গোধূলি আর কলকাতার সন্ধ্যার মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়ে চলে অলোকরঞ্জন । আজ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ( ৬ অক্টোবর, ১৯৩৩ — ১৭ নভেম্বর, ২০২০ ) চলে যাওয়ার একবছর পূর্ণ হল।
‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি’। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের উত্তরপর্বের কবিতায় এক উজ্জ্বল মাইলফলক। সদ্যপ্রয়াত কবির ছ’দশক জোড়া দীর্ঘ কবিতাযাত্রার শিখরে ‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি'(২০১৬), ‘তোমরা কি চাও, শিউলি না টিউলিপ’ (২০১৭), ‘শুকতারার আলোয় পড়ি বিপর্যয়ের চিঠি’ (২০১৮), ‘ঝাউ-শিরীষের শীর্ষসম্মেলনে (২০১৯), ‘বাস্তুহারার পাহাড়তলি’ (২০২০) নিয়ে শেষ পঞ্চকের সূচনা এই হার্দ্যমধুর কবিতার বইটি দিয়েই। পাঠক লক্ষ করবেন তাঁর অধিকাংশ কবিতার বইয়ের নামও ছন্দোময়, তাঁর কবিতার মতোই। মালার্মের মতো তিনি বিশ্বাস করেন, সরকার আসবে যাবে, কিন্তু ছন্দ থেকে যাবে। বক্ষ্যমাণ বইটির নামে এসে গেছে একেবারে লোকায়ত, প্রায় সবার জানা এক ছেলেভুলানো ছড়ার চরণ এবং ছন্দ, শ্বাসাঘাতপ্রধান স্বরবৃত্তে। বইয়ের নামকরণে এবং অনেক কবিতায় বেলাশেষের বা বিদায়ের ছবি, কিন্তু সে বিদায়সুর কোনো নিরাশায় তলিয়ে যায় না। সে-সুর মধুর, কৃতজ্ঞতার,মুগ্ধতার। এই আলো এই সৌন্দর্যে ভরা পৃথিবীর মাঝখানে তিনি হয়ত থাকবেন না, কিন্তু কীই বা আসে যায় তাতে! এইখানে তাঁর জীবনদেবতা রবীন্দ্রনাথের সুরে সুরেগেয়ে উঠতেই পারেন সুধাকণ্ঠ অলোকরঞ্জন ‘নাই যদি রোস নাই রবি’। ‘অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ’ ভরিয়ে তোলবার নেশায়, হলই বা সেটা সায়ন্তনের ‘ক্লান্ত’ ফুলের গন্ধ।
মূলত ‘যৌবনবাউল’ এবং অংশত তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের কবিতা নিয়েই তাঁর কবিতার অনেক আলোচনা শেষ হয়, ‘মরমী করাত’ (১৯৯০) বা ‘রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ'(১৯৯৩) অবধি যার শেষ সীমা। এর একটা কারণ হয়তো, ছোট ছোট প্রকাশন থেকে বের হওয়া তাঁর অনেক বইয়ের অলভ্যতা, দে’জ-কৃত কবিতা সংগ্রহের এ তাবৎ তিনটি খণ্ডই প্রকাশিত। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ নিঃশেষিত। এইসব কারণেই এরপর থেকেই বুঝি শুরু হয়ে যায় পূর্বজ আর এক দাশগুপ্ত কবির মতো পাঠক হারানোর বৃত্তান্ত। উত্তরপর্বের জীবনানন্দ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর অনাগ্রহ কি একই ধাঁচের নয়? এক নদীতে দুবার স্নান করা যায় না। কবিতা থেকে কবিতার সঞ্চারপথে পুনরুক্তিপ্রবণতা খারিজ করে চলা অলোকরঞ্জনের নানা পর্যায়ের কবিতার ধরতাই এখনও অনেক কবিতাপ্রেমী পাঠকের অধরা।
এ শতকে তাঁর লেখালেখি নিয়ে আলোচনা নজরে পড়ে কম। শুধুমাত্র শেষ পাঁচটি কবিতার বইয়ের ঋদ্ধিঋণ বাংলাভাষাভাষী হিসেবে বর্তমান বিনীত প্রতিবেদককে কৃতজ্ঞ করে।
রবীন্দ্রনাথ এক অর্থে তাঁর জীবনদেবতা। রিখিয়া ও শান্তিনিকেতনের দিনগুলি কিশোর কবিকে দিয়েছিল কল্পনাপ্রতিভার বাঁধনহারা স্বতঃস্ফূর্তি, কলকাতায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে তা পেয়েছিল কাঙ্ক্ষিত ফ্রেম, শিল্পের পরিচর্যা। রবীন্দ্রনাথের শেষ দশকের কবিতা তাঁর নিবিড় বন্ধু শঙ্খ ঘোষের মতোই গভীর আগ্রহের বিষয়।
আমাদের বিনীত বিবেচনায়, তাঁর জীবনদেবতা রবীন্দ্রনাথের মতো অলোকরঞ্জনেরও কবিতা-যাত্রায় শেষ দশকটি নব নব উন্মেষশালিনী কল্পনাপ্রতিভায় বেড়া-ডিঙোনো দৌড়বীরের মতো বাংলা কবিতার কম্প্র সীমারেখাকে দিকদিগন্তরে বিস্তীর্ণ করার বিবরণ। একটি দ্রবপাত্রের মতো অস্থির আয়তনের ভেতরেও কবি বজায় রাখছেন তাঁর এপিক শ্বাস, বাংলার অজস্র লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক, ছোটো ছোটো প্রকাশনের হাতে উজাড় করে বিলিয়ে দিচ্ছেন তাঁর অমূল্য সব কবিতা, গদ্য। স্রোতের মধ্যে ধ্রুবতারার আদলের মতো কবিতার শাশ্বত ফুটে বেরুচ্ছে কবিতার নৈমিত্তিকের ভেতরে। ঘরোয়া তাঁর শিকড়চেতনা এসে মিশছে দুনিয়াজোড়া শরণার্থীচেতনায়, যুদ্ধের বিরুদ্ধে, গণহত্যার বিরুদ্ধে তাঁর বদ্ধপরিকর জেহাদে। সীমান্তহারা টিউলিপের পাশে তাঁর কবিতার সবুজ ছায়ার প্রদোষে দীপাবলি জ্বেলে আছে দেশজ শিউলি।
উত্তরপর্বের উন্মেষ ঘটে গিয়েছিল ইতিমধ্যে। ২০০৫ সাল। চলে গেলেন তাঁর সারা জীবনের আশ্রয় ও তাঁর বৃহৎ পরিবারের অগণন ভাইবোনের ‘বড়ো বৌদি’ শ্রীমতী ট্রুডবার্টা দাশগুপ্ত।
২০০৬ এ প্রকাশিত দুটি বই ‘ওষ্ঠে ভাসে প্রহত চুম্বন’ (এবং মুশায়েরা) এবং ‘সমস্ত হৃদয় শুধু ভূকম্পপ্রবণ হয়ে আছে’ (কবিতীর্থ) স্বভাবতই বিদায়বিধুর। ‘ওষ্ঠে ভাসে প্রহত চুম্বন’-এর কবিকে দেখব বাড়িতে অনবরত স্ত্রীর ছবির সামনে মোম জ্বালতে আর সমাধিতে শুয়ে পড়তে উৎসুক হতে, ‘কিন্তু কবরের প্রহরীরা/ বলল এ পান্থসদনে যুগ্মশয়নের কোনো অনুমতি নেই…’। এর আগে বইয়ের বিভাব কবিতায় আমরা দেখেছি, মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রীর অনুরোধ ‘তুমি আমার বন্ধ চোখের পাতায় চুম্বন রোপণ কোরো না’ ফেলতে অপারগ কবির ওষ্ঠে ভাসে প্রহত চুম্বন। হির্শবার্গের শূন্য ঘরে প্রয়াত স্ত্রীর ছবির সামনে একের পর এক মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আছেন কবি, সেখানে তখন জীর্ণ পাতা ঝরার বেলা। আশেপাশে ছড়ানো অজস্র শুকনো পাতায় যে-কোনো সময় বিপজ্জনক অগ্নিসংযোগের সম্ভাবনা থেকে শুশ্রূষু এবং শক্ত হাতে তাঁকে সরিয়ে আনছেন সবচেয়ে ছোটো ভাই দীপঙ্কর দাশগুপ্ত, যিনি একদা স্পোর্টসম্যান, কবির মতো যিনিও জার্মানিপ্রবাসী।
অনুজ কবি শ্যামলকান্তি দাশকে উৎসর্গ করা পরের কবিতা-বই ‘দুধে আলতায় কুয়াশায় আঁকা ছবি’র প্রচ্ছদ প্রয়াতা কবিপত্নী ট্রুডবার্টা দাশগুপ্তের করা। এ বইয়ের ‘রাজ্ঞী আমার’ কবিতায় দেখব, ‘সারা আকাশ ছেয়ে রয়েছে মৃত্যুশোকে’ তবু দাবি উঠছে ‘সূর্য আর নক্ষত্রের পদাবলি’র। ‘ইন্দ্রধনুর কাঁটা বিছানো সাঁকোয় কাঁটা বিছিয়ে বলো/ আমারই দায় তার উপরে সাঁতার কাটা।’ কবি ক্রমে সে দায় গ্রহণ করতে থাকেন। এ বইয়ের সূচনা-কবিতাতেই দেখি, ‘..আমার রয়েছে/ রবার্ট ফ্রস্টে আঁকা আযোজন পথ’। সেই কবে অন্তরঙ্গ সুহৃদবর শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে সংকলন বিশ্বকবিতার অনুবাদগ্রন্থ ‘সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত’ (১৯৬৩), যেখানে ফ্রস্টের ‘Stopping by the Woods on a Snowy Evening’ এর পুনরাবৃত্ত অন্ত্য চরণযুগল ‘And miles to go before I sleep’ তাঁর অনুবাদে হয়েছিল, ‘ঘুমোবার আগে আযোজন পথ বাকিপ’, তার পর থেকেই বুঝি ‘আযোজন’ শব্দটি তাঁর ভারি প্রিয়। (আর প্রায়শই, সে-শব্দ যে ছাপাখানার কারসাজিতে ‘আয়োজন’ ছাপা হয়ে থাকে, সে প্রসঙ্গ স্বতন্ত্র!) কবির যাত্রা তাই অব্যাহত থাকে কবিতার পথে।
বৃহৎ পরিবারের সদস্যরা পাশে দাঁড়িয়েছেন মাঙ্গলিক শুশ্রূষার অর্ঘ্য নিয়ে। ছোট বোন কিটি, ভ্রাতৃবধূরা, ভ্রাতুষ্পুত্রেরা। ভগ্নীপতি প্রকাশ বসু, আরো অনেক ভাই, বোন। দেশে-বিদেশে অগণিত গুণমুগ্ধ ছাত্র, পাঠক, লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক, তাঁর অনুবাদকেরা। বিশ্বভরা তাঁর প্রীতিধন্য সেবাময় চিকিৎসকেরা। ইতিমধ্যে কবির নিজের একটি স্ট্রোক হয়ে গেছে, স্ত্রীর মৃত্যুর পরে এসেছে অনিবার্য নিরাশাকরোজ্জ্বলতা।
স্বজনের শুশ্রূষায় ভর করে কবি ক্রমে উপনীত হলেন ‘আলো, আরো আলো’র (২০০৯, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০১৩) উপকূলে। নতুন প্রকাশনী ‘অভিযান’ থেকে প্রকাশিত এই তাঁর প্রথম বই। তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের নাম তাৎপর্যপূর্ণভাবে ‘বয়সের ছাপ মুছে ফেলি বল্কলে’ (২০১০)। বয়স বাড়লেও জীবনের প্রতি টানে, কৌতূহলে, মানুষের প্রতি বিশ্বাসে, স্নেহে (ও ভালোবাসায় কবি প্রাণবন্ত। প্রকাশক ‘প্রতিভাস’, যে-প্রকাশন তাঁর অনেক বইয়ের প্রকাশক, ‘যৌবনবাউল’ও পুনঃপ্রকাশিত তাদের হাতেই। প্রকাশ করে চলেছে গদ্যসংগ্রহ। দে’জ যেমন ‘কবিতা সংগ্রহ’।
‘আলো, আরো আলো’র বিভাব কবিতায় ‘সূর্যাস্তে রুপোর খনির মধ্যে নেমে শেষ নিঃশ্বাসের আগে অরুণোদয়ের দিকে হেঁটে’ গ্যোয়টের শেষ সংলাপ “আলো, আরো আলো”। প্রথম কবিতাতেই সতীর্থ বিনয় মজুমদারের সুদীর্ঘ স্মরণ, ‘সেই-যে কবে কার্ল মার্কস তাঁর কানের ঝিনুকে মন্ত্র ঢেলে দিয়েছিলেন নিত্যনৈমিত্তিক অন্নবস্ত্রের সংস্থান থেকে মুক্ত হওয়ার স্বাধীনতা মানুষের চূড়ান্ত পারমিতা, সেই জায়গাটায় বিনয় আমৃত্যু থেকে যেতে পারলেন।…এই ত্রুবাদুরের ভালোবাসা নিঃসহায় প্রজ্ঞারই সমার্থক। যে-ঈশ্বরী তাঁর সুরশৃঙ্গারের আরাধ্য প্রতিমা, সেই বিয়াত্রিচে চিরদিনই কবির ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান।’ আর এ অমোঘ পঙ্ক্তি ‘শুধুমাত্র মানুষই কবিতা লিখতে সক্ষম, কেননা তাঁর চক্ষে তৃষ্ণা, তাঁর বক্ষ জুড়েও।’ এ বইতেই দেখব ‘সেই আমিও অলোকরঞ্জন/শব্দে-আলোয় যে চায় দূরান্বয়।’ শব্দ-আলোর দূরান্বয়ী কবি ‘আলো, আরো আলো’র উপান্তে, শেষ পাতাটার আগের পাতায় কূলকিনারালোলুপ এই প্রতীতিতে দ্রঢ়িষ্ঠ, ‘চোর নিয়েছে থালাবাসন, মাটি থেকে ভাত তবু খাব না।’
এই পর্বে লেখা হল সদ্য-অতিক্রান্ত রবীন্দ্রজন্মের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষ্যে নিবেদিত নিবন্ধসম্ভার ‘রবীন্দ্র-আলোকবর্ষে’ (২০১২) এবং আমাদের বক্ষ্যমাণ বই ‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি’র সহজাত ‘নাচের আড়ালে লুকিয়ে কে ছায়ানট?’ (২০১৬) -এর মতো মুক্তোপম নিবন্ধগ্রন্থ। কবিদের নতুন প্রকাশনী ‘পাঠক’ থেকে প্রকাশিত এ দুই প্রবন্ধগ্রন্থ ।
ঈশ্বর-নিরীশ্বরের দোলাচল নিয়ে দুখানি কবিতার বই এল অব্যবহিত পৌর্বাপর্য নিয়ে, ‘সে কি খুঁজে পেল ঈশ্বরকণা?’ (২০১২) আর ‘নিরীশ্বর পাখিদের উপাসনালয়ে’ (২০১৩)। উল্লেখ্য, এই পর্বের প্রায় সবকটি কবিতার বইয়ের প্রকাশক ‘অভিযান’।
পার্থপ্রতিম দাসের অসামান্য প্রচ্ছদে শোভিত পাঁচ ফর্মা-ছাপানো এই ‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি’ বইয়ের বিভাব কবিতায় কবি লিখছেন,
মনের ভেতর গুমরে ওঠে
ধাই-মার সেই দাবি
‘মাছের কাঁটা পায়ে বিঁধলে
দোলায় চেপে যাবি
দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি
গুনতে গুনতে যাবি’…
প্রথম কবিতার নাম ‘২০২’। বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিবিজড়িত ২০২ রাসবিহারী এভিনিউ ঘিরে “আমাদের তারুণ্যের শেষ তীর্থ ‘কবিতা ভবন’।” শ্মশানের অন্য নাম ‘পিতৃবন’। এ বইয়ের ‘পিতৃবন’ কবিতায় তাই পেয়ে যাই তাঁর স্নেহাপ্লুত বাবা বিভূতিরঞ্জন দাশগুপ্তকে, শ্রীমান অলোকরঞ্জনকেই যেন তিনি চেয়ে চেয়ে দেখছেন তাঁর ‘ক্ষমাহীন দুর্বলতায়’। দূরান্বয়ে স্মরণে আসে, কবি শ্রীমধুসূদনের ‘মেঘনাদবধকাব্যে’র ‘প্রেতপুরী’ নামধেয় অষ্টম সর্গে লক্ষ্মণের শক্তিশেলের প্রতিকারকামনায় সশরীরে স্বর্গলোকগামী রামের দর্শন পেয়ে ঊর্ধ্বলোকবাসী পুত্রশোকে লোকান্তরিত দশরথের স্নেহাকুল মুখচ্ছবি,যিনি রামকে দেখে বলে উঠছেন, ‘আইলি কি রে এ দুর্গম দেশে / এতদিনে, প্রাণাধিক, দেবের প্রসাদে,/ জুড়াতে এ চক্ষুর্দ্বয়?’। ‘পিতৃবন’ কবিতায় অলোকরঞ্জন দেখেন, তাঁর পিতার পিছনেই দাঁড়িয়ে পিতামহ দক্ষিণারঞ্জন,’যৌবনবাউল’-এর সুখ্যাত ‘আমার ঠাকুমা’ কবিতার সেই ‘শহরবিদ্বেষী’ মানুষটি, যিনি সাঁওতাল পরগনার রিখিয়ায় ভিটেপত্তন করে তাঁর বড়ো নাতি অলোকরঞ্জনের বয়স যখন ‘বড়োজোর পনেরো’, তখনই সেই জ্যেষ্ঠ পৌত্রের হাতে ‘তবু আমায় পারিবারিক দুর্গাপূজার ভার তুলে দিয়েছিলেন’। এভাবেই পরিজনেরা ঘুরে ঘুরে আসেন অলোকরঞ্জনের কবিতায়, যেমন অনুধাবন করেছেন শঙ্খ ঘোষ (‘আমার বন্ধু অলোকরঞ্জন’) এবং সাম্প্রতিক ‘দেশ’-এর স্মরণ পর্যায়ের এক লেখায় জয় গোস্বামী (‘অলোকরঞ্জনের পরিজন’)। আর সেই পরিজনদের সীমা বিস্তারিত হতে হতে চলে দুনিয়াভর, রক্তসম্পর্কহীন দীনতম বৃদ্ধ মানুষটিও কবির আত্মীয়। প্রসঙ্গত আগ্রহীদের জ্ঞাতার্থে, অলোকরঞ্জনের কবিতায় কবির নিজের নাম ও তাঁর কবিবন্ধু-পরিজনদের নামোল্লেখ নিয়ে এক নিবন্ধ আছে ‘নতুন কবিসম্মেলন’-র অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (Alokranjan Dasgupta) সংখ্যায় (আগস্ট, ২০১৯)।
আর, এ বইতেই টানা গদ্যে লেখা ‘অনাবাসী যদি অনুবাদ করে’ কবিতায় লিখলেন, ‘তুলসীতলার আজলকাজল মায়ামদির নিরাপত্তার ঘেরাটোপ থেকে একবার বেরিয়ে পড়লে ইহমানুষের কপাল থেকে বাস্তুদেবতার আশীর্বাদ চিরতরে অবলুপ্ত হয়ে যায়, তার বরাতে তখন চলতে থাকার চালচিত্তির ছাড়া অন্যতর কোনো বিধিলিপি অবশিষ্ট থাকে না। তখন থেকেই সম্ভবত ভাষাই হয়ে ওঠে মানুষের একমাত্র আবাসন।’ হাইডেগার-অনুরণিত এই আভাষণ অলোকরঞ্জনেরই সিলমোহর হয়ে ওঠে আজকের ভুবনজোড়া শরণার্থীর মেলায়।
এ বইয়ের ‘কবিতা লেখার গরজে’ কবিতায় পাচ্ছি ‘আশৈশব সুহৃদ’ শঙ্খ ঘোষকে :
দুপুরের কাছে নিরপেক্ষতা শিখি
দুপুর যেন বা আশৈশব সুহৃদ
শঙ্খ ঘোষের মতো..
আসছেন নিভৃতচারী ঘনিষ্ঠ কবিবন্ধু আলোক সরকার :
বিকেলের দিকে আলোক সরকারের
প্রজ্ঞা ও পারমিতা
শিখে নিয়ে আমি থেকে যাই অনাহত..
অলোকরঞ্জনের কবিতা-বইয়ে শতেক যুগের কবিদলের আনাগোনা, শতেক যুগের গীতিকা হাতে। এ বইয়ের ‘স্বরশয্যায়’ কবিতায় স্বভাবসম্মিত সৌজন্যেই উপস্থিত শিল্পাচার্য শিলার ও শিষ্য নোভালিস।
‘দাহ’ কবিতার শেষ দুই চরণ এক মুগ্ধ বিস্ময়ের সামনে আমাদের উপনীত করে:
অর্থাৎ কিনা আমার মৃত্যু হয়নি সুচারুভাবে,
অর্থাৎ কিনা আমাকে নিয়েই তোমরা দিন কাটাবে..
তাই হোক, তবে তাই হোক, অলোকদা!
‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি’ বইয়ের উপান্ত্য কবিতা ‘পালকি করে যারা আমায় নিয়ে চলেছে’তে পাই, তাঁর পালকির বাহকেরাই কখন নিজেদের অজান্তেই তাঁর শববাহক হয়ে উঠেছে। ‘আমার হাতে অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি’, একটি বাহক, যার নাম হয়ত নিখিল, সে চায়, শেষ বইটির ‘অপূর্ণতা পূরণ’ করে ছাপতে দিতে, পুঁথি বিষয়ে গবেষণায় যার নাকি ডি. ফিল..
আহা, সত্যিই আজ যদি আমরা এমন ‘অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি’ খুঁজে পেতাম। ‘কবিসম্মেলন’, Kabita Ashram ‘কবিতা আশ্রম’-সমেত নানা পত্রপত্রিকায় তাঁর সাম্প্রত শারদ অঞ্জলি এখনও তো গ্রন্থভুক্ত হতে বাকি। দৈববাণীর মতো দূরভাষে ভেসে আসা কিছু কবিতার শ্রুতিলিপিকর তো এই প্রতিবেদকও। যেমন একটু আগে উদ্ধৃত ‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি’র ‘কবিতা লেখার গরজে’ কবিতাও দূরভাষে এই অধীনের কাছে ভেসে এসেছিল ‘মাঝি’ -সম্পাদক প্রশান্ত রায়ের হাতে তুলে দেওয়ার গরজে।
এ বইয়ের উপান্ত্য কবিতা ‘পালকি করে যারা আমায় নিয়ে চলেছে’ পড়ে যেই না পাঠক সজলচক্ষু হতে যাবেন, অমনি আসে অলৌকিক শৈলীতে অমোঘ আশ্বাস, বইটির সবশেষ কবিতায়:
আমার জন্য হা-হুতাশন কোরো না, অরুণাভ,
উত্তরাধিকার সূত্রে পুণ্য পারমিতার
ছ’পণ কড়ি সঞ্চয়িত আছে আমার দোলায়,
বাকিটা পথ গুনতে গুনতে যাব!
তাঁর ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পুণ্য পারমিতার’ ঋদ্ধিঋণ আবহমানের বাংলা কবিতায় সঞ্চারিত হোক, এই প্রার্থনা। 🙏
ডাঃ রজতকান্তি সিনহা চৌধুরী , কলকাতা থেকে ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.