আজ কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ( ৬ অক্টোবর, ১৯৩৩ — ১৭ নভেম্বর, ২০২০ ) জন্মদিন। এই প্রথম তাঁর জন্মদিনে তিনি আমাদের মধ্যে নেই। রয়ে গেল তাঁর সোনার তরী ভরা কবিতার অর্ঘ্য, আমাদের দৃকপাতের অপেক্ষায়। তাঁর কবিতার প্রকৃত মূল্যায়ন আজও হয়নি। সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। আসুন, আজ আমরা তাঁর কিছু কবিতা পড়ি।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা উত্তররৈবিক বাংলা কবিতার তো বটেই, আবহমান বাংলা কবিতার নিরিখেও আমাদের এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। আবির্ভাবের সময় থেকেই পঞ্চাশের বুধমণ্ডলীতেও তিনি ভাস্বর ছিলেন। কবিবন্ধু শঙ্খ ঘোষ স্মরণ করেছেন, ১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলের সেই ঐতিহাসিক কবিসম্মেলনে জীবনানন্দ দাশ থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অবদি বাহাত্তর জন কবি কবিতা পড়েছিলেন ; সেখানে একুশ বছর বয়সী তরুণ অলোকরঞ্জনের পঠিত ‘আমার ঠাকুমা’ ( ‘শতভিষা’য় প্রথম প্রকাশিত, পাঁচ বছর পরে ‘যৌবনবাউল’ -এ গ্রন্থভুক্ত) কবিতা অনায়াসেই সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সময় ছিল কলকাতা আর জার্মানির ভেতরে দ্বিধাবিভক্ত। তবু আমৃত্যু তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব এবং পাশপোর্ট রক্ষা করেছিলেন। প্রবাসী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রতিভা নিষ্ক্রমণমুখী নয়, স্বভূমি এবং মাতৃভাষার সঙ্গে নিরন্তর সংলাপরত। সাহিত্য, শিল্পসংস্কৃতি, পরিবেশ বা রাজনীতি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক স্তরের আন্দোলনগুলি তাঁরই হাত ধরে আছড়ে পড়ে বাংলার অজস্র লিটল ম্যাগাজিনে। আজীবন কত ছোট ছোট কাগজে অকাতরে বিলিয়ে গেছেন তাঁর মুক্তোপম কবিতা আর গদ্য। কাব্যভাষার অকুতোভয় প্রয়োগে নতুন বাকরীতির, বাকস্পন্দের জগৎ রচনা করে কবি শ্রীমধুসূদনের পর বাংলা ভাষার আকম্প্র সীমান্তরেখাকে আর কেই বা এমন হাট করে খুলে দিয়েছেন?
আজ দুখানি সান্ধ্য অনুষ্ঠানে দেশবিদেশের বহু গুণিজনের সঙ্গে আমিও তাঁকে স্মরণ করব
।বন্ধুদের স্বাগত জানাই।
আজ তাঁর কবিতা নিয়ে এক লেখা :
‘কারুকথাএইসময়
(সম্পাদক : সুদর্শন সেনশর্মা) পত্রিকায় প্রকাশিত
অচ্ছিন্নপ্রবাহ এক জীবনানীচ্ছায়া : অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতায় শুশ্রুষা আর পরিচর্যার জগৎ
রজতকান্তি সিংহচৌধুরী
(এক)
‘জবাবদিহির টিলা’ (১৯৮১)। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের এক মধ্য পর্যায়ের কবিতার বই। এ বইয়ের দ্বিতীয় কবিতাটিতেই কবি লিখছেন :
দিন চলে যায় সেবাব্রতে
মানুষের আনন্দের স্রোতে
ইচ্ছা যেই জেগে ওঠে প্রাণে
তক্ষুনি দুর্ভিক্ষ কোনোখানে
কিংবা যুদ্ধ বাধে। আত্মদানে
আর পরিচর্যার জগতে
খুঁজে পাই অস্তিত্বের মানে।…
(‘শরণার্থী শিবির’)
‘জবাবদিহি’ কীসের? ‘জবাবদিহির টিলা’ কবির সপ্তম কবিতার বই। পঞ্চাশের দিনগুলিতে ‘বাংলা কবিতার যুবরাজ’ ইতিমধ্যেই ‘যৌবন বাউল’-এর (১৯৫৯) রিখিয়া-শান্তিনিকেতন পর্বের পথের কলস-ভরা ‘কানায় কানায় আলো’ আর ‘একলা খুশির পালক ছড়িয়ে’ কাঁপা ‘কোপাইয়ের জল’ পেরিয়ে এসেছেন। পাঁচের দশকের শেষ বছরে প্রকাশিত এই ঐতিহাসিক বইটির সংযুক্তির-অঙ্গীকার ভরা আস্তিক্যবোধ দায়বিদ্ধ হয়েছে ‘ঐশ্বরিকতার প্রাদুর্ভাবের’ জন্য। আঙ্গিক বদলের কবিতা-বই ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’তে (১৯৬৭) কখনো রাজনীতি, কখনো শারীরিকতার দিকে ঝুঁকে কবিবন্ধু শঙ্খ ঘোষকে উৎসর্গ করা ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’য় (১৯৬৯) কবি এসে দাঁড়ালেন নিত্যব্যবহার্য জীবনের রক্তিমতায়। কিছুটা দূরান্বয়ের ঝুঁকি নিয়েও বলা যায়, এ যেন ইয়েটসের মতো স্বপ্নমদির প্রথম পর্ব পেরিয়ে উত্তরপর্বে নিষ্ক্রমণের দৈনন্দিন দোলাচলে চষ্ক্রমণ।
‘ছৌ-কাবুকির মুখোশ’ (১৯৭৩) বইতে ভৌগোলিকতা এবং চিত্রকল্পে এসেছে আন্তর্জাতিক ছোঁয়া। হাইডেলবার্গে সূর্যাস্ত মিশেছে স্বর্ণসীতা বা কুরুক্ষেত্রে ভীষ্মের
প্রতিমায়। পরবর্তী গিলোটিনে আলপনা’ (১৯৭৭) সত্তরের দশকের হন্যমান দিনগুলির স্মৃতিবহ। কবিতার বই ‘লঘু সংগীত ভোরের হাওয়ার মুখে’তেও দেখি সমস্যাদীর্ণ বাস্তব দুনিয়ার সঙ্গে কবির সংযুক্তির আকুতি। তাঁর শিকড়চেতনা ক্রমশ এসে মিশছে যুদ্ধদীর্ণ পৃথিবীতে শরণার্থী চেতনায়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে ‘জবাবদিহির টিলা’র যে-কবিতার অংশ গোড়ায় উদ্ধৃত, তার নাম ‘শরণার্থী শিবির’।
অথচ সংবেদনশীল কবিকে আগাগোড়াই অভিযুক্ত হতে হয়েছে। কখনো তাঁর কবিতায় ঈশ্বরচেতনার জন্য, কখনো বা নিসর্গমগ্নতার জন্য, আবার কখনো ছন্দে লেখার জন্য। ‘জবাবদিহির টিলা’-য় উপনীত কবি তাই বলছেন :
আর আমার কোনো নিসর্গ নেই, মানুষজন যখন ঘুমিয়ে পড়ে আপাতমৃত লোকালয়ের মধ্য দিয়ে যেতে-যেতে অনুভব করি অনন্ত নিসর্গের আস্বাদ
যেন দেবদারুর দূতীরা ঢেলে দেয় আমার মুখে অমৃত আঃ আমার ঘুম পায় আর দুদিকে খাটিয়া পেতে ঘুমিয়ে থাকে কাতারে কাতারে নরনারী তাদের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাবার পথটাই আজ আমার নিসর্গ
‘জবাবদিহির টিলা’ (১৯৮১) বইয়ের সমালোচনায় তাঁর পঞ্চাশের সহযাত্রী কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত লিখেছেন, “সন্দেহ নেই, অলোকরঞ্জনের রচনা রীতিমতো সমর্থও নিপুণ। তবে তিনি যখন এ-জাতীয় কবিতা লেখেন, ‘আত্মদানে/আর পরিচর্যার জগতে/খুঁজে পাই অস্তিত্বের মানে’, তখন আমিও আমার প্রিয় অলোকরঞ্জনকে দেখে বিপুল স্বস্তি পাই।”
স্বদেশে নকশাল আন্দোলন আর ইমার্জেন্সির ঝাপট, যুধ্যমান বিশ্বে মানবিকতার সংকট কবিকে এই মর্মে দীক্ষিত করল, কবিতাকে শাশ্বতে ন্যস্ত রেখেই সমকালের ফেনিল আবর্তে শামিল হতে হবে। সারা জগতের দূরান্বয়ের স্বপ্ন কবিতায় এখন থেকে জারি রইল সমকাল ও চিরায়তের অন্তর্বয়নে।

(দুই)
এই মিতকথনের গোড়ায় কবিকে ‘জবাবদিহির টিলা’য় দণ্ডায়মান দেখেছি আমরা। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারেও কবি বলেছেন, “ “জবাবদিহির টিলা’য় আমি দাঁড়িয়ে।” ‘যৌবন বাউল’-এর হির্নাটিলা বা ত্রিকূট পাহাড়ের নন্দিত নিসর্গ পিছনে ফেলে কবি মানুষজনের ভেতরেই খুঁজে নিলেন তার নিসর্গ। কিন্তু বাস্তব হল, তার নিসর্গচেতনা বা ঈশ্বরচেতনা আগাগোড়াই মানুষজনকে বুকে জড়িয়ে।
‘যৌবন বাউল’-এ শুধু রিখিয়ানিখিলের নিসর্গসৌন্দর্য নয়, প্রান্তিক লোকজীবনের চলচ্ছবি। ‘শ্মশানে আমি জীবন ছাড়ব না’ এই প্রত্যয়ে শুরু থেকেই বদ্ধপরিকর কবি এ বইয়ের দ্বিতীয় কবিতাতেই দেখছেন দেহাতি মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, ‘অরণ্য মধু ভরে নিতে মৌচাকে/শহরিয়া যতো গ্রামে কেন বাঁধে ডেরা?’ ‘বৃক্ষের বিষাদনেত্রে আয়ত পত্রের অশ্রু পড়ে’ (‘বিষাদবৃক্ষ’) মতো পরিবেশ-সচেতন চরণও এ বইতেই অনুস্যূত। আর ‘নাম খোদাই’ কবিতাতে তো অনুচ্চকণ্ঠ কবি বিবৃত করছেন তাঁর কাব্যপ্রস্থান। ঘুমনিবিড় মাঠ, মুখরা নদী, শীর্ণ টিলা নিয়ে যে প্রকৃতি, আর বুকে নাম খোদাই করলে তা মুছে যেতে পারে। কিন্তু সাঁওতাল পরগনার সেই সহজ, সরল, মাদল বাজিয়ে নাচগানে মুখর মূলনিবাসী মানুষজনের বুকে যদি নাম বপন করা যায়, তারা ভোলে না। বিশে আশ্বিন কবির জন্মদিন। একুশে আশ্বিন জীবনের নতুন বছরে পা দিয়ে কবির শপথ, ‘আমাকে আমি ভুলেছি এই একুশে আশ্বিনে’। আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়াবার এই আকুতি তার জীবনদেবতা রবীন্দ্রনাথের মতো কবির নিজেরও, সূচনাপর্ব থেকেই।
‘যৌবন বাউল’-এর (১৯৫৯) বিশ্রুত ঈশ্বরচেতনা দ্বিতীয় বই ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’ (১৯৮৯) প্রণত হল মানবিকতার দোরগোড়ায়। ‘ঈশ্বরের প্রতি’ কবিতায় কবি লিখলেন, ‘সেদিকে ফেরাও উট, যত দূরে দূরে তুমি কীর্ণ কর তাঁবু, … বিশ্বাসের জল, তুমি পান করো, আমি জল না খেয়ে মরব।’ কিংবা ‘মুখ’ কবিতায় ‘আজকাল অকূল মমতা পাই মানুষের নিসর্গের কাছে’। অথবা, ‘অসনাক্ত, অজস্র মানুষ’ কবিতায় আমরা দেখি, ‘এ যেন সবার ভালোবাসা বরণডালার মতো বুকে এসে আকুল কাঁদায়/অনুমতি করো, আমি ঈশ্বরের নাম গেয়ে উঠি।’ বস্তুত তাঁর ঈশ্বরচেতনাও কোনো অমেরুদন্ডী আনুগত্য নয়, মানুষের ভালোবাসা থেকে জাগ্রত, নশ্বর অস্তিত্বের দেবায়ন। শুশ্রূষা আর পরিচর্যা তাঁর কবিতায় ওতপ্রোত।
আর যা কিছু অমানবিক, যা কিছু এই ভালোবাসার বিরুদ্ধে, যা কিছু নিষ্ঠুর তার প্রতি কবির বিরূপতাও তার নিজস্ব শৈলীতেই।
ধানখেতে এসেছিল বেড়াতে দু’জন,
ধানখেতে শিশু রেখে পালাচ্ছে দু’জন,
‘এবার স্টেশনে চলো’ বলল একজন,
‘এবার স্টেশনে চলো’ বলল একজন।
‘সাঁকো বেয়ে নিচে এসো’ এ ওকে বলল,
সাঁকো বেয়ে নিচে এসো’ এ ওকে বলল
আর নেমে এসে দেখে সুন্দর কাঁথায়
রক্তমাখা শিশু নিয়ে ধানী নৌকো যায়।
( ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’)
[কারুকথা এই সময় নভেম্বর ২০২০-এপ্রিল ২০২১]
‘রক্তাক্ত ঝরোখা’ (১৯৬৯) বইয়ের শেষ অংশ ‘রুদ্রাক্ষের ঋতু-তে দেখব কবি ‘যেন এক ঐশ্বরিক ছেলেধরা’, ‘সকলকে ধরে/পৌঁছে দেওয়া নিজ নিজ অমোঘ ভূমিতে’, কিংবা ‘বাড়িতে-বাড়িতে’ তার মানবিক কর্তব্য।
(তিন)
‘ছৌ-কাবুকির মুখোশ’ (১৯৭৩) বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে ট্রুডবার্টা হেসলিঙারকে, যিনি অচিরেই হয়ে উঠবেন কবিপত্নী শ্রীমতী ট্রুডবার্টা দাশগুপ্ত, কবির ও তার পরিবারের সারা জীবনের আশ্রয়। ইতিমধ্যে কবির ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। প্রেসিডেন্সি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ১৯৫৭ সাল থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত অদীনপুণ্য কবি জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। এখন থেকে পরবর্তী পাঁচ দশক জুড়ে তার সময় কলকাতা ও জার্মানির মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত। এক বৃহৎ যৌথ পরিবারের সব ছোট ছোট ভাইবোনেদের ‘বড়দা’ আলোকরঞ্জনের কবিতায় এসেছে ভাইবোনেদের নাম পিন্টু, কিটি, বুলবুল, কবিবন্ধুর নাম এবং অবশ্যই তার মা, বাবা ঠাকুমা, ঠার্কুদার কথা। তাঁর বিশ্ববীক্ষাও মা থেকে আরম্ভ করে স্বদেশ ও বিশ্বময়ীর আঁচলে সম্প্রসারিত, যে মা হয়ে ওঠেন ‘বসুমতী মা’-এর মতোই কবির প্রতিবাৎসল্যের পাত্রী, ‘মা আজ আমার শিশু’।
‘ছৌ-কাবুকির মুখোশ’-এ কবি সকলের সঙ্গে ‘অচ্ছিন্নপ্রবাহ এক জীবনানীচ্ছায়ে’ নিজেকে খুঁজে পান :
রান্না চড়িয়ে দিল মা এসে সবার জন্য, বঁটির উপর নারকেল-কোরানি ঢেউ দেখি আমি সৈকতে চিকনপুঞ্জ ফেনা
আমরা কয়েকজন আমরা মায়ের দেবতার এলোমেলো তত্ত্বাবধানের মধ্যে আজ ভয়ানক ভালো আছি
সকলের অনন্যতা অচ্ছিন্নপ্রবাহ এক জীবনানীচ্ছায়ে। (‘ফ্রেস্কো’)
জীবন ও বনানীকে মিলিয়ে এক জীবনানী, তার ছায়ায় বেঁচে থাকা। সব মানুষের সঙ্গে বিচ্ছেদবিহীন ভাবে মিলেমিশে। কেননা ‘যে আমাকে তার অন্তর্নিহিত করে, সে আমার অন্তর্গত।’ ‘কোনো অংশ বর্জন করলে শিল্প এসব ধারণা/মানি না বিশ্বাস করো।’ এই প্রতীতিতে কবির যাপন অচ্ছিন্নপ্রবাহ এক জীবনানীচ্ছায়ায় পরিচর্যাময়। তার ভৃঙ্গারে ভরা থাকে ভবিষ্যবিশ্বের শুশ্রূষার শ্বাস।
বন্ধুত্বও তো এক শুশ্রূষা। ‘দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে’ (১৯৮৩) বইয়ের ‘সপ্তম বৃত্তে’ কবিতায় দেখছি দান্তেকে ভার্জিল যেমন ‘দিভিনা কম্মেদিয়া’র সপ্তম বৃত্তে গভীরে/ নিয়ে গিয়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিলো সহযোগীর আব্রহ্মস্তম্ব, অলোকরঞ্জনও চরাচরে খুঁজছেন তেমনি এক সতীর্থ। উদ্দেশ্য?
‘তার সঙ্গে স্বাস্থ্যময় সখ্য আর তীব্র মতান্তর
উদ্ঘাটিত করে দেবে অনন্তের চিদঘন প্রান্তর ৷৷’
‘শতভিষা’ থেকে প্রকাশিত ‘দুই বন্ধু’ (১৯৮৫) কবিতা-পুস্তিকাটি বস্তুত একটিই দীর্ঘ কবিতা। মৃণাল দত্ত ও কালীকৃষ্ণ গুহকে উৎসর্গ করা এ বইয়ের শুরুতেই সেই অমোঘ চরণ
বন্ধুত্বের ইতিহাস সংস্কৃতির ইতিহাস
(চার)
১৯৮৫ সাল। আকস্মিক পথ দুর্ঘটনায় দিল্লিতে প্রাণ হারালেন কবির মেজ ভাই (পিন্টু)। লেখালেখি থেমে না গেলেও বই প্রকাশের ব্যাপারে স্থবিরতা এসে যায় কবির। সংবেদনশীল, শুশ্রূষাময় এক হৃদয়ের অধিকারী কবির পক্ষে যা স্বাভাবিক। ‘ধুনুরি দিয়েছে টংকার’ (১৯৮৮) বইয়ের ‘রাজধানী’ কবিতায় তাই দেখি :
দৃশ্যটা কল্পনা করো : তিনদিনও কাটেনি আমার ভাইয়ের মৃত্যুর পর, তলব পড়েছে সেই কথা মা-কে সই করতে হবে নোটারির কাছে, লৌকিকতা
এইভাবে শোকের উপরে থাকবে শিলমোহর হয়ে! মাকে নিয়ে ভোর থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছি একঠায় (এখানে—রাজধানীতে–সময় শুধুই যায় ক্ষয়ে)
‘আয়না যখন নিঃশ্বাস নেয়’ (১৯৯১) এবং ‘রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ’ (১৯৯৩) বইদুটি আলোকরঞ্জনের কবিতায় বিশ্বজোড়া যুদ্ধ এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সোচ্চার। আয়নার ‘দীর্ঘশ্বাসে’, আমরা দেখব, ‘চরাচর জরিপের কাজ চলছে, বিম্বনের নয়। কবির আশৈশবলালিত কাব্যমীমাংসার জায়গা নিচ্ছে কাব্যজিজ্ঞাসা। যুদ্ধ, সন্ত্রাস এ গণহত্যার বিরুদ্ধে কবির প্রতিরোধও তো তাঁর শুশ্রূষাময় হৃদয়েরই অঙ্গ :
মাকে বললাম তুমি রাতারাতি সমস্ত অভ্যাস বদলিয়ে ফেলো, চশমাটা কেন যেখানে-সেখানে রাখো
অত অৰ্চনা করতে যেয়ো না কাক ডাকবারও আগে…
শেফালির মুখে বারুদ এখন, মৃত্যু দুর্বাঘাসে
‘রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ’-এ দেখি ‘রেখদেউল মেঘের রক্ত লেগে/ভেসে উঠল প্রসন্ন উদ্বেগে’! কেননা কবির পথ ঢেকেছে মন্দিরে মসজিদে।
‘ধুলোমাখা ঈথারের জামা’ (১৯৯৯) বইয়ের বিভাব কবিতায় আমরা দেখব : আমার একজন পূর্বসুরি তাঁর ইথারের জামা দিয়ে মিলিয়ে গেলেন মেঘে, আমি সেটাই সচরাচর পরি তবে কিনা তাতে মেখে নিই ব্রহ্মান্ডের ধূলি…
এ যুগের সবচেয়ে বড়ো মরমী কবি হওয়া সত্ত্বেও অলোকরঞ্জনের ওই ধুলোমাটিকে জড়িয়ে থাকাটা তার কাব্যদর্শনের স্বচিহ্নিত লক্ষণ। সকলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা, উপচে পড়া এক হৃদয়ার্তি তার বৈশিষ্ট্য।
বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী। যেমন আশাবাদী লিটল ম্যাগাজিন নিয়েও। ‘এখনও নামেনি, বন্ধু, নিউক্লিয়ার শীতের গোধূলি’ (১৯৯৯, আনন্দ) বইয়ের বিভাব কবিতায় যেমন দেখি :
কাঁথা-স্টিচ মেঘে মেঘে কবিতার মূল্যবোধগুলি লেগে আছে, লিট্ল ম্যাগাজিনের ব্রতীরা নেয়নি বেয়নেট তুলে, শুধু থেকে থেকে ত্রস্ত হায়নারা জোট বেঁধে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করে ক্ষমতার লোভে, এবং ধ্বংসাবশেষ রেখে যায়, কবিদের কাজ সে-সব বিয়োগফল ধরে রাখা, ওরা বৈতালিক— শালবনে এখন নয়, ভাঙাচোরা নিয়তির ব্যূহে অভিমন্যুতায়, দ্যাখো, কবিতার এই তো সময়…
অভিমন্যু অলোকরঞ্জনের এক প্রিয় পুরাণপ্রতিমা। অভিমন্যুকে তিনি দ্বিতীয় বিজয়ী ভাবেন। জয়-পরাজয় বলে কিছু নেই, নিজের সত্যের কাছে সত্যবান থাকাটাই জয়।
গ্যোয়েটের ‘ডিভান’ বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে বাউল-ফকির-মরমিয়া-দরবেশদের জীবন দর্শনকে পুনরাবিষ্কার করলেন যৌবন-বাউল। তার এই অসামান্য অনুবাদ ‘প্রাচী প্রতীচীর মিলনবেলার পুঁথি’ (১৯৯৭) নামে প্রকাশিত হল। আর নতুন শতাব্দীতে কবির নতুন কবিতার বই ‘শুনে এলাম সত্যপীরের হাটে (২০০১) হল এই দর্শনের অনুরণনে জঙ্গম। তবু কবি লক্ষ করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আগ্রাসনে ‘যুদ্ধ এসে গুঁড়িয়ে দিল পীরের হাটবাজার’ (‘আমার সূফী হওয়া হয় না)। বহুদিন ধরেই যুদ্ধ তার কাছে দুই সিলেবলের অশ্লীলতম শব্দ।
সাম্প্রতিক কলকাতায় বাংলা ভাষা তথা বঙ্গসংস্কৃতির অবলুপ্তি তাকে কষ্ট দেয়। পেলিকান পাখি যেমন নিজের রক্ত দিয়ে নিজের শুশ্রূষা করে তার দেখা পূর্বের কলকাতার স্মৃতির রক্ত দিয়ে শুশ্রূষা করতে চান অলোকরঞ্জন।
কলকাতার মানুষ তার ভাষা ভুলে গিয়েছে, তিনি দেখেন। আর কবির ভাষাই তো আবাসন। তাই তার ভয়, ‘কলকাতায় এলে বাংলা ভুলে যাব?’ (সাক্ষাৎকার, বইয়ের দেশ, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০১৩)
(পাঁচ)
২০০৫ সাল। চলে গেলেন তার সারাজীবনের আশ্রয় এবং তার এক বৃহৎ পরিবারের অগণন ভাইবোনের বড় বৌদি শ্রীমতী ট্রুডবার্টা দাশগুপ্ত। ২০০৬ সালে প্রকাশিত ‘ওষ্ঠে ভাসে প্রহত চুম্বন’ (এবং মুশায়েরা) স্বভাবতই বিদায়
বেলার বেদনায় বিধুর। এ বইয়ে দেখব, মৃত্যুপথযাত্রী কবিপত্নীর অনুরোধ তুমি বন্ধ চোখের পাতায় চুম্বন রোপণ কোরো না’ ফেলতে অপারগ কবির ওষ্ঠে ভাসে প্রহত চুম্বন। বাড়িতে অনবরত স্ত্রীর ছবির সামনে মোম জ্বালান কবি। আর উৎসুক হন সমাধিতে শায়িত হতে। ‘কিন্তু কবরের প্রহরীরা/বলল এ পান্থসদনে যুগ্মশয়নের অনুমতি – নেই”। সে-অনুমতি শেষমেষ মিলল। ৪ ডিসেম্বর, ২০২০ কবির চিতাভস্ম সমাহিত হন কবিপত্নীর পাশেই।
বৃহৎ যৌথ পরিবার তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মাঙ্গলিক শুশ্রূষা নিয়ে। ছোট বোন কিটি, ভগ্নীপতি প্রকাশ বসু, ভ্রাতৃবধু রত্না, ভ্রাতুষ্পুত্রেরা। বিশ্বভরা তাঁর প্রীতিধন্য সেবাব্রতী চিকিৎসক, লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও তাঁর অনুবাদকেরা। ইতিমধ্যে কবির নিজের একটি স্ট্রোক হয়ে গেছে, এসেছে অনিবার্য নিরাশাকরোজ্জ্বলতা।
স্বজনের শুশ্রূষায় ভর করে কবি উপনীত হলেন ‘আলো, আরো আলো’-র (২০০৯, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০১৩) উপকূলে। এই বইতেই আমরা দেখব, ‘সেই আমিও অলোকরঞ্জন শব্দে আলোয় যে দূরান্বয় যায়।’ শব্দ আলোর দূরান্বয়ী কবি গ্যোয়টের শেষ উক্তি ‘Lich mehr licht (Light, more light) – এর অনুরণনে লেখা ‘আলো, আরো আলো’র উপান্তে শেষ পাতাটার আগের পাতায় কূলকিনারালোলুপ’ এই প্রতীতিতে দ্রঢ়িষ্ঠ, “চোর নিয়েছে থালাবাসন, মাটি থেকে ভাত তবু খাব না।”
কবির কবিতাযাত্রায় নানা বাঁকবদল। কবিতা থেকে কবিতার সঞ্চারপথে পুনরুক্তিপ্রবণতা খারিজ করাই তাঁর কবিধর্ম। তবু সব পরিবর্তনের মাঝখানেও স্রোতের মাঝখানে ধ্রুবতারার মতো পরিস্ফুট হয়ে থাকে শুশ্ৰূষাময় এক কবিহৃদয়। সব বঞ্চনা, অবিচার, নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে বদ্ধপরিকর।
কবি শামসুর রাহমান-কে উৎসর্গ করা বাংলাদেশের যুক্ত প্রকাশন থেকে বের হওয়া। ‘নওল কিশোর এসেছে বুকের তলে’ (২০১৩) বইয়ে তাই কবি বলছেন,
চিরায়তের বিচিত্রানুষ্ঠানে
অনাথ শিশুর কান্না বাদ গেলে
একথা জেনো প্রলয় এসে গেছে। (বিচিত্রানুষ্ঠান)
দেবীপক্ষে বড়ো নাতি অলোকরঞ্জনের জন্মের পরে তাঁর ঠাকুর্দা তাঁর রিখিয়ার নতুন ভিটেবাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন। তিন বছর করলেই হয়, কিন্তু বড়ো নাতি অলোক রঞ্জনের ওপর ভার দিয়ে যাওয়া এই পুজো চলেছিল চল্লিশ বছর। কবি লিখছেন,
বসতবাড়ির শেষবারকার পুজোয়
শেফালিকার শুভ্র আগুনটাকে
চয়ন করে বেরিয়ে পড়লাম
প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে।
মীরা আমার প্রথম পর্যায়ের
কিছুটা পথ এগিয়ে দিয়েছিল,
সুদীপ আমার ছাত্রবন্ধু আমায়
সঙ্গ দিল ভিনদেশের গাঁয়ে
সেখানে দেখি অজস্র টিউলিপ
যা শুধু লাগে নশ্বরের কাজে,
শরণার্থীর ছাউনি প্রসাধনে,
বাঁধনছাড়া সৃষ্টির মেজাজে।
আমায় নিয়েই অনেক বিভাজন
মীরা এখনও শিউলি নিয়ে বিভোর,
টিউলিপেই বিহ্বল সুদীপ
তোমরা কী চাও, শিউলি না টিউলিপ?
(বিভাব কবিতা, তোমরা কী চাও, শিউলি না টিউলিপ, ২০১৭)
রিখিয়ায় তাঁদের একান্নবর্তী পরিবারের পুজোর শিউলি ফুল এসে মিশল ইয়োরোপীয় টিউলিপে। দেশজ তার শিকড়চেতনা যেমন মিলল আন্তর্জাতিক শরনার্থীচেতনায়।
সংকীর্ণ জাতিবর্গের পরিচয় মুছে ফেলে তার একটি পাখা প্রাচী, অন্য পাখা প্রতীচী। দেশজ আর আন্তর্জাতিক, শাশ্বত আর নৈমিত্তিক, গ্রামীণ আর নাগরিক, অস্তিত্ব আর অস্তিত্ব-অতিশায়ীর মধ্যে সেতু রচনা তাঁর ব্রত। সেতু গড়তে গড়তে সেতুর ওপর যে থাকে, তাকে তো রক্তাক্ত হয়ে যেতেই হয়। ‘ইন্দ্রধনুর সাঁকোয় কাঁটা বিছিয়ে বলো/ আমারই দায় তার উপরে সাঁতার কাটা।’ (দুধে আলতায় কুয়াশায় আঁকা ছবি, ২০০৮) সেতু গড়ার কাজ তবু জারি থাকে। কবি তাঁর সর্বশেষ বই ‘বাস্তুহারার পাহাড়তলি’ (২০২০) তে মালার্মের অনুরণনে যেমন বলবেন,
ভাষা যেরকম ঝাপটানি তুলে দূর
দিগন্তটাকে দিয়ে যায় হাতছানি
ভবিষ্যতের কবিতাও সেই মতো
গৃহকোণ থেকে মুক্তির সন্ধানী….
তাৎপর্যপূর্ণভাবে এ বইয়ের নাম ‘বাস্তুহারার পাহাড়তলি’। কবি একদা তাঁর ঠাকুর্দার রিখিয়ায় তাদের ভিটে বাড়িতে শৈশব কাটিয়েছেন। বরাবর শহরতলির বাসিন্দা আলো জার্মানির যে শহরতলিতে ভদ্রাসন পেতেছেন, তার নাম হির্শবার্গ, অর্থ হরিণপাহাড়। প্রবাসী এই সত্তার আকুতি তাঁর নতুন বইয়ের নামকরণে।
এর আগে তার একটি উল্লেখযোগ্য বই ‘দোলায় আছে ছ’পন কড়ি’তেও কবি হাল্টার বেঞ্জামিনকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, ‘উৎসভাষাকে নিজের ভাষায় উন্মুক্ত দেওয়াটাই আমাদের আসল কাজ। আমাদের লক্ষ্যক্রম হল, অনুবাদ্য ভাষার ধাঁচ ও ধরন স্বভাষায় ঢুকিয়ে দেওয়া এবং সেই মুক্তিবোধের গরজে নিজের ভাষার বহুব্যবহৃত শতজীর্ণ বেড়াজালগুলোর সমাপ্তিসাধন।’… (‘অনাবাসী যদি অনুবাদ করে )
ভাষার শুশ্রূষাও তো কবিকর্ম। কবি তার গোষ্ঠীর ভাষাকে অমলিন রাখেন। বহু ব্যবহারে জীর্ণ হতে হতে ঘষা পয়সার সঙ্গে অচল হয়ে পড়ে শব্দ, বাকবন্ধ, উপমা। সেই ভাষা কবির হাতে বুক টানটান টনকো যুবা হয়ে ওঠে। আমাদের ভাষাঞ্চলে যে-স্বল্পসংখ্যক গুণিজন গত অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আমাদের দুঃখিনী বর্ণমালার ক্ষমতাকে আরো ঋদ্ধ করে তোলবার কাজে ব্রতী, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তাঁদের অন্যতম। তৎসম, দেশজ, বিদেশি, আঞ্চলিক কোনো শব্দই তাঁর কাছে ব্রাত্য নয়। উপরন্তু নতুন নতুন শব্দের, প্রতিশব্দের নির্মাণ, নতুন নতুন সমাসবদ্ধ পদের জোড়কলম, ছন্দের বারান্দায় অক্লান্ত প্রব্রজ্যা তাঁর নিত্যকৃত্য। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভাষা-সংস্কৃতি-রাজনীতির নব অবস্থান, নতুন আন্দোলনগুলিকে বাংলা কবিতায় তিনি আজীবন সঞ্চারিত করে গেছেন। ভাষাতাত্ত্বিক জ্যাকবসনের মতো তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রচলিত ভাষাকে লঙ্ঘন করে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই তো কবিতা।
আমরা এই মিতকথনের উপান্তে উপনীত। ১৭ নভেম্বর, ২০২০ কবি চলে গেছেন, রয়ে গেছে তাঁর কাব্যসম্ভার। আমাদের দৃকপাতের অপেক্ষায়। তাঁরই কবিতার চরণ দিয়ে এ লেখায় ইতি টানি :
কবিতার আয়ু নিই চিনে
যা কিনা মৃত্যুর কব্জা থেকে
কবিকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে
তাকে বলে মৃত্যুর পরেও
ভ্রুমণ্ডলে কবিতা ঘনায়
জনপ্রিয়তার দশা থেকে
তুলে আনে প্রিয়জনতায়।
লেখক : ডাঃ রজতকান্তি সিংহচৌধুরী, কবি এবং প্রবান্ধিক ।

