সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

মির্জা মোঃ আব্দুল জব্বার ওরফে কুড়ান মেম্বার,

একাত্তরের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মধ্যে তিন কোটি মানুষ এখনো বেঁচে আছেন, যারা নিজ ভূমিতে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, দাবড়ানি খেয়েছেন, আবার ফিরে এসেছেন নিজ ভূমিতেই। তেমনি একজন আমিও। আমি মির্জা মোঃ আব্দুল জব্বার ওরয়ে কুড়ান মেম্বার। জন্ম: ১৫ আগষ্ট ১৯৪২ সাল। আমার বাবা আব্দুল করিম কৃষিকাজ করতেন। মাতা কহুরা খাতুন গৃহিনী। তিন ভাইবোনের মধ্যে আমি প্রথম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমিও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৬৯ সালের ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে জোয়ার আসতে শুরু করে। আমাদের এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা হাসনা গ্রামের এইচ এম মজিবর রহমান আওয়ামী লীগ করতেন। সিরাজগঞ্জ কলেজে যারা পড়তেন তারা প্রায় সবাই ছাত্রলীগ করতেন। এ ছাড়াও প্রায়ই আসতেন মহুকুমা আওয়ামী লীগ নেতা মোতাহার হোসেন তালুকদার, সৈয়দ হায়দার আলী এবং মাঝেমধ্যেই আসতেন। পাশ্ববর্তী রতনকান্দি ইউনিয়নের বাসিন্দা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীও মাঝেমধ্যে। স্থানীয় নেতাদের সাথে বিশেষ করে ছাত্রদের সাথে আমরাও আওয়ামী লীগ সমর্থক হয়ে উঠি। সত্তুরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং প্রাদেশিক পরিষদের প্রাথী সৈয়দ হায়দার আলী। আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের একটি ঘোষণা সাধারণ মানুষকেও আরো ক্ষিপ্ত করে তোলে। আমাদের কাছে মনে হতে থাকে যে, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে না-রাজী। ছাত্রদের সঙ্গে সঙ্গে আমরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি। নাওয়া-খাওয়া ভুলে স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল শুরু করি। পাশ্ববর্তী বাগবাটী হাই স্কুলে ছাত্ররা বাঁশের লাঠি নিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে। প্রশিক্ষণ দিতে এগিয়ে আসেন পাইনাবাড়ি গ্রামের আনসার সদস্য শাহজামাল। কিন্তু ২৫ মার্চ পাকসেনারা ঢাকাসহ বড় বড় শহরে হামলা চালালে সাধারণ মানুষ ভীত হয়ে পড়ে। শহর ছেড়ে মানুষ গ্রামে আসতে থাকে। ধীরে ধীরে স্বাধীনতা বিরোধী লোকজন নড়াচড়া বাড়তে থাকে। ২৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ মহুকুমা শহরে পাকসেনা আসার পর মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম ও পাকিস্তানপন্থীরা বাগবাটী ইউনিয়নে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। আমাদের এলাকায় শান্তি কমিটির নেতা হন ঢলডোব গ্রামের মনিরুজ্জামান মুন্সী এবং চক মোহনবাড়ির গ্রামের তমেজ উদ্দিন মিলিটারি। স্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধীদের নেতৃত্বে পাকসেনা নিয়ে এসে বাগবাটী অঞ্চলে হামলা চালায় মে মাসের শেষ সপ্তাহে। সেদিন সকালে আমি ক্ষেতে কাজ করার জন্য হালগরু নিয়ে এসেছি কুড়াগাছা হাটখোলার উত্তর পাশে নদীর অপর পাড়ে [এখন নদী নেই।] হঠাৎ দেখতে পাই হরিণাবাগবাটীর পাশের উত্তর আলোকদিয়ার গ্রামে আগুণ জ্বলছে। সে আগুণ দেখতে দেখতেই আবার কুড়াগাছা হাটখোলার পাশে সুধীর তাম্বুলির বাড়িতে আগুন দেখি। এ সময় ওই বাড়ির লোকজন বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছিল। পাকসেনা ও তার সহযোগিরা বেড়িয়ে আসে। দূর থেকে দেখতে পাই তাদের। আমি আমার গরুগুলোর দড়ি খুলে দেই। আর আমি ক্ষেতের আলের নিচে পালিয়ে থাকি যাতে আমাকে দেখতে না পায়, যদিও আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল যে, পাকসেনারা নদী পাড় হয়ে আসতে পারবে না। এ সময় লিচু সেনের বাড়ির পিছনে গুলি করে হত্যা করে মনোরঞ্জণ তাম্বুলি ও নরেণ তাম্বুলিকে। এর পর পাকসেনারা মালীগাঁতী ও হাসনায় চলে যায়। মালীগাতীতে হুÐি খাঁ ও মাঙ্গনকে হত্যা করে। হাসনায় গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা এইচ এস মজিবুর রহমানের বাড়িতে হামলা চালায়। তাকে না পেয়ে সে বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। তিন/চার ঘন্টা আলোকদিয়ার, হরিণা বাগবাটি ব্যাপক তাÐব চালিয়ে গোলাগুলি করে বিপুল সংখ্যক মানুষ হত্যা করে। এ সময় এলাকার বাইরের লোকজন এনে ব্যাপক ভাবে লুটপাট চালানো হয়। পাকসেনারা তাÐব চালিয়ে বাগবাটি ছেড়ে চলে যায়। পাকসেনারা চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন আসতে থাকে বাগবাটী অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে। সে দলে আমিও ঢুকে পড়ি। বিভিন্ন স্থানে লাশের স্তুপ পড়ে থাকতে দেখি, আবার কোথাও কোথাও একজন দুই জনের লাশও পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে আমি উত্তর আলোকদিয়ার ৭ জন. মসজিদের কাছে ৫ জন, হাটের পশ্চিম পাশে ৪ জন- এভাবে মোট ৬৫ জনের লাশ গুনতে সক্ষম হই। তবে পুরো গণহত্যায় ১শ’ তিরিশের ওপরে হত্যা করা হয়েছে বলে আমার ধারণা। শহিদ কারো কারো লাশ তাঁর স্বজনেরা নিয়ে দাফন অথবা পুঁতে ফেলেছে। এর মধ্যে কিছু শহিদের লাশ বাগবাটি স্কুল ঘরে থাকা হরিজনদের দিয়ে স্থানীয় বেশ কয়েকটি ইন্দারায় বা কুয়ার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যেমন দারোগ বাড়ির ইন্দারা এবং কুড়াগাছার হাটখোলার ইন্দারায়। এছাড়াও কোথাও ১০ জন আবার কোথাও এক জনকেও পুঁতে রাখা হয়েছে। সে হিসেবে অন্তত তিরিশটি স্থানে গণহত্যার লাশ মাটি চাঁপা দেওয়া হয়। বিকেলের দিকে গ্রামের মাঙ্গণ খাঁ এবং হুÐি খাঁর করবের ব্যবস্থা করা হয়। কবর খোঁড়া ও জানাযা দেন মালীগাঁতী গ্রামের সাফের প্রামানিক। এসব জানাযায় লোক হয় খুবই কম, বড় জোর ৭/৮ জন। কারণ তখনো মানুষের মধ্যে ভীতি যে যেকোনও সময় পাক বাহিনী ফিরে আসতে পারে। বাগবাটি গণহত্যার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্ন গ্রাম থেকে পালাতে শুরু করে। তরুণেরা দলে দলে যোগ দিতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে। তবে বাগবাটি অঞ্চলে পাকসেনা ও রাজাকারদের কোনও স্থায়ী ক্যাম্প করা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে একদিন হাসনার খালে শরণার্থীদের একটি নৌকা ডুবে যায়। আমরা তাদের উদ্ধার করে পরে তাদের চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করি। এলাকায় মাঝে মধ্যে পাকসেনা আসতো, তাদের নিয়ে আসতো স্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধীরা। এর কিছুদিন পর থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনার কথা শোনা যেতে থাকে। একদিন গভীর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা হামলা চালায় পাশ্ববর্তী সূবর্নগাতী গ্রামে। এদিন স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাÐে যুক্ত থাকার অভিযোগে আজিজ খাঁকে হত্যা করা হয়। পরে একদিন ব্রহ্মগাছা এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ও পাকসেনারা সঙ্গে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পরে শুনেছি, সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাশ্ববর্তী জোলাগাতী গ্রামে অবস্থান করছিল, পাকসেনা আসার খবরে তারা হামলা চালায়। এদিন স্বাধীনতা বিরোধী পক্ষ অবস্থান নেয় নদীর পূর্ব পাড়ে আর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ছিল নদীর পশ্চিম পাড়ে। ধীরে ধীরে এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। তারা অবশ্য দিনের বেলা চলাচল করতো না। তাছাড়াও বাগবাটি অঞ্চল এড়িয়ে চলতো। তবে শোনা যেত যে, নদী দিয়ে নৌকায় তারা যাতায়াত করতো। অবশেষে মুক্তিযোদ্ধারা দৃশ্যমান হয় ডিসেম্বর মাস থেকে। গ্রাম ছাড়ে স্বাধীনতা বিরোধীরা। ধীরে ধীরে বিভিন্ন এলাকা থেকে মহুকুমা শহরে জড় হয়ে পাকসেনারা ১৩ ডিসেম্বর রাতে সিরাজগঞ্জ থেকে পালিয়ে যায়। ১৪ ডিসেম্বর শহরে ঢুকে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা। মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। মীর্জা মোঃ আব্দুল জব্বার ওরফে কুড়ান মেম্বার। ৯ সন্তানের জনক। দীর্ঘদিন বাগবাটী ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। সাক্ষাৎকার গ্রহণ- ৩১ আগষ্ট ২০২১ সাল, বিকেলে, কুড়াগাছা হাটখোলায়।

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.